প্রথম পাতা

অবাধ নির্বাচনের তালা খুলবে কে?

সাজেদুল হক

২৪ জানুয়ারি ২০২২, সোমবার, ৯:৩১ অপরাহ্ন

কথাটি পুরনো। আবার নতুনও। বাংলাদেশ রাষ্ট্রের জন্মের নেপথ্যে ব্যালটের ভূমিকা ঐতিহাসিক। মূলত সত্তরের নির্বাচনে এদেশের জনগণ পাকিস্তান রাষ্ট্রের মৃত্যু ঘোষণা করে। অবশ্যম্ভাবী হয়ে ওঠে বিশ্বের মানচিত্রে নতুন একটি রাষ্ট্রের অভ্যুদয়। ভাত ও ভোটের অধিকারের জন্য এ ভূমের মানুষকে কম লড়তে হয়নি। সমালোচনা বা ত্রুটি আছে। তবে কেয়ারটেকার সরকারের আমলেই এদেশে অপেক্ষাকৃত সবচেয়ে ভালো চারটি নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়েছে। কেয়ারটেকারের এই ব্যবস্থা সংখ্যাগরিষ্ঠ মতের ভিত্তিতে সুপ্রিম কোর্টে বাতিল হয়ে যায়। এ মামলার শুনানিকালে প্রবীণ আইনজীবী সদ্যপ্রয়াত টি এইচ খান হুঁশিয়ারি উচ্চারণ করেছিলেন। পরবর্তীতে কী হয়েছে তা সবারই জানা। যদিও স্বচ্ছ, অবাধ ও সুষ্ঠু নির্বাচনের সাংবিধানিক বাধ্যবাধকতার কথা বেঞ্চের সব বিচারপতিই স্বীকার করেছিলেন।

কিন্তু আমরা এখন কোথায় দাঁড়িয়ে? রায়ের পর দু’টি আলোচিত নির্বাচন হয়ে গেছে। এতে কী হয়েছে তা সবারই জানা। এই পরিস্থিতিতে দীর্ঘদিন ধরেই নির্বাচন কমিশন গঠনে আইনের দাবি ওঠছিল। সুশাসনের জন্য নাগরিক- সুজন এ সংক্রান্ত আইনের একটি খসড়াও আইনমন্ত্রী আনিসুল হকের কাছে দাখিল করেছিল। আইনমন্ত্রী আইনের প্রয়োজনীয়তার কথা স্বীকার করলেও বারবারই এটা সাফ জানিয়ে আসছিলেন, এবার নির্বাচন কমিশন গঠনের ক্ষেত্রে আইন করা সম্ভব নয়। সময় না থাকার কথাই জানাচ্ছিলেন তিনি। কিন্তু কোথা থেকে কি হলো! হঠাৎই মন্ত্রিসভা নতুন আইনের খসড়া অনুমোদন করলো। এ সংক্রান্ত বিলও গতকাল সংসদে ওঠে গেছে। এতে আগের দুই সার্চ কমিটিকে বৈধতা দেয়া হয়েছে। নতুন আইনে আবার সার্চ কমিটির মাধ্যমেই নির্বাচন কমিশন গঠনের বিধান রাখা হয়েছে।

এটা সত্য- দীর্ঘ পঞ্চাশ বছর পর সংবিধানের একটি ম্যান্ডেট পূর্ণ হতে চলছে। নির্বাচন কমিশন গঠনে আইনের বিষয়টি তো সংবিধানেরই নির্দেশনা। সংবিধানের ১১৮ (১) অনুচ্ছেদে বলা হয়েছে, ‘প্রধান নির্বাচন কমিশনার এবং অনধিক চারজন নির্বাচন কমিশনারকে লইয়া বাংলাদেশের একটি নির্বাচন কমিশন থাকিবে এবং উক্ত বিষয়ে প্রণীত কোনো আইনের বিধানাবলী-সাপেক্ষে রাষ্ট্রপতি প্রধান নির্বাচন কমিশনারকে ও অন্যান্য নির্বাচন কমিশনারকে নিয়োগদান করিবেন।’ দীর্ঘদিন পরে হলেও এ ব্যাপারে আইন পাসের উদ্যোগ নেয়ায় সরকার সাধুবাদ পাওয়ার যোগ্য। কিন্তু বিলিয়ন ডলারের প্রশ্ন হচ্ছে, নতুন আইন পরিস্থিতির কোনো পরিবর্তন আনবে কিনা?

পুরনো গল্প। যুদ্ধে পরাজিত সেনাপতির কাছে রাজা পরাজয়ের কারণ জানতে চাইলেন। সেনাপতি বললেন, একশ’ একটা কারণ আছে। বলো শুনি। বারুদ ভিজে গিয়েছিল। রাজা বললেন, আর কারণ শোনার প্রয়োজন নেই। নির্বাচন কমিশন আইন বা যেভাবেই নির্বাচন কমিশন গঠন হোক না কেন সবচেয়ে বড় প্রশ্নটি থেকে যাবে, এতে অবাধ নির্বাচনের কোনো সম্ভাবনা তৈরি হয় কিনা?
আপিল বিভাগের সাবেক বিচারপতি এম এ মতিনের সাক্ষাৎকার পড়ছিলাম প্রথম আলো’তে। দৃশ্যত নতুন আইন নিয়ে তিনি হতাশাই প্রকাশ করেছেন। বলেছেন, আমাদের যদি জটিলেশ্বর মুখোপাধ্যায়ের মতো একজন সংগীতশিল্পী থাকতেন, তিনি গাইতে পারতেন, এ কোন সকাল, রাতের চেয়েও অন্ধকার। নাগরিক সমাজের প্রতিনিধিরাও এ আইন নিয়ে সংশয় প্রকাশ করেছেন।

এদেশে নির্বাচন কমিশন নিয়ে বহুকথা হয়েছে। কোনো কোনো নির্বাচন কমিশন হয়েছে প্রশংসিত। কলঙ্ক নিয়ে বিদায় নিতে হয়েছে কাউকে কাউকে। কিন্তু নির্বাচনে আদৌ রেফারির ভূমিকা কতোটা? নির্বাচন কমিশন কি সবসময় অবাধ নির্বাচন চায়? নির্বাচন কমিশন চাইলেই কী অবাধ নির্বাচন সম্ভব। এমনিতে সংবিধান অনুযায়ী, নির্বাচনের সময় রাষ্ট্রের সকল কর্তৃপক্ষ নির্বাচন কমিশনকে সহযোগিতা করতে বাধ্য। কিন্তু কেতাবের এই কথা বাস্তবে কতোটা প্রতিফলন হয় তা নিয়ে বড় প্রশ্ন রয়েই গেছে। পর্যবেক্ষক মাত্রই এটা স্বীকার করেন, বাংলাদেশে কেমন নির্বাচন হবে তা নির্ভর করে ক্ষমতায় থাকা সরকার কেমন নির্বাচন চায় তার ওপর। সরকার চাইলে নির্বাচন কমিশনের পক্ষে অবাধ ও সুষ্ঠু নির্বাচন না করার উপায় নেই। আবার সরকার না চাইলে কমিশনের পক্ষে অবাধ নির্বাচন করাও সম্ভব হয় না।

পর্যবেক্ষকরা বলছেন, নতুন আইন অবাধ ও সুষ্ঠু নির্বাচনের পক্ষে কোনো আশাবাদ তৈরি করতে পারছে না। বরং প্রশ্ন ও সংশয়ই বাড়ছে। তাই বলে এ আইন অবাধ নির্বাচনের পথে বাধাও হবে না। প্রশ্নটি হচ্ছে, রাজনৈতিক সমঝোতার। রাজনৈতিক সমঝোতা হলে, বিবদমানপক্ষগুলো অবাধ ও স্বচ্ছ নির্বাচন চাইলে নির্বাচন কমিশন আইনটি নিয়ে আরও আলোচনা হতে পারে। সম্ভব আরও গ্রহণযোগ্য আইন প্রণয়নও। অবাধ নির্বাচনের তালা খুলতে পারে এতে। বহু সংকটের সমাধানসূত্র এখানেই।
প্রধান সম্পাদক মতিউর রহমান চৌধুরী
জেনিথ টাওয়ার, ৪০ কাওরান বাজার, ঢাকা-১২১৫ এবং মিডিয়া প্রিন্টার্স ১৪৯-১৫০ তেজগাঁও শিল্প এলাকা, ঢাকা-১২০৮ থেকে
মাহবুবা চৌধুরী কর্তৃক সম্পাদিত ও প্রকাশিত।
ফোন : ৫৫০-১১৭১০-৩ ফ্যাক্স : ৮১২৮৩১৩, ৫৫০১৩৪০০
ই-মেইল: [email protected]
Copyright © 2022
All rights reserved www.mzamin.com