শেষের পাতা

সর্বনিম্ন বেতন নির্ধারণ, ব্যাংক খাতে বিতর্ক

আলতাফ হোসাইন

২৪ জানুয়ারি ২০২২, সোমবার, ৯:২৭ অপরাহ্ন

সম্প্রতি ব্যাংকারদের সর্বনিম্ন বেতন নির্ধারণ করে দিয়েছে বাংলাদেশ ব্যাংক। পাশাপাশি লক্ষ্য পূরণে ব্যর্থতা ও অদক্ষতার অজুহাতে কাউকে চাকরিচ্যুত করা যাবে না বলেও নির্দেশনা দেয়া হয়েছে। করোনাকালে কয়েকটি ব্যাংকের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বেতন কমানো ও চাকরিচ্যুতির ঘটনার প্রেক্ষিতে কেন্দ্রীয় ব্যাংক এমন উদ্যোগ নিয়েছে। এই উদ্যোগকে ব্যাংক কর্মকর্তারা ও চাকরি প্রত্যাশীরা ইতিবাচক হিসেবে দেখলেও ব্যাংক খাতে এ নিয়ে বিতর্ক তৈরি হয়েছে। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের এমন নির্দেশনাকে সরাসরি হস্তক্ষেপ এবং চাপিয়ে দেয়া সিদ্ধান্ত বলে মনে করছে দেশের বেসরকারি ব্যাংকগুলো। অদক্ষদের চাকরিচ্যুত করা যাবে না- এমন নিয়মও গ্রহণযোগ্য নয় বলে মনে করছেন তারা। তবে, ব্যাংকের পরিচালক পর্যায়ে এবং কর্মকর্তাদের মধ্যে যে বেতন বৈষম্য বিরাজ করছে সেটি কমিয়ে আনতে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের এমন নির্দেশনাকে ইতিবাচকভাবেই দেখছেন বিশেষজ্ঞরা।

গত বৃহস্পতিবার এক প্রজ্ঞাপনে বাংলাদেশ ব্যাংক ব্যাংকারদের ন্যূনতম বেতন নির্ধারণের নির্দেশনা দেয়। প্রজ্ঞাপনে বলা হয়, ট্রেইনি সহকারী কর্মকর্তা (ক্যাশ) ও জেনারেল এবং সহকারী কর্মকর্তাদের সর্বনিম্ন বেতন হবে ২৮ হাজার টাকা, আর শিক্ষানবিশকাল শেষ হলে বেতন-ভাতা দাঁড়াবে ৩৯ হাজার টাকা। এ ছাড়া অফিস সহকারী, নিরাপত্তাকর্মী, পরিচ্ছন্নতাকর্মী ও মেসেঞ্জারদের সর্বনিম্ন বেতন হবে ২৪ হাজার টাকা। পাশাপাশি লক্ষ্য পূরণে ব্যর্থতা ও অদক্ষতার অজুহাতে কাউকে চাকরিচ্যুত করা যাবে না।
ব্র্যাক ব্যাংকের চেয়ারম্যান ড. আহসান এইচ মনসুর বলছেন, বাংলাদেশ ব্যাংক হলো রেগুলেটরি প্রতিষ্ঠান। তাদের আসল দায়িত্ব ব্যাংকের যে বিধিবিধান রয়েছে সেগুলো তারা প্রতিপালন করবে। তারা গ্রাহকদের স্বার্থরক্ষায় কাজ করবে। বিজনেস কীভাবে চালাবে সেটি দেখবে প্রতিষ্ঠানের ম্যানেজমেন্ট। এখানে বাংলাদেশ ব্যাংক এমন সিদ্ধান্ত দিতে পারে না বলে মনে করেন এই অর্থনীতিবিদ। তিনি মানবজমিনকে বলেন, এটা সরাসরি হস্তক্ষেপের সমতূল্য। পৃথিবীর কোনো দেশে এটা করা হয় না। ব্যাংকিং খাতের বেতন কাঠামো এমনিতেই সাধারণ ইন্ডাস্ট্রির থেকে অনেক বেশি। যেকোনো প্রতিষ্ঠানের পিয়ন কিংবা সর্বনিম্ন পদের কর্মচারীরা চাকরিতে প্রবেশ করলে বেতন হয় ১০ থেকে ১৫ হাজার টাকা। গার্মেন্টেও বেতন নির্ধারণ করা হয়েছে, তাদের বেতন সর্বনিম্ন ৮ হাজার টাকা। সেখানে ব্যাংকের ক্ষেত্রে ২৪ হাজার টাকা ন্যূনতম বেতন নির্ধারণ করা হলো কেন? আহসান এইচ মনসুর বলেন, প্রতিষ্ঠানে তার কর্মকর্তাদের যার যেমন পারফরম্যান্স তার ওপর ভিত্তি করে বেতন নির্ধারণ করবে। কিন্তু এই নির্দেশনায় বলা হচ্ছে অদক্ষ হলেও তাকে এমনিই বেতন-ভাতা বাড়িয়ে দিতে হবে। তিনি বলেন, ব্যাংকগুলোর সক্ষমতা যাচাই না করেই এই নির্দেশনা চাপিয়ে দেয়া হচ্ছে। নতুন নিয়োগ পাওয়া কর্মীদের বেশি বেতন হলে, পুরনোদের বেতনও সমন্বয় করতে হবে। তখন ব্যাংকের আর্থিক ব্যবস্থাপনাকে দুর্বল করবে।
তবে, বাংলাদেশ ব্যাংকের এমন সিদ্ধান্ত ইতিবাচক হিসেবে দেখছেন সাবেক গভর্নর ড. সালেহউদ্দিন আহমেদ। তিনি মানবজমিনকে বলেন, আমি এটাকে ইতিবাচক হিসেবেই দেখছি। কারণ বেসরকারি ব্যাংকগুলো কর্মকর্তা-কর্মচারীদের নিয়োগ এবং চাকরিচ্যুত করার যে নিয়মগুলো রয়েছে তা খুব বেশি ফলো করে বলে মনে হয় না। বেসরকারি ব্যাংকগুলো নিজেদের ব্যবসার স্বার্থে সবকিছু করে। এখানে এমন নির্দেশনা দরকার ছিল। সেই হিসেবে আমি মনে করি বাংলাদেশ ব্যাংকের এমন সিদ্ধান্ত খারাপ হয়নি। তিনি বলেন, বেসরকারি ব্যাংকগুলোতে সর্বোচ্চ এবং সর্বনিম্ন বেতনে অনেক ফারাক। একজন পায় ৫-১০ লাখ টাকা, আরেকজন পায় ১৫-২০ হাজার টাকা। এটা তো ঠিক না। বিশিষ্ট এই অর্থনীতিবিদ বলেন, সরকার যদি সুদের ব্যাপারে নয়-ছয় করে তখন মানা হয়। তাহলে এটাতে আপত্তি কিসের? এটা তো আরও মানবিক। তিনি বলেন, যদি কোনো ব্যাংক তাদের সক্ষমতা বিবেচনায় এটা মানতে না চান। তাহলে তারা বাংলাদেশ ব্যাংকে বলুক যে, আমাদের এই সমস্যা। তখন বাংলাদেশ ব্যাংক মনিটরিং করে দেখবে যে আসলেই তাদের সক্ষমতা আছে কি নেই। সেই অনুযায়ী তারা ব্যবস্থা নেবে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্যমতে, গত বছর বেসরকারি ছয়টি ব্যাংকে বিশেষ পরিদর্শন করে কেন্দ্রীয় ব্যাংক। এতে ২০২০ সালের ১লা জানুয়ারি থেকে ২০২১ সালের ৯ই আগস্ট পর্যন্ত ওই ছয় ব্যাংকের ৩ হাজার ৩১৩ জন কর্মকর্তা চাকরি ছাড়ার তথ্য উঠে আসে। এর মধ্যে ‘স্বেচ্ছায়’ পদত্যাগ করেছেন ৩ হাজার ৭০ জন। বাকিদের মধ্যে ১২ কর্মকর্তাকে ছাঁটাই, ২০১ কর্মকর্তাকে অপসারণ ও ৩০ কর্মকর্তাকে বরখাস্ত করা হয়েছে। কিন্তু যেসব কর্মকর্তা স্বেচ্ছায় পদত্যাগ করেছেন বলে ব্যাংকগুলো জানিয়েছে, সেটাকে অস্বাভাবিক ঘটনা মনে করে কেন্দ্রীয় ব্যাংক। এর পরিপ্রেক্ষিতে গত বছরের সেপ্টেম্বরে কয়েকটি ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালকদের (এমডি) সঙ্গে আলোচনা করেন বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর ফজলে কবির। তখন বেসরকারি ব্যাংকগুলোর সর্বনিম্ন বেতনসহ বিভিন্ন বিষয় জানতে পারে কেন্দ্রীয় ব্যাংক। সে অনুযায়ী কেন্দ্রীয় ব্যাংক গত বৃহস্পতিবার বেসরকারি ব্যাংক খাতের বেতন-ভাতা বিষয়ে প্রজ্ঞাপন জারি করে। যা আগামী মার্চ থেকে কার্যকর হবে বলে জানানো হয়।
ওই প্রজ্ঞাপনে বলা হয়েছে, ব্যাংকের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা (সিইও) বা ব্যবস্থাপনা পরিচালকের (এমডি) পরের পদের কর্মকর্তা-কর্মচারীর সঙ্গে নিম্ন পদের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বেতন-ভাতার পার্থক্য যৌক্তিকভাবে নির্ধারণ করতে হবে। তবে কোনো কর্মকর্তা-কর্মচারীর বেতন-ভাতা কমানো যাবে না। এ ছাড়া চাকরি স্থায়ীকরণ ও বার্ষিক বেতন বৃদ্ধির জন্য ব্যাংকারদের আমানত সংগ্রহের লক্ষ্যও বেঁধে দেয়া যাবে না।
কেন্দ্রীয় ব্যাংক বলেছে, ব্যাংকের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের নিষ্ঠা, নৈতিকতা, মনোবল ও কর্মস্পৃহা অটুট রাখতে তাদের যথাযথ বেতন-ভাতা প্রদান আবশ্যক। কিন্তু সম্প্রতি লক্ষ্য করা গেছে যে, কিছু ব্যাংকে প্রথম ধাপের কর্মকর্তাদের বেতন-ভাতা যথাযথভাবে নির্ধারণ না করে ইচ্ছামাফিক করা হচ্ছে, যা উচ্চপর্যায়ে কর্মরত কর্মকর্তাদের বেতন-ভাতার তুলনায় খুবই কম। উচ্চ ও নিম্নপর্যায়ের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বেতন-ভাতার মধ্যে এ রকম অস্বাভাবিক ব্যবধান কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়। আরও দেখা গেছে, কোনো কোনো ব্যাংকে একই পদে নিয়োজিত কর্মকর্তা ও কর্মচারীরা ভিন্ন ভিন্ন বেতন-ভাতা পাচ্ছেন। তা ছাড়া নির্ধারিত লক্ষ্য অর্জন করতে না পারা বা অদক্ষতার অজুহাত তোলা ও বেতন-ভাতার ভিন্নতার কারণে কর্মকর্তা-কর্মচারীদের মধ্যে সংশ্লিষ্ট ব্যাংককে নিজের প্রতিষ্ঠান মনে করে একনিষ্ঠ ও অঙ্গীকারবদ্ধ হয়ে কাজ করার মনোভাব গড়ে ওঠে না। এতে অদক্ষতা, অসম প্রতিযোগিতা ও নৈতিক অবক্ষয়সহ বিভিন্ন ধরনের জটিলতার উদ্ভব হয়, যা সুষ্ঠুভাবে মানবসম্পদ ব্যবস্থাপনা ও সুশাসন প্রতিষ্ঠার অন্তরায় এবং ব্যাংকের জন্য ক্ষতিকর।
প্রধান সম্পাদক মতিউর রহমান চৌধুরী
জেনিথ টাওয়ার, ৪০ কাওরান বাজার, ঢাকা-১২১৫ এবং মিডিয়া প্রিন্টার্স ১৪৯-১৫০ তেজগাঁও শিল্প এলাকা, ঢাকা-১২০৮ থেকে
মাহবুবা চৌধুরী কর্তৃক সম্পাদিত ও প্রকাশিত।
ফোন : ৫৫০-১১৭১০-৩ ফ্যাক্স : ৮১২৮৩১৩, ৫৫০১৩৪০০
ই-মেইল: [email protected]
Copyright © 2022
All rights reserved www.mzamin.com