দেশ বিদেশ

নীরব উপাচার্য যেভাবে সক্রিয়

স্টাফ রিপোর্টার, সিলেট থেকে

২৪ জানুয়ারি ২০২২, সোমবার, ৯:১৫ অপরাহ্ন

তিনদিন ধরে মুখ বন্ধ শাহ্‌জালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের ভিসি অধ্যাপক ফরিদ উদ্দিন আহমদের। বিশ্ববিদ্যালয়ের উদ্ভূত পরিস্থিতি নিয়ে তিনি মিডিয়ার সামনে আর কথা বলছেন না। নিজ বাংলোতেই অবস্থান করছেন। যারা যাচ্ছেন দেখা করছেন। ভিসিপন্থি শিক্ষক ও কর্মকর্তারা যাচ্ছেন, তার সঙ্গে দেখাও করছেন। অনশনস্থলেও রয়েছেন তার প্রতিনিধরা। ঘটনা পর্যবেক্ষণ করছেন। মুহূর্তে মুহূর্তে খবর যাচ্ছে ভিসির দরবারে। শাবি ক্যাম্পাসে আপাত দৃষ্টিতে মনে হচ্ছে; ভিসি নীরব হয়ে পড়েছেন। কিন্তু না, নানা সূত্র সেটি বলছে না। ভিসি অধ্যাপক ফরিদ উদ্দিন আহমদ সক্রিয়ই রয়েছেন। নিজ বাসভবনে বসেই তিনি গোটা বিষয়টি মনিটরিং করছেন। নিজের অবস্থান সুসংহত রেখে তিনি সমঝোতার মাধ্যমেই আন্দোলনরত শিক্ষার্থীদের সঙ্গে ঘটনার পরিসমাপ্তি করতে চান। তবে, হাসপাতালের দিকেই তার নজর বেশি। কারণ. এই মুহূর্তে অনশনস্থল থেকে অসুস্থ হয়ে যেসব শিক্ষার্থী হাসপাতালে ভর্তি হচ্ছে, তাদের দিকেই বেশি মনোযোগ। চিকিৎসায় যাতে কোনো ত্রুটি না হয় সেদিকে নজর রাখছেন। ঘণ্টায় ঘণ্টায় খবর নিচ্ছেন হাসপাতালে। ভিসির ঘনিষ্ঠ কয়েকজন শিক্ষক জানিয়েছেন, আমরণ অনশনস্থল থেকে যারা হাসপাতালে যাচ্ছে তাদের জীবন নিয়ে শঙ্কা রয়েছে। কোনো ‘অঘটন’ ঘটে গেলে বিষয়টি জটিল আকার ধারন করবে। এ কারণে ভিসির নজর ওদিকেই বেশি। পাশাপাশি তিনি বিষয়টি দীর্ঘ করতেও চাচ্ছেন। কারণ, শিক্ষার্থীদের এই আন্দোলনে বাইরের ইন্ধনের বিষয়টি পরিষ্কার নয়। কেবল বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক শিক্ষার্থীদের সঙ্গে আন্দোলনরত শিক্ষার্থীদের যোগাযোগ আছে। এর বাইরে কারও সঙ্গে নয়। ফলে আন্দোলনরত শিক্ষার্থীরা ক্লান্ত হয়ে গেলে আলোচনায় বিষয়টি সমাধানের পথ খুঁজছেন ভিসি। এজন্য সিলেট আওয়ামী লীগের নেতাদের উপরও ভরসা রেখে চলেছেন। শিক্ষার্থীরা জানিয়েছে, ভিসি ঘটনার শুরু থেকেই নানা নাটকীয়তা করছেন। এসব তিনি করছেন বাংলোতে বসেই। তিনি শিক্ষার্থীদের এই আন্দোলন নিয়ে রাজনীতি করছেন। প্রথমে ক্যাম্পাস, এরপর সিলেটের নেতৃবৃন্দ এবং সর্বশেষ বিষয়টি শিক্ষামন্ত্রী পর্যন্ত গড়িয়েছেন ভিসি নিজেই। আর এতদূর যাওয়ার পেছনে কারণ একটাই- তার চেয়ার ঠিক রাখা। বেগম সিরাজুন্নেছা চৌধুরী হলে ঘটনার সূত্রপাত হয়েছিল ১৩ই জানুয়ারি রাতে। ওই হলের প্রভোস্ট করোনা আক্রান্ত হলেও ভিসি ফরিদ উদ্দিন আহমদ ক্যাম্পাসে ছিলেন। তিনি চাইলে বিষয়টির তাৎক্ষণিক সমাধান দিতে পারতেন। কিন্তু তিনি সেটি না করে তার অদক্ষতার পরিচয় দিয়েছেন। শিক্ষকদের দিয়ে বিষয়টিকে আরও জটিল করে তুলেছেন। এরপর ১৬ই জানুয়ারি ঘটে বিশ্ববিদ্যালয়ের ইতিহাসের পুলিশ-শিক্ষার্থী সংঘর্ষের ঘটনা। ওইদিন বিকালে ভিসিকে আইসিটি ভবনের ভেতরে অবরুদ্ধ করে রেখেছিলেন শিক্ষার্থীরা। তার আগেই ক্যাম্পাসে খবর রটে; দাবি মেনে নিয়ে বিশ্ববিদ্যালয় বন্ধের ঘোষণা আসতে যাচ্ছে। বিষয়টি সমাধানের পথেই ছিল। কিন্তু ক্যাম্পাসে শিক্ষার্থীদের ধাওয়ার কারণে ভিসি নিজেই সমাধানের পথ বন্ধ করে দেন। ওইদিন দুপুর থেকে ভিসি ক্যাম্পাসের ভেতরে ডেকে নিয়ে আসেন পুলিশ। সশস্ত্র অবস্থানে পুলিশ থাকলেও শিক্ষার্থীরা শান্তিপূর্ণভাবেই তাদের কর্মসূচি চালিয়ে যাচ্ছিল। কিন্তু অবরুদ্ধ অবস্থা থেকে মুক্ত হতে ভিসি শিক্ষার্থীদের উপর পুলিশ লেলিয়ে দিয়েছেন বলে শুরু থেকেই এ অভিযোগ করে আসছেন আন্দোলনকারী শিক্ষার্থীরা। পুলিশ শিক্ষার্থীদের উপর সাউন্ড গ্রেনেড নিক্ষেপ ও রাবার বুলেট ছোড়া ছাড়াও বেধরক লাঠিচার্জ করে। আর এ ঘটনার পর থেকেই শিক্ষার্থীরা ক্যাম্পাসে ভিসির পদত্যাগ দাবিতে একদফা আন্দোলন শুরু করে। এরপর ভিসি বিশ্ববিদ্যালয় অনির্দিষ্টকালের জন্য বন্ধ ঘোষণা ও হল ছাড়ার নির্দেশ দিয়েছিলেন। ভিসির তরফ থেকে বলা হয়েছিল; জরুরি সিন্ডিকেট সভায় সিদ্বান্ত নিয়ে বিশ্ববিদ্যালয় বন্ধের ঘোষণা দেয়া হয়েছে। কিন্তু ছাত্র আন্দোলনের প্রথমদিন থেকেই ভিসি নানা নাটকীয়তা করেন। এসব নাটকীয়তার কারণেই মুলত শিক্ষার্থীদের ক্ষোভ বাড়ে। তারা শেষ পর্যন্ত আমরণ অনশন ও পরবর্তীতে গণঅণশনের ডাক দেয়। পুলিশের সঙ্গে শিক্ষার্থীদের সংঘর্ষের ঘটনার পর ভিসির তরফ থেকে বলা হয়েছে শিক্ষার্থীদের সঙ্গে মিশে কোনো পক্ষ ক্যাম্পাসে পুলিশের উপর হামলা চালিয়েছে। এরপর পুলিশ পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনে। ওই রাতে সাংবাদিকদের কাছে দেয়া বক্তব্যে ভিসি জানিয়েছিলেন, বহিরাগতদের ইন্ধনে ক্যাম্পাসে হামলা ও এসব ঘটনা ঘটানো হয়েছে। এরপর ভিসি ও তার পন্থি শিক্ষকরা অভিযোগ করে জানান, শিক্ষার্থীরা তাদের গালিগালাজ করে। এমনকি ভিসির ইশারায় ক্যাম্পাসে আন্দোলনরত শিক্ষার্থীদের মুখোমুখি হয়েছিলেন শিক্ষকরা। তবে- এতে সংগঠন হিসেবে শিক্ষক সমিতির নেতারা অংশ নেননি। কিংবা তারা ভিসির পক্ষে অবস্থান নিয়ে কথা বলেননি। সমঝোতার চেষ্টা করে যান। ক্যাম্পাসে ছাত্র বিক্ষোভ ছড়িয়ে পড়লে প্রধান ফটকে নিয়ে আসা হয় সাঁজোয়া যান ও জলকামান। এছাড়া বিশ্ববিদ্যালয়ের পেছনের ফটকে র‌্যাবের টহল জোরদার করা হলে শিক্ষার্থীদের মধ্যে তীব্র আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে। এ কারণে ১৭ই জানুয়ারি শিক্ষার্থীরা বিশ্ববিদ্যালয়ে সবক’টি প্রবেশমুখে বাঁশ দিয়ে ব্যারিকেড দেয়। পাশাপাশি বালির বস্তা ফেলে পথরোধ করে দেয়। শিক্ষার্থীরা অভিযোগ করেন, ভিসির নির্দেশেই আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যরা শিক্ষার্থীদের মধ্যে আতঙ্ক ছড়ায়। এতে তারা আরও ক্ষুব্ধ হয়। তারা জানায়, শিক্ষকরা ভালোবাসার তাগিদে দায়িত্ববোধ থেকে বারবার এলেও ভিসি আসেননি। তিনি নিজ বাংলোতে বসেই শিক্ষার্থীদের হটাতে নানা কৌশল করে যান। এমনকি প্রথমদিন পুলিশের হামলার ঘটনায় আহত হওয়া শিক্ষার্থীদের তিনি দেখতে যাননি। তাদের চিকিৎসার দেখভাল কিংবা খরচ বহন করেননি। ভিসির এই আচরণে শিক্ষার্থীরা আরও বেশি আহত হয়েছেন। তারা আরও জানায়, ভিসি প্রথমে বাইরের ইন্ধন, পরে গালিগালাজ ও সর্বশেষ বেয়াদব হিসেবে শিক্ষার্থীদের তকমা দেয়ার চেষ্টা করেছিলেন। কিন্তু সেটি হয়নি। একদফা দাবিতে আলোচনা শুরু নিয়ে শিক্ষার্থীদের উপর নানা মহল থেকে ক্ষোভ প্রকাশ করা হয়। এ কারণে শিক্ষার্থীরা শেষে আলোচনা শুরু করেছেন। গতকাল দুপুরে আন্দোলনরত শিক্ষার্থী নুরুল মোহাইমিন রাজ জানিয়েছেন, ‘গত শনিবার সন্ধ্যায় বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক প্রতিনিধির সঙ্গে বৈঠকের পর শিক্ষামন্ত্রীর প্রতিক্রিয়া ছিল কড়া। কিন্তু শনিবার রাতে যখন তারা শিক্ষামন্ত্রীর সঙ্গে ভার্চ্যুয়াল আলোচনায় বক্তব্য উপস্থাপন করেন তখন শিক্ষামন্ত্রী অনেকটা শান্ত হয়েছেন। মন্ত্রীর কথামতো আমরা আমাদের দাবি ও বক্তব্য লিখিত আকারে শিক্ষামন্ত্রীকে জানাচ্ছি।’ তিনি বলেন, ‘শিক্ষামন্ত্রী যখনই চাইবেন আমরা তার সঙ্গে আলোচনা করবো। কিন্তু আমাদের একদফা দাবি হচ্ছে- ভিসির অপসারণ। এই ভিসি ক্যাম্পাসে থাকলে শিক্ষার্থীরা অনিরাপদ থাকবে না।’ এদিকে, ভিসি ফরিদ উদ্দিন আহমদের পক্ষে রয়েছেন দেশের প্রায় ৩৪টি পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের ভিসিরা। এর বাইরে বাংলাদেশ শিক্ষক সমিতি ফেডারেশনও ইতিমধ্যে ভিসির পক্ষে বিবৃতি দিয়েছে।
প্রধান সম্পাদক মতিউর রহমান চৌধুরী
জেনিথ টাওয়ার, ৪০ কাওরান বাজার, ঢাকা-১২১৫ এবং মিডিয়া প্রিন্টার্স ১৪৯-১৫০ তেজগাঁও শিল্প এলাকা, ঢাকা-১২০৮ থেকে
মাহবুবা চৌধুরী কর্তৃক সম্পাদিত ও প্রকাশিত।
ফোন : ৫৫০-১১৭১০-৩ ফ্যাক্স : ৮১২৮৩১৩, ৫৫০১৩৪০০
ই-মেইল: [email protected]
Copyright © 2022
All rights reserved www.mzamin.com