প্রথম পাতা

শাবি সংকট

হাসপাতালে ১৪ শিক্ষার্থী আলোচনার প্রস্তাব শিক্ষামন্ত্রীর

ওয়েছ খছরু ও আরাফ আহমদ, সিলেট থেকে

২২ জানুয়ারি ২০২২, শনিবার, ৯:৪৯ অপরাহ্ন

টানা চারদিন ধরে অনশনে শিক্ষার্থীরা। মুখে তুলছেন না পানিও। অসুস্থ হয়ে হাসপাতালে যাচ্ছেন। একটু সুস্থ হয়েই আবার ফিরে আসছেন অনশনস্থলে। এভাবেই কাটছে তাদের সময়। তবে অভুক্ত থেকে অনেকেই উঠে দাঁড়াতে পারছেন না। শক্তি হারিয়ে ফেলেছেন। কেউ কেউ শয্যাশায়ী। সর্বশেষ হিসাব মতে, অনশনস্থল থেকে গুরুতর অসুস্থ হয়ে হাসপাতালে গেছেন ১২ জন শিক্ষার্থী। দু’জনকে হাসপাতালে নেয়া হয়েছিল। তারা সুস্থ হয়ে বিকালেই অনশনস্থলে ফিরেছেন। তবে অনশনে বসা ২৪ শিক্ষার্থীর মধ্যে সবাই প্রায় অসুস্থ। সিলেটের শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের ভিসি ভবনের ফটকে গত রাত পর্যন্ত অনশনে ছিলেন ১১ জন। হাসপাতালে থাকা শিক্ষার্থীরাও অনশনে। ওখানেও তাদের মুখে কিছু দেয়া সম্ভব হচ্ছে না। তাদের একটাই দাবি- ভিসি প্রফেসর ফরিদ উদ্দিন আহমদের পদত্যাগ। ভিসি পদত্যাগ করলেই কেবল তারা অনশন ভাঙবেন। নতুবা অনশন চালিয়ে যাবেন। অনশনে থাকা শিক্ষার্থীদের নিয়ে দুশ্চিন্তার অন্ত নেই। ক্যাম্পাসে রাত কাটে অজানা আতঙ্কে। অধিকাংশ শিক্ষার্থীরাই নির্ঘূম রাত কাটান। কেউ অসুস্থ হলেই তাকে দ্রুত হাসপাতালে ভর্তি করা হচ্ছে। অনশনস্থলে আছে ওসমানী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের ছাত্রলীগের একটি মেডিকেল টিম। তারা সার্বক্ষণিক সবাইকে দেখভাল করছেন। কিন্তু ওই টিমের প্রধান সিওমেক ছাত্রলীগের সভাপতি ডা. নাজমুল হাসান জানিয়েছেন, বলতে গেলে এখন সবাই অসুস্থ। যাদের অবস্থা শোচনীয় হচ্ছে তাদেরকে হাসপাতালে ভর্তি করা হচ্ছে। এই অবস্থা চললে সবাইকেই হাসপাতালে ভর্তি করতে হবে। তবে অনশনস্থলে উপস্থিত থাকা তার টিমের সব সদস্যরাই আন্তরিক হয়ে কাজ করছেন। স্যালাইন দেয়া হচ্ছে শিক্ষার্থীদের। এদিকে আলোচনার কোনো সুযোগ দিচ্ছেন না শিক্ষার্থীরা। তারা চান ভিসির পদত্যাগ। কিন্তু এখনো অনড় ভিসি। তিনি পদত্যাগ করবেন না। তবে সরকার যে সিদ্ধান্ত দেবে সেটি তিনি মানবেন। সরকারের তরফ থেকে আলোচনার মাধ্যমে বিষয়টি সমাধানের চেষ্টা করা হচ্ছে। দুপুরে কেন্দ্রীয় সাংগঠনিক সম্পাদক শফিউল আলম চৌধুরী নাদেলের নেতৃত্বে ক্যাম্পাসে অনশনস্থলে যান আওয়ামী লীগ নেতারা। তারা প্রথমে শিক্ষার্থীদের সঙ্গে কথা বলেন। হাসপাতালে অনশনে থাকা গুরুতর অসুস্থ এক শিক্ষার্থীকে অনশন ভাঙাতে তারা শিক্ষার্থীদের সহযোগিতা চান। কিন্তু তার এই প্রস্তাবে রাজি হয়নি শিক্ষার্থীরা। পরে আওয়ামী লীগ নেতারা বেলা আড়াইটার দিকে ভিসি অধ্যাপক ফরিদ উদ্দিন আহমদের সঙ্গে দেখা করতে যান। ভিসির সঙ্গে বৈঠক শেষে বেরিয়ে এসে আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় সাংগঠনিক সম্পাদক শফিউল আলম চৌধুরী নাদেল শিক্ষার্থীদের বলেন- শিক্ষামন্ত্রী কথা বলতে চান। এতে রাজি হয় শিক্ষার্থীরা। এ সময় নাদেলের মোবাইল ফোনে শিক্ষার্থী সাদিয়া আফরিনসহ কয়েকজন মোবাইলের লাউড স্পিকার অন করে কথা বলেন। এ সময় শিক্ষামন্ত্রী ডা. দীপু মনি শিক্ষার্থীদের সঙ্গে আলোচনার প্রস্তাব দেন। শিক্ষামন্ত্রী জানান, বিশ্ববিদ্যালয়ের আন্দোলনরত শিক্ষার্থীদের বিষয়টি তিনি গুরুত্ব সহকারে দেখছেন। যদি শিক্ষার্থীরা রাজি হন; তাহলে তিনি তাদের সঙ্গে সরাসরি কথা বলতে রাজি। যত দ্রুত সম্ভব বিষয়টির শান্তিপূর্ণ সমাধান আশা করেন শিক্ষার্থী। এ সময় শিক্ষার্থীরা শিক্ষামন্ত্রীর কাছে তাদের আন্দোলনের যৌক্তিকতা তুলে ধরেন। বলেন, তাদের দাবি না মেনে ভিসি ফরিদ উদ্দিন আহমদ নানা সময় নানা কথা বলছেন। যা কোনোভাবেই মেনে নেয়া যাচ্ছে না। শিক্ষামন্ত্রীর সঙ্গে কথা বলার পর আনুষ্ঠানিক প্রেস ব্রিফিং করেন শিক্ষার্থীরা। তারা জানিয়েছেন, শিক্ষামন্ত্রী তাদের সঙ্গে আলোচনা করতে ঢাকায় ডেকেছেন। তারা এতে প্রাথমিকভাবে রাজি হয়েছেন। সন্ধ্যা কিংবা আজকের মধ্যে তারা ঢাকায় গিয়ে আলোচনায় অংশ নিতে পারেন। এ সময় তারা বলেন, ভিসি ফরিদ উদ্দিন আহমদের পদত্যাগ হচ্ছে তাদের এক দফা দাবি। এ দাবি পূরণ না হলে তারা আন্দোলন কিংবা অনশন থেকে সরে যাবে না। প্রেস ব্রিফিংকালে উপস্থিত ছিলেন শিক্ষার্থী সাদিয়া আফরিন, ইয়াসীন সরকার, সাব্বির আহমদ, মীর রানাসহ অনেকেই। শিক্ষামন্ত্রীর সঙ্গে আলোচনার পর আন্দোলনরত শিক্ষার্থীরা বিশ্ববিদ্যালয়ের গোলচত্বর এলাকায় বৈঠক আহ্বান করেন। বৈঠকে শিক্ষামন্ত্রীর আলোচনার প্রস্তাবসহ সার্বিক বিষয় নিয়ে আলোচনা হয়। সন্ধ্যায় বৈঠক সম্পর্কে কয়েকজন আন্দোলনরত শিক্ষার্থী জানিয়েছেন- শিক্ষামন্ত্রী আলোচনার বসার প্রস্তাব দেয়ার বিষয়টি ইতিবাচক। আমরা তার সঙ্গে আলোচনা করতে চাই। কিন্তু এই আলোচনায় আমরণ অনশনে থাকা শিক্ষার্থীদের মধ্যে একজন থাকতে চায়। কিন্তু তাকে ঢাকায় নিয়ে যাওয়া সম্ভব নয়। এ কারণে ভার্চ্যুয়ালি আলোচনাটি করা যায় কিনা- সেটি নিয়ে চিন্তাভাবনা করা হচ্ছে। আর শিক্ষামন্ত্রী রাজি হলে সেটি করা সম্ভব। একই সঙ্গে ওই বৈঠক থেকে আন্দোলনরত শিক্ষার্থীরা শিক্ষামন্ত্রীকে ক্যাম্পাসে এসে একবার দেখে যাওয়ার অনুরোধ জানান। শিক্ষার্থীরা জানান- গতকাল রাত পর্যন্ত শিক্ষার্থীরা ঢাকায় যাবে কী যাবে না; সেটি চূড়ান্ত হয়নি। তবে বেশিরভাগ শিক্ষার্থীই ঢাকায় না যাওয়ার পক্ষে। কারণ বৈঠকে বসা শিক্ষার্থীরা প্রস্তাব মেনে নিলে অনশনরতরা নাও মানতে পারেন। ফলে বিষয়টি নিয়ে দোদুল্যমান অবস্থায় রয়েছেন শিক্ষার্থীরা। সকালে অনশনরত শিক্ষার্থীদের দেখতে ক্যাম্পাসে ছিলেন বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক ছাত্রলীগ নেতারা। তারা শিক্ষার্থীদের সঙ্গে কথা বলেন। ওইদিনের পুলিশি হামলার জন্য তারা মর্মাহত হন। এ সময় তারা বলেন, শুক্র ও শনিবার ছুটির দিন। চাইলে সরকার কোনো সিদ্ধান্ত নিতে পারে না। এ কারণে আপাতত দু’দিনের জন্য কর্মসূচি স্থগিত করার আহ্বান জানান। কিন্তু অনশনে থাকা শিক্ষার্থীরা সে প্রস্তাবে রাজি হননি। তারা জানান, আপনারা আমাদের বড় ভাই। আপনারাও আমাদের সঙ্গে আন্দোলনে বসুন। আমরা কারো কথায় এখানে বসিনি। ভিসির নির্দেশে পুলিশ পিটিয়েছে, এ কারণে বসেছি। সুতরাং বড়ভাই হিসেবে সাবেক ছাত্রলীগ নেতাদের তাদের সঙ্গে আন্দোলনে নামার অনুরোধ জানান। বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্রলীগের সাবেক সভাপতি মাসুম বিল্লাহ জানিয়েছেন, ‘আমরা শিক্ষার্থীদের যে প্রস্তাব দিয়েছিলাম সেটি তারা মানেননি। কর্মসূচিতে অটল রয়েছেন। আমরা ভিসিকে বিষয়টি রিয়েলাইজড করার আহ্বান জানিয়েছি। তিনিই পারেন ঘটনাটি শেষ করতে।’ দুপুরে ক্যাম্পাসে অনশনরত শিক্ষার্থীদের দেখতে যান সিলেটের শহীদ বুদ্ধিজীবী ডা. শামসুদ্দিন আহমদের ছেলে আমেরিকা প্রবাসী ডাক্তার ও প্রফেসর জিয়াউদ্দিন আহমদ। তিনি শিক্ষার্থীদের উদ্দেশে বলেন, ‘এভাবে অনশন করলে সবাই অসুস্থ হবে। এমনকি ক্ষতি হতে পারে। ঘটনার একটি সুষ্ঠু সমাধান খুঁজে বের করতে তিনি সকলের প্রতি আহ্বান জানান। পরে ডা. জিয়াউদ্দিন আহমদ মানবজমিনকে জানিয়েছেন, ভিসিও পদত্যাগ করছেন না, শিক্ষার্থীরাও অনশন ভাঙছেন না। এমন ভাবে ঘটনাটি শেষ করতে হবে যাতে উইন-উইন সিচুয়েশন থাকে। এজন্য সবাইকে সক্রিয় ভূমিকা রাখার আহ্বান জানান তিনি। বিকালে ক্যাম্পাসে আমরণ অনশনে থাকা শিক্ষার্থীদের দেখতে যান জেলা আওয়ামী লীগের ভারপ্রাপ্ত সভাপতি শফিকুর রহমান চৌধুরী, সাধারণ সম্পাদক নাসির উদ্দিন খান। এ ছাড়া মহানগর আওয়ামী লীগের সভাপতি মাসুক উদ্দিন আহমদও যান। তারা গিয়ে শিক্ষার্থীদের সঙ্গে কথা বলেন। এর আগে নাদেলের পক্ষে ক্যাম্পাসে গিয়েছিলেন জেলা আওয়ামী লীগের সহ-সভাপতি ও সদর উপজেলা চেয়ারম্যান আশফাক আহমদ, মহানগর সাধারণ সম্পাদক অধ্যাপক জাকির হোসেন ও যুগ্ম সম্পাদক বিধান কুমার সাহা। এদিকে গতকাল থেকে সমঝোতার বিষয়ে নীরব হয়ে পড়েছেন বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকরা। আগের রাত ৩টায় সাস্টিয়ান শিক্ষকরা গিয়ে শিক্ষার্থীদের অনুরোধ জানালেও তারা মানেনি। গতকাল সন্ধ্যা পর্যন্ত শিক্ষকদের কোনো অংশ অনশনস্থলে আসেননি। কয়েকজন শিক্ষক জানিয়েছেন, শিক্ষার্থীদের ওপর পুলিশি হামলার ঘটনায় শিক্ষকরা মর্মাহত। আবার ভিসির পদত্যাগ দাবি করে শিক্ষার্থীরা আমরণ অনশন শুরু করায় তারা বিব্রত। এ কারণে শিক্ষকরা এখন সিদ্ধান্তহীনতায় ভুগছেন। তবে গতকাল অনশনস্থলে বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক সমিতির সাধারণ সম্পাদক অধ্যাপক মুহিবুল আলমের সঙ্গে কথা বলেছেন শিক্ষামন্ত্রী ড. দীপু মনি। সংকট নিরসনে শিক্ষক সমিতি সার্বিক বিষয়ে সহযোগিতা করবে বলে শিক্ষামন্ত্রীকে আশ্বস্ত করেন অধ্যাপক মুহিবুল আলম। এদিকে রাত সাড়ে ৭টার দিকে শিক্ষার্থীরা শিক্ষামন্ত্রীর সঙ্গে ঢাকায় গিয়ে আলোচনার বিষয়ে কোনো সিদ্ধান্ত না নেয়ায় রাতে আবারো ক্যাম্পাসে যান আওয়ামী লীগের সাংগঠনিক সম্পাদক শফিউল আলম চৌধুরী। তিনি আন্দোলনরত কয়েকজন শিক্ষার্থীর সঙ্গে কথা বলেন। এবং কয়েকজনকে ঢাকায় যাওয়ার আহ্বান জানান। আর অনশনস্থলে থাকা শিক্ষার্থীরা ভার্চ্যুয়ালি সংযুক্ত হতে পারবেন বলে আশ্বস্ত করেন। এই প্রস্তাবেও শিক্ষার্থীরা সাড়া দেয়নি। আওয়ামী লীগের নেতারা জানিয়েছেন, যদি শিক্ষামন্ত্রীর ডাকে তারা সাড়া না দেন তাহলে শিক্ষামন্ত্রী তাদের ডাকে সাড়া দিয়ে সিলেটে আসতে পারেন। সার্বিক বিষয়টি এখনো আলোচনার পর্যায়ে রয়েছে বলে জানান তারা।
প্রধান সম্পাদক মতিউর রহমান চৌধুরী
জেনিথ টাওয়ার, ৪০ কাওরান বাজার, ঢাকা-১২১৫ এবং মিডিয়া প্রিন্টার্স ১৪৯-১৫০ তেজগাঁও শিল্প এলাকা, ঢাকা-১২০৮ থেকে
মাহবুবা চৌধুরী কর্তৃক সম্পাদিত ও প্রকাশিত।
ফোন : ৫৫০-১১৭১০-৩ ফ্যাক্স : ৮১২৮৩১৩, ৫৫০১৩৪০০
ই-মেইল: [email protected]
Copyright © 2022
All rights reserved www.mzamin.com