দেশ বিদেশ

‘সমঝোতার’ চেষ্টায় ভিসি

স্টাফ রিপোর্টার, সিলেট থেকে

২১ জানুয়ারি ২০২২, শুক্রবার, ৯:২৮ অপরাহ্ন

সরকার তরফ থেকে তেমন চাপ নেই। নিজ থেকে দোষ সরিয়ে ফেলেছেন ভিসি। ইতিমধ্যে জানিয়েও দিয়েছেন, সরকারের সিদ্ধান্ত মেনে নেবেন তিনি। এ কারণে ‘সমঝোতার’ চেষ্টায় রয়েছেন শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের ভিসি ফরিদ উদ্দিন আহমদ। তার পক্ষ থেকে সমঝোতার আহ্বান নিয়ে বারবার আমরণ অনশনে থাকা শিক্ষার্থীদের কাছে যাচ্ছেন শিক্ষকদের একটি অংশ। গতকালও তারা তিন দফা গেছেন। সর্বশেষ রাতেও আরেক দফা গেছেন। কিন্তু শিক্ষার্থীদের কাছ থেকে কোনো সাড়া মিলছে না।
শিক্ষার্থীরা যতই কঠোর হচ্ছে; ততই শিক্ষকরা সরে যাচ্ছেন। কারণ, গত রাত পর্যন্ত শিক্ষার্থীরা আমরণ অনশনে ছিল। কয়েকজন অসুস্থ হয়ে হাসপাতালে ভর্তি রয়েছে। এই অবস্থায় ভিসির তরফ থেকে কোনো সাড়া মিলছে না। ভিসির ঘনিষ্ঠ কয়েকজন শিক্ষক ও কর্মকর্তা জানিয়েছেন- মাত্র একটি ঘটনার কারণেই শিক্ষার্থীরা আন্দোলনে। আর আন্দোলন এক দফা, সেটি হচ্ছে ভিসির বিরুদ্ধে। ফলে ভিসি এখনো আশাবাদী বিষয়টি সমঝোতায় শেষ হবে। এ কারণে শিক্ষকরা বারবার আন্দোলনে থাকা শিক্ষার্থীদের কাছে ছুটে যাচ্ছেন। এই আন্দোলনে বাইরের কোনো সম্পৃক্ততা নেই। কোনো পক্ষ ফায়দা লুটার চেষ্টা করছে না। ফলে এক সময় শিক্ষার্থীরা ক্লান্ত হয়ে পড়লে সমঝোতায়ই সমাধান হতে পারে। তারা জানিয়েছেন- সরকারের তরফ থেকে ভিসির ওপর তেমন চাপ নেই। তাকে সমঝোতার জন্য সময় দেয়া হয়েছে কিনা- এমন প্রশ্নের জবাবে এক শিক্ষক জানান, ভিসি এখনো সুসংহত অবস্থানে। আন্দোলনরত শিক্ষার্থীরা ছাড়া আর কারোই চাপের মুখে নেই তিনি। শিক্ষকরাও চাইছেন ঘটনাটির সুষ্ঠু সমাধান। এ কারণে তারা আলোচনার পথ খুঁজে বের করতে শিক্ষার্থীদের কাছে যাচ্ছেন। গতকাল দুপুর থেকে বরফ গলতে শুরু করেছে মনে করেন তারা। শিক্ষক সমিতির এক নেতা জানিয়েছেন, ভিসির বিরুদ্ধে তেমন অভিযোগ নেই। তবে সম্প্রতি টঙদোকান উচ্ছেদ নিয়ে শিক্ষার্থীদের সঙ্গে মনস্তাত্ত্বিক লড়াই চলছিল। ক্ষুব্ধ ছিলেন শিক্ষার্থীরা। কিন্তু ওই বিষয়টি এই আন্দোলনের সঙ্গে মিশেছে বলে মনে হয় না। কারণ শিক্ষার্থীরা এখনো ওই দিনের পুলিশি হামলার প্রতিবাদে ভিসির পদত্যাগ চাইছে। এদিকে- শিক্ষার্থীদের এক দফা অর্থাৎ ভিসির পদত্যাগ দাবি আন্দোলন শুরু হওয়ার পর ক্যাম্পাসে নানা নাটকীয় অবস্থা চলছে। ভিসি বলেছিলেন, শিক্ষার্থীদের বিরুদ্ধে কোনো আইনি উদ্যোগ নেয়া হবে না। কিন্তু ঘটনার পরদিনই নগর পুলিশের পক্ষ থেকে ৩শ’ জনকে আসামি করে মামলা হয়েছে। যদিও পুলিশ বলছে, এ মামলায় কাউকে হয়রানি করা হচ্ছে না। কিন্তু জালালাবাদ থানায় দায়ের করা মামলায়ই শিক্ষার্থীদের মধ্যে আরও আস্থার সংকট তৈরি করে। এছাড়া- ওই দিন পুলিশের সঙ্গে সংঘর্ষে কয়েকজন শিক্ষার্থী আহত হয়ে হাসপাতালে ছিলেন। তাদের পাশে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন দাঁড়ায়নি। সিলেটের আওয়ামী লীগ নেতারা দফায় দফায় দেখতে গেল বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রশাসনের পক্ষ থেকে কেউ যাননি। তাদের চিকিৎসার ব্যয়ভার প্রদান করা হয়নি। এ নিয়েও শিক্ষার্থীদের সঙ্গে আরও দূরত্ব তৈরি হয়। আন্দোলনরত শিক্ষার্থীদের কয়েকজন গতকাল মানবজমিনকে জানিয়েছেন, ভিসি ফরিদ উদ্দিন আহমদ পুলিশ দিয়ে শিক্ষার্থীদের পেটানোর বিষয়টিকে প্রথম থেকেই ভিন্ন খাতে নেয়ার চেষ্টা করছেন। তিনি প্রথমে ‘বহিরাগতদের ইন্ধন’ রয়েছে বলে দাবি করেছিলেন। এরপর আহতদের ব্যাপারে কোনো খোঁজখবর নেননি। মামলা দায়ের করা হলেও সে ব্যাপারে ভিসি কিংবা প্রশাসনের কেউ কার্যত কোনো ভূমিকা পালন করছে না। এসবই করা হচ্ছে শিক্ষার্থীদের অবহেলার কারণেই। ভিসির কারণেই ক্যাম্পাসে শিক্ষার্থীরা নিরাপত্তাহীন হয়ে যাচ্ছেন বলে তারা জানিয়েছেন। জানান- ভিসি অধ্যাপক ফরিদ উদ্দিন আহমদের নির্দেশে ক্যাম্পাসে তীব্র আন্দোলন চলাকালে কয়েক ঘণ্টা বিদ্যুৎ শাটডাউন দিয়ে রাখা হয়। এই কয়েক ঘণ্টা শিক্ষার্থীরা চরম নিরাপত্তাহীনতায় ভোগেন। এরপর তার নির্দেশে জলকামান, সাজোয়া যান এনে রাখা হয় ক্যাম্পাসের প্রধান ফটকে। পেছনের ফটক এলাকা দিয়ে র‌্যাবের টহল জোরদার করা হয়েছিল। এ কারণে শিক্ষার্থীরা প্রধান ফটক বাঁশ দিয়ে ব্যারিকেড দিতে বাধ্য হয়েছিল। ভিসি শিক্ষার্থীদের মধ্যে নানা ধরনের ভয় ও আতঙ্ক ছড়িয়ে আন্দোলনকে বানচাল করার চেষ্টা করেছেন বলে দাবি করেন আন্দোলনে থাকা ছাত্র নেতারা। এরপর ভিসি নিজেই শিক্ষার্থীদের বিরুদ্ধে অশালীন গালিগালাজ করার অভিযোগ তোলেন। পরবর্তীতে শিক্ষকরা একই অভিযোগ করে ক্যাম্পাসে অবস্থান নেন। আন্দোলনরত শিক্ষার্থীরা জানিয়েছে- ভিসি ফরিদ উদ্দিন আহমদ কৌশলে শিক্ষার্থীদের মুখোমুখি শিক্ষকদের দাঁড় করানো চেষ্টা করছেন। কিন্তু সেটি তিনি পারেননি। কখনোই আন্দোলনকারী শিক্ষার্থীদের তরফ থেকে গালিগালাজ করা হয়নি। ভার্চ্যুয়ালি গালিগালাজের দায় শিক্ষার্থীরা নেবে না। সর্বশেষ শিক্ষার্থীরা অনশনে বসলেও ভিসি কিংবা বিদ্যালয় প্রশাসনের পক্ষ থেকে ডাক্তার ও সরঞ্জাম প্রদানের প্রয়োজনীয়তা অনুধাবন করেননি। এ কারণে শিক্ষার্থীরা বাধ্য হয়ে বাইরে থেকে অ্যাম্বুলেন্স এনে রাখেন। বাইরের ডাক্তার দিয়ে চিকিৎসা করানো হয়। এদিকে- গতকাল সিলেট মহানগর আওয়ামী লীগের যুগ্ম সম্পাদক আজাদুর রহমান আজাদ ক্যাম্পাসে গিয়ে প্রথমে শিক্ষার্থী এবং পরে ভিসির সঙ্গে দেখা করেছেন। এর দু’দিন আগে আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় সাংগঠনিক সম্পাদক শফিউল আলম চৌধুরী নাদেলের নেতৃত্বে সিলেট মহানগর আওয়ামী লীগের নেতারা ভিসির সঙ্গে দেখা করেন। সিলেটের আওয়ামী লীগ নেতা জানিয়েছেন, আলোচনার মাধ্যমে ভিসি উদ্ভূত পরিস্থিতির সমাপ্তি ঘটাবেন বলে নেতাদের আশ্বস্ত করেছেন। কিন্তু তার এই আশ্বাসের প্রতিফলন দেখা যাচ্ছে না। এ কারণে আওয়ামী লীগ নেতৃবৃন্দ এখনো সার্বিক বিষয়টি মনিটরিং করছেন। গতকাল সিলেটের একটি অনুষ্ঠানে পরিকল্পনামন্ত্রী এমএ মান্নান জানিয়েছেন, শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ে যে ঘটনা ঘটেছে তার জন্য আমি খুবই দুঃখিত।’ শিক্ষার্থীরা আমাদের সন্তান। তাদেরকে ছেড়ে যেতে আমরা পারি না। তাদের মঙ্গল আমরা চাই। সুতরাং এইটা মুখোমুখি না হয়ে আলোচনা করে সমাধান করা উচিত। ইতিমধ্যে আমাদের সরকারের পক্ষ থেকে শিক্ষামন্ত্রী ডা. দীপু মণি, বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের সাংগঠনিক সস্পাদক শফিউল আলম চৌধুরী নাদেলকে আলোচনার জন্য পাঠিয়েছেন। দল থেকে উচ্চ পর্যায়ে প্রেসিডিয়াম সদস্য জাহাঙ্গীর কবির নানক খোঁজখবর নিচ্ছেন। এই আসনের সংসদ সদস্য পররাষ্ট্রমন্ত্রীও বিষয়টি সমাধানে খুবই আন্তরিক। তাছাড়া সিলেট মহানগরের সাধারণ সম্পাদকসহ সবার সঙ্গে আলোচনা করে সময় দিয়ে একটা সমাধান করতে পারবেন বলে আমার মনে হয়। কোমলমতি শিক্ষার্থীরা তাদের বয়স খুবই কম। একটু উত্তেজনা থাকতেই পারে। ধৈর্যের সঙ্গে এটা মোকাবিলা করতে হবে।
প্রধান সম্পাদক মতিউর রহমান চৌধুরী
জেনিথ টাওয়ার, ৪০ কাওরান বাজার, ঢাকা-১২১৫ এবং মিডিয়া প্রিন্টার্স ১৪৯-১৫০ তেজগাঁও শিল্প এলাকা, ঢাকা-১২০৮ থেকে
মাহবুবা চৌধুরী কর্তৃক সম্পাদিত ও প্রকাশিত।
ফোন : ৫৫০-১১৭১০-৩ ফ্যাক্স : ৮১২৮৩১৩, ৫৫০১৩৪০০
ই-মেইল: [email protected]
Copyright © 2022
All rights reserved www.mzamin.com