মত-মতান্তর

জিয়াউর রহমানের ১৯ দফা: শ্রেষ্ঠত্বের মানদণ্ডে অনন্য

গালিব ইমতেয়াজ নাহিদ

১৮ জানুয়ারি ২০২২, মঙ্গলবার, ৯:৩৪ অপরাহ্ন

সময়টা ১৯৩৬। পরাধীনতার গ্লানি বয়ে বেড়ানো সমাজ ব্যবস্থার প্রতিকুল পরিবেশে জানুয়ারি মাসের ১৯ তারিখে সভ্রান্ত মুসলিম পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন জিয়াউর রহমান। বিভিন্ন ঐতিহাসিক ও রাজনৈতিক পথ-পরিক্রমায় শৈশব- কৈশোর অতিবাহিত করে ১৯৫৩ সালে সামরিক কর্মকর্তা হিসেবে যোগ দেন তৎকালীন পাকিস্তান সেনাবহিনীতে, ১৯৫৫ সালে তিনি সেকেন্ড লেফটেন্যান্ট হিসেবে পদোন্নতি  লাভ করেন। সামরিক বাহিনীতে তিনি বিভিন্ন সময়ে সাহসী ভূমিকা পালন করার জন্য তাকে শ্রেষ্ঠত্বের খেতাবে ভূষিত করা হয়। যা তাকে তার পেশাগত পরিমন্ডলে শ্রেষ্ঠতর মর্যাদায় ভূষিত করে থাকে। সাহসী রণকৌশল ও অসীম বীরত্বের প্রমাণস্বরূপ হিলাল-ই-জুরাত এবং তামঘা-ই-জুরাত পদকও লাভ করেন তিনি। ১৯৭০ সালে মেজর হিসেবে তিনি চট্টগ্রামে ইষ্টবেঙ্গল রেজিমেন্টের সেকেন্ড ইন-কমান্ড হিসেবে দায়িত্ব পালন এবং পরবর্তীতে মহান মুক্তিযুদ্ধে বীরত্বের সাথে নেতৃত্ব প্রদান করেন। মুক্তিযুদ্ধে তার শ্রেষ্ঠত্বর ভূমিকার বিষয়টি সর্বজন এবং আর্ন্তজাতিকভাবে স্বীকৃত। স্বাধীনতার ঘোষণা, সেক্টর কমান্ডার হিসেবে সম্মুখযুদ্ধে অংশগ্রহণ, দিশেহারা জাতিকে সঠিক পথ দেখানো এবং সশস্ত্র নেতৃত্বের কারণে শ্রেষ্ঠত্বের প্রমাণস্বরূপ মুক্তিযুদ্ধের শ্রেষ্ঠ খেতাব বীরউত্তম খেতাবে ভূষিত হয়েছেন। পেশাগত জীবনে তিনি নিঃসন্দেহে শ্রেষ্ঠত্বের ছাপ রেখে গেছেন।

জিয়াউর রহমানের শ্রেষ্ঠত্বের অন্যতম আরেকটা দিক হলো নির্মোহতা। যা ১৯৮০ সালে দৈনিক দেশ পত্রিকার প্রথম বর্ষপূর্তি সংখ্যার ‘স্বাধীনতাযুদ্ধের স্মৃতি’ নিবন্ধে তার দেয়া বর্ণনায় ফুটে ওঠে। জাতির চরম সংকটের মুহুর্তে কাউকে না কাউকে সামনে এগিয়ে আসতে হবে। নিতে হয় দায়িত্ব। আমি কেবল দায়িত্ব পালন করেছি। নেতা যখন উধাও হয়ে গেলো- সিদ্ধান্ত দেয়ার মতো কেউ যখন থাকল না, তখন জাতির পক্ষ থেকে বড় সিদ্ধান্ত আমাকে ঘোষণা করতে হলো। তার এই সহজ সরল জবানবন্দীতে স্পষ্ট প্রতিয়মান হয় যে, তিনি কোন লোভ-লালসা কিংবা শ্রেষ্ঠত্বর স্বাক্ষর রাখার জন্য নয়, শুধুমাত্র দায়িত্ববোধ এবং দেশপ্রেম অনুপ্রাণিত হয়েই সম্মুখযুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়েন এবং শ্রেষ্ঠত্বের অবদান রাখেন।

সময়ের পরিক্রমায় ১৯৭৫ সালে ৭ই নভেম্বর ইতিহাস তার শ্রেষ্ঠ সন্তানকে আবার জাতির ক্রান্তিলগ্নে সিপাহি জনতার বিপ্লবের মাধ্যমে ত্রাণকর্তা হিসেবে আবির্ভূত করে। পরবর্তীতে ১৯৭৭ সালের ২১শে এপ্রিল তিনি পুনরায় জাতির প্রয়োজনে প্রেসিডেন্টের দায়িত্বভার গ্রহণ করেন। দায়িত্ব গ্রহণের মাত্র ৯ দিনের মাথায় একটি ভঙ্গুর রাষ্ট্রের সংস্কারের উদ্দেশ্যে ১৯ দফা ঘোষণা করেন। এই ১৯ দফা ছিল মূলত একটি মৃত রাষ্ট্রকে সবল রাষ্ট্রে পরিণত করার ব্যবস্থাপত্র। রাষ্ট্রের মৌলিক কাঠামো, জনগণ, আইনের শাসন, পররাষ্ট্রনীতি, কূটনীতি, ধর্মব্যবস্থা, মূল্যবোধ, গণতন্ত্র, জাতীয়তাবাদ, অর্থনীতি সকল কিছুুর সমন্বয়ে একটা আধুনিক রাষ্ট্রের উন্নত হওয়ার মডেল তত্ত্ব। আধুনিক রাষ্ট্রব্যবস্থার সকল গুরুত্বপূর্ণ সময়োপযোগী বৈশিষ্ট্যের সমন্বয়ে আলোকবর্তিতা ছিল এই ১৯ দফা। ১৯ দফা ছিলো জিয়াউর রহমানের দেয়া রাষ্ট্রের মুক্তির দিক-নির্দেশনাবলী, এক কথায় বলা যেতে পারে সমসাময়িক রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে রাষ্ট্রগঠনে মনোযোগ ফিরিয়ে আনেন জিয়াউর রহমান এই ১৯ দফা প্রণয়নের মাধ্যমে। তিনি ১৯ দফাতে যেমন শাসনতন্ত্রের মূলনীতি গণতন্ত্রের পথ দেখিয়েছেন, ঠিক তেমনি সমাজন্ত্রের ভালো যে দিক সমাজিক ও অর্থনৈতিক ন্যায়বিচারের কথাও বলেছেন। তিনি সমাজব্যবস্থার সকল উত্তম দিকের সমন্বয়ে একটা স্বাধীন, অখণ্ড ও স্বার্বভৌমত্ব রাষ্ট্রের স্বপ্নের বাস্তবিক প্রয়োগ দেখিয়েছেন। এই ১৯ দফায় রাষ্ট্রকে তিনি যেমন সমসাময়িক মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠতাকে প্রাধান্য দিয়েছের, ঠিক তেমনি ধর্ম-বর্ণ-গোত্র নির্বিশেষে সকলকে নিয়ে জাতীয় ঐক্যের রাষ্ট্রের পথ দেখিয়েছেন। তিনি আত্মনির্ভরশীল জাতি গঠনের জন্য নিরক্ষতা মুক্ত শিক্ষিত জাতির কথা বলেছেন তার মডেল তত্ত্বে। তিনি জনগণের মৌলিক অধিকার সংরক্ষণের জন্য গৃহ নির্মাণ/বাসস্থানের ব্যবস্থা, বস্ত্র উৎপাদন, খাদ্যে স্বয়ং-সম্পূর্ণতা অর্জনের সাথে সাথে ন্যূনতম চিকিৎসা ব্যবস্থার বিষয়গুলো উল্লেখ করে গেছেন। তিনি ভৌগলিক আয়তনের সীমাবদ্ধতার কথা মাথায় রেখে জন্ম নিয়ন্ত্রণের বিষয়টি তুলে ধরেছেন। গ্রামীণ অর্থনীতিতে কৃষির অনস্বীকার্য অবদানের কথা মাথায় রেখেছেন, পক্ষান্তরে পণ্য উৎপাদনের দিকেও নারী পুরুষকে সমতারভিত্তিতে এগিয়ে যাওয়ার জন্য অনুপ্রাণিত করেছেন, যার দরুন তিনি বেসরকারি খাতে উদ্যোক্তা তৈরিতে উৎসাহ প্রদান করেছেন। নারীর ক্ষমতায়ন, মালিক-শ্রমিকের সর্ম্পক, সরকারি চাকুরিজীবীদের জীবনমান উন্নয়নের বিষয়গুলো তুলে ধরেছেন। তিনি সমাজ গঠনে প্রশিক্ষিত যুব সমাজ, দুর্নীতিমুক্ত ন্যায়নীতিভিত্তিক সমাজ কায়েম করার বিষয়গুলো দৃঢ়ভাবে তুলে ধরেছেন। প্রশাসন, আইনশৃংখলাবাহিনী সর্বস্তরে জনগণের সর্ম্পৃকতা যে জনগণের রাষ্ট্র কায়েমের ক্ষেত্রে অগ্রণী ভূমিকা পালন করে থাকে, সেটিও তিনি ১৯ দফায় ভেতর অন্তর্ভূক্ত করে গেছেন। তিনি প্রসাশনের বিকেন্দ্রীকরণে এবং স্থানীয় সরকার ব্যবস্থার উন্নয়নের ওপর জোর দিয়েছেন, যা কিনা জবাবদিহি সরকার ব্যবস্থার অন্যতম রূপ। তিনি বিদেশি রাষ্ট্রের সাথে রাষ্ট্রের সর্ম্পক কেমন হওয়া উচিত সেটির ব্যাপারেও একটা স্পষ্ট রূপরেখা এই ১৯ দফার মাধ্যমে তুলে ধরেছেন।

সর্বোপরি বলতে পারি যে, ১৯ দফা একটা রাষ্ট্রের পরিপূর্ণ রূপরেখা। এই রূপরেখা অনুযায়ী রাষ্ট্র চললে সে রাষ্ট্র কখনোই উন্নয়নের ধারা থেকে বিচ্যূত হবে না এবং উন্নত রাষ্ট্র হিসেবে মাথা তুলে দাঁড়াবে। এই পরিপূর্ণ রাষ্ট্র ব্যবস্থার তত্ত্বই জিয়াউর রহমানকে শ্রেষ্ঠত্বের চরম শিখরে পৌঁছে দিয়েছে, অমরত্বের জন্য অনন্যতা প্রদান করেছে এবং জাতীয়তাবাদী শক্তিকে গর্বিত করেছে। এক কথায় ১৯ দফাকে আমরা The Foundation of Bangladeshi State বলে অভিহিত করতে পারি।

লেখক: সহ-সাংগঠনিক সম্পাদক (খুলনা), স্বেচ্ছাসেবক দল।
প্রধান সম্পাদক মতিউর রহমান চৌধুরী
জেনিথ টাওয়ার, ৪০ কাওরান বাজার, ঢাকা-১২১৫ এবং মিডিয়া প্রিন্টার্স ১৪৯-১৫০ তেজগাঁও শিল্প এলাকা, ঢাকা-১২০৮ থেকে
মাহবুবা চৌধুরী কর্তৃক সম্পাদিত ও প্রকাশিত।
ফোন : ৫৫০-১১৭১০-৩ ফ্যাক্স : ৮১২৮৩১৩, ৫৫০১৩৪০০
ই-মেইল: [email protected]
Copyright © 2022
All rights reserved www.mzamin.com