দেশ বিদেশ

রাজউকের পূর্বাচল প্রকল্প: ২৭ বছরে সামগ্রিক অগ্রগতি ৭৫ শতাংশ

নূরে আলম জিকু

১৬ জানুয়ারি ২০২২, রবিবার, ৯:০৩ অপরাহ্ন

ফাইল ছবি

রাজধানীতে বেড়েই চলছে জনসংখ্যার ঘনত্ব। দুই সিটি করপোরেশনে প্রায় দুই কোটির অধিক মানুষের বাস। ক্রমেই দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে ঢাকামুখী হচ্ছেন অনেকে। এতে ঢাকার উপর বাড়ছে চাপ। সৃষ্টি হচ্ছে নানা সমস্যা। নাগরিক জীবনে পড়ছে এর প্রভাব। নষ্ট হচ্ছে জীববৈচিত্র্য। পরিবেশের ভারসাম্য যখন হুমকির মুখে, তখনই নড়েচড়ে বসে সরকার। নেয়া হয় মেগা প্রকল্প। নগরীর আশেপাশে নগরবাসীর আবাসনের সুযোগ বৃদ্ধি করে ঢাকা শহরের জনসংখ্যার চাপ হ্রাস করতে ১৯৯৫ সালে নেয়া হয় ‘পূর্বাচল নতুন শহর প্রকল্প’। উদ্দেশ্য ছিল পূর্বাচলে যথাযথ নগরায়নের মাধ্যমে পরিবেশের ভারসাম্য বজায় রাখা। পরিবেশবান্ধব এবং টেকসই পরিবেশ তৈরি করা। আবাসনের বিদ্যমান তীব্র সমস্যা হ্রাস করা। আশেপাশের অঞ্চলে নগরায়নের মাধ্যমে নাগরিক সুবিধা প্রসারিত করা। নতুন জনপদের উন্নয়ন এবং অর্থনৈতিক সুযোগ-সুবিধা সমপ্রসারণ করা। ভবিষ্যতের আবাসন চাহিদা হ্রাস করা। তবে ২৭ বছর আগে এ প্রকল্পের কাজ শুরু হলেও এখনো সমাপ্ত হয়নি। দফায় দফায় বাড়ছে ব্যয়ভার। বেড়েছে প্রকল্পের মেয়াদ। গৃহায়ন ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত স্থায়ী কমিটি বৈঠক সূত্রে জানা যায়, এখন পর্যন্ত এর সামগ্রিক অগ্রগতি হয়েছে ৭৫ শতাংশ। ওয়াটার পাইপলাইন, রোড নেটওয়ার্ক, ব্রিজ নির্মাণ, আন্ডারগ্রাউন্ড ক্যাবলিং, ওয়াকওয়ে, ইকোপার্ক, লেক খননসহ সম্পন্ন হয়নি অন্যান্য কার্যক্রমও। দীর্ঘ সময়েও কাজ শেষ না হওয়ায় ক্ষোভ প্রকাশ করছেন অনেকেই। এনিয়ে জনমনে রয়েছে নানা প্রশ্ন। বিষয়টি নিয়ে অসন্তোষ প্রকাশ করেছেন গৃহায়ন ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত স্থায়ী কমিটির সভাপতি ইঞ্জিনিয়ার মোশাররফ হোসেন। স্থায়ী কমিটির ১৭তম বৈঠকে তিনি এ অসন্তোষ প্রকাশ করেন।
বৈঠকের কার্যবিবরণী থেকে এসব তথ্য পাওয়া যায়। বৈঠকে সভাপতির বক্তব্যে ইঞ্জিনিয়ার মোশাররফ হোসেন বলেন, রাজউক ৩০ বছর পূর্বে পূর্বাচল নতুন শহর প্রকল্পের অবকাঠামোগত উন্নয়নের কাজ শুরু করে অথচ এখন পর্যন্ত ওয়াটার পাইপলাইন, রোড নেটওয়ার্ক, ব্রিজ নির্মাণ, আন্ডারগ্রাউন্ড ক্যাবলিং, ওয়াকওয়ে, ইকোপার্ক, লেক খননসহ অন্যান্য কার্যক্রম সম্পন্ন করা সম্ভবপর হয়নি। পূর্বাচল নতুন শহর প্রকল্পে অবকাঠামোগত উন্নয়ন দৃশ্যমান না হলে সেখানে বসবাসের জন্য মানুষ আগ্রহী হবে না। ওয়াটার পাইপলাইন নির্মাণের জন্য দায়িত্বপ্রাপ্ত প্রতিষ্ঠানটিকে দ্রুত কাজ শুরু করতে হবে। ব্যর্থ হলে চুক্তি বাতিল করে নতুন কোনো প্রতিষ্ঠানকে কাজ দেয়া যায় কিনা সেটি খতিয়ে দেখতে  রাজউক কর্তৃপক্ষকে নির্দেশও দেন। তিনি বলেন, পূর্বাচল প্রকল্পে আন্ডারগ্রাউন্ড ক্যাবলিং ও লেক তৈরির কাজ দ্রুত সমাপ্ত করতে হবে। এ ছাড়াও পিপিপি’র মাধ্যমে উক্ত প্রকল্পে নিম্ন ও মধ্যম আয়ের লোকজনের জন্য বরাদ্দকৃত জমিতে ফ্ল্যাট প্রকল্প গ্রহণ করা সম্ভবপর না হলে রাজধানী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ এবং গণপূর্ত অধিদপ্তর সম্মিলিতভাবে উক্ত প্রকল্পে নিজস্ব অর্থায়নে কাজ করতে পারে বলে জানান তিনি। এদিকে পূর্বাচল নতুন শহর প্রকল্পে প্রাতিষ্ঠানিক প্লট বরাদ্দের ক্ষেত্রে শ্রেণি পরিবর্তন না করায় বাংলাদেশ পরিবেশ আইনজীবী সমিতিসহ পরিবেশবাদীদের সংগঠন রাজউকের বিরুদ্ধে রিট আবেদন করেছে। সেটি বর্তমানে আদালতে বিচারাধীন রয়েছে। উক্ত মামলা সংক্রান্ত জটিলতা নিষ্পত্তি করার নিমিত্তে বর্তমান অ্যাটর্নি জেনারেলের সঙ্গে নিয়মিত যোগাযোগ রক্ষার জন্য রাজউক চেয়ারম্যানের প্রতি আহ্বান জানান স্থায়ী কমিটির এ সভাপতি।
জানা যায়, ১৯৯৫ সালে রাজধানী ঢাকার সমপ্রসারণের লক্ষ্য নিয়ে ‘পূর্বাচল নতুন শহর প্রকল্প’ গৃহীত হয়েছিল। প্রকল্পটির বাস্তবায়নকাল ছিল ২০১০ সাল পর্যন্ত। যা পরে সংশোধন করে ২০১৮ সালের জুন পর্যন্ত বর্ধিত করা হয়। পরে আবারো সময় বৃদ্ধি করে ২০১৯ সালের মধ্যে সমাপ্ত করার ঘোষণা দিয়েছিল সরকার। এই সময়েও কাজ শেষ করতে পারেনি রাজউক। ফলে ফের সময় বৃদ্ধি করা হয়। ১৯৯৫ সালের জুলাই থেকে ২০২০ সালের ডিসেম্বর পর্যন্ত সময়ে এ প্রকল্পের বাস্তবায়ন হয়েছে ৬৮ শতাংশ। ২০২১ সালের শেষ নাগাদ এর কাজ সমাপ্ত হয় ৭৫ শতাংশ। প্রকল্পটি অনুমোদনের পর থেকে বিভিন্ন কারণে বহুবার নকশা সংশোধন করা হয়েছে। বারবার সংশোধনের পর প্রকল্প ব্যয় দাঁড়ায় ৭ হাজার ৭৮২ কোটি ১৫ লাখ টাকায়।  ঢাকা থেকে ১৬ কিলোমিটার দূরে ‘পূর্বাচল নতুন শহর’ স্থাপনের জন্য সরকার ছয় হাজার ২২৭ একর ভূমি অধিগ্রহণ করেছিল। এর মধ্যে নারায়ণগঞ্জ অংশে রয়েছে ৪ হাজার ৫৭৭ দশমিক ৩৬ একর ভূমি এবং গাজীপুর অংশে রয়েছে ১৫শ’ একর জমি। মূল পরিকল্পনা অনুযায়ী মোট ভূমির মধ্যে আবাসিক প্লটে ব্যয় হবে ৩৮ দশমিক ৭৪ শতাংশ ভূমি। এ ছাড়া সড়ক তৈরিতে ব্যয় হবে ২৫ দশমিক ৯০ শতাংশ, সামাজিক অবকাঠামো তৈরিতে ব্যয় হবে ৩ দশমিক ০৪ শতাংশ, লেক তৈরিতে ব্যয় হবে ৭ দশমিক ১০ শতাংশ, প্রশাসনিক ও বাণিজ্যিকে প্লট তৈরিতে ব্যয় হবে ৬ দশমিক ৪১ শতাংশ, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও শিক্ষা সংশ্লিষ্ট অন্যান্য প্রতিষ্ঠান নির্মাণে ৬ শতাংশ ব্যয় হবে ভূমি। জনসমাগম ও খেলার মাঠের জন্য ২ দশমিক ৫০ শতাংশ বরাদ্দ রাখা হয়েছিল। অবশিষ্ট ১০ দশমিক ৩১ শতাংশ ভূমি সংরক্ষিত রাখা হয়েছিল। তবে রাজউক বলছে, পুরো প্রকল্পটি ২০২৫ সালের মধ্যে শেষ হবে। প্রথমদিকে এ প্রকল্পের মাধ্যমে ১০ লাখ মানুষের বসবাস উপযোগী আবাসন ব্যবস্থা গড়ে তুলতে মূল পরিকল্পনা প্রণয়ণ করা হয়। পরবর্তীতে নতুন নকশা অনুসারে এ প্রকল্পে ২৭ লাখ মানুষের বসবাসের লক্ষ্যমাত্রা পুনঃনির্ধারণ করা হয়েছে।
কার্যবিবরণীতে রাজউকের এক সদস্য জানান, পূর্বাচল প্রকল্পে সামগ্রিক অগ্রগতি হয়েছে ৭৫ শতাংশ। প্রকল্পে ৩২০ কিলোমিটার রাস্তার মধ্যে ৩০০ কিলোমিটার রাস্তার নির্মাণকাজ শেষ হয়েছে। বাকি ২০ কিলোমিটার রাস্তা নির্মাণের জন্য টেন্ডার আহ্বান করা হয়েছে। ২০২১ সালের ডিসেম্বরে প্রকল্পের মেয়াদ শেষ হওয়ার আগেই বাকি ২০ কিলোমিটার রাস্তার নির্মাণ কাজ শেষ হবে। যদিও এই সময়েও তা শেষ হয়নি।
রাজউক চেয়ারম্যান এবিএম আমিন উল্লাহ নূরী মানবজমিনকে বলেন, পূর্বাচল প্রকল্পের কাজ প্রায় শেষের দিকে। কিছু কাজ এখনো বাকি আছে। এটা যেহেতু উন্নয়ন প্রকল্প সব কাজ এক সঙ্গে শেষ করা যাবে না। কিছু কাজ আছে বারবার সংস্কার করতে হচ্ছে। আমরা চেষ্টা করছি, দ্রুত কাজগুলো শেষ করতে। এ প্রকল্পটি এখন মানুষের বসবাসযোগ্য হয়েছে। মানুষ বাড়িঘর নির্মাণ করতে পারবে। যারা এর সঙ্গে সংশ্লিষ্ট রয়েছেন তাদেকে এখানে বাড়িঘর নির্মাণের আহ্বান জানাচ্ছি। বসবাস শুরু হলেই প্রকল্পটির বাস্তবতা ফুটে উঠবে। তিনি আরও বলেন, আমরা সরকারি কিছু সংস্থাকে এখানে জায়গা দিয়েছি। থানা, ফায়ার সার্ভিস, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানসহ সবাইকে বরাদ্দ দেয়া হয়েছে। তারা এখন তাদের কার্যক্রম শুরু করলেই কাজ দ্রুত সমাপ্ত হবে।
প্রধান সম্পাদক মতিউর রহমান চৌধুরী
জেনিথ টাওয়ার, ৪০ কাওরান বাজার, ঢাকা-১২১৫ এবং মিডিয়া প্রিন্টার্স ১৪৯-১৫০ তেজগাঁও শিল্প এলাকা, ঢাকা-১২০৮ থেকে
মাহবুবা চৌধুরী কর্তৃক সম্পাদিত ও প্রকাশিত।
ফোন : ৫৫০-১১৭১০-৩ ফ্যাক্স : ৮১২৮৩১৩, ৫৫০১৩৪০০
ই-মেইল: [email protected]
Copyright © 2022
All rights reserved www.mzamin.com