বাংলারজমিন

বরগুনায় ৭৫ টাকার ইনজেকশন ৩ হাজারে বিক্রি করেন চিকিৎসক!

বরগুনা প্রতিনিধি

১৬ জানুয়ারি ২০২২, রবিবার, ৮:৪২ অপরাহ্ন

বরগুনা জেলা শহরে ডক্টরস কেয়ার ক্লিনিক অ্যান্ড হাসপাতালে এক চিকিৎসকের বিরুদ্ধে ৭৫ টাকার ইনজেকশন তিন হাজার টাকায় বিক্রির অভিযোগ উঠেছে। অভিযুক্ত ওই চিকিৎসকের নাম মো. শিহাব উদ্দিন শিহাব। তিনি বরিশাল শেরেবাংলা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের অর্থোসার্জারি বিভাগের সহকারী অধ্যাপক।
ডা. মো. শিহাব উদ্দিন শিহাব বরগুনার কলেজ রোডের ডক্টরস কেয়ার ক্লিনিক অ্যান্ড হাসপাতালে প্রতি মাসে দু’বার রোগী দেখেন। এই চিকিৎসকের আগমন উপলক্ষে বরগুনায় প্রতিদিন মাইকিং করা হয়।
আবদুর রাজ্জাক ও রিয়াজুল ইসলাম নামের দু’জন ভুক্তভোগী রোগী সাইনোকর্ট নামের ৭৫ টাকার ইনজেকশন তাদের কাছে তিন হাজার টাকায় বিক্রির অভিযোগ করেন। ফার্মেসিতে খোঁজ নিয়ে জানা যায়, ইনজেকশনটির সর্বোচ্চ খুচরা মূল্য ৭৫ টাকা, টেকনো ড্রাগস লিমিটেড এর উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠান। যদিও ওই চিকিৎসকের দাবি, ইনজেকশনটির দাম কম। ইনজেকশনটি পুশ করতে তিন হাজার টাকা থেকে আট হাজার টাকা পর্যন্ত নেয়া হয়। আর যদি রোগী গরিব হয়, তাহলে ফ্রিতেও ইনজেকশন পুশ করা হয়।
অভিযোগকারী আবদুর রাজ্জাক বরগুনা সদর উপজেলার লাকুরতলা এলাকার বাসিন্দা। আর অপর অভিযোগকারী রিয়াজুল ইসলাম বরগুনা সদর উপজেলার কুমড়াখালী এলাকার বাসিন্দা।
এ বিষয়ে আবদুর রাজ্জাক বলেন, আমার স্ত্রী জান্নাতুল ফেরদৌসী ব্রেন টিউমারে আক্রান্ত। তার মেরুদণ্ড এবং পায়ে ব্যথা। তাই শুক্রবার বিকাল ৩টার দিকে স্ত্রীর চিকিৎসার জন্য ডক্টরস কেয়ার ক্লিনিক অ্যান্ড হাসপাতালে চিকিৎসক মো. শিহাব উদ্দিন শিহাবের কাছে যাই। এরপর ৬০০ টাকা ভিজিট দিয়ে আমার স্ত্রীকে ডাক্তারের কাছে নিয়ে যাই। ডাক্তার শিহাব আমার স্ত্রীকে দেখে দু’টি এক্সরে এবং রক্তের জন্য তিনটি টেস্ট দেন। যার জন্য খরচ হয় ১৮০০ টাকা। এরপর রিপোর্ট নিয়ে ফের ডাক্তারের কাছে গেলে তিনি আমার স্ত্রীকে সাইনোকর্ট নামের একটি ইনজেকশন পুশ করার কথা বলেন। ইনজেকশনটির দাম তিন হাজার টাকা উল্লেখ করে তিনি বলেন, পুশ করার জন্য কোনো চার্জ দিতে হবে না। পরে আমার কাছে টাকা না থাকায় আমি বাইরে থেকে ইনজেকশনটি কিনে পুশ করতে চাই। এজন্য ইনজেকশনটির নাম লিখে দিতে বললে তিনি রাজি হননি। তাই বিকাশের মাধ্যমে টাকা চান তিনি। পরে আমি বিকাশের মাধ্যমে ডাক্তারের দেয়া ০১৯১৯১..৬৬৭ এই নম্বরে তিন হাজার টাকা দেই। এরপর ডাক্তার নিজেই আমার স্ত্রীকে ইনজেকশন পুশ করেন।
তিনি আরও বলেন, পরে আমি ফার্মেসিতে গিয়ে ইনজেকশনটির দাম জেনে অবাক হই। একজন চিকিৎসকের এ কেমন প্রতারণা তা কিছুতেই বুঝতে পারছি না। আমি এর বিচার চাই।
অপর ভুক্তভোগী মো. রিয়াজুল ইসলাম বলেন, শুক্রবার বেলা ১১টার দিকে আমার স্ত্রীর বোনকে ডা. মো. শিহাব উদ্দিন শিহাবের কাছে নিয়ে যাই। এরপর ৬০০ টাকা ভিজিট দিয়ে তার সঙ্গে দেখা করি। এরপর তিনি একটি এক্সরেসহ চারটি টেস্ট দেন। এ টেস্টের জন্য ব্যয় হয় ১ হাজার ৭৫০ টাকা। পরে বিকাল ২টার দিকে টেস্টের রিপোর্ট নিয়ে ডা. মো. শিহাব উদ্দিন শিহাবের কাছে গেলে আমার স্ত্রীর বোন মোসা. পারভীন আক্তারকে সাইনোকর্ট নামের ইনজেকশন পুশ করতে হবে বলে জানান। এ ইনজেকশনের দাম জানতে চাইলে তিনি ৩ হাজার টাকা বলেন। পরে আমি নগদ ৩ হাজার টাকা দিলে ডাক্তারের টেবিলে থাকা ইনজেকশন পুশ করেন। এরপর বাইরে ফার্মেসিতে গিয়ে আমি এই ইনজেকশনের দাম ৭০ টাকা জানতে পারি। একজন ডাক্তার এমন প্রতারণা করতে পারে, তা আমি ভাবতেই পারিনি। আমি এমন প্রতারণার বিচার চাই।
বরগুনা জেলা ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ কমিটির সদস্য ও গণমাধ্যমকর্মী আবু জাফর মো. সালেহ বলেন, একজন চিকিৎসকের নিজ চেম্বারে ওষুধ বিক্রি করার কথা না। রোগীদের জিম্মি করে ৭৫ টাকা মূল্যের ওষুধ ৩ হাজার টাকায় বিক্রি করা অমানবিক এবং অনৈতিক। আমি মনে করি, এমন চিকিৎসকের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণ করা জরুরি।
এ বিষয়ে চিকিৎসক মো. শিহাব উদ্দিন শিহাব বলেন, সাইনোকর্ট নামের ইনজেকশনটির দাম কম। বাইরে এটি ৫ থেকে ৬ শত টাকায় পুশ করা হয়। তবে এটি পুশ করতে সিনিয়র চিকিৎসকরা তিন হাজার টাকা থেকে আট হাজার টাকা পর্যন্ত নেন। আবার গরিব রোগীদের ফ্রিতেও পুশ করা হয়।
ডক্টরস কেয়ার ক্লিনিক অ্যান্ড হাসপাতালের ব্যবস্থাপক মো. ইব্রাহীম বলেন, সাইনোকর্ট নামের ইনজেকশনটির দাম ৭৫ টাকা। এটার দামসহ পুশ করার জন্য ডা. মো. শিহাব উদ্দিন শিহাব ৩ হাজার টাকা নেন। এই ইনজেকশন তার কাছেই থাকে। এই ইনজেকশনের কথা ব্যবস্থাপত্রে উল্লেখ করা হয় না। তবে এই টাকার কোনো ভাগ ক্লিনিক কর্তৃপক্ষ পায় না।
শিহাব উদ্দিন শিহাব একজন সিনিয়র চিকিৎসক। তাই নাম পরিচয় প্রকাশ করে এ বিষয়ে কথা বলতে নারাজ বরগুনায় কর্মরত এমবিবিএস ডিগ্রিধারী চিকিৎসকরা। তবে নাম প্রকাশ না করার শর্তে একজন চিকিৎসক জানান, এই ইনজেকশন পুশ করার জন্য ঢাকাতেও ৬ শত থেকে ৮ শত টাকা নেয়া হয়। সিনিয়র এবং উচ্চ ডিগ্রিধারী চিকিৎসকরাও এ ইনজেকশন পুশ করার জন্য এক হাজার টাকার বেশি নেন বলে জানান।
বরগুনার সিভিল সার্জন ডা. মুহাম্মদ ফজলুল হক বলেন, বিষয়টি আমরা অবশ্যই খতিয়ে দেখবো। অভিযোগের সত্যতা পাওয়া গেলে আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।
প্রধান সম্পাদক মতিউর রহমান চৌধুরী
জেনিথ টাওয়ার, ৪০ কাওরান বাজার, ঢাকা-১২১৫ এবং মিডিয়া প্রিন্টার্স ১৪৯-১৫০ তেজগাঁও শিল্প এলাকা, ঢাকা-১২০৮ থেকে
মাহবুবা চৌধুরী কর্তৃক সম্পাদিত ও প্রকাশিত।
ফোন : ৫৫০-১১৭১০-৩ ফ্যাক্স : ৮১২৮৩১৩, ৫৫০১৩৪০০
ই-মেইল: [email protected]
Copyright © 2022
All rights reserved www.mzamin.com