শিক্ষাঙ্গন

গুচ্ছ ভর্তি পরীক্ষা, শিক্ষার্থী পাচ্ছে না বিশ্ববিদ্যালয়গুলো

পিয়াস সরকার

১৫ জানুয়ারি ২০২২, শনিবার, ৭:৪৩ অপরাহ্ন

বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রথম বর্ষের আসন সংখ্যা ১ হাজার ৩৯৫টি। এর মধ্যে ভর্তি হয়েছেন মাত্র ২৫৪ জন। আসন ফাঁকা রয়েছে ৮১ শতাংশ। আর রাজধানীর স্বনামধন্য বিশ্ববিদ্যালয় জগন্নাথে চার বার মেধাতালিকা প্রকাশ করেও পূরণ করতে পারেনি সব আসন। পরিকল্পনা চলছে পঞ্চমবারের মতো মেধা তালিকা প্রকাশের।

গুচ্ছ পরীক্ষা নিয়ে দীর্ঘ পরিকল্পনা। শেষে ২০২১ সালে বাস্তবায়ন। ৩০টি বিশ্ববিদ্যালয় নিয়ে হয় তিন গুচ্ছ। এরমধ্যে ২০টি সাধারণ এবং বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় নিয়ে হয় পরীক্ষা। কিন্তু এই পরীক্ষা নিয়ে শুরু থেকেই নানা অসন্তোষ প্রকাশ করেন শিক্ষার্থীরা। আর এখন শিক্ষার্থী পাচ্ছে না বিশ্ববিদ্যালয়গুলো। বারবার মেধা তালিকা প্রকাশের পর শিক্ষার্থী ভর্তি করাতে পারছে না বিশ্ববিদ্যালয়গুলো।

জানা যায়, বরিশাল বিশ্ববিদ্যালয়ে বুধবার তৃতীয় মেধা তালিকা ভর্তির শেষ দিন ছিল। দ্বিতীয় মেধা তালিকা শেষে ভর্তি হন ৫৫২ শিক্ষার্থী। মোট আসন ১ হাজার ৪৪০টি। জগন্নাথে ৩য় মেধা তালিকা পর্যন্ত ভর্তি হয়েছেন ২ হাজার ১২২ জন। আসন ফাঁকা রয়েছে ৭১২টি। চতুর্থ মেধাতালিকায় ভর্তি কার্যক্রম চলছে। হাজী দানেশ বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ে ফাঁকা আসন ৭৯৩টি, ইসলামি বিশ্ববিদ্যালয়ে মোট আসন ২ হাজার ৯৫টি, ফাঁকা রয়েছে ১ হাজার ৭৪৫টি। কুমিল্লায় ১ হাজার ৪০ আসনের বিপরীতে ভর্তি হয়েছেন ৫০৭ শিক্ষার্থী। পটুয়াখালী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় পরীক্ষার তিন মাস পেরিয়ে গেলেও এখনো শুরু করতে পারেনি ভর্তি কার্যক্রম। সোমবার তারা দেয় প্রথম মেধা তালিকা। শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ে মোট আসন সংখ্যা ১ হাজার ৫৮৭টি। যার মধ্যে ভর্তি হয়েছেন মাত্র ৪০৭ জন।

পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যয়নের জন্য মুখিয়ে থাকেন শিক্ষার্থীরা। এবার সম্পূর্ণ উল্টো চিত্র মিলছে। একাধিক শিক্ষার্থী জানান, পরীক্ষার দীর্ঘ সময় পর ভর্তি কার্যক্রম। পছন্দের বিশ্ববিদ্যালয় ও বিষয়ে পড়বার সুযোগের অনিশ্চয়তাই এর প্রধান কারণ। রংপুরের শিক্ষার্থী শেখ মো. আদনান সম্প্রতি ভর্তি হয়েছেন রাজধানীর একটি বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে। তিনি বলেন, কবে ভর্তি হবো? কবে আসবে সুযোগ? করোনার কারণে আগেই ক্ষতি হয়েছে দীর্ঘ সময়। এখন যদি অপেক্ষায় থাকতাম জানুয়ারিতেও আমরা অনার্স জীবন শুরু হতো না। তিনি বলেন, পাবলিকে পড়বার ইচ্ছা ছিল। কিন্তু তাদের প্রক্রিয়ায় সময় সাপেক্ষ। আর অপেক্ষা করেও যে পছন্দ অনুযায়ী ভর্তি হতে পারবো তার নিশ্চয়তা কই?
বিশ্ববিদ্যালয়গুলো দীর্ঘ তিন মাস পার হওয়ার পরও পাচ্ছেন না শিক্ষার্থী। আবার বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয় ক্লাস শুরুর তারিখ ঘোষণা করবে। খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রথম বর্ষের ক্লাস শুরু হবে ৩০শে জানুয়ারি। জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্লাস শুরু ১০ই ফেব্রুয়ারি। একদিকে শিক্ষার্থী পাচ্ছে না বিশ্ববিদ্যালয়গুলো। অন্যদিকে এগিয়ে আসছে ক্লাস শুরুর সময়। ফলে শঙ্কা দেখা দিয়েছে বিপুল সংখ্যক আসন ফাঁকা থেকেই যাবে।

ঢাকা কলেজের শিক্ষার্থী খান মো. ইবরাহীম। অনার্সে তিনি ঢাকা কলেজেই ভর্তি হন। ইবরাহীম গুচ্ছে দ্বিতীয়বার পরীক্ষা দেন। তিনি বলেন, আমার নম্বর অনেক কম (৪৬)। বিজ্ঞান বিভাগের হওয়ায় সাহস হয়ে ওঠেনি আবেদন করার। এখনো মেধা তালিকা দিচ্ছে। কিন্তু আর সেখানে যাবো না। তারা যেভাবে কালক্ষেপণ করছে এতে আমার লেখাপড়ায় দীর্ঘ বিরতি চলে আসবে। বিরতির থেকে ঢাকা কলেজেই পড়াটা শ্রেয় মনে হচ্ছে।

গুচ্ছের বিজ্ঞান বিভাগের পরীক্ষা অনুষ্ঠিত হয় গত বছরের ১৭ই অক্টোবর। মানবিক ও বাণিজ্য বিভাগের যথাক্রমে ২৪শে অক্টোবর ও ১লা নভেম্বর। তিন বিভাগের ফল প্রকাশ হয় যথাক্রমে ২০শে অক্টোবর, ২৬শে অক্টোবর ও ৩রা নভেম্বর।

গুচ্ছ নিয়ে শুরু থেকেই ছিল নানা অভিযোগ। বিভাগ পরিবর্তনকারী ইউনিট না রাখা থেকে শুরু হয় অসন্তোষের। পরীক্ষার আবেদন ফি করা হয় দ্বিগুণ। পরীক্ষায় সিলেকশন পদ্ধতি নিয়ে প্রতিবাদ হয়েছে বিস্তর। পছন্দের এলাকায় পরীক্ষার হল না পড়া নিয়ে বিপাকে ছিলেন অনেক শিক্ষার্থী। গুচ্ছ পদ্ধতিতে এই পরীক্ষাকে সাধুবাদ জানিয়েছেন সর্বমহল। কিন্তু পরীক্ষা নিয়ে এসব নানা অসন্তোষ নিয়ে একাধিকবার হয়েছে আন্দোলন, মানববন্ধন। এমনকি গড়িয়েছিল আদালতেও। আর সব থেকে বড় অসন্তোষ দেখা দেয় প্রতিটি বিশ্ববিদ্যালয়ের বিভাগ প্রতি আলাদা আবেদন ফি নিয়ে। এতে একেক জন শিক্ষার্থীর খরচ হয়েছে কয়েক হাজার টাকা।

গুচ্ছের পরীক্ষার পর অনেক শিক্ষার্থী ভর্তির অপেক্ষায় ছিলেন। কিন্তু গুচ্ছের বাইরে থাকা বিশ্ববিদ্যালয়, মেডিকেলের ভর্তি সম্পন্ন না হওয়ায় ভর্তি কার্যক্রম শুরু করেনি বিশ্ববিদ্যালয়গুলো। এই বিশ্ববিদ্যালয় ও মেডিকেল ভর্তি কার্যক্রম শেষ হওয়ার পর শিক্ষার্থী পাচ্ছে না বিশ্ববিদ্যালয়গুলো। অনেকেই বিশ্ববিদ্যালয়ে আবেদন করবার থেকে বাড়ির পাশে কলেজে অধ্যয়নে বেশি আগ্রহ দেখাচ্ছেন।
রাকিব রায়হান গুচ্ছে পরীক্ষা নিয়ে অসন্তোষ প্রকাশ করে বলেন, আমি গুচ্ছে বিভাগ পরিবর্তনকারী ইউনিট না থাকার কারণে পরীক্ষায় অংশ নেইনি। তারা বিভাগ পরিবর্তনকারী ইউনিট রাখবে না- এটা হুট করে ঘোষণা দিলে কীভাবে হবে?

আরেক শিক্ষার্থী রাফসানা শাহ বলেন, বিশ্ববিদ্যালয়গুলো এখন ভর্তি করানোর শিক্ষার্থী পাচ্ছে না। আর আমাদের সিলেকশন প্রসেসে এনে পরীক্ষাটাই দিতে দিলো না। তারা দু’জনই জানান, শিক্ষার্থীদের দুর্দশা লাঘবের এই পরীক্ষায় এতো অসন্তোষ। এই পদ্ধতি-প্রক্রিয়া সংশোধন কিংবা বাতিল করা হোক।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক বিশ্ববিদ্যালয়ের রেজিস্ট্রার বলেন, তার বিশ্ববিদ্যালয়ে শতভাগ আসন পূর্ণ হওয়া নিয়ে নিজেদের মধ্যে আলোচনা হয়েছে। আলোচনায় এক পর্যায়ে ভাইস চ্যান্সেলর বলেন, এভাবে স্বেচ্ছাচারী মনোভাব থাকলে গুচ্ছতে আর আমরা যাবো না। তিনি আরও বলেন, এবার করোনার কারণে বিরতির পরে আমরা ভেবেছিলাম শিক্ষার্থীরা হুমড়ি খেয়ে পড়বেন। কিন্তু সঠিক সিদ্ধান্তের অভাবে হয়েছে তার উল্টোটা।

বরিশাল বিশ্ববিদ্যালয়ের ভাইস চ্যান্সেলর অধ্যাপক ড. ছাদেকুল আরেফিন বলেন, আমি বলবো গুচ্ছ নিয়ে কোনো গলদ নেই। বিশ্ববিদ্যালয় ২০টি হওয়ায় শিক্ষার্থীরা ভালো সুযোগের অপেক্ষা করছেন। ভর্তির যখন মেধা তালিকা দেয়া হয় তখন শিক্ষার্থীরা ভর্তি হচ্ছে। আমার বিশ্ববিদ্যালয়ে ৫০ শতাংশ শিক্ষার্থী ভর্তি হয়েছে (তৃতীয় মেধা তালিকা শেষে)। আমার কাছে মনে হয়েছে, মেধা তালিকার দিকে শিক্ষার্থীরা তাকিয়ে আছে। তিনি আরও বলেন, গুচ্ছ নিয়ে পরবর্তীতে কি হবে এগুলো নিয়ে এখনো আলোচনা হয়নি। এখনো এই বিষয়ে বলার সময় আসেনি।
প্রধান সম্পাদক মতিউর রহমান চৌধুরী
জেনিথ টাওয়ার, ৪০ কাওরান বাজার, ঢাকা-১২১৫ এবং মিডিয়া প্রিন্টার্স ১৪৯-১৫০ তেজগাঁও শিল্প এলাকা, ঢাকা-১২০৮ থেকে
মাহবুবা চৌধুরী কর্তৃক সম্পাদিত ও প্রকাশিত।
ফোন : ৫৫০-১১৭১০-৩ ফ্যাক্স : ৮১২৮৩১৩, ৫৫০১৩৪০০
ই-মেইল: [email protected]
Copyright © 2022
All rights reserved www.mzamin.com
DMCA.com Protection Status