মত-মতান্তর

'আমাদের মতপার্থক্যকে মিজান সহজেই হেসে লঘু করে দিতে পারতো'

আলী রীয়াজ

১১ জানুয়ারি ২০২২, মঙ্গলবার, ৪:৩৩ অপরাহ্ন

আজ ১১ জানুয়ারি মিজানুর রহমান খানের প্রথম মৃত্যুবার্ষিকী।

মিজানের মৃত্যুর সংবাদ শোনার কথা স্মরণ হয়। তাঁর অসুস্থতার কথা শোনার পর থেকেই এক ধরণের ভীতি মনের মধ্যে বাসা বেধেছিলো, কিন্ত এক ধরণের বিশ্বাস ছিলো মিজান ভালো হয়ে উঠবেন। প্রতিদিন আশা করছিলাম এই খবরের জন্যে যে, প্রথম আলো থেকে কেউ একজন জানাবেন, অথবা জাকারিয়ার সঙ্গে আমার কথোপকথনের শুরুতে জাকারিয়া বলবেন – ‘মিজান ভাই ভালো হয়ে উঠেছেন, শিগগিরই বাড়ি ফিরবেন।’ এগুলো ছিলো আমার প্রত্যাশা, কিন্ত তা হয়নি। নির্মম এই সংবাদটি আমাকে শুনতে হয়েছে।

মিজান এতো সহজেই আমাদের ছেড়ে যাবেন এটা আমি কখনোই ভাবিনি। বয়সে মিজান আমার চেয়ে অনেক ছোট বলেই শুধু নয়, মিজানের মতো প্রাণোচ্ছল মানুষ অকস্মাৎ চলে যেতে পারেন তা আমি কখনোই ভাবতে পারিনি। মিজানকে যতদিন ধরে চিনতাম ততদিন মিজানকে আমি দেখেছি হাস্যোচ্ছল। আমাদের মতপার্থক্যকে যে সহজেই হেসে লঘু করে দিতে পারতো, যার হাসি ছিলো সংক্রামক। আমি যতবার মিজানের সঙ্গে রাগ করতে চেয়েছি ততবার মিজান আমাকে ব্যর্থ করে দিতে পেরেছেন। আমি ভাবতাম মন ভালো করে ফেলার জন্যে হলেও আমার উচিত মিজানের সঙ্গে রাগ করা।

যার সঙ্গে কথা বললে আমার জানার বোঝার পরিধি বাড়তো সেই রকম একজন প্রাণবান মানুষ কী করে এতো সহজেই আমাদের কাছে থেকে হারিয়ে যায় তা এখনও আমি উপলব্ধি করতে পারিনা, তখন পারিনি – এক বছর পরেও পারিনা।

২০০৫ সালে থেকে একটি ব্যতিক্রম ছাড়া ঢাকায় আমার প্রতিটি সফরেই আমার সঙ্গে মিজানের দেখা হয়েছে। মিজানের সঙ্গে দেখা না করে ঢাকা সফর পূর্ণ হবার অবকাশ ছিলোনা।

মিজান চলে গেলে আমি লিখেছিলাম ‘আমাদের অপ্রস্তত রেখে চলে গেলেন মিজান’। সেটা গত বছর। গত এক বছরে আমি তার চেয়ে বেশি করে বুঝেছি আমরা কতটা অপ্রস্তত ছিলাম, তাঁর অনুপস্থিতি কত বড় শুন্যতা তৈরি করেছে। গত বছর ঢাকায় গিয়ে মনে হয়েছে কারও কারও অনুপস্থিতি আমাদের চারপাশের জীবনের স্বাভাবিকতার মধ্যেই এক ধরণের শুন্যতা রেখে যায়। সেগুলো আর পূরণ হয়না। আমরা আমাদের জীবন যাপন করি, কিন্ত তাঁরা থাকেন না তা নয়। মিজান সেই রকম মানুষ। এখনও মাঝে মাঝে মনে হয়, এই বিষয়ে আমি সম্ভবত মিজানকে ফোনে জিজ্ঞাসা করতাম। এই যে মুহুর্তগুলো সেগুলো অতিক্রম করা যায় না।

মিজানকে যারা চিনতেন তাঁদের সকলের এই রকম স্মৃতি আছে, কেননা মিজানের উপস্থিতি আপনাকে স্পর্শ করবে না তা অসম্ভব। সাংবাদিকতায় মিজানের অবদান নিয়ে অনেক কথা বলার আছে, সেই কথা আমরা আগামীতে আরও বলবো। মিজানের কাজ থেকে মিজানকে আলাদা করা যাবে না – কাজ পাগল মানুষ ছিলেন। কিন্ত আমার কাছে যে মিজান সে আমার বন্ধু, যার কাছে আমি শিখেছি, যার সঙ্গে আমি সহজেই অনেক কথা ভাগ করে নিতে পেরেছি। আমি সেই মিজানের অনুপস্থিতি টের পাই। এক বছর পরেও টের পাই, এখন আরও বেশি করে টের পাই।

আলী রীয়াজ: যুক্তরাষ্ট্রের ইলিনয় স্টেট ইউনিভার্সিটির রাজনীতি ও সরকার বিভাগের ডিস্টিংগুইশড প্রফেসর, আটলান্টিক কাউন্সিলের অনাবাসিক সিনিয়র ফেলো এবং আমেরিকান ইনস্টিটিউট অব বাংলাদেশ স্টাডিজের প্রেসিডেন্ট।

(লেখাটি লেখকের ফেসবুক টাইমলাইন থেকে নেয়া)
প্রধান সম্পাদক মতিউর রহমান চৌধুরী
জেনিথ টাওয়ার, ৪০ কাওরান বাজার, ঢাকা-১২১৫ এবং মিডিয়া প্রিন্টার্স ১৪৯-১৫০ তেজগাঁও শিল্প এলাকা, ঢাকা-১২০৮ থেকে
মাহবুবা চৌধুরী কর্তৃক সম্পাদিত ও প্রকাশিত।
ফোন : ৫৫০-১১৭১০-৩ ফ্যাক্স : ৮১২৮৩১৩, ৫৫০১৩৪০০
ই-মেইল: [email protected]
Copyright © 2022
All rights reserved www.mzamin.com
DMCA.com Protection Status