প্রথম পাতা

ঢাকায় শান্তি সম্মেলন উদ্বোধন প্রেসিডেন্টের

বিশ্বময় শান্তির সুবাতাস ছড়িয়ে দেয়ার প্রত্যয়

কূটনৈতিক রিপোর্টার

৫ ডিসেম্বর ২০২১, রবিবার, ৯:৩১ অপরাহ্ন

যুদ্ধবিগ্রহ, বিভাজন-বাস্তুচ্যুতি এবং ক্ষুধা-দারিদ্র্যের কারণে ধরণী আজ অশান্ত-উত্তাল। এই অশান্ত বিশ্বে শান্তির সুবাতাস ছড়িয়ে দেয়ার প্রত্যয়ে ঢাকায় শুরু হয়েছে দু’দিনের বিশ্ব শান্তি সম্মেলন। প্রেসিডেন্ট আবদুল হামিদ গতকাল বিকালে আনুষ্ঠানিকভাবে শান্তি সম্মেলনের উদ্বোধন করেন। উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে দেয়া বক্তব্যে প্রেসিডেন্টও ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য দুনিয়াজুড়ে শান্তি আনয়নে নিজ নিজ অবস্থান থেকে প্রয়াস চালানোর তাগিদ দেন। বিভাজনের পথ পরিহার করে, হাতে হাত রেখে শান্তির পথে এগিয়ে চলতে বিশ্ব নেতাদের প্রতি আহ্বান জানান তিনি। রাজধানীর ইন্টারকন্টিনেন্টালে অনুষ্ঠিত ‘ওয়ার্ল্ড পিস কনফারেন্স-২১’ এর উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে বঙ্গভবন থেকে ভার্চ্যুয়ালি যুক্ত হয়েছিলেন প্রেসিডেন্ট। সেখানে প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি একটি শান্তিপূর্ণ, ন্যায়সঙ্গত, অধিকারভিত্তিক, অন্তর্ভুক্তিমূলক ও সমৃদ্ধ জাতি গঠনে বাংলাদেশের অক্লান্ত প্রচেষ্টার কথা তুলে ধরেন। দেশে-বিদেশে শান্তি প্রতিষ্ঠায় জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের অবদানের আন্তর্জাতিকীকরণের লক্ষ্য নিয়ে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় ওই শান্তি সম্মেলনের আয়োজন করেছে। যা আজ ‘ঢাকা শান্তি ঘোষণা’র মধ্যদিয়ে শেষ হবে। সমাপনী অনুষ্ঠানে বক্তব্য রাখবেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। জাতীয় সংসদের স্পিকার শিরীন চৌধুরীর সভাপতিত্বে উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে পররাষ্ট্রমন্ত্রী এ কে আবদুল মোমেন, জাতিসংঘের সাবেক মহাসচিব বান কি-মুন, পূর্ব তিমুরের সাবেক প্রেসিডেন্ট নোবেল বিজয়ী হোসে রামোস-হোর্তা, রাজনীতিবিদ ও ভারতের বেসামরিক বিমান পরিবহন, রেলওয়ে, বাণিজ্য ও শিল্প বিষয়ক সাবেক মন্ত্রী সুরেশ প্রভাকর প্রভু, মিশরের সাবেক পররাষ্ট্রমন্ত্রী ও আরব লীগের সাবেক মহাসচিব আমর মুসা, ওয়ার্ল্ড ইসলামিক ইকোনমিক ফোরাম ফাউন্ডেশনের সাবেক চেয়ারম্যান এবং মালয়েশিয়ার পররাষ্ট্র, স্বরাষ্ট্র ও প্রতিরক্ষা বিষয়ক সাবেক ফেডারেল মন্ত্রী তান শ্রী দাতো সেরি সৈয়দ হামিদ আলবার এবং জাতিসংঘ মহাসচিবের গণহত্যা প্রতিরোধ বিষয়ক বিশেষ উপদেষ্টা অ্যালিস ওয়াইরিমু এনদেরিতু উদ্বোধনী অধিবেশনে ভার্চ্যুয়ালি ও সশরীরে উপস্থিত থেকে বক্তৃতা করেন। অনুষ্ঠানে পররাষ্ট্র সচিব মাসুদ বিন মোমেন স্বাগত বক্তব্য রাখেন। তাছাড়া প্রতিমন্ত্রী শাহরিয়ার আলম এমপি অনুষ্ঠানের সার্বিক ব্যবস্থাপনায় যুক্ত ছিলেন।
সম্মেলনে শান্তি রক্ষায় কাজ করা বিশ্বের বিভিন্ন দেশের কবি, সাহিত্যিক, নোবেল বিজয়ী, শিক্ষাবিদ, বিজ্ঞানী, শিল্পী, সাংবাদিক, সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব, রাজনীতিক, মানবাধিকারকর্মী ও বুদ্ধিজীবীরা অংশ নিয়েছেন। এতে বিশ্বের ৫০টি দেশের প্রতিনিধি অংশ নিচ্ছেন। যার মধ্যে ৩০ দেশের ৫৯ জন সশরীরে এবং ২০ দেশের ৪০ জন প্রতিনিধি ভার্চ্যুয়ালি যুক্ত হন। প্রধান অতিথির বক্তব্যে প্রেসিডেন্ট আবদুল হামিদ আরও বলেন, শান্তি মানুষের মৌলিক অধিকার। শান্তি নিশ্চিত করতে আমরা বদ্ধপরিকর। জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান শুধু দেশে নয়, সারা বিশ্বেই শান্তি কামনা করেছিলেন। সে কারণে তিনি বঙ্গবন্ধু থেকে বিশ্ববন্ধুতে পরিণত হয়েছিলেন। প্রেসিডেন্ট বলেন, বিশ্ব এখন নানা ধরনের চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করছে। আমরা সেসব চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করেই সামনে শান্তি ও সম্প্রীতির জন্য এগিয়ে যেতে চাই। অনুষ্ঠানে সভাপতির বক্তব্যে জাতীয় সংসদের স্পিকার ড. শিরিন শারমীন চৌধুরী বলেন, বিশ্ব এখন নানাভাবে বিভক্ত হয়ে পড়েছে। ধর্ম, বর্ণ, জাতি, দারিদ্র্য, অসমতা ইত্যাদিতে বিশ্ব বিভক্ত। এমনকি কোভিড-১৯ টিকা নিয়েও বিভক্তি দেখা যায়। আমরা বঙ্গবন্ধুর আদর্শ-নীতি অনুযায়ী বিভক্ত ও বৈষম্যহীন বিশ্ব দেখার প্রত্যাশী। পররাষ্ট্র মন্ত্রী ড. এ কে আবদুল মোমেন তার বক্তব্যে বলেন, বিশ্বে হিংসা-বিদ্বেষ বেড়েছে। তবে আমরা শান্তির সংস্কৃতিতে বিশ্বাসী। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাও শান্তির সংস্কৃতির কথা জাতিসংঘে বলেছেন। আমরা বঙ্গবন্ধুর আদর্শ অনুয়ায়ী বিশ্বে শান্তির বার্তা ছড়িয়ে দিতে চাই। দু’দিনের সম্মেলনে চারটি প্যানেলে নির্ধারিত বিষয়ের ওপর আলোচনা চলছে। এতে বঙ্গবন্ধুর শান্তি দর্শনের আলোকে শান্তির সঙ্গে সংশ্লিষ্ট গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ের ওপর আলোচনা হচ্ছে। সম্মেলনে সাবেক বৃটিশ প্রধানমন্ত্রী গর্ডন ব্রাউন, সিঙ্গাপুরের সাবেক প্রধানমন্ত্রী গোহ চক তং, বুলগেরিয়ার সাবেক পররাষ্ট্রমন্ত্রী ইরিনা বোকোভা, ইউনিভার্সিটি অব পিসের রেক্টর ফ্রান্সিসকো রোজাস আরাভেনাসহ আরও অনেকে বিভিন্ন সেশনে যুক্ত রয়েছেন।
প্রেসিডেন্টের বক্তব্যের বিস্তারিত: শান্তি সম্মেলনে দেয়া বক্তব্যে প্রেসিডেন্ট মো. আবদুল হামিদ আরও বলেন, শান্তি বজায় রাখতে বাংলাদেশ অত্যন্ত আন্তরিক এবং যেকোনো মূল্যে শান্তি প্রতিষ্ঠা, বজায় রাখা ও জোরদারে আমরা অঙ্গীকারবদ্ধ। দেশের সংবিধানের সঙ্গে সঙ্গতি রেখে, বাংলাদেশ বিশ্বাস করে যে, বিশ্বব্যাপী শান্তি বজায় থাকাই জাতীয় নিরাপত্তার জন্য সর্বোত্তম সুরক্ষা। তিনি বলেন, আমরা শান্তিপূর্ণ উপায়ে সংঘাতগুলোর সমাধান করতে এবং বিশ্বব্যাপী শান্তি বজায় রাখতে আমাদের প্রচেষ্টা অব্যাহত রাখবো। প্রেসিডেন্ট আবদুল হামিদ জাতি, বর্ণ ও ধর্মভিত্তিক সব ধরনের বৈষম্যের অবসান এবং সকলের জন্য সমান সুযোগ নিশ্চিত করার আহ্বান জানান। বলেন, একই বিশ্বের বাসিন্দা হিসেবে সকলেরই অভিন্ন দায়িত্ব রয়েছে এবং বিশ্বের সকল মানুষের জন্য একটি ন্যায্য আন্তর্জাতিক ব্যবস্থা জরুরি। আমরা মনে করি বিশ্বের সর্বত্রই শান্তি গুরুত্বপূর্ণ বলে বিবেচিত হবে। শান্তি ও সম্প্রীতি বজায় থাকা আমাদের জীবনে অত্যন্ত প্রয়োজন। শান্তি আমাদেরকে সহিংসতা বা ভীতি থেকে স্বাধীনতার নিশ্চয়তা দেয়। ঢাকায় ‘বিশ্ব শান্তি সম্মেলন’কে বিশ্বের সকল শান্তিকামী মানুষের প্রতি যথাযথ শ্রদ্ধা হিসেবে উল্লেখ করে প্রেসিডেন্ট বলেন, বিশ্বের যেকোনো স্থানে শান্তি প্রতিষ্ঠায় কিছু করতে পারলে আমরা আমাদের সেবা দিতে পেরে খুশি হবো। আমরা সব সময় শান্তির পক্ষে এবং কোনো পূর্বশর্ত ছাড়াই আছি। ৫০ বছর আগে বাংলাদেশের জন্মের কথা উল্লেখ করে তিনি বলেন, ১৯৭১ সালের ডিসেম্বরে জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের নেতৃত্বে প্রায় ৩০ লাখ শহীদের সর্বোচ্চ আত্মত্যাগের মাধ্যমে বাংলাদেশ একটি স্বাধীন রাষ্ট্র হিসেবে আত্মপ্রকাশ করে। স্বাধীনতার পরপরই, শান্তির প্রবক্তা বঙ্গবন্ধু একটি সংবিধান প্রবর্তন করেন যা দেশের সকল নাগরিকের মৌলিক মানবাধিকারের নিশ্চয়তা দেয়, আন্তর্জাতিক শান্তি, নিরাপত্তা ও সংহতির প্রচার নিশ্চিত করে। বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতি উল্লেখ করে তিনি বলেন, সকলের সঙ্গে বন্ধুত্ব, কারও প্রতি বৈরিতা নয়। শান্তি প্রতিষ্ঠায় বঙ্গবন্ধুর অবদানের স্বীকৃতি হিসেবে বিশ্ব শান্তি পরিষদ ১৯৭৩ সালে বঙ্গবন্ধুকে বিশ্ব শান্তির প্রতীক হিসেবে জুলিও-কুরি শান্তি পুরস্কার প্রদান করে।
প্রধান সম্পাদক মতিউর রহমান চৌধুরী
জেনিথ টাওয়ার, ৪০ কাওরান বাজার, ঢাকা-১২১৫ এবং মিডিয়া প্রিন্টার্স ১৪৯-১৫০ তেজগাঁও শিল্প এলাকা, ঢাকা-১২০৮ থেকে
মাহবুবা চৌধুরী কর্তৃক সম্পাদিত ও প্রকাশিত।
ফোন : ৫৫০-১১৭১০-৩ ফ্যাক্স : ৮১২৮৩১৩, ৫৫০১৩৪০০
ই-মেইল: [email protected]
Copyright © 2022
All rights reserved www.mzamin.com
DMCA.com Protection Status