করোনা টিকার পার্শ্ব-প্রতিক্রিয়ায় শঙ্কিত হওয়ার কিছু নেই

ডা. ভিসওয়াসভারান বালাসুব্রামানিয়ান

মত-মতান্তর ১৮ নভেম্বর ২০২১, বৃহস্পতিবার

প্রকৃতির নিয়মানুসারে মানবদেহের তাৎক্ষণিক রোগপ্রতিরোধ ক্ষমতা বয়সের সঙ্গে সঙ্গে কমতে শুরু করে। তবে সাম্প্রতিক করোনার প্রভাবে ছেলে-বুড়ো সকলেই কাবু। সুস্বাস্থ্য এবং রোগপ্রতিরোধ ক্ষমতা কতটা গুরুত্বপূর্ণ তা নতুনভাবে শিখেছে বিশ্ববাসী। বিগত ২ বছর যাবত বিশ্বব্যাপী রাজত্ব করে আসা করোনার বিরুদ্ধে লড়াই করতে ইতোমধ্যেই বেশ কিছু প্রতিষেধক আবিষ্কৃত হয়েছে। শুরু হয়েছে প্রয়োগ এবং ফলাফলও ইতিবাচক। তবে অন্য যেকোন রোগের প্রতিষেধকের মতো করোনার প্রতিষেধকেরও আছে কিছু পার্শ্ব-প্রতিক্রিয়া। যা ভাবিয়ে তুলছে সাধারণ মানুষদের।
 
বিশ্বব্যাপী প্রায় সাড়ে ৬ বিলিয়ন (৬০০ কোটি) ডোজ প্রতিষেধক বা ভ্যাকসিন প্রয়োগ করা হয়েছে এবং প্রায় ২.৬ বিলিয়ন (২৬০ কোটি) মানুষ ভ্যাকসিনের আওতায় এসেছে, যা মোট জনসংখ্যার প্রায় ৩২.৫ শতাংশ। দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোর মধ্যে বাংলাদেশে প্রায় ৩৮ মিলিয়ন (৩ কোটি ৮০ লক্ষ) ডোজ ভ্যাকসিন প্রয়োগ করা হয়েছে এবং প্রায় ১৫.২ মিলিয়ন (১ কোটি ৫২ লক্ষ) মানুষ ভ্যাকসিনের আওতায় এসেছে, যা দেশের মোট জনসংখ্যার প্রায় ১০.৮ শতাংশ। আমাদের প্রতিবেশি দেশ ভারতে প্রায় ৮২৩ মিলিয়ন (৮২ কোটি ৩০ লক্ষ) ডোজ ভ্যাকসিন প্রয়োগ করা হয়েছে এবং প্রায় ২১০ মিলিয়ন (২০ কোটি ১০ লক্ষ) মানুষ ভ্যাকসিনের আওতায় এসেছে, যা দেশের মোট জনসংখ্যার ১৫.৪ শতাংশ। পাকিস্তানে প্রয়োগকৃত ভ্যাকসিন ডোজের সংখ্যা প্রায় ৭৪.৯ মিলিয়ন (৭ কোটি ৪৯ লক্ষ) এবং প্রায় ২৫ মিলিয়ন (২ কোটি ৫০ লক্ষ) মানুষ ভ্যাকসিনের আওতায় এসেছে, যা দেশের মোট জনসংখ্যার প্রায় ১১.৬ শতাংশ। শ্রীলঙ্কায় প্রায় ২৫ মিলিয়ন (২ কোটি ৫০ লক্ষ) ডোজ ভ্যাকসিন প্রয়োগ করা হয়েছে এবং প্রায় ১১.২ মিলিয়ন (১ কোটি ১২ লক্ষ) মানুষ ভ্যাকসিনের আওতায় এসেছে, যা দেশের মোট জনসংখ্যার প্রায় ৫১ শতাংশ।   
 
বিশ্বের অধিকাংশ দেশেই করোনার টিকাকরণ চলছে। মডার্না, ফাইজার, সিনোফার্ম, অ্যাস্ট্রাজেনেকা, জনসন অ্যান্ড জনসন ইত্যাদি অনেক ধরণের টিকাই ব্যবহৃত হচ্ছে। একই সঙ্গে বাড়ছে টিকাকে ঘিরে আতঙ্ক। করোনা যেমন নতুন একটি রোগ, এর টিকাও স্বাভাবিকভাবে সকলের কাছে নতুন। তাই প্রয়োগকালীন অনেকের মনেই ছিল নানা শঙ্কা এবং অনীহা। আর থাকবে না’ই বা কেন! টিকা প্রয়োগ শুরুর পর থেকেই বিভিন্ন পার্শ্ব-প্রতিক্রিয়ার খবর সামনে আসছে। তবে সবার মনে যতটা শঙ্কা বিরাজ করছে, আসলেই কি টিকার পার্শ্ব-প্রতিক্রিয়াগুলো ততটা গুরুতর?
 
ইনজেকশনের স্থান লাল হয়ে যাওয়া, চুলকানি বা ফুলে যাওয়া, জ্বর, মাথাব্যাথা, ক্লান্তি অনুভব করা, পেশী ব্যথা, গিটে ব্যথা, শীত করা, বমিভাব এবং/বা বমি হওয়া ইত্যাদি ভ্যাকসিনের সাধারণ কিছু পার্শ্ব-প্রতিক্রিয়া। কম বেশি সবগুলো ভ্যাকসিনেই এসব পার্শ্ব-প্রতিক্রিয়া লক্ষ্য করা যায়। তবে এগুলো ২/৩ দিনের বেশি স্থায়ী হয় না। ঢাকা মেডিকেল কলেজের তথ্য মতে, ৬০-৭০% অ্যাস্ট্রাজেনেকা গ্রহীতার মধ্যে হালকা গলা-ব্যথা, ৩০% এর মধ্যে শরীর ব্যথা এবং ৩০% এর মধ্যে জ্বরের উপসর্গ দেখা গেছে। জনসন অ্যান্ড জনসনের টিকা গ্রহণের পর কয়েকজনের শরীরে রক্তজমাট বাঁধার কথা জানা গেছে। ফাইজারের টিকা গ্রহণের পর ৮০-৮৫% গ্রহীতার ইনজেকশনের স্থানে ব্যথা, ৬০-৬৫% এর মধ্যে ক্লান্তি, ৫৫-৬০% এর মধ্যে মাথাব্যথা, ৩৫-৪০% এর মধ্যে পেশী ব্যথা, ৩০-৩৫% এর মধ্যে ঠান্ডা, ২০-২৫% এর মধ্যে গিটে ব্যথা, ১৫-২০% এর মধ্যে জ্বরের উপসর্গ দেখা গেছে। কর্তৃপক্ষের তথ্য অনুযায়ী, মডার্না টিকা প্রয়োগে সাধারণ জ্বর, শরীর ব্যথা, ক্লান্তি ইত্যাদি পার্শ্ব-প্রতিক্রিয়া দেখা দিতে পারে। কিন্তু শরীরে অ্যালার্জি ও মুখের স্নায়ু নিষ্ক্রিয় হওয়ার মতো ঘটনাও জানা গেছে। ভ্যাকসিনের ফলে যেহেতু রোগপ্রতিরোধ ক্ষমতা শক্তিশালী হওয়া শুরু হয় তাই এসব পার্শ্ব-প্রতিক্রিয়া দেখা দিতে পারে। তবে এসবের কোনটিই গুরুতর নয়। তাই বিশেষজ্ঞদের মতে, ভ্যাকসিন নিয়ে শঙ্কিত হওয়ার কোন কারণ নেই। যদিও সকলের ক্ষেত্রে পার্শ্ব-প্রতিক্রিয়া একরকম হয় না। অনেকের ক্ষেত্রে কোন পার্শ্ব-প্রতিক্রিয়াই দেখা যাচ্ছে না। তবে তার মানে এই নয় যে শরীরে ভ্যাকসিন কাজ করছে না।
 
ভ্যাকসিন প্রয়োগ ও পার্শ্ব-প্রতিক্রিয়া সম্পর্কে ভারতের ইয়াশোদা হসপিটালস, হায়দ্রাবাদ-এর ইন্টারভেনশনাল পালমোনোলজি এবং স্লিপ মেডিসিন বিভাগের কনসালটেন্ট ডা. ভিসওয়াসভারান বালাসুব্রামানিয়ান বলেন, “ছোটখাটো কিছু পার্শ্ব-প্রতিক্রিয়া থাকলেও বর্তমানে করোনার যে কয়টি ভ্যাকসিন পাওয়া যাচ্ছে, সবগুলোই নিরাপদ ও করোনার সংক্রমণ ঠেকাতে সক্ষম। যেকোন ভ্যাকসিন প্রয়োগের পর পার্শ্ব-প্রতিক্রিয়া হওয়া স্বাভাবিক একটি বিষয়। তবে যেসব পার্শ্ব-প্রতিক্রিয়াগুলো বেশি জটিল বা দীর্ঘস্থায়ী সেগুলো শুধু করোনা নয়, যেকোন ভ্যাকসিনের ক্ষেত্রেই ভীষণ অপ্রত্যাশিত। ভ্যাকসিনের কাজ হলো শরীরের রোগপ্রতিরোধ ক্ষমতাকে ওই রোগের বিরুদ্ধে লড়তে সাহায্য করা। তবে সবাই যে রোগাক্রান্ত হয়, তা নয়। পার্শ্ব-প্রতিক্রিয়া হলে বুঝতে হবে যে রোগের বিরুদ্ধে শরীর প্রতিরোধ গঠন করছে, সুতরাং এটি ঘাবড়ানোর চেয়ে স্বস্তির বিষয়ই বেশি। এই পার্শ্ব-প্রতিক্রিয়াগুলো ব্যক্তির দৈনন্দিন কাজ কিছুটা বিঘ্নিত করলেও কিছুদিনের মধ্যেই সেরে যায়। যাদের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা দুর্বল, ডায়াবেটিস, ইমিউনোসপ্রেশন আক্রান্ত, ট্রান্সপ্লান্ট-পরবর্তী ও বয়স্ক রোগীদের জন্য ভ্যাকসিন গ্রহণ সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। যথাযথভাবে সকল পরীক্ষা নিরীক্ষা বা ধাপে ধাপে ক্লিনিক্যাল ট্রায়ালের পরই সাধারণ মানুষদের ভ্যাকসিন প্রয়োগ করা হয়। তাই ভ্যাকসিন নিয়ে দুশ্চিন্তা, সন্দেহ বা অনীহা প্রকাশ করা মোটেই উচিৎ নয়।
 
করোনা মোকাবিলার সবচেয়ে বড় অস্ত্র এখন ভ্যাকসিন। সুস্থভাবে বেঁচে থাকতে এবং আগামী প্রজন্মের সুরক্ষা নিশ্চিতে ভ্যাকসিনের কোন বিকল্প নেই। তাই আর সময় নষ্ট না করে সকলেরই উচিৎ ভ্যাকসিন গ্রহণ করা।  
 
 
লেখক: কনসালটেন্ট ইন্টারভেনশনাল পালমোনোলজি এবং স্লিপ মেডিসিন
ইয়াশোদা হসপিটালস, হায়দ্রাবাদ

আপনার মতামত দিন

মত-মতান্তর অন্যান্য খবর

আন্দোলন থেকে বলছি-

আহারে, জবাব মিললো এতো দ্রুত!

৩০ নভেম্বর ২০২১

কাওরান বাজারের চিঠি

স্বজনহারাদের কান্নার শব্দ আগারগাঁওয়ে পৌঁছায় না!

২৯ নভেম্বর ২০২১

আইন, অধিকার, গণতন্ত্র

২৩ নভেম্বর ২০২১



মত-মতান্তর সর্বাধিক পঠিত



দেখা থেকে তাৎক্ষণিক লেখা

কোটিপতিদের শহরে তুমি থাকবা কেন?

কাওরান বাজারের চিঠি

ছবিটির দিকে তাকানো যায় না

DMCA.com Protection Status