মত-মতান্তর

এইসব মৃত্যুর দায়-দায়িত্ব কার?

ড. মাহফুজ পারভেজ

১১ নভেম্বর ২০২১, বৃহস্পতিবার, ৩:৪১ অপরাহ্ন

প্রতিদিনই মানুষ মরছে। যুদ্ধে, সংঘাতে, বন্যায়, দুর্যোগে, মহামারিতে পোকামাকড়ের মতো কাতারে কাতারে মরছে মানুষ। দুর্যোগকালীন মৃত্যুর প্রকোপের পাশাপাশি কিছু কিছু মৃত্যু মানবতাকে স্তব্ধ করে দেয়। সংশ্লিষ্টদের দায়িত্বশীলতা ও কর্তব্যকর্মের বিষয়গুলোকে তীব্রভাবে প্রশ্নবিদ্ধ করে। জনমনে প্রশ্ন উত্থাপিত হয় তখন, এইসব মৃত্যুর দায় কার?

হাঁটতে গিয়ে দেয়াল চাপায়, ফুটপাতে, নিম্নমানের নির্মাণের তলায় অকাতরে জীবন যায় যখন, তখন চারিদিকে তাকিয়ে কাউকেই দায়-দায়িত্ব নিতে দেখা যায় না। অদৃশ্য ছায়ার মধ্যে একজন আরেকজনের দোষ খুঁজে। ঠিকাদার আঙুল তুলে ইঞ্জিনিয়ারের দিকে। ইঞ্জিনিয়ার দোষী করে ঠিকাদারকে। ডাক্তার দোষে নার্সকে, নার্স ওয়ার্ডবয়কে।

প্রতিটি চাঞ্চল্যকর দুর্ঘটনার পর ইঁদুর-বিড়ালের 'টম অ্যান্ড জেরি' খেলা চলে আর দোষী কর্তাব্যক্তিরা গোপনে নিজেকে আড়াল করে নেন। অপরাধ ও কর্তব্যকর্মে অবহেলার ক্ষেত্রে যথাযথ বিচার না হওয়ায় সবার মধ্যে ড্যামকেয়ার ভাব চলে আসে। কেউ যেন কাউকে জবাবদিহি করার নেই। এমন ফ্রিস্টাইল পরিস্থিতিতে বাড়ছে দুঃখজনক দুর্ঘটনার মিছিল। কর্তাদের দেখাদেখি নিম্নপর্যায়েও চলছে চরম অবহেলা ও অমার্জনীয় অপরাধ। যার মাশুল দিচ্ছে আমজনতা।

মানবজমিনে প্রকাশিত একটি ভয়ানক অমানবিক খবরে জানা যায়, মাত্র ৫০ টাকা বকশিস কম দেয়ায় হাসপাতাল বেড থেকে অক্সিজেন মাক্স খুলে নেয়ায় বিকাশ চন্দ্র (১৭) নামের এক স্কুল ছাত্রের মৃত্যু হয়েছে। চরম অমানবিক এই ঘটনাটি ঘটেছে বগুড়া শহীদ জিয়াউর রহমান মেডিকেল কলেজ (শজিমেক) হাসপাতালে। মঙ্গলবার (০৯ নভেম্বর) রাত ১১টার দিকে শজিমেক হাসপাতালের ৩য় তলায় এঘটনা ঘটে। মৃত বিকাশ চন্দ্র গাইবান্ধা জেলার সাঘাটা থানার পুটিমারি গ্রামের বিশু চন্দ্র কর্মকারের ছেলে এবং স্থানীয় স্কুলের ৮ম শ্রেণির ছাত্র।

এহেন পাশবিক ঘটনা একটি বা আকস্মিক নয়। হরহামেশাই ঘটছে। যেন এসব কোনও বিষয়ই নয়। যেন এসবই স্বাভাবিক। একই দিন আরেক খবরে প্রকাশ, রংপুরের কাউনিয়া উপজেলার হারাগাছে অন্তঃসত্ত্বা লিমা বেগমের প্রসব বেদনা ওঠে সন্ধ্যা সাড়ে ৬টার দিকে। এরপর বাড়িতেই স্থানীয় দাইদের দিয়ে সন্তান প্রসবের চেষ্টা করে পরিবার। কিন্তু দীর্ঘ সময়েও সন্তান প্রসবে ব্যর্থ হয় দাই। বাধ্য হয়ে নিরাপদ সন্তান জন্মের জন্য রাত ১১টার দিকে স্থানীয় হারাগাছ মা ও শিশু কল্যাণ কেন্দ্রে নিয়ে যায় পরিবারের লোকজন।

কিন্তু মা ও শিশু কল্যাণ কেন্দ্রের বাইরের গেটে ঝুলছিল তালা। এদিকে প্রসব বেদনায় ছটফট করছিলেন লিমা বেগম। পরে কেন্দ্রের ভবনের সামনের মাঠে কোনও স্বাস্থ্যকর্মী ও গাইনি ছাড়াই মেয়ে সন্তানের জন্ম দেন লিমা বেগম। রাত একটার দিকে মা ও নবজাতক মেয়েকে নিয়ে বাড়ি ফেরেন পরিবারের লোকজন।

এই হলো বিভিন্ন পর্যায়ের ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের দায়িত্বশীলতার হাল! শিকড় থেকে শিখর পর্যন্ত এহেন উদাহরণের কথা হরহামেশাই মিডিয়ায় প্রকাশিত হয়। কিন্তু এসব দূরীকরণের কার্যকর পদক্ষেপ দৃষ্টিগোচর হয় না। অপরাধ ও অন্যায়ের জন্য কাউকে দায়ী করা কিংবা শাস্তি দেওয়া যায় না।

এমন পরিস্থিতি সুশাসনের জন্য মোটেও সুখকর নয়। গণমুখী প্রশাসনের জন্য অন্তরায় স্বরূপ। গণতান্ত্রিক শাসন ব্যবস্থায় মানুষের প্রতি এমন চরম অবহেলা ও অবজ্ঞা অকল্পনীয়। উপরন্তু এসব অব্যবস্থার প্রতিবিধান না করা দুঃখজনক।

মানুষের কষ্ট-দুর্দশার মর্মান্তিক ঘটনাগুলোকে কিছুতেই মেনে নেওয়া যায় না। এসব ঘটনা সংশ্লিষ্টদের মুখচ্ছবিকে উজ্জ্বল করে না। বরং কোনও অর্জন থাকলে, তাকেও মলিন করে দেয়। কলঙ্কের মতো এইসব ঘটনা পুরো ব্যবস্থাকেই প্রশ্নবিদ্ধ করে।

এইসব দুঃখজনক ও অনাকাঙ্ক্ষিত দুর্ঘটনার দিনেই মানবজমিনে এক সাক্ষাতকারে বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক গভর্নর ড. সালেহউদ্দিন আহমেদ বলেছেন, 'সমাজে দিন দিন বৈষম্য বাড়ছে। সরকারি চাকরিজীবীদের যেভাবে সুযোগ-সুবিধা বাড়ছে, যারা রাজনীতির সঙ্গে জড়িত তারা যেভাবে সম্পদ গড়ছে বেসরকারি খাতের কর্মীদের আয় সেভাবে বাড়ছে না। আমাদের ভারসাম্যমূলক উন্নয়ন দরকার। সেদিকে কারও নজর দেখছি না।'

মানবজমিনের সঙ্গে আলাপকালে তিনি আরও বলেন, 'দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতি, বাসভাড়া যেভাবে বাড়ানো হলো তাতে তো মনে হয় সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার মানের ব্যাপারে সরকার যে খুব মনোযোগী তা কিন্তু দেখা যাচ্ছে না। বিশ্ববাজারে কিছু পণ্যের দাম বেড়েছে। দেশে আমদানিকারক, পাইকারি বাজার, খুচরা বাজার ঘুরে পণ্যের দাম বিশ্ববাজারের চেয়ে অনেক বেড়ে যায়। পণ্যবাহী যানবাহনকে ধাপে ধাপে চাঁদাবাজির শিকার হওয়াও দাম বৃদ্ধির অন্যতম কারণ।'

সীমাহীন আর্থিক চাপ ও বৈষম্যের সঙ্গে সঙ্গে মানুষের প্রতি অবহেলা, অবজ্ঞা, দায়িত্বহীনতা ও কর্তব্য পালনের ক্ষেত্রে সীমাহীন অনীহার বিস্তার কে থামাবে? কে নেবে দায়-দায়িত্ব?

প্রশ্নগুলো সবার জানা থাকলেও উত্তর জানা নেই!
প্রধান সম্পাদক মতিউর রহমান চৌধুরী
জেনিথ টাওয়ার, ৪০ কাওরান বাজার, ঢাকা-১২১৫ এবং মিডিয়া প্রিন্টার্স ১৪৯-১৫০ তেজগাঁও শিল্প এলাকা, ঢাকা-১২০৮ থেকে
মাহবুবা চৌধুরী কর্তৃক সম্পাদিত ও প্রকাশিত।
ফোন : ৫৫০-১১৭১০-৩ ফ্যাক্স : ৮১২৮৩১৩, ৫৫০১৩৪০০
ই-মেইল: [email protected]
Copyright © 2022
All rights reserved www.mzamin.com
DMCA.com Protection Status