রোহিঙ্গা: শরণার্থী থেকে নিরাপত্তার ইস্যু?

ড. মাহফুজ পারভেজ

মত-মতান্তর ২৩ অক্টোবর ২০২১, শনিবার | সর্বশেষ আপডেট: ১০:০৮ পূর্বাহ্ন

কুমিল্লায় সৃষ্ট অস্থিরতার রেশ কাটতে না কাটতেই শিরোনামে চলে এসেছে রেহিঙ্গারা। যখন দেশের বিভিন্ন স্থানে সহিংসতার ঘটনায় ২০ হাজার ৬১৯ জনকে অভিযুক্ত করে ১০২টি মামলা দায়ের করে ৫৮৩ জনকে গ্রেফতার করা হয়েছে, ঠিক তখনই দক্ষিণ-পূর্বাঞ্চলের রোহিঙ্গা ক্যাম্পে সাতজন নিহত ও বহুজন আহত হওয়ার খবর পাওয়া গেছে। কিছুদিন আগেই সেখানে নিহত হন এক শীর্ষ রোহিঙ্গা নেতা।

স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন উঠছে, কোন পথে রোহিঙ্গা ইস্যু? রোহিঙ্গা ইস্যু কি শরণার্থী বিষয়ক সমস্যা হিসেবে আছে? নাকি সন্ত্রাসের হটস্পটে পরিণত হয়ে বিপজ্জক দিকে মোড় নিচ্ছে? সাধারণ শরণার্থী সমস্যা থেকে ইস্যুটি যে দিনে দিনে জাতীয় নিরাপত্তার নাজুক ইস্যুতে পরিণত হচ্ছে, তা এখন স্পষ্ট।

সন্ত্রাস ছাড়াও মাদক, অস্ত্র চোরাচালান, মানব পাচার ইত্যাদি নানাবিক অপরাধ সংগঠিত হচ্ছে প্রায় দশ লাখ রোহিঙ্গা শরণার্থীদের ঘিরে। স্থানীয় মানুষের সঙ্গেও প্রায়শই মুখোমুখি হচ্ছে রোহিঙ্গারা। যার ফলে বিভিন্ন মাত্রার উত্তেজনা যেমন তৈরি হচ্ছে, তেমনিভাবে বাড়ছে নিরাপত্তার ঝুঁকি।

যারা মিয়ানমারে যেতে চায় না তারাই রোহিঙ্গা ক্যাম্পে অঘটন ঘটিয়ে থাকতে পারে বলে মনে করেন পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. একে আব্দুল মোমেন। মন্ত্রী জানান- ‘রোহিঙ্গা ক্যাম্পে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি উন্নত করতে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর সভাপতিত্বে একটি সভা হয়েছে। রোহিঙ্গা ক্যাম্প ও রোহিঙ্গা ক্যাম্পের বাইরে যাতে আইনশৃঙ্খলা আরও উন্নত করা যায় সেটি নিয়ে আলোচনা হয়েছে।
এরপরও রোহিঙ্গা ক্যাম্পের দুর্ঘটনা, এটা তো খুবই আতঙ্কের বিষয়।’

মন্ত্রী জানান- ‘বিভিন্ন লোকে বলছে যে, ওখানে ড্রাগের ব্যবসা হয়। আর কেউ কেউ তথ্য দিয়েছে, কিছু উইপেন, কিছু বন্দুকও আনা হয়। আমরা এসব নিয়ে আলোচনা করেছি। আমার প্রস্তাব হলো, এই ড্রাগ ও অস্ত্র পুরোপুরি বন্ধ করার জন্য প্রয়োজনে গুলি ছুঁড়তে হবে।’

সাম্প্রতিক ঘটনায় কক্সবাজারের উখিয়ার রোহিঙ্গা ক্যাম্পে হামলায় ৭ জন নিহত হয়েছেন। এ ঘটনায় আহত হন কমপক্ষে ১১ থেকে ১৫ জন। প্রথমে দুই গ্রুপের সংঘর্ষ বলা হলেও পরে জানা গেছে ৮ থেকে ১০ জনের সশস্ত্র সন্ত্রাসী গ্রুপ এসে মসজিদে নামাজরত মুসল্লিদের গুলিবর্ষণ করে পালিয়ে যায়। শুক্রবার (২২ অক্টোবর) ভোরে উখিয়ার ১৮ নম্বর রোহিঙ্গা ক্যাম্পে এ ঘটনা ঘটে। এ ঘটনায় অস্ত্রসহ মুজিবুর রহমান নামে একজনকে আটক করেছেন ৮ আর্মড পুলিশ ব্যাটালিয়নের সদস্যরা।

একাধিক নির্ভযোগ্য সূত্র জানায়, শুক্রবার ভোর ৪টা ১৫ মিনিটের দিকে উখিয়ার রোহিঙ্গা ক্যাম্প-১৮ এর দারুল উলুম নাদওয়াতুল ওলামা আল-ইসলামীয়া মাদ্রাসার মসজিদে নামাজরত মুসল্লিদের ওপর অতর্কিত গুলিবর্ষণ ও হামলা চালায় ৮/১০ জনের একটি অস্ত্রধারী গ্রুপ। চারদিক থেকে গুলিবর্ষণ হওয়ায় কেউ মসজিদ থেকে বের হতে পারেনি। এতে ঘটনাস্থলে চারজন ও হাসপাতালে নেওয়ার পর আরও দুজনের মৃত্যুর তথ্য জানা যায়।

প্রত্যক্ষদর্শীরা বলেছেন, ঘুম থেকে ওঠে ফজরের নামাজ আদায় করতে মসজিদের দিকে যাচ্ছিলাম। যেতে যেতে কানে আসছিল গুলির আওয়াজ। একপর্যায়ে সবাই বসতঘর থেকে বের হয়ে ছুটাছুটি করছিল। আমরাও পেছনের দিকে চলে আসি। পরে গিয়ে দেখি, সেখানে রক্তাক্ত অবস্থায় পড়ে আছেন অনেকে। যারা মূলত নামাজরত ছিলেন। কে বা কারা হামলা করেছে তাদের আমরা চিনতে পারেনি। তবে, মাদ্রাসা ও মসজিদের চারদিকের অংশে শুধু গুলির চিহ্ন। আর দা দিয়ে কুপিয়ে কেটে ফেলা হয়েছে টিনের শেট। আমরা ঘটনাস্থলে অনেক মুসল্লির কর্তনকৃত আঙ্গুলের অংশও দেখতে পেয়েছি।

রোহিঙ্গা ক্যাম্পের এসব সন্ত্রাসী ঘটনা খুবই স্পর্শকাতর, সংঘবদ্ধ ও পরিকল্পিত। বাড়িঘর ফেলে আশ্রয় নেওয়া নারী, পুরুষ, শিশু শরণার্থীদের কাজ নয় এসব সন্ত্রাস। বরং রেহিঙ্গাদের মধ্যে সন্ত্রাসী আকারে কোনও কোনও সশস্ত্র গ্রুপের উপস্থিতির ইঙ্গিত দেয় এসব ঘটনা, যারা আগেও একাধিক হত্যাকাণ্ড সংঘটিত করেছে।

ফলে রোহিঙ্গা শরণার্থীদের ঘিরে মানবাধিকার রক্ষা ও মানবিক সহায়তা প্রদানের পাশাপাশি নিরাপত্তার ক্রমবর্ধমান ঝুঁকি চিহ্নিত ও নিরসন করা জরুরি হয়ে দাঁড়াচ্ছে। কেননা, বিশ্বের বিভিন্ন স্থানে শরণার্থী সমস্যা থেকে ভয়ানক নিরাপত্তার সমস্যা সৃষ্টি হওয়ার নজির রয়েছে। করাচিতে বিহারি শরণার্থী, লেবাননে ফিলিস্তিনি শরণার্থী, পাকিস্তানে আফগান শরণার্থীদের ঘিরে নাজুক পরিস্থিতি ও উত্তেজনাকর অবস্থার সৃষ্টি হয়েছে।

আবার শরণার্থীদের ইতিবাচক শক্তিরূপে পুনর্বাসনের দৃষ্টান্তও রয়েছে। ভারতে তিব্বতি শরণার্থী ও নেপালে অবস্থানরত ভূটানি শরণার্থীদের দক্ষতা অর্জন করে মানবসম্পদে রূপান্তিত করা হয়েছে। সেখানে তারা কুটির শিল্প ও বিভিন্ন দেশজ সামগ্রীর উৎপাদন ও বিপননের মাধ্যমে সামাজিক ও আর্থিকভাবে সাবলম্বী হয়েছেন।

বাংলাদেশে রোহিঙ্গা শরণার্থীদের নিয়েও আন্তর্জাতিক ও জাতীয় পর্যায়ে স্রোতের মত বিলিয়ন-মিলিয়ন ডলার খরচ করা হচ্ছে। কক্সবাজার শহর ও শরণার্থী অধ্যুষিত এলাকায় একাধিক বার সরেজমিনে গিয়ে ব্যাঙের ছাতার মতো এনজিও প্রতিষ্ঠানের দেখা পাওয়া গেছে। সেসব এলাকায় গিজগিজ করছে বিভিন্ন এনজিওতে কর্মরত তরুণ-তরুণীরা। বিভিন্ন সময়ে তাদের নিয়ে আপত্তিকর খবরও প্রকাশ পায়। এইসব উন্নয়ন তৎপরতা বিরাট আর্থিক লেনদেন ও কর্মসংস্থানের সিন্ডিকেটে পরিণত হলেও রোহিঙ্গা ইস্যুর নিরাপত্তাজনিত সমস্যা দূরীকরণে সুপরিকল্পিত পদক্ষেপের মাধ্যমে আদৌ কোনও ভূমিকা পালন করতে পারছে না। বরং সেখানে সন্ত্রাস, হত্যাকাণ্ড, মাদক, অস্ত্র, মানব পাচারের একটি অদৃশ্য জগৎ তৈরি হচ্ছে।

বিদ্যমান সঙ্কটজনক পরিস্থিতিতে রোহিঙ্গা শরণার্থী সমস্যাটি মানবিক দিকের পাশাপাশি বিপজ্জনক নিরাপত্তার ইস্যুতে পরিণত হচ্ছে বলেই প্রতীয়মান হয়, যা একের পর এক ভয়াবহ ঘটনার জন্ম দিচ্ছে। এমনতাবস্থায় জাতীয় নিরাপত্তার নীতি ও কৌশলের আলোকে রোহিঙ্গা ইস্যু এবং শরণার্থীদের কেন্দ্র করে পরিচালিত দেশী-বিদেশী তৎপরতাকে গভীর পর্যবেক্ষণ, নিয়ন্ত্রণ ও স্কুটিনির আওতায় আনা অপরিহার্য। রোহিঙ্গাদের মানবাধিকার ও মানবিক সহায়তা নিশ্চিত করা অবশ্যই বাংলাদেশসহ বিশ্ববাসীর কর্তব্য। তবে সেটা মোটেও সামগ্রিক নিরাপত্তার ঝুঁকি ও বিপদ বাড়িয়ে নয়।

পাঠকের মতামত

**মন্তব্য সমূহ পাঠকের একান্ত ব্যক্তিগত। এর জন্য সম্পাদক দায়ী নন।

ঊর্মি

২০২১-১০-২৩ ১২:৫৭:০৯

মুক্তিযুদ্ধ প্রাক্কালে পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীর অতর্কিত আক্রমণ ও হত্যাযজ্ঞে দিশেহারা হয়ে অগনিত পূর্ব পাকিস্তানি বাঙ্গালী পাড়ি জমিয়েছিল ভারতের পশ্চিমবঙ্গে প্রাণ রক্ষার আশায়। ভারতসরকার তাদের বাধা না দিয়ে আশ্রয় দিয়েছিল, আর সেই সাথে সেই অমানবিক সমস্যার প্রতিকার চেয়ে বিশ্বের শক্তিধর দেশগুলির সঙ্গে কূটনৈতিক যোগাযোগ শুরু করেছিল তৎকালীন ইন্দিরা সরকার। আর তাদের তৎকালীন সার্থক কূটনীতিই শেষপর্যন্ত প্রমাণ করে দিয়েহিল যে তাদের কাছে তখন নয় মণ তেল তো ছিলই, সেই সাথে রাধার সার্থক নৃ্ত্যও ছিল। আর আমরা? মানবিক কারণে যে রোহিঙ্গাদের আমরা আশ্রয় দিলাম, কূটনীতির দুর্বল খেলায় এখন সেই রোহিঙ্গারাই মনে হয় আজীবন আমাদের বোঝা হয়ে থাকবে!!!

আপনার মতামত দিন

মত-মতান্তর অন্যান্য খবর

আইন, অধিকার, গণতন্ত্র

২৩ নভেম্বর ২০২১



মত-মতান্তর সর্বাধিক পঠিত



দেখা থেকে তাৎক্ষণিক লেখা

কোটিপতিদের শহরে তুমি থাকবা কেন?

কাওরান বাজারের চিঠি

ছবিটির দিকে তাকানো যায় না

DMCA.com Protection Status