যে কারণে করোনার টিকা নেবেন না এই মার্কিনিরা

মানবজমিন ডেস্ক

বিশ্বজমিন (২ সপ্তাহ আগে) অক্টোবর ১২, ২০২১, মঙ্গলবার, ২:৪৭ অপরাহ্ন | সর্বশেষ আপডেট: ১০:২৭ পূর্বাহ্ন

বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের কর্মীদের কোভিড-১৯ টিকা নেয়ার আল্টিমেটাম বেঁধে দিতে মালিকদের প্রতি আহ্বান জানিয়েছেন প্রেসিডেন্ট জো বাইডেন। শিগগিরই স্বাস্থ্যকর্মীদের জন্য টিকা নেয়া বাধ্যতামূলক করে আদেশ জারি করবেন বলে জানিয়েছেন তিনি। পাশাপাশি, রাজ্য সরকারগুলোকে শিক্ষকদের জন্য টিকা বাধ্যতামূলক করতে বলেছেন। কিন্তু আশ্চর্যজনকভাবে, বাইডেনের এসব পদক্ষেপের বিরুদ্ধে বিক্ষোভ করছেন অনেক স্বাস্থ্যকর্মী ও শিক্ষক। সম্প্রতি নিউ হ্যাম্পশায়ারের কনকর্ডে এমন বিক্ষোভে যোগ দিয়েছেন নার্স লিয়াহ কুশম্যান। তার বক্তব্য, প্রয়োজনে তিনি নার্সের চাকরি ছেড়ে দেবেন, তাও টিকা নেবেন না।
তিনি বলেন, এর মূলে রয়েছে আমার বিশ্বাস ধর্মীয়। আমি বিশ্বাস করি যে, সৃষ্টিকর্তা আমাকে একটি রোগ প্রতিরোধ ব্যবস্থা দিয়েছেন। সেই ব্যবস্থা আমাকে রক্ষা করে।
আর আমি অসুস্থ হলে তাও সৃষ্টিকর্তার ইচ্ছাতেই ঘটবে। আমি যদি ওষুধ গ্রহণ করি, তাহলে তা আমার রোগ প্রতিরোধ ব্যবস্থায় প্রভাব ফেলবে। তিনি আরও জানান, তার ধর্মীয় বিশ্বাস ও নার্স হিসেবে তার দায়িত্বের মধ্যে কোনো সংঘাত নেই।
লিয়াহ’র যুক্তি, করোনার টিকাগুলো এখনো ‘পরীক্ষামূলক’। যদিও যুক্তরাষ্ট্রের খাদ্য ও ওষুধ প্রশাসন ইতিমধ্যেই ফাইজারের টিকা প্রয়োগের অনুমোদন দিয়েছে। অর্থাৎ, তাদের কাছে টিকাটি কার্যকর ও ব্যবহারের জন্য নিরাপদ প্রমাণ করার জন্য পর্যাপ্ত উপাত্ত রয়েছে। কিন্তু লিয়াহ জানান, তিনি কোনো অসুখের জন্যই আর টিকা নেন না।
এদিকে, যেসব হাসপাতালের ব্যবস্থাপকরা তাদের কর্মীদের জন্য টিকা নেয়া বাধ্যতামূলক করার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন, তারা জানান, এটার মুখ্য কারণ হচ্ছে রোগীদের নিরাপদ অনুভব করানো। কিন্তু এমনটা করতে গিয়ে হাসপাতালের বেশ কিছু কর্মী হারিয়েছেন আপার কানেকটিকাট ভ্যালি হসপিটালের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা স্কট কলবি। এতে করে ডেল্টা ভ্যারিয়ান্টসহ অন্য রোগের সেবা প্রদানে হাসপাতালের উপর চাপ বেড়েছে।
স্কট বলেন, টিকা নেয়ার বিরোধীদের সবার মধ্যে মেডিক্যাল বা ধর্মীয় বিশ্বাস উপস্থিত নেই। তার মতে এটা অনেকটা রাজনৈতিক ব্যাপার। তিনি বলেন, কেবল কোভিডের ক্ষেত্রেই এমনটা ঘটছে না। হাসপাতালের কর্মীদের হেপাটাইটিস বা এমএমআর-এর মতো আরো কিছু টিকা নেয়া বাধ্যতামূলক। অতএব, একে অরাজনৈতিক বলার সুযোগ নেই।
কনকর্ডে বিক্ষোভ সমাবেশে নিবন্ধনের সময় নিজেকে নার্সের পাশাপাশি রিপাবলিকান পার্টির একজন রাজ্য প্রতিনিধি হিসেবেও উল্লেখ করেছেন লিয়াহ। তিনি জানান, বিক্ষোভে অংশগ্রহণ সম্পূর্ণরূপেই তার স্বাধীনতার ব্যাপার।
তিনি বলেন, বাইডেন প্রশাসন আমাদের সার্বভৌম অধিকারকে টার্গেট করছে। আমরা পেশাদার স্বাস্থ্যকর্মী। তা সত্ত্বেও আমাদের দেহের সঙ্গে কী ঘটবে, তা ঠিক করার অধিকার আমাদের আছে।
বিক্ষোভে যোগদানকারী কিছু নার্স মনে করেন, বাইডেনের ডাকে সাড়া দিয়ে রাজনীতিতে অংশ নিচ্ছে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ। তাদের বিশ্বাস, আদতে এটা রোগীদের আস্থা অর্জনের ব্যাপার হলে টিকা নেয়া বাধ্যতামূলক করার বদলে প্রতি সপ্তাহে করোনার জন্য তাদের পরীক্ষা করা হতো। কারণ, টিকা নেয়ার পরও অনেকের মাধ্যমে ভাইরাসটি ছড়াতে পারে।
কিন্তু টিকা গ্রহণে অনিচ্ছুক অনেক আমেরিকান নিয়মিত পরীক্ষাও করাতে চান না। এমন একজন হচ্ছেন কাশেইম আউট’ল। কানেকটিকাটের ওয়ালিংফোর্ডের এক স্কুলে শিক্ষকতা করতেন তিনি। গত বছর স্কুলের সেরা শিক্ষক নির্বাচিত হয়েছেন। সম্প্রতি রাজ্যটিতে স্কুল শিক্ষকদের জন্য টিকা নেয়া বাধ্যতামূলক করা হলে তা মানতে অস্বীকৃতি জানান তিনি। বিকল্প হিসেবে তাকে প্রতি সপ্তাহে করোনা ভাইরাসের পরীক্ষা করানোর প্রস্তাব দেয়া হয়। তাতেও অস্বীকৃতি জানালে, চাকরি হারান তিনি।
কাশেইম বলেন, আমার জীবনে কখনোই কোনো কৃত্রিম উপাদান ব্যবহার করিনি, হোক তা স্বাস্থ্যগত প্রয়োজনে, কিংবা সাপ্লিমেন্ট খাদ্য হিসেবে। এ কারণে, টিকা নেয়ার বিধান সম্পূর্ণভাবে আমার জীবন ধারণের পদ্ধতির বিরুদ্ধে যায়।
নিয়মিত করোনা পরীক্ষা করানোকেও ‘অপ্রয়োজনীয় মেডিক্যাল প্রসিডিওর’ মনে করেন তিনি। তার জন্য এটা অস্বস্তিকর। তিনি বলেন, আত্মা আমাদের সঙ্গে যেভাবে কথা বলে, যে ক্ষীণ আওয়াজ আমাদের বলে যে, এটা ঠিক বা বেঠিক, সে আওয়াজ আমায় বলছে যে, এ ব্যাপারে আমাকে এখনই সিদ্ধান্ত নিতে হবে।
কাশেইম অবশ্য অ্যান্টিবডি টেস্ট করাতে ইচ্ছুক ছিলেন। এতে করে প্রমাণ হতো যে, তিনি পূর্বে করোনা আক্রান্ত হয়েছিলেন। তার শরীরে প্রাকৃতিকভাবেই প্রতিরোধ ব্যবস্থা জন্মেছে। আগেও তিনি এই পরীক্ষা করিয়েছেন। অবশ্য তিনি এটাও বিশ্বাস করেন যে, প্রাকৃতিকভাবে জন্মানো ওই প্রতিরোধ ক্ষমতা দীর্ঘস্থায়ী হবে না। কিন্তু স্কুল কর্তৃপক্ষ তাকে অ্যান্টিবডি পরীক্ষার অপশন দেয়নি।
ক্লাসরুমে শিক্ষার্থীদের আশপাশে থাকার কারণে কাশেইমের জন্য টিকার প্রয়োজন ছিল। কিন্তু যারা বাড়ি থেকে কাজ করেন? তাদের ক্ষেত্রে কী ব্যবস্থা? কর্তৃপক্ষের কী তাদেরকে টিকা নিতে বাধ্য করার অধিকার রয়েছে?
নিউ হ্যাম্পশায়ারের এক প্রত্যন্ত গ্রামীণ এলাকার বাসিন্দা রব সার্জিন। পেশায় একজন তথ্য-প্রযুক্তি বিষয়ক কর্মী। তিনি জানান, বাড়ি থেকেই কাজ করেন। কিন্তু তার প্রতিষ্ঠান তাকে জানিয়েছে, এ মাসের মধ্যে টিকা না নেয়া হলে চাকরি হারাবেন।
রব বলেন, আমি জীবনে কখনো অফিসে গিয়ে কাজ করিনি। কখনোই মানুষের সঙ্গে সশরীরে বার্তা বিনিময় করি না। আমি টিকা নেয়ার বিরুদ্ধে আপত্তি জানাই। কারণ আমার মতামত হচ্ছে এখন অবধি টিকাগুলো নিয়ে পর্যাপ্ত গবেষণা হয়নি। আমি আমার পরিবারকে যথাসম্ভব সুরক্ষিত রাখি।
তিনি বলেন, আমার মনে হয়েছে এই ‘হয়তো এটা করো, নয়তো চাকরি হারাও’ ধরণের নির্দেশ আমার ও আমার পরিবারের বিরুদ্ধে ব্যক্তিগত আক্রমণ। যেন তারা আমার জীবিকার পেছনে লেগেছে।
রব জানান, এখন অবদি টিকা নেয়ার বিষয়ে মালিকের সঙ্গে যত আলোচনা করেছেন সবই ব্যর্থ হয়েছে। এমতাবস্থায়, তিনি তার পূর্ণমেয়াদী চাকরি হারাবেন। এর সঙ্গে হারাবেন তার স্বাস্থ্যবীমা, তার পরিবারের স্বাস্থ্য সংশ্লিষ্ট সুবিধাও। করোনার টিকা নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের নীতিমালায় ব্যাপক অসঙ্গতি রয়েছে। পুরো মহামারির প্রত্যেক ধাপেই এমন অসঙ্গতি দেখা গেছে। এর মাঝে, রিপাবলিকান নিয়ন্ত্রিত রাজ্যগুলোতে স্থানীয় সরকার এখনো টিকা বাধ্যতামূলক করার বিরুদ্ধে লড়ে যাচ্ছে। কিন্তু ব্যক্তিগত স্বাধীনতা ও জনস্বাস্থ্যের মধ্যকার বিতর্কে আটকা পড়া দেশটিতে এখনও প্রতিদিন করোনায় প্রাণ হারাচ্ছেন প্রায় ১৫০০ মানুষ।

আপনার মতামত দিন

বিশ্বজমিন অন্যান্য খবর



বিশ্বজমিন সর্বাধিক পঠিত



DMCA.com Protection Status