খবর নেই বাস রুট পুনর্গঠনের

সড়কে বিশৃঙ্খলা

নূরে আলম জিকু

প্রথম পাতা ২৭ সেপ্টেম্বর ২০২১, সোমবার | সর্বশেষ আপডেট: ৪:১২ অপরাহ্ন

রাজধানীর সড়কে বাড়ছে বিশৃঙ্খলা ও যানজট। দেড় বছরের মহামারির প্রকোপ কমে আসায় এখন স্বাভাবিক হওয়ার পথে জনজীবন। এই অবস্থায় কর্মমুখর হয়ে ওঠা রাজধানী হয়ে উঠছে যানজটের শহর। প্রধান প্রধান সড়কে দিনভর লেগে থাকছে যানজট। সড়কে শৃঙ্খলা ফেরাতে নানা উদ্যোগ নেয়া হলেও দৃশ্যমান কোনো অগ্রগতি দেখা যাচ্ছে না। এদিকে রাজধানীর গণপরিবহনে শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনতে এবং যানজট নিরসনে গঠিত ‘বাস রুট রেশনালাইজেশন’ গঠনের ৩ বছরের বেশি সময় পার হলেও বাস রুট পুনর্গঠন নিয়ে এখনো তেমন অগ্রগতি নেই। এ পর্যন্ত ১৭টি সভা অনুষ্ঠিত হলেও দৃশ্যমান কোনো কাজ শুরু হয়নি। আগামী ১ বছরের মধ্যেও বাস রুট পুনর্গঠন করা সম্ভব হবে না বলে মনে করছেন বাস রুট রেশনালাইজেশনের সঙ্গে সংশ্লিষ্টরা।
তারা বলছেন- বাস টার্মিনাল, ডিপো, রোড মার্কিং, বাস স্টপেজ, যাত্রী ছাউনি, জেব্রা ক্রসিং, অন স্ট্রিট পার্কিংসহ নানা বিষয়ে পরিবহন সংশ্লিষ্ট ও বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন কর্তৃপক্ষ (বিআরটিএ)’র সঙ্গে আলাপ-আলোচনা চলছে। এসব নির্মাণ করতে দীর্ঘ সময়ের প্রয়োজন। বাস রুট রেশনালাইজেশন দৃশ্যমান করতে ২০২২ সালের পুরোটা সময় লেগে যাবে।

এদিকে বিশেষজ্ঞ ও পরিবহন সংশ্লিষ্টরা বলছেন, রাজধানীর যানজট ও জনদুর্ভোগ কমাতে সরকার সমন্বিত পরিবহন ব্যবস্থার পরিকল্পনা গ্রহণ ও বাস্তবায়নের উদ্যোগ নেয়া হয়েছে। তবে তা বাস্তবায়ন হয়নি। এতে সময় যত বেশি লাগছে রাজধানীতে নৈরাজ্য ততই বাড়ছে। ফিটনেসবিহীন গাড়ি, অদক্ষ চালক, সড়ক ও ফুটপাথ দখল হয়ে যাওয়া, নির্দিষ্ট স্থানে বাসস্ট্যান্ড না থাকাসহ অপরিকল্পিতভাবে রাস্তা কেটে নির্মাণকাজ করার ফলে নগরীতে তীব্র যানজট সৃষ্টি হচ্ছে বলে মনে করছেন তারা।

অনেকেই বলছেন, সুশৃঙ্খল পরিবহন ব্যবস্থাপনার অভাব রয়েছে। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যদের গাফিলতি আর নীতিনির্ধারণী পর্যায়ে হুটহাট সিদ্ধান্ত গ্রহণের কারণে সড়ক-মহাসড়কে শৃঙ্খলা ফিরছে না। সড়কে শৃঙ্খলা ফেরাতে দ্রুত সময়ে সরকারের নেয়া প্রকল্পগুলো বাস্তবায়ন করতে হবে। ফুটপাথ দখলমুক্ত করার পাশাপাশি ফিটনেস ও রুট পারমিটবিহীন যানবাহন বন্ধ করতে হবে। বাসের প্রতিযোগিতা নিয়ন্ত্রণ করতে হবে। নির্দিষ্ট বাসস্ট্যান্ডে যাত্রী উঠানামা বাধ্য করতে হবে। একই সঙ্গে ট্রাফিক ব্যবস্থাপনার আধুনিকায়ন ও স্বয়ংক্রিয় ব্যবস্থার ওপর গুরুত্ব দিতে হবে। নিরাপদ সড়ক আন্দোলনের পর ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশ, ঢাকা উত্তর ও দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের তরফে বেশকিছু উদ্যোগ নেয়া হয়। এসব উদ্যোগের পরিপ্রেক্ষিতে সার্বিক পরিস্থিতির কিছুটা উন্নতি হলেও দৃশ্যমান পরিবর্তন খুব একটা হয়নি বলেও মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা।

ডিএনসিসি’র তৎকালীন মেয়র আনিসুল হক ২০১৫ সালে ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের দায়িত্ব গ্রহণের পর রাজধানীর যানজট কমাতে উদ্যোগী হন। গণপরিবহনে শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনতে মাঠে নামেন। একাধিক সভা করেন গণপরিবহন বিশেষজ্ঞদের নিয়ে। বাস রুট রেশনালাইজেশন ও কোম্পানির মাধ্যমে বাস পরিচালনার সিদ্ধান্ত নেন। তবে তার মৃত্যুতে এ উদ্যোগ থেমে যায়। পরে রাজধানীর গণপরিবহনে শৃঙ্খলা ফেরানো ও যানজট নিরসনে ২০১৮ সালের ৯ই সেপ্টেম্বর প্রেসিডেন্টের আদেশে স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় মন্ত্রণালয়ের সিনিয়র সচিব ড. জাফর আহমদ খান ১০ সদস্যের একটি কমিটি করে প্রজ্ঞাপন জারি করেন। এ কমিটির আহ্বায়ক করা হয় ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের (ডিএসসিসি) সাবেক মেয়র মোহাম্মদ সাঈদ খোকনকে।

কমিটিতে রাখা হয় ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের (ডিএনসিসি) তখনকার প্যানেল মেয়র, বাংলাদেশ রোড ট্রান্সপোর্ট অথরিটির (বিআরটিএ) চেয়ারম্যান, বাংলাদেশ রোড ট্রান্সপোর্ট করপোরেশন (বিআরটিসি) চেয়ারম্যান, রাজধানী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (রাজউক) চেয়ারম্যান, ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশ কমিশনার, গণপরিবহন বিশেষজ্ঞ ড. এসএম সালেহ উদ্দিন, বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন মালিক সমিতির মহাসচিব, বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন শ্রমিক ফেডারেশন সভাপতি ও ঢাকা পরিবহন সমন্বয় কর্তৃপক্ষের নির্বাহী পরিচালককে। তখন কমিটির কার্যবিবরণীতে বলা হয়েছে, ঢাকা মহানগরীর যানজট নিরসনে বাস রুট রেশনালাইজেশন ও কোম্পানির মাধ্যমে বাস পরিচালনা পদ্ধতি প্রবর্তনের বিষয়ে ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের প্রয়াত মেয়র আনিসুল হক যে পদক্ষেপগুলো নিয়েছিলেন সেগুলো বিবেচনায় নিয়ে কার্যক্রম গ্রহণ করতে হবে। সংশ্লিষ্ট অংশীজনের মাধ্যমে বাস রুট রেশনালাইজেশন ও কোম্পানির মাধ্যমে বাস পরিচালনা পদ্ধতি প্রবর্তন করতে হবে। বাস রুট রেশনালাইজেশন ও কোম্পানির মাধ্যমে বাস পরিচালনা পদ্ধতি প্রবর্তনের রোডম্যাপসহ কর্মপরিকল্পনা প্রণয়ন করা ও এসব বিষয়ে জড়িত অন্যান্য কার্যক্রম গ্রহণ করা এবং কমিটির কার্যক্রম প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়, স্থানীয় সরকার বিভাগ, সড়ক পরিবহন ও মহাসড়ক বিভাগকে নিয়মিত অবহিত করতে হবে। পরে নিয়োগ দেয়া হয় পরামর্শকও। তবে গতি ফিরেনি তাতে। দীর্ঘ তিন বছরের বেশি সময় ধরে চলেছে নানা সমীক্ষা। বর্তমানে ওই কমিটির সভাপতির দায়িত্ব পালন করছেন ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের (ডিএসসিসি) মেয়র শেখ ফজলে নূর তাপস। গত বছরের ১০ই নভেম্বর ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের (ডিএসসিসি) নগর ভবনে বসে ১৩তম সভায় জমা দেয়া হয় কমিটির সমীক্ষা প্রতিবেদন। এখন পর্যন্ত ওই কমিটির সভা হয়েছে ১৭টি।

‘বাস রুট রেশনালাইজেশন’ কমিটির ১৭তম সভা শেষে কমিটির সভাপতি ও ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের (ডিএসসিসি) মেয়র ব্যারিস্টার শেখ ফজলে নূর তাপস বলেছিলেন, চলতি বছরের ৭ই সেপ্টেম্বর থেকে ঘাটারচর-কাঁচপুর রুটে পরীক্ষামূলকভাবে বাস রুট রেশনালাইজেশন কার্যক্রমের আওতায় বাস চলাচল হবে। নির্ধারিত ওই সময়েও তা দৃশ্যমান কোনো কাজ শুরু হয়নি। তখন কমিটির সভাপতি বলেছেন, এই কার্যক্রম কার্যকর করতে ঘাটারচরে একটি বাসডিপো প্রয়োজন। দুই মেয়রসহ সংশ্লিষ্টরা একটি জায়গা পরিদর্শন করেছেন। এ ছাড়া কাঁচপুর, হেমায়েতপুর, বাটুলিয়া এবং কেরানীগঞ্জের বাঘাইরেও টার্মিনাল ও বাসডিপো নির্মাণ করবেন। এ জন্য বাস মালিকপক্ষের সঙ্গে গত ৮ই জুলাইয়ের মধ্যে একটি চুক্তি চূড়ান্ত হওয়ার কথা থাকলেও এখনো তা আটকে আছে।

ঢাকা পরিবহন সমন্বয় কর্তৃপক্ষের এক কর্মকর্তা জানান, বাস রুট রেশনালাইজেশন কমিটির কাজের গতি নেই। বারবার সভা করেও দৃশ্যমান কাজে নামতে পারিনি। এভাবে চলতে থাকলে কয়েক বছরেও এটি শুরু করা যাবে না। ফলে শিগগিরই ঢাকা শহরে গণপরিবহনের শৃঙ্খলা আনা সম্ভব হবে না। এটি বাস্তবায়ন করতে কমিটির সঙ্গে সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়কে ও গতি বাড়াতে উদ্যোগ নিতে হবে। অন্যথায় নগরজীবনে পরিবহন নৈরাজ্য থেকে সহসাই মুক্তি মিলবে না।

ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশন সূত্রে জানা যায়, বাস রুট রেশনালাইজেশনকে বাস্তবায়ন করতে চূড়ান্ত পর্যায়ে আছে কমিটি। এ নিয়ে আগামী ৫ই অক্টোবর নগর ভবনে আরেকটি সভা অনুষ্ঠিত হবে।
বাংলাদেশ যাত্রী কল্যাণ সমিতির মহাসচিব মোজাম্মেল হক চৌধুরী মানবজমিনকে বলেন, সরকারের সদিচ্ছা থাকলে সড়কের নৈরাজ্য অনেক আগেই কমিয়ে আনা সম্ভব হতো। বাস রুট রেশনালাইজেশন কমিটির ৩ বছর পার হলেও দৃশ্যমান কিছু দেখা যাচ্ছে না। রাজধানীতে বাস্ট স্টপেজগুলো নষ্ট হয়ে গেছে। এসব স্থানে বাস থামে না। যাত্রী উঠানোর সময় পুরো শহরকে বাস স্টপেজ হিসেবে ব্যবহার করা হয়। যেখানে সেখানে যাত্রী হাত উঠালেই বাস থামে। চলতি মাসে ঘাটারচর-কাঁচপুর রুটে পরীক্ষামূলকভাবে বাস রুট রেশনালাইজেশন চালুর কথা ছিল। কিন্তু এখনো কোনো কাজই শুরু হয়নি। এটা আদৌ হবে কিনা কিংবা কবে হবে তা নিয়ে অনিশ্চয়তা রয়েছে।

বাস রুট রেশনালাইজেশন কমিটির সদস্য ও গণপরিবহন বিশেষজ্ঞ ড. এসএম সালেহ উদ্দিন মানবজমিনকে বলেন, বাস রুট রেশনালাইজেশন কাজটি চলমান রয়েছে। করোনার কারণে কিছুটা সময় অতিবাহিত হয়েছে। এটি বাস্তবায়ন করতে গণপরিবহন মালিক ও শ্রমিকদের নিয়ে একাধিকবার বৈঠক করতে হয়েছে। এই সময়ে নানা সিদ্ধান্ত নেয়া হয়েছে। এই সড়কে বিআরটিএ ও এমআরটি’র কাজ চলছে। সকল সংস্থার সঙ্গে সমন্বয় করেই আমাদেরকে এই বাস রুট ফ্র্যাঞ্চাইজ চালু করতে হবে। কমিটি দ্রুত সময়ে বাস রুট রেশনালাইজেশন শুরু করবে। এতে নগরীর যানজট ও নৈরাজ্য সবই কমে আসবে।

পাঠকের মতামত

**মন্তব্য সমূহ পাঠকের একান্ত ব্যক্তিগত। এর জন্য সম্পাদক দায়ী নন।

Md

২০২১-০৯-২৭ ১০:৪০:৫৬

S.R Lane e parbe ei shohorer 80% janjot komate. karon S.R lane Dharona toiry hoyece, Chalok,pothochari o jatri der sentiment mathay rekhe,

Kazi

২০২১-০৯-২৬ ২০:২২:৪৬

কিছুতেই সুফল আসবে না । রাস্তার ধারন ক্ষমতার চেয়ে যানবাহন বেশি । পিঁপড়ার মত রাস্তায় গাড়ি ।

আপনার মতামত দিন

প্রথম পাতা অন্যান্য খবর

কুমিল্লার ঘটনায় সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম দায় এড়াতে পারে না

২৫ অক্টোবর ২০২১

আওয়ামী লীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক এবং তথ্য ও সমপ্রচারমন্ত্রী ড. হাছান মাহমুদ বলেছেন, কুমিল্লার ঘটনা ...

পায়রা সেতুর উদ্বোধন, ঢাকা-সিলেট ৬ লেন সড়কের ভিত্তিস্থাপন

বাংলাদেশকে আর কেউ পেছনে টানতে পারবে না

২৫ অক্টোবর ২০২১

ডলারের মূল্য ৯০ ছাড়ালো

২৫ অক্টোবর ২০২১

মুহিবুল্লাহ হত্যা, সরাসরি জড়িত আজিজসহ গ্রেপ্তার ৪

কিলিং মিশনে ১৯ জন

২৪ অক্টোবর ২০২১

ওয়ালটন কারখানা পরিদর্শনে সালমান এফ রহমান

ইলেকট্রনিক পণ্য গার্মেন্ট খাতকে ছাড়িয়ে যাবে

২৪ অক্টোবর ২০২১



প্রথম পাতা সর্বাধিক পঠিত



আলিশা মার্টের অফিসে ভিড়

টাকা-পণ্য কিছুই মিলছে না

DMCA.com Protection Status