৭৪ বছরে বয়সী ‘ব্লাক উইডো’, প্রেমিকদের হত্যা করেছেন সায়ানাইড দিয়ে

মানবজমিন ডেস্ক

বিশ্বজমিন (৩ সপ্তাহ আগে) সেপ্টেম্বর ২৬, ২০২১, রোববার, ১:০৯ অপরাহ্ন | সর্বশেষ আপডেট: ১১:১২ পূর্বাহ্ন

‘ব্লাক উইডো’ চিসাকো কাকেহি। তার বয়স এখন ৭৪ বছর। প্রথম স্বামী মারা যাওয়ার পর প্রেমের ফাঁদ পেতে আকৃষ্ট করেছেন পুরুষদের। তাদের কাউকে কাউকে বিয়ে করে খুন করেছেন। এক্ষেত্রে খাবারের সঙ্গে মিশিয়ে দিয়েছেন বিষাক্ত রাসায়নিক সায়ানাইড ট্যাবলেট। কিন্তু পাপ ছাড়ে না বাপেরে। শেষ পর্যন্ত ধরা পড়তে হয়েছে চিসাকো কাকেহিকে। আদালতে দীর্ঘ বিচারে তার বিরুদ্ধে দেয়া হয়েছে মৃত্যুদণ্ডের রায়।
তা কার্যকরের অপেক্ষায় এখন। এ খবর দিয়েছে অনলাইন সিএনএন।
ইসাও কাকেহি’র বয়স ৭৫ বছর। তখনও তিনি সুস্থ ছিলেন। ভালবাসার মধ্যে ছিলেন। ২০১৩ সালে তিনি ৬৭ বছর বয়সী এক বিধবা চিসাকো কাকেহির সঙ্গে প্রেমের সম্পর্কে জড়িয়ে পড়েন। জাপানে ম্যাচমেকিং বিষয়ক একটি এজেন্সির মাধ্যমে তিনি চিসাকোর সাক্ষাত পেয়েছিলেন। এর দুই মাসের মধ্যে তারা বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হন এবং এসসঙ্গে বসবাস করতে শুরু করেন। কিয়োটোর মুকো সিটিতে তারা চমৎকার এক দাম্পত্য সম্পর্ক শুরু করেছিলেন। নতুন বছরকে উদযাপনের জন্য তারা তৈরি করেছিলেন কেক। কিন্তু নতুন বছরে বেঁচে থাকতে পারলেন না ইসাও। ২৮ শে ডিসেম্বর তিনি জাপানে ‘ব্লাক উইডো’ খুনের চতুর্থ ও চূড়ান্ত শিকারে পরিণত হন।
এখন চিসাকো কাকেহি’র বয়স ৭৪ বছর। প্রেমের সম্পর্কের মাধ্যমে তিনজন পার্টনারকে খুন ও চতুর্থ জনকে হত্যা চেষ্টার অভিযোগে মৃত্যুদণ্ডের মুখোমুখি।
চিসাকো কাকেহি এই হত্যাকাণ্ড শুরু করেন ২০০৭ সালে। এ সময় তার বয়স ছিল ৬১ বছর। ওই সময় থেকে তিনি প্রেমের সম্পর্ক গড়ে হত্যাকাণ্ড শুরু করলেও পুলিশের চোখ ফাঁকি দিতে পেরেছেন। কিন্তু ২০১৪ সালে চতুর্থ পার্টনার ইসাও কাকেহিকে হত্যার ঘটনায় তিনি আর পালাতে পারেননি। পুলিশের তদন্তে তার নাম উঠে আসে। গ্রেপ্তার করা হয় তাকে। জাপানে এ যাবতকাল যত দীর্ঘমেয়াদি বিচার হয়েছে তার মধ্যে এই মামলা অন্যতম। এই মামলায় ২০১৭ সালে আদালত চিসাকো কাকেহিকে মৃত্যুদণ্ডের রায় দেয়। এর বিরুদ্ধে তিনি আপিল করেন। কিন্তু জুনে তাও প্রত্যাখ্যাত হয়।
জাপানের সরকারি টেলিভিশন এনএইচকে’র মতে, চিসাকো কাকেহি একটি ম্যাচমেকিং এজেন্সি ব্যবহার করতেন। তা ব্যবহার করে তিনি একের পর এক প্রবীণ ব্যক্তিদের শিকারে পরিণত করতেন। তাদেরকে আস্থায় নেয়ার পর বিষ প্রয়োগ করতেন। জুনে আদালতের বিচারক এ মন্তব্য করেছেন। বিচারক আরো বলেছেন, হত্যাকাণ্ডের উদ্দেশে এটা হলো সুপরিকল্পিত ও শক্তিশালী একটি বেপরোয়া অপরাধ। এই ঘটনা সামনে আসার পর জাপানে এক উদ্বেগ দেখা দেয়। বিশেষ করে ঝুঁকিতে থাকা বয়স্ক ও সিঙ্গেল মানুষদেরকে অনলাইনে প্রেমের ফাঁদে ফেলার বিপদের বিষয় জোরালোভাবে ফুটে ওঠে। একই সঙ্গে প্রশ্ন সৃষ্টি হয়, যে নারী জীবনের শেষ প্রান্তে, তিনি কেন প্রেমের ফাঁদ পেতে পুরুষদের হত্যা করছেন।
জাপানে দ্রুতই কুখ্যাত হয়ে ওঠেন চিসাকো কাকেহি। তাকে এর আগে খুবি বেশি মানুষ চিনতো না। তিনি জাপানের দক্ষিণ-পশ্চিমের সাগা এলাকায় জন্মগ্রহণ করেন। কাজ করতেন একটি প্রিন্টিং কারখানায়। ১৯৬৯ সালে প্রথম বিয়ে করেন। তখন তার বয়স ছিল ২৩ বছর। ১৯৯৪ সালে তার প্রথম স্বামী অসুস্থতায় মারা যান। এর পূর্ব পর্যন্ত তাদের দাম্পত্য জীবন টিকে ছিল ২৫ বছর। কিন্তু ২০০৭ সালে তিনি ৭৮ বছর বয়সী তোশিয়াকি সুয়েহিরোর সঙ্গে সম্পর্ক গড়ে তোলেন। এ বছরই ১৮ই ডিসেম্বরের বিকেলে তিনি সুয়েহিরো ও তার সন্তানদের সঙ্গে মধ্যাহ্ন ভোজ সারেন। সুয়েহিরো ওষুধ খেতেন। ফলে কাকেহি তাকে একটি সায়ানাইড ক্যাপসুল দেন। মধ্যাহ্নভোজের ১৫ মিনিটের কম সময়ের মধ্যে সুয়েহিরো রাস্তার ওপর অচেতন হয়ে পড়েন। এম্বুলেন্স ডাকা হয়। ততক্ষণে শ্বাসপ্রশ্বাস ছাড়তে হাঁসফাঁস করছিলেন তিনি। এসব কথা বলা হয়েছে আদালতের নথিতে।
সুয়েহিরোকে হাসপাতালে নেয়া হয়। সঙ্গে ছিলেন চিসাকো কাকেহি। সুয়েহিরোর পরিবার ও এম্বুলেন্স স্টাফদের সঙ্গে আলোচনার সময় নিজেকে ‘হিরাওকা’ হিসেবে পরিচয় দেন চিসাকো কাকেহি। হাসপাতালে চিকিৎসকরা দেখতে পান সুয়েহিরো মৃত্যুর কাছাকাছি পৌঁছে গেছেন অভ্যন্তরীণভাবে শ্বাস বন্ধ হয়ে। তবে কপাল ভাল। চিসাকো কাকেহি যে চারটি শিকার ধরেছিলেন তার মধ্যে সুয়েহিরোই একমাত্র ব্যক্তি, যিনি বেঁচে গিয়েছিলেন। এর প্রায় দেড় বছর পরে অসুস্থতায় মারা যান তিনি।
এর কয়েক বছর পরেই দ্বিতীয় শিকারের দিকে চোখ ফেলেন চিসাকো কাকেহি। তিনি ছিলেন ৭১ বছর বয়সী মাসানোরি হোন্ডা। তার শরীর স্বাস্থ্য ছিল ভাল। ২০১১ সালে মাঝারি পর্যায়ের ডায়াবেটিস ধরা পড়ে তার। ফলে তিনি ঘন ঘন স্পোর্টস ক্লাবে যেতে শুরু করেন। এক পর্যায়ে তিনি চিসাকো কাকেহির সঙ্গে অন্তরঙ্গ সম্পর্কে জড়িয়ে পড়েন। তারা কিভাবে একে অন্যের সাক্ষাত পেয়েছিলেন বা কতদিন ডেটিং করেছেন তা পরিষ্কার নয়। এই যুগল তাদের বন্ধুদের বলেছিলেন, বছরের শেষের দিকে তারা বিয়ে করতে যাচ্ছেন। পরের বসন্তেই চিসাকো কাকেহি তার গতি পরিবর্তন করলেন। ২০১২ সালের ৯ই মার্চ তিনি হোন্ডার সঙ্গে তার স্টোরে সাক্ষাত করলেন। তারপর তারা আলাদা হয়ে থাকার পথ বের করে ফেলেন। ওইদিনই বিকাল প্রায় ৫টার দিকে, মোটরসাইকেল চালানোর সময় চেতনা হারিয়ে ফেলেন হোন্ডা। দু’ঘন্টারও কম সময়ের মধ্যে হাসপাতালে চিকিৎসকরা তাকে মৃত ঘোষণা করেন।
পরে তথ্যপ্রমাণে দেয়া যায়, হোন্ডার সঙ্গে জীবন কাটানোর কোনো পরিকল্পনা ছিল না চিসাকো কাকেহির। হোন্ডা মারা যাওয়ার দুই মাস আগেই ২০১২ সালের জানুয়ারিতে একটি ডেটিং এজেন্সির মাধ্যমে গোপনে অন্য পুরুষদের সঙ্গে ডেটিং দেয়া শুরু করেন চিসাকো কাকেহি।
একাকীত্বে এবং ফুসফুসের ক্যান্সারে ভুগছিলেন মিনোরু হিওকি। ২০১৩ সািলের জুলাইয়ে তার জীবন যেন ঘুরে গেল। ক্যান্সারের চিকিৎসায় রেডিয়েশন থেরাপি দেয়া হলো তাকে। এতে তিনি সুস্থ হয়ে ওঠেন। ফলে ৭৫ বছর বয়সী এই পুরুষের নতুন করে প্রেমে আগ্রহ জন্মে। ২০১৩ সালের আগস্টে চিসাকো কাকেহির সামনে হাজির হন হিওকি। তাকে ইমেইল লেখেন। তাতে বলেন, তার সঙ্গে তিনি চিরদিন একসঙ্গে থাকতে চান। ফলে তাদের আন্তরিকতা বাড়তেই থাকে। তারা একসঙ্গে খাবার খেতে থাকেন। একজন আরেকজনের বাড়িতে রাত যাপন করতে থাকেন। কিন্তু এই প্রেমের সমাপ্তি ঘটে ২০ শে সেপ্টেম্বর। এদিন রাতে এই যুগল খাবার খেতে বাইরে গিয়েছিলেন। চিসাকো কাকেহির দ্বিতীয় স্বামী সুয়েহিরোর মতো হিওকিও ওষুধ সেবন করতেন। ফলে তাকে সায়ানাইড ক্যাপসুল সেবন করানোর একটি উত্তম সুযোগ পেয়ে যান চিসাকো কাকেহি। এই রাতে এই যুগল সবেমাত্র খাবার শেষ করেছেন, এমন সময় চেতনা হারান হিওকি। সঙ্গে সঙ্গে এম্বুলেন্স এসে হাজির। এ সময় হিওকি শ্বাস ছাড়তে না পেয়ে ব্যথায় কুঁকড়ে যাচ্ছিলেন এবং হাসফাস করছিলেন। যদিও তার সন্তান আছে, ক্যান্সার থেকে সুস্থ হয়েছেন, তবু এম্বুলেন্স ক্রুদের কাছে মিথ্যে বলেছেন চিসাকো কাকেহি। বলেছেন, হিওকির কোনো পরিবার নেই। তিনি ফুসফুসের একেবারে শেষ পর্যায়ে আছে এমন ক্যান্সারে আক্রান্ত। ক্রুরা হিওকির দেহে প্রাণ ফেরানোর প্রক্রিয়া শুরু করতে চাইলেন। কিন্তু তাতে বাধা দিলেন চিসাকো কাকেহি। এতে মাত্র দুই ঘন্টার মধ্যে মারা যান হিওকি।
হিওকি মারা যাওয়ার মাত্র দুই মাস পরে ২০১৩ সালের নভেম্বরে বিয়ে করে নিয়েছেন পরবর্তী টার্গেট- ইসাও কাকেহি’কে। বিয়ের বড়জোর এক মাসের মধ্যে, অন্য এক পুরুষের সঙ্গে গোপনে ডেটিং শুরু করেন চিসাকো কাকেহি। কিন্তু ইসাও কাকেহি ছিলেন জ্ঞানী। তিনি জীবনকে উপভোগ করতে চেয়েছেন। ইমেইল এবং টেক্সট ম্যাসেনে তার নতুন বউকে জানিয়েছেন, দ্বিতীয় জীবনকে আলোকিত করতে, চমৎকার সময় কাটাতে চান তিনি। কিন্তু বিয়ের মাত্র কয়েক সপ্তাহের মধ্যে ইসাও বাসায় তার স্ত্রীর সঙ্গে নৈশভোজের পরপরই হার্টএটাকে আক্রান্ত হন। এ সময় এম্বুলেন্স ডাকেন চিসাকো কাকেহি। ইসাওকে দ্রুত হাসপাতালে নেয়ার এক ঘন্টা পরেই তিনি মারা যান। এই মৃত্যুতে পুলিশি তদন্ত শুরু হয়। জাপানে লাশের ময়না তদন্ত বিরল। যদি কোনো অনিয়ম বা অত্যাচার করে মারা হয়েছে বলে সন্দেহ হয়, শুধু তবেই ময়না তদন্ত করা হয়।
ফলে ইসাওয়ের মৃত্যু নিয়ে সন্দেহ হয় সংশ্লিষ্টদের। তারা লাশের ময়না তদন্ত করার সিদ্ধান্ত নেন। এতে দেখা যায়, তার হার্ট, রক্ত এবং পাকস্থলির ভিতর সায়ানাইডের আয়ন রয়েছে। ইসাও মারা যাওয়ার কয়েকদিন পরে কর্তৃপক্ষ চিসাকো কাকেহি এপার্টমেন্ট থেকে সায়ানাইড ক্যাপসুল এবং ক্যাপসুলের খালি খোসা উদ্ধার করে। এ থেকে সিদ্ধান্তে আসা হয় যে, তিনি সায়ানাইড ব্যবহার করে এসব পুরুষকে হত্যা করেছেন।

পাঠকের মতামত

**মন্তব্য সমূহ পাঠকের একান্ত ব্যক্তিগত। এর জন্য সম্পাদক দায়ী নন।

KAZI NAZRUL ISLAM

২০২১-০৯-২৬ ১৭:৫৮:২৮

i think this is wrong! actually this is a story!

samsulislam

২০২১-০৯-২৬ ০২:২৯:২২

গল্প না সত্যি?

Kazi

২০২১-০৯-২৬ ০০:৫৪:৪৬

Serial killer.

আপনার মতামত দিন

বিশ্বজমিন অন্যান্য খবর

ইমরান খানকে পিপিপি নেতা

আইএসআই ডিজি নিয়োগ নিয়ে রাশিয়ান জুয়া বন্ধ করুন

২৩ অক্টোবর ২০২১



বিশ্বজমিন সর্বাধিক পঠিত



DMCA.com Protection Status