টিকার বৈষম্য!

ড. মাহফুজ পারভেজ

মত-মতান্তর ২৫ সেপ্টেম্বর ২০২১, শনিবার | সর্বশেষ আপডেট: ১১:২০ পূর্বাহ্ন

চলমান বৈশ্বিক মহামারি করোনাকালে টিকার বৈষম্যের চিত্র প্রকট আকারে সামনে চলে এসেছে। কোনও কোনও দেশ তাদের নাগরিকদের দ্বিতীয় ডোজ দিয়ে তৃতীয় বা বুস্টার ডোজ দেওয়া পথে। আর বিশ্বের সিংহভাগ দেশের বিপুল নাগরিক এখনও টিকার প্রথম ডোজই পায় নি। করোনার টিকা বা ভ্যাকসিন আসার পর থেকেই 'ভ্যাকসিন মনোপলি', 'ভ্যাকসিন জাতীয়তাবাদ', 'ভ্যাকসিন ডিপ্লোম্যাসি'র মাধ্যমে টিকার কর্তৃত্ব, নিয়ন্ত্রণ, প্রাপ্যতা ও সরবরাহের বিষয়গুলো রয়েছে ধনী দেশগুলোর কব্জায়, যা বিশ্বব্যাপী চরম বৈষম্যের সৃষ্টি করেছে। আন্তর্জাতিক অঙ্গনে এ প্রসঙ্গটি তীব্রভাবে আলোচিত হচ্ছে এবং বিশ্বনেতৃত্বের সবচেয়ে বড় ফোরাম জাতিসংঘের অধিবেশনেও চর্চিত হয়েছে।

টিকাকরণের সর্বশেষ পরিসংখ্যানে দেখা গেছে, কোভিড টিকার তৃতীয় বা বুস্টার ডোজ় দেওয়ায় ছাড়পত্র দিয়েছে আমেরিকা। সে দেশের স্বাস্থ্য দফতর জানিয়েছে, প্রবীণ ও ঝুঁকির তালিকায় থাকা বাসিন্দাদের তৃতীয় ডোজ় দেওয়া শুরু হবে শীঘ্রই। অন্যদিকে, অনেক গরিব দেশ এখনও একটি ডোজ়ও দিতে পারেনি তাদের বাসিন্দাদের।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, বিশ্বের অন্তত ১৫টি দেশ, যার বেশির ভাগই আফ্রিকান, তারা তাদের জনসংখ্যার ৩ শতাংশকেও প্রথম ডোজ়টি দিয়ে উঠতে পারেনি। এর মধ্যে রয়েছে নাইজেরিয়া, ইথিওপিয়ার মতো দেশ।
আফ্রিকার সবচেয়ে ঘনবসতিপূর্ণ দেশ নাইজেরিয়ায় অন্তত ২০ কোটি মানুষের বাস। ইথিওপিয়ায় থাকেন সাড়ে ১১ কোটি মানুষ। টিকাকরণে মারাত্মক পিছিয়ে হাইতি-ও। আমেরিকার ফ্লোরিডা থেকে মাত্র ৭০০ মাইল দূরে এই দেশ। যুদ্ধবিধ্বস্ত দেশ ইয়েমেনে এ পর্যন্ত ১.১ শতাংশ বাসিন্দাকে টিকার একটি ডোজ় দেওয়া হয়েছে। সেখানে দিনে গড়ে মাত্র ২৪৪ জন টিকা পাচ্ছেন।

খোদ জাতিসংঘ ক্ষুব্ধ বক্তব্যে জানিয়েছে, এই পরিস্থিতিতে বুস্টার ডোজ়ে ছাড়পত্র দেওয়ার অর্থ গরিব দেশগুলোকে মহামারির মধ্যে ফেলে রাখা। কারণ, বিশ্বের কোথাও করোনাভাইরাস থেকে যাওয়ার অর্থ বিপদ থেকে যাওয়া। টিকাহীন অঞ্চলগুলোতে সংক্রমণ ঘটবে এবং ভাইরাসের নতুন অতিসংক্রামক স্ট্রেন তৈরি হবে। ফলে বুস্টার ডোজ় চালু করার জন্য এই বছরের শেষ পর্যন্ত ধনী দেশগুলোকে অপেক্ষা করতে আবেদন জানিয়েছেন বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (হু)-এর প্রধান টেড্রস অ্যাডানম গেব্রিয়েসাস।

জাতিসংঘ এবং বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (হু)-এর আপত্তি উপেক্ষা করে আগেই ইসরায়েল, জার্মানি-সহ কিছু ধনী দেশে বুস্টার ডোজ় দেওয়া শুরু হয়েছে। এই তালিকায় যুক্ত হতে চলেছে আমেরিকাও। সেখানকার 'সেন্টারস ফর ডিজ়িজ় কন্ট্রোল অ্যান্ড প্রিভেনশন' (সিডিসি)-এর ছাড়পত্রের আলোকে লক্ষ লক্ষ আমেরিকান বুস্টার ডোজ় পাবেন সামনের অক্টোবর মাস থেকে।

টিকাকরণের প্রশ্নে বিশ্বের স্বার্থ ও আন্তর্জাতিক চাহিদার দিকে নজর না দিয়ে ধনী দেশগুলো নিজেদের জাতীয় স্বার্থের দিকেই অধিকতর মনোযোগী। ধনী দেশগুলোর বক্তব্য হলো এই যে, তারা জাতিসংঘের 'কোভ্যাক্স প্রকল্প'র মাধ্যমে টিকা দান করছে বিশ্বের দরিদ্র দেশগুলোর জন্য। কিন্তু পরিসংখ্যান বলছে, 'এই দান' প্রয়োজনের তুলনায় অতি সামান্য। জাতিসংঘের মহাসচিব আন্তোনিয়ো গুতেরেজ় নিজেই এই তথ্য জানিয়েছেন যে, ‘বিশ্বে ৫৭০ কোটিরও বেশি ডোজ় টিকাকরণ হয়েছে। কিন্তু এর ৭৩% পেয়েছে বিশ্বের ১০টি দেশ।’

কোভিড-মুক্ত বিশ্ব গড়তে সার্বজনীন ও সাশ্রয়ী মুল্যে টিকা প্রাপ্যতায় যথাযথ বৈশ্বিক পদক্ষেপ যখন জরুরি হয়ে উঠছে, তখন টিকার উপর ধনী দেশগুলোর একচেটিয়া কর্তৃত্ব বিশ্ব স্বাস্থ্য ব্যবস্থায় ভারসাম্যহীনতা ও মহামারি প্রতিরোধে শৈথিল্য সৃষ্টি করবে বলে দাবি করেছেন বিশেষজ্ঞরা। তারা হুশিয়ার করে দিয়ে বলেছেন, বর্তমান ‘টিকা-বিভাজন’ প্রবণতা শুধুমাত্র মহামারিটিকেই দীর্ঘস্থায়ী করবে।

বিভিন্ন আন্তর্জাতিক ফোরাম, জনস্বাস্থ্য সংস্থা, গবেষণা প্রতিষ্ঠান বার বার তাগিদ দিচ্ছে যে, কোভিডমুক্ত বিশ্বের জন্য অবশ্যই বিশ্বব্যাপী সকল মানুষের জন্য সার্বজনীন ও সাশ্রয়ী মূল্যে টিকার প্রাপ্যতা নিশ্চিত করতে হবে। ধনী ও দরিদ্র দেশগুলোর মধ্যে টিকা বৈষম্য বৃদ্ধিতে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করে এটাও বলা হয়েছে যে, এ যাবৎ উৎপাদিত টিকার ৮৪ শতাংশ উচ্চ ও উচ্চ-মধ্যম আয়ের দেশগুলোর মানুষের কাছে পৌঁছেছে। অন্যদিকে, নিম্ন আয়ের দেশগুলো ১ শতাংশেরও কম টিকা পেয়েছে, যা চরম ভারসাম্যহীনতা ও বৈষম্যের পরিচায়ক।

বিশেষজ্ঞদের স্পষ্ট অভিমত এটাই যে, করোনা সংক্রমণের আবর্তনরত প্রকোপ বিভিন্ন দেশে দ্বিতীয় ও তৃতীয় ঢেউ সৃষ্টি ছাড়াও নতুন নতুন অতিসংক্রামক স্ট্রেন তৈরি করে চলেছে। ফলে বিশ্বব্যাপী সমতালে টিকাকরণ জরুরি। একই সঙ্গে টিকা বৈষম্য দূর করাও অপরিহার্য। কারণ, লক্ষ কোটি মানুষকে টিকা থেকে দূরে রেখে কখনই চরম মহামারি থেকে টেকসই পুনরুদ্ধার সম্ভব নয় এবং পুরোপুরি নিরাপত্তা নিশ্চিত করাও অসম্ভব।

জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞগণ এবং গবেষকবৃন্দ এ লক্ষ্যে অবিলম্বে টিকা প্রযুক্তি হস্তান্তরের মাধ্যমে টিকার সমতা নিশ্চিত করার প্রতি গুরুত্বারোপ করেছেন। কেননা, প্রযুক্তি সহায়তা ও মেধাস্বত্ত্বে ছাড় পেলে বাংলাদেশসহ বিশ্বের বহুদেশ বিপুল পরিমাণে টিকা তৈরি করতে সক্ষম হবে, যা টিকার নিয়ন্ত্রণ-চক্রকে ভেঙে ফেলার পাশাপাশি গণটিকাকরণে প্রবল গতিবেগ নিয়ে আসবে।

মহামারির প্রলয়ঙ্করী গ্রাস থেকে কোভিডমুক্ত, নিরাপদ বিশ্ব গড়ে তোলার লক্ষ্যে টিকার সর্বজনীন ও সাশ্রয়ী মূল্যে প্রাপ্যতা নিশ্চিত করার বিকল্প নেই। তবে, তা সম্ভব হতে পারে স্বার্থান্ধ শক্তিধর দেশগুলো সহযোগিতামূলক মনোভাব ও মানবিক পদক্ষেপের মাধ্যমে।

আপনার মতামত দিন

মত-মতান্তর অন্যান্য খবর

মুরগিকে মনে হয় যেনো গরু

২২ অক্টোবর ২০২১

অশনি সঙ্কেত!

১৮ অক্টোবর ২০২১



মত-মতান্তর সর্বাধিক পঠিত



দেখা থেকে তাৎক্ষণিক লেখা

কোটিপতিদের শহরে তুমি থাকবা কেন?

কাওরান বাজারের চিঠি

ছবিটির দিকে তাকানো যায় না

DMCA.com Protection Status