ডেসটিনি-যুবক থেকে ইভ্যালি

হতাশার যে গল্পের শেষ নেই

আলতাফ হোসাইন

প্রথম পাতা ২৫ সেপ্টেম্বর ২০২১, শনিবার | সর্বশেষ আপডেট: ৪:৫২ অপরাহ্ন

মাত্র এক দশক আগে যুবক, ডেসটিনির মতো এমএলএম কোম্পানিতে বিনিয়োগ করে হাজার হাজার কোটি টাকা খুইয়েছেন দেশের অনেক মানুষ। সম্প্রতি ইভ্যালি, ই-অরেঞ্জ কিংবা ধামাকা শপিংয়ের মতো ই-কমার্স প্রতিষ্ঠানগুলোতে একইভাবে বিনিয়োগ করে আবারো প্রতারিত হয়েছেন লাখ লাখ গ্রাহক। অর্থ আত্মসাতের অভিযোগের পর সরকার এসব প্রতিষ্ঠানের কর্তাব্যক্তিদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থাও নিচ্ছে। তবে প্রতারণা করে গ্রাহকদের কাছ থেকে নেয়া হাজার হাজার কোটি টাকা ফিরে পাওয়া নিয়ে রয়েছে অনিশ্চয়তা। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, একবার প্রতারকের হাতে অর্থ চলে গেলে সেটি ফিরে পাওয়ার আইনি প্রক্রিয়াও জটিল। অতীতেও দেশের কয়েকটি এমএলএম প্রতিষ্ঠান গ্রাহকের কোটি কোটি টাকা আত্মসাৎ করলেও তা ফিরে পাওয়ার দৃষ্টান্ত নেই।

জানা যায়, সম্প্রতি দেশের বেশ কয়েকটি ই-কমার্স প্রতিষ্ঠান থেকে বিভিন্ন মডেলের মোটরসাইকেল, মোবাইল, ফ্রিজসহ বিভিন্ন পণ্য অর্ডার দিয়ে অগ্রিম টাকা পাঠিয়েছেন। কিন্তু অর্ডারের পণ্য কিংবা রিফান্ড পাননি হাজার হাজার গ্রাহক। এতে দেশের নানা শ্রেণির-পেশা শতাধিক গ্রাহক এসব প্রতিষ্ঠানে বিনিয়োগ করে সর্বস্বান্ত হয়েছেন।
নিঃস্ব হয়েছেন অনেক পণ্য সরবারহকারীও।

ধামাকা: রাজধানীর বসুন্ধরা সিটি শটিংমলে মোবাইল ফোনের শো-রুম রয়েছে আব্দুল হাকিমের। এই ব্যবসাতেই তার সংসার ভালোই চলছিল। তবে নিজের প্রতিষ্ঠিত ব্যবসার পাশাপাশি অতিরিক্ত আয়ের চিন্তা করে চুক্তির মাধ্যমে একটি মোবাইল কোম্পানি থেকে পণ্য সরবাহ দিতেন ই-কমার্স প্রতিষ্ঠান ধামাকাকে। সবমিলিয়ে তিনি বিনিয়োগ করেছিলেন ১ কোটি টাকা। কিন্তু ধামাকার কর্তাব্যক্তিরা গ্রাহকদের পণ্য বা টাকা না দিয়ে তাদের ব্যবসা গুটিয়ে নিয়ে বিদেশে পাড়ি জমিয়েছেন। এ অবস্থায় পথে বসার উপক্রম হয়েছে তার।

ইভ্যালি: টাঙ্গাইলের ভূঞাপুর ইব্রাহীম খাঁ সরকারি কলেজ রোডের একটি মোবাইল ফোনের দোকানে কাজ করেন সুধন দত্ত। লাভের আশায় ধার দেনা ও ঋণ করে ইভ্যালি মোবাইলসহ কয়েকটি পণ্য অর্ডার করেছিলেন। কিন্তু ইভ্যালির দেয়া নির্দিষ্ট সময় পার হলেও তিনি পণ্য পাননি। একই অবস্থা ওই রোডের সেভেন ব্রাদার্স নামের একটি প্রতিষ্ঠানের স্বত্বাধিকারী শেখ সাদীর। তিনি প্রথমদিকে ইভ্যালিতে পণ্য অর্ডার করে পণ্য পেলেও পরবর্তী সময়ে বেশি অর্ডার করে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন। তিনিও ইভ্যালির সাইক্লোনসহ বিভিন্ন লোভনীয় অফারে পণ্য অর্ডার করে প্রায় ৯ লাখ টাকা বিনিয়োগ করেছেন।
ইভ্যালিতে বিনিয়োগ করা সুধন দত্ত বলেন, ঋণ ও কষ্টার্জিত টাকা দিয়ে লাভের আশায় ইভ্যালিতে পণ্য অর্ডার করেছিলাম। কিন্তু মাসের পর মাস পেরিয়ে গেলেও পণ্য পাইনি। তবে আশায় ছিলাম পণ্য পাবো। এখন ইভ্যালির মালিক গ্রেপ্তার হওয়ায় সেই আশায় চিন্তার ভাঁজ পড়েছে। এখন টাকা ফেরত পাওয়া নিয়ে খুবই চিন্তায় আছি।

গ্রাহক শেখ সাদী বলেন, ইভ্যালিতে প্রথমবার পণ্য অর্ডার দিয়ে পেলেও পরবর্তী অর্ডারে কোনো পণ্য বা টাকা পাইনি। এতে বিভিন্ন পণ্য মিলিয়ে আমার প্রায় ৯ লাখ টাকা বিনিয়োগ হয়েছে। ইভ্যালির শর্ত অনুয়াযী ৪৫ দিনের মধ্যে পণ্য দেয়ার কথা ছিল। কিন্তু সময় পেরিয়ে কয়েক মাস পার হলেও পণ্য পাইনি। এর আগে ইভ্যালিতে একটা চেক দেয়া হয়েছিল। সেটাও ক্যাশ করতে পারিনি এখনো। এর মধ্যে ইভ্যালির মালিকদের গ্রেপ্তারে পাওনা ফেরতের কোনো সম্ভাবনা দেখছি না।

মিরপুরের বাসিন্দা গত ২৪শে জুন ইভ্যালি থেকে দুটি ফ্যান কেনার অর্ডার দিয়েছিলেন মিরপুরের বাসিন্দা কামরুল আহসান। দাম ৫ হাজার ৮০০ টাকা। তিনি জানান, ইভ্যালি তাকে বলেছিল ৭ থেকে ৪৫ দিনের মধ্যে ফ্যান পৌঁছে দেবে বাসায়। অর্ডারের সঙ্গে ৯০ শতাংশ অর্থাৎ ৫ হাজার ২২০ টাকা ক্যাশব্যাক পান কামরুল। এই টাকা ইভ্যালির সরবরাহ করা কাচ্চি বিরিয়ানি খেয়ে শেষ করেন। কিন্তু দুই মাস হতে চললেও ফ্যান আর পাননি তিনি।

যুবক: গাজীপুরের বাসিন্দা মাসুম ২০০৫ সালে যুবক নামের একটি মাল্টি লেভেল মার্কেটিং কোম্পানিতে প্রথমে ৫০ হাজার টাকা বিনিয়োগ করেছিলেন। প্রথম দিকে সবকিছু ঠিকঠাকই ছিল। যুবকের তরফ থেকে তাকে প্রতিশ্রুতি দেয়া হয়েছিল বেশি মুনাফা এবং জমি দেয়া হবে। সে আশায় তিনি আরও টাকা বিনিয়োগ করেন। একপর্যায়ে দেখেন কোম্পানির লোকজনের আর কোনো খবর নেই। তিনি বলেন, প্রথমে আমি যখন ৫০ হাজার টাকা রাখি তখন আমাকে ২০ থেকে ২৫ পার্সেন্ট লাভ দিয়েছিল। এরপর সব ইতিহাস। দেড় দশক আগে বিতর্কিত মাল্টি-লেভেল মার্কেটিং ব্যবসার নামে হাজার কোটি টাকা হাতিয়ে নিয়েছে যুবক। প্রতারণার অভিযোগে ২০০৬ সালে যুবকের কার্যক্রমও বন্ধ করে দেয় সরকার। তিন লাখ চার হাজার গ্রাহক তাদের পাওনা ২ হাজার ৬০০ কোটি টাকা ফেরত পাননি।  

ওদিকে, ১০ বছর আগে এমএলএম কোম্পানি যুবকে ১২ লাখ টাকা বিনিয়োগ করেছিলেন মুকুল। তার মতো আরও ৩ লাখ গ্রাহক টাকা ফিরে পাওয়ার জন্য চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছেন। মুকুল মানবজমিনকে বলেন, আমরা যারা প্রতারিত হয়েছি সবাই মিলে একটি সংগঠন করেছি। এর নাম দিয়েছি যুবকের ক্ষতিগ্রস্ত জনকল্যাণ সোসাইটি। আমরা টাকা ফিরে পেতে গত ১০ বছরে অনেক কিছু করেছি। সরকারের কাছে আবেদন করেছি। বাণিজ্য মন্ত্রণালয়কে বলেছি। আন্দোলন সংগ্রাম করে যাচ্ছি এখনো। কিন্তু কোনো আশার মুখ দেখিনি।

৯ বছর আগে প্রতারণার শিকার হয়ে আত্মহত্যা করেন বাগেরহাটের মোরেলগঞ্জের একটি মাধ্যমিক স্কুলের শিক্ষক দীপক দত্ত। শিক্ষক দীপক দত্ত নিজের সম্বলের পাশাপাশি আত্মীয়স্বজন ও পরিচিতজনের কাছ থেকে ঋণ নিয়ে যুবককে দিয়েছিলেন মোট ২৬ লাখ টাকা। সহ্য করতে না পেরে ২০১২ সালের ৩০শে এপ্রিল গলায় ফাঁস দিয়ে আত্মহত্যা করেন তিনি। এরপর পাওনাদারদের চাপে এক সময় দীপকের স্ত্রী এলাকা ছাড়েন। আর তার কোনো খোঁজ নেই।

ডেসটিনি: যুবকের মতোই প্রতারণা এবং জালিয়াতির অভিযোগ রয়েছে ডেসটিনির বিরুদ্ধেও। মানুষের কাছ থেকে ৪ হাজার কোটি টাকা আত্মসাৎ ও জালিয়াতির মামলায় ডেসটিনির শীর্ষ ব্যক্তিরা এখন কারাগারে।

এসপিসি ওয়ার্ল্ড: গত বছরের জানুয়ারিতে রাজধানীর কলাবাগান থেকে ই-কমার্সের নামে যাত্রা শুরু করে এমএলএম কোম্পানি এসপিসি ওয়ার্ল্ড এক্সপ্রেস। প্রতিষ্ঠানটির ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) ও প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা (সিইও) আল আমিন প্রধানের নেতৃত্বে অন্য সহযোগীরা গত বছরের জানুয়ারি থেকে নভেম্বর পর্যন্ত মাত্র ১১ মাসে ২৬৮ কোটি টাকা হাতিয়ে নেয়। এর মধ্যে বন্ধ হয়ে যাওয়া ডেসটিনি ২০০০ লিমিটেডের সাবেক এক কর্মকর্তা জড়িত আছেন। তবে আবার চালু হয়েছে প্রতিষ্ঠানটি।

ইউনিপে টু ইউ: ইউনিপে টু ইউতে ১০ মাসে দ্বিগুণ লাভের আশায় ৬ লাখ বিনিয়োগকারীর বিনিয়োগ করা ৬ হাজার কোটি টাকা হাতিয়ে নেয় চেয়ারম্যান শহীদুজ্জামান ও ব্যবস্থাপনা পরিচালক মুনতাসির হোসেন। ২০১১ সালের ইউনিপেটুইউ’র কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে বিনিয়োগকারীদের অর্থ আত্মসাৎ ও পাচারের অভিযোগে মামলা করে দুদক। এ টাকা ফেরত পেতে বিনিয়োগকারীরা সরকারের সংশ্লিষ্ট অফিসের দ্বারে দ্বারে ঘুরে হয়রান। টাকা ফেরত দিতে আদালতের নির্দেশনা থাকলেও তা বাস্তবায়নের উদ্যোগ নেই। আবার কিছু গ্রাহক এমএলএম প্রতিষ্ঠানটির বিরুদ্ধে টাকা আদায়ের মামলা করলেও তা বছরের পর বছর ঝুলছে।

আইসিএল গ্রুপ: অতিরিক্ত মুনাফার লোভ দেখিয়ে ২০১৩ সালে প্রায় পাঁচ লাখ গ্রাহকের কাছ থেকে ৩ হাজার কোটি টাকা হাতিয়ে নেয় আইসিএল গ্রুপ। পরবর্তীকালে নামসর্বস্ব ১৩টি প্রতিষ্ঠান ফেলে উধাও হয়ে যায় গ্রুপটির ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) ও মূল উদ্যোক্তা শফিকুর রহমানসহ পরিচালকরা। যদিও পরে গ্রুপটির মূল উদ্যোক্তা শফিকুর রহমান ও তার স্ত্রী আইসিএল গ্রুপের পরিচালক কাজী সামসুন নাহার মিনা র‌্যাবের হাতে আটক হন। তবে এখনো প্রতারিত গ্রাহকরা টাকা ফিরে পাননি।
এদিকে, সমবায় অধিদপ্তরের ২০১৭ সালের এক প্রতিবেদন বলছে, ২০০৮ সাল থেকে ওই বছর পর্যন্ত ২৬৬টি সমবায় সমিতি প্রায় ৪ হাজার ১০০ কোটি টাকা নিয়ে উধাও হয়ে গেছে। সমবায় অধিদপ্তর সূত্র জানায়, ২০১৭ সালের পরে সমন্বিত আর কোনো প্রতিবেদন করা হয়নি। নানা অভিযোগে সমবায় অধিদপ্তর থেকে নিবন্ধন নেয়া তিন শতাধিক সমবায় সমিতির বিরুদ্ধে তদন্ত করছে দুদক। তিনি বলেন, ২৬৬ সমিতির বিরুদ্ধে দুদক তদন্ত করে সমবায় অধিদপ্তরকে ব্যবস্থা নিতে বলেছে।

এদিকে, গত ১০ই সেপ্টেম্বর পিরোজপুরের এহসান মাল্টিপারপাস কো-অপারেটিভ সোসাইটির চেয়ারম্যান রাগীব আহসানকে গ্রেপ্তার করে র‌্যাব। এহসান গ্রুপ গ্রাহক ও সমিতির সদস্যদের কাছ থেকে ১১০ কোটি টাকা হাতিয়ে নিয়েছে। র‌্যাব জানিয়েছে, সবমিলিয়ে ১৭ হাজার কোাটি টাকা দেনা এই এহসান গ্রুপের।

দুর্নীতি প্রতিরোধে কাজ করা সংস্থা ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশের (টিআইবি) নির্বাহী পরিচালক ড. ইফতেখারুজ্জামান মনে করেন, যারা গ্রাহকের সঙ্গে প্রতারণা করেছে তাদের আইনি প্রক্রিয়ায় জবাবদিহির মধ্যে নিয়ে আসতে হবে। তিনি বলেন, আইনে সুযোগ থাকলেও দেশে তার প্রয়োগ নেই। যে কারণে গ্রাহকরা কখনই টাকা ফেরত পান না। ই-কমার্সের নামে গ্রাহকের টাকা হাতিয়ে নেয়া প্রসঙ্গে ইফতেখারুজ্জামান বলেন, সরকারের পক্ষ থেকে যদি পরিবীক্ষণ, নিয়ন্ত্রণ ও জবাবদিহি নিশ্চিত করা যেতো, তাহলে আজকের দুঃখজনক পরিস্থিতি তৈরি হতো না।

আপনার মতামত দিন

প্রথম পাতা অন্যান্য খবর

পূজা উদ্‌যাপন পরিষদের প্রশ্ন

নানুয়া দীঘির পাড়ের মণ্ডপে বিদ্যুৎ বিচ্ছিন্ন হয়েছিল কেন?

২৩ অক্টোবর ২০২১

আলিশা মার্টের অফিসে ভিড়

টাকা-পণ্য কিছুই মিলছে না

২২ অক্টোবর ২০২১



প্রথম পাতা সর্বাধিক পঠিত



আলিশা মার্টের অফিসে ভিড়

টাকা-পণ্য কিছুই মিলছে না

DMCA.com Protection Status