শপআপের চমক ৯৩৫ কোটি টাকা বিনিয়োগ

আলতাফ হোসাইন

প্রথম পাতা ১৭ সেপ্টেম্বর ২০২১, শুক্রবার | সর্বশেষ আপডেট: ৫:৩২ অপরাহ্ন

সুনামগঞ্জের তাহিরপুর উপজেলার প্রত্যন্ত গ্রামের বাসিন্দা জাহাঙ্গীর আলম। বাবার টানাপড়েনের সংসারের হাল ধরতে ২০০১ সালে মাত্র ১৭ বছর বয়সে একটি মুদি দোকান করেন তিনি। তবে পুঁজি কম থাকায় এবং ক্রেতার চাহিদা অনুযায়ী দোকানে পণ্য না উঠাতে পারায় ব্যবসা তেমন চলছিল না। রাস্তাঘাট ভালো না থাকায় নৌকায় করে পণ্য আনতে হতো দূর থেকে। এতে সময়ও লাগতো বেশি। পরিবহন খরচ বেড়ে যাওয়ায় লাভ হতো কম। দেশে করোনা মহামারি শুরু হলে আরও সমস্যায় পড়েন। পড়েন আর্থিক সংকটে।
এর মধ্যে একদিন জাহাঙ্গীর জানতে পারেন ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী-উদ্যোক্তাদের আর্থিক ও পণ্য সেবা দেয়া প্রতিষ্ঠান শপআপের কথা। ৬ মাস আগে শপআপের মোকাম নামে সার্ভিসটি নেয়া শুরু করেন তিনি। এরপর আর পেছনে ফিরে তাকাতে হয়নি। দোকানে বসেই দ্রুতই পেয়ে যান চাহিদা মোতাবেক সব ধরনের পণ্য। চিন্তা করতে হয় না পুঁজির জন্যও। লাখ টাকার পণ্য নিয়ে নিশ্চিন্তে বিক্রি করে দুই তিনদিন পরও টাকা পরিশোধ করা যায়। আর এতেই বদলে গেছে জাহাঙ্গীরের জীবন। অল্পদিনেই ব্যবসা বেড়ে গেছে কয়েক গুণ। আগে যেখানে সামান্য আয়ে সংসার চালাতেই কষ্ট হতো, আর এখন এই মুদি দোকানের ব্যবসা থেকে বার্ষিক ১২ থেকে ১৫ লাখ টাকা আয়ের সম্ভাবনা দেখছেন তিনি। শুধু জাহাঙ্গীর নন, দেশের বিভিন্ন অঞ্চলের ৪৫ লাখেরও বেশি মুদি দোকানির ব্যবসা ও তাদের জীবনমানের উন্নয়ন ঘটিয়েছে শপআপ। এছাড়া দেশের ১০ লাখেরও বেশি ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোক্তার সেবা দিয়ে যাচ্ছে তারা।
বর্তমানে মোকাম, রেডএক্স ও বাকি নামে ৩টি সেবা রয়েছে শপআপের। বিটুবি (বিজনেস টু বিজনেস) ব্যবসার অ্যাপ ‘মোকাম’ এর মাধ্যমে ২৪ ঘণ্টার মধ্যে পাড়া-মহল্লার মুদি দোকানে নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্য পৌঁছে দেয় শপআপ। এজন্য বিভিন্ন পণ্য উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠান, পরিবেশক ও পাইকারদের সঙ্গে চুক্তি রয়েছে তাদের। তা ছাড়া রেডএক্স-এর মাধ্যমে ব্যবসায়ীদের পণ্য কাস্টমারদের কাছে পৌঁছে দেয়া হয়। গত বছর যাত্রা শুরু করা রেডএক্স বর্তমানে দেশের ৪৯৩ উপজেলায় সেবা দিয়ে যাচ্ছে। আর ‘বাকি’ সেবার মাধ্যমে বাকিতে পণ্য কিনতে পারেন ছোট ব্যবসায়ীরা। এ ক্ষেত্রে কিস্তিতে টাকা পরিশোধ করতে পারেন ব্যবসায়ীরা। ব্যতিক্রমী এই ব্যবসায়িক মডেলের প্রতি আকৃষ্ট হয়েই অতি সম্প্রতি নতুন করে ৬৪০ কোটি টাকার বড় অঙ্কের বিদেশি বিনিয়োগ পেয়েছে শপআপ। ১০ মাসের ব্যবধানে শপআপে এটি দ্বিতীয় বিদেশি বিনিয়োগ। এর আগে গত অক্টোবরে ১৯০ কোটি টাকার বিনিয়োগ পেয়েছিল শপআপ।
মুঠোফোনে কথা হয় তাহিরপুরের মুদি দোকানি জাহাঙ্গীর আলমের সঙ্গে। তিনি বলেন, আগে দোকানে পণ্য উঠাতে নানান ঝামেলায় পড়তে হতো। রাস্তাঘাট ভাঙা থাকায় নৌকায় করে পণ্য আনতে হতো। সেইসঙ্গে অর্থের সংকটও ছিল। এখন শপআপের মোকাম অ্যাপের মাধ্যমে মুহূর্তে সহজে দোকানে বসেই পণ্য নিতে পারছি। এতে পরিবহন খরচ কমেছে, ব্যবসায় লাভও বেশি হচ্ছে। এছাড়া কাছে যদি টাকা না থাকে তাহলে পণ্য বিক্রি করে দুই তিনদিন পর অথবা কয়েক ধাপে টাকা পরিশোধ করা যায়। শপআপ এই সুবিধা দেয়াতে আমার ব্যবসা এখন অনেক গুণ বেড়ে গেছে। আগে কাস্টমারকে প্রয়োজনীয় পণ্য না পেয়ে ফিরে যেতে হতো। আর এখন কোনো কাস্টমারকে ফিরে যেতে হয় না।
বৈশ্বিক মহামারির কারণে দেশের অর্থনীতি স্থবির হয়ে পড়েছিল, ব্যবসা-বাণিজ্যে মন্দাভাবের কারণে অনেক উদ্যোক্তাও ঝরে গেছে। বন্ধ হয়ে গেছে অনেক ব্যবসা প্রতিষ্ঠান। এমন সংকটকালেও যেন ম্যাজিক দেখিয়েছে এই প্রতিষ্ঠানটি। শপআপের দাবি, করোনার মধ্যেও গত ১২ মাসে তাদের ব্যবসা বেড়েছে ১৩ গুণ।
শপআপের দারুণ এই সফলতার বিষয়ে কথা হয় প্রতিষ্ঠানটির প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা (সিইও) আফিফ জামানের সঙ্গে। তিনি মানবজমিনকে বলেন, শপআপের ব্যবসায়িক বৃদ্ধির একটি বড় অংশই এসেছে করোনাকালীন সময়ে। যখন সারা দেশে লকডাউন চলছিল, মানুষের যাতায়াত সীমাবদ্ধ ছিল, তখন ব্যবসায়ীরা চাহিদা অনুযায়ী পণ্যের যোগান পাচ্ছিল না। ঠিক সে সময় মোকাম অ্যাপ এই সমস্যার সমাধান করে। অ্যাপের মাধ্যমে পণ্য অর্ডারের মাত্র চব্বিশ ঘণ্টার মধ্যেই পণ্য পৌঁছে যেতো ব্যবসায়ীদের দোরগোড়ায়। আর সারা দেশে সম্পন্ন হওয়া মোট ডেলিভারির অর্ধেকেরও বেশি ডেলিভারি করে রেডএক্স, যা দেশের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে।
বিদেশি বিনিয়োগকারীরা কিসের ভিত্তিতে শপআপকে অর্থ দিয়ে থাকে? আফিফ জামান বলেন, বিনিয়োগকারীরা প্রথমে শপআপের ব্যতিক্রমী ব্যবসায়িক মডেলে আকৃষ্ট হয়। শপআপের দ্রুত ব্যবসায়িক বৃদ্ধি ও দক্ষ কর্মীদের সমন্বয় বিনিয়োগকারীদের এই বিনিয়োগে আরও আস্থাশীল করে তোলে। সর্বশেষ ৬৪০ কোটি টাকাসহ সবমিলিয়ে শপআপে বিনিয়োগের পরিমাণ গিয়ে দাঁড়ালো ৯৩৫ কোটি টাকারও বেশি, যা বাংলাদেশে যেকোনো স্টার্ট-আপে সবচেয়ে বেশি বিনিয়োগ।
তিনি বলেন, শপআপ একটি বিটুবি (ই২ই) ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠান এবং এটি অবশ্যই একটি স্টার্টআপ। বাংলাদেশের ৪৫ লাখের বেশি মুদি দোকনদারদের ব্যবসায়িক পরিবর্তনের মাধ্যমে তাদের ব্যবসা ও জীবনমানের উন্নয়ন ঘটাচ্ছে শপআপ। প্রচলিত অর্থে এটা কোনো ই-কমার্স প্রতিষ্ঠান নয়। ই-কমার্সগুলো শুধু পণ্য বিক্রি করে থাকে। কিন্তু, আমরা ক্ষুদ্র এবং মাঝারি ব্যবসা সংক্রান্ত উদ্যোক্তাদের সব ধরনের সেবা প্রদান করি। এ পর্যন্ত আমরা ১০ লাখেরও বেশি উদ্যোক্তর সেবা দিয়েছি। মোকাম, রেডএক্স ও বাকি নামে ৩টি সেবা রয়েছে। বিটুবি ব্যবসার অ্যাপ মোকামের মাধ্যমে ২৪ ঘণ্টার মধ্যে পাড়ার মুদি দোকানে নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্য পৌঁছে দেয় শপআপ। আর রেডএক্সের মাধ্যমে ব্যবসায়ীদের পণ্য কাস্টমারদের কাছে পৌঁছে দেয়া হয়। আর ‘বাকি’ সেবার মাধ্যমে বাকিতে পণ্য কিনতে পারেন ছোট ব্যবসায়ীরা।
শপআপের যাত্রা কীভাবে? আফিফ জামান বলেন, বিশ্ববিদ্যালয়ে আমার কাছের বন্ধু ছিল সিফাত সারওয়ার। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ব্যবসায় প্রশাসন ইনস্টিটিউট (আইবিএ) থেকে বিবিএ শেষ করে সিফাত সারওয়ার যোগ দেয় স্ট্যান্ডার্ড চার্টার্ড ব্যাংকে। আর আমি নিজের একটি ব্যবসা চালু করি। তখন পরিচয় হয় আতাউর রহিম চৌধুরীর সঙ্গে। আতাউর রহিম ইস্ট ওয়েস্ট ইউনিভার্সিটির কম্পিউটার বিজ্ঞান এবং প্রকৌশল বিভাগ থেকে পাস করেছিলেন। ২০১৮ সালে পটুয়াখালীর দাদাবাড়িতে বেড়াতে গিয়ে দেখলাম, গ্রামের কারুশিল্পীরা প্রাচীন ঐতিহ্যবাহী মাটির তৈজস তৈরি করছেন, কিন্তু তারা ন্যায্য দাম পান না। তখন ওইসব কারুশিল্পীকে সহায়তা দেয়ার উদ্দেশ্য থেকেই আমরা একটি অনলাইন প্ল্যাটফরম তৈরির চেষ্টা করি। সেখান থেকেই শুরু শপআপের যাত্রা। শপআপের সিইও হিসেবে আমি, আর চিফ প্রোডাক্ট অফিসার হিসেবে আতাউর রহিম এবং চিফ ফাইন্যান্স অফিসার হিসেবে আরেকজন উদ্যোক্তা শাহিন সিয়াম আমাদের সঙ্গে ছিলেন। এভাবেই শপআপের যাত্রা শুরু।

আপনার মতামত দিন

প্রথম পাতা অন্যান্য খবর

পূজা উদ্‌যাপন পরিষদের প্রশ্ন

নানুয়া দীঘির পাড়ের মণ্ডপে বিদ্যুৎ বিচ্ছিন্ন হয়েছিল কেন?

২৩ অক্টোবর ২০২১

আলিশা মার্টের অফিসে ভিড়

টাকা-পণ্য কিছুই মিলছে না

২২ অক্টোবর ২০২১



প্রথম পাতা সর্বাধিক পঠিত



আলিশা মার্টের অফিসে ভিড়

টাকা-পণ্য কিছুই মিলছে না

আওয়ামী লীগের শান্তি সমাবেশ

এসব ২০০১ সালের ঘটনার পুনরাবৃত্তি

DMCA.com Protection Status