নির্বাচন ও মানবাধিকারে গুরুত্ব বৃটেনের

কূটনৈতিক রিপোর্টার

এক্সক্লুসিভ ১২ সেপ্টেম্বর ২০২১, রোববার | সর্বশেষ আপডেট: ১১:২২ পূর্বাহ্ন

বাংলাদেশের মানবাধিকার পরিস্থিতি নিয়ে উদ্বেগ পুনর্ব্যক্ত করে দেশে একটি অবাধ, সুষ্ঠু এবং নিরপেক্ষ নির্বাচন দেখতে চেয়েছে বৃটেন। লন্ডনে পররাষ্ট্র সচিব পর্যায়ের বৈঠকে রাজনীতি, নির্বাচন, শাসনক্ষমতা, উন্নয়ন, নিরাপত্তাসহ দুই দেশের কৌশলগত সম্পর্কের বিভিন্ন বিষয় নিয়ে বিস্তৃত আলোচনা হয়েছে বৃহস্পতিবার। শুক্রবার পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় এবং ঢাকাস্থ বৃটিশ হাইকমিশন এ নিয়ে পৃথক সংবাদ বিজ্ঞপ্তি প্রচার করেছে। দুপুরে ইংরেজি ভাষায় প্রচারিত ঢাকার সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে ‘রাজনৈতিক বিষয়াবলী’ ছিল অনুপস্থিত। তবে রাতে বৃটিশ হাইকমিশনের তরফে বাংলায় প্রচারিত দীর্ঘ সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়Ñ বৈঠকে বৃটিশ ফরেন অ্যান্ড কমনওয়েলথ অফিস প্রচারিত বার্ষিক মানবাধিকার প্রতিবেদনে উঠে আসা বাংলাদেশের মানবাধিকার সম্পর্কিত কিছু বিষয় (যেমন: ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনের প্রভাব, বিধিবহির্ভূত আটক, বিধিবহির্ভূত বিচার প্রক্রিয়া, এবং বিচারবহির্ভূত হত্যাকা-) নিয়ে বৃটেন উদ্বেগ প্রকাশ করেছে। উভয় দেশই অবাধ, সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ নির্বাচনের গুরুত্ব, জবাবদিহিমূলক শাসন ব্যবস্থার উন্নয়নে সুশীল সমাজের উপস্থিতি এবং মতপ্রকাশ ও ধর্মীয় স্বাধীনতার বিষয়ে একমত হয়েছে। সংলাপে সংঘাত প্রতিরোধ, সন্ত্রাসবাদ মোকাবিলা, নিয়মভিত্তিক আন্তর্জাতিক শৃঙ্খলা সমর্থনসহ বৈশ্বিক চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় একে অপরকে সহযোগিতা করতে সম্মত হয়েছে বলেও উল্লেখ করা হয়। দ্বিপক্ষীয় বিষয়াদি নিয়ে বাৎসরিক আলোচনার সর্বোচ্চ ফোরামে বাংলাদেশ-বৃটেন স্ট্র্যাটেজিক ডায়ালগ শেষে যৌথ বিবৃতি প্রচার করা হয়।
অতীতের ৩টি ডায়ালগে তা-ই হয়েছে। কিন্তু এবারে অনুষ্ঠিত চতুর্থ সংলাপটি ছিল ব্যতিক্রম। কিন্তু কেন যৌথ বিবৃতি এলো না বা বাংলাদেশ ও বৃটেনের মধ্যকার বিজ্ঞপ্তিতে বিস্তর এই ফারাকÑ জানার চেষ্টা করা হয়। দায়িত্বশীল কেউ এ নিয়ে মুখ খুলতে রাজি হননি। লন্ডন সফররত বাংলাদেশ প্রতিনিধি দলের এক সদস্য অবশ্য নাম প্রকাশ না করার শর্তে মানবজমিনকে বলেন, সময়ের অভাব ছিল বলে যৌথ বিবৃতিটি তৈরি করা যায়নি। বৈঠকটি খুবই আন্তরিক পরিবেশে হয়েছে উল্লেখ করে তিনি এ-ও বলেন, আলোচনায় নির্বাচন এবং দেশের মানবাধিকার পরিস্থিতি নিয়ে বৃটেনের যে ভাষ্য ছিল তার বিপরীতে বাংলাদেশের বক্তব্য ছিল। সবকিছু লেখা সম্ভব নয় বলে ঢাকার সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে তা এড়িয়ে যাওয়া হয়েছে বলে দাবি করেন ওই কর্মকর্তা।
বৃটেনের সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে যা আছেÑ
ঢাকাস্থ বৃটিশ হাইকমিশন জানিয়েছেÑ লন্ডন বৈঠকে বাংলাদেশের সঙ্গে রাজনৈতিক ও কূটনৈতিক সম্পর্ক, বৈশ্বিক ও আঞ্চলিক ইস্যু, বাণিজ্য, অর্থনৈতিক ও উন্নয়ন অংশীদারিত্ব, নিরাপত্তা ও প্রতিরক্ষাসহ দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কের বিভিন্ন দিক নিয়ে কার্যকর মতবিনিময় হয়েছে বৃটেনের। বাংলাদেশ ও বৃটেন উভয়ে ২০১৯ সালের পর প্রথমবারের মতো সশরীরে সাক্ষাতের সুযোগকে স্বাগত জানিয়ে সংলাপ শুরু হয়। বলা হয়, বাংলাদেশের স্বাধীনতার ৫০ বছর পূর্তির বছরে অনুষ্ঠিত এবারের কৌশলগত সংলাপ বৃটেন-বাংলাদেশ কূটনৈতিক সম্পর্ককে আরও দৃঢ় করেছে। উভয় দেশের প্রতিনিধিরা যুক্তরাজ্য ও বাংলাদেশের মধ্যে গভীর সামাজিক, সাংস্কৃতিক এবং প্রবাসী সংযোগ ও কমনওয়েলথের সদস্যপদের কারণে মানুষের সঙ্গে মানুষের সুদৃঢ় সম্পর্কের উপর গুরুত্ব আরোপ করেন। সংলাপে বৃটিশ প্রতিনিধিদলের নেতৃত্বে ছিলেনÑ দেশটির ফরেন কমনওয়েলথ অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট অফিসের পার্মানেন্ট আন্ডার সেক্রেটারি স্যার ফিলিপ বার্টন কেসিএমজি ওবিই ও বাংলাদেশ প্রতিনিধি দলের নেতৃত্ব দেন পররাষ্ট্র সচিব (সিনিয়র সেক্রেটারি) অ্যাম্বাসেডর মাসুদ বিন মোমেন। বৃটেন ও বাংলাদেশে কোভিড-১৯ অতিমারি চলাকালীন যারা প্রিয়জনকে হারিয়েছেন, তাদের প্রতি গভীর সমবেদনা প্রকাশ করেন এই সংলাপে অংশগ্রহণকারী সদস্যরা। দেশব্যাপী কোভিড-১৯ টিকাদান কর্মসূচি পরিচালনার জন্য বৃটেন বাংলাদেশকে অভিনন্দন জানায়। সংলাপে দ্বিপক্ষীয় সামরিক সহযোগিতার বিষয়ে উভয় দেশই প্রশিক্ষণ, পেশাগত সামরিক শিক্ষা ও ইন্সট্রাকশনাল এক্সচেঞ্জ সহ যৌথ সহযোগিতাকে স্বাগত জানায় এবং এই বছরের শেষের দিকে একটি প্রতিরক্ষা বিষয়ক সংলাপ উদ্বোধনের আশা ব্যক্ত করেন। জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবিলায় বৃটেন ও বাংলাদেশ বিশ্বের সকল দেশকে আরও দৃঢ় পদক্ষেপ নেয়ার প্রয়োজনীয়তার কথা পুনর্ব্যক্ত করেছে। একই সঙ্গে ২০২০ সালের জানুয়ারিতে উদ্বোধন হওয়া ইউকে-বাংলাদেশ ক্লাইমেট পার্টনারশিপের জন্য উভয় দেশই কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করে। ২০২৬ সালের মধ্যে স্বল্পোন্নত দেশের (এলডিসি) তালিকা থেকে বের হয়ে উন্নয়নশীল দেশ হওয়ার জন্য জাতিসংঘের সুপারিশ লাভ করায় বাংলাদেশকে অভিনন্দন জানায় বৃটেন। এই উত্তরণকে সফল করতে সাহায্য করতে ও বাংলাদেশ যেন তাদের রপ্তানিভিত্তিক প্রবৃদ্ধি বজায় রাখতে পারে, তাই বৃটেন ২০২৯ সাল পর্যন্ত তাদের দেশের বাজারে বাংলাদেশের জন্য শুল্ক ও কোটামুক্ত প্রবেশাধিকার অব্যাহত রাখার প্রতিশ্রুতি পুনর্ব্যক্ত করে। বাংলাদেশের দ্বিতীয় বৃহত্তম ক্রমবর্ধমান বিনিয়োগকারী হিসেবে বৃটেন ২০২১ সালের ফেব্রুয়ারিতে ইউকে-বাংলাদেশ ট্র্যাড অ্যান্ড ইনভেস্টমেন্ট ডায়ালগের উদ্বোধনকে স্বাগত জানায়। বাংলাদেশে ব্যবসার পরিবেশের উন্নতির গুরুত্ব এবং বাজার প্রবেশাধিকার বাধা হ্রাস করার ওপর বৃটেন জোর দেয়। চলাচল ও অভিবাসন বিষয়ক একটি পার্টনারশিপ গঠনে যুক্ত হতে উভয় দেশ সম্মত হয়। বৃটেন তাদের নতুন পয়েন্টভিত্তিক অভিবাসন ব্যবস্থায় প্রদত্ত সুযোগগুলোর কথা উল্লেখ করে। দুই দেশের মধ্যে উচ্চশিক্ষা বিষয়ক অংশীদারিত্ব বৃদ্ধি করতে বৃটেন বাংলাদেশকে ‘ক্রস বর্ডার উচ্চশিক্ষা আইন’ বাস্তবায়নের অনুরোধ জানায়। রাখাইনে মিয়ানমার সেনাবাহিনীর সহিংসতার শিকার হয়ে পালিয়ে আসা রোহিঙ্গা শরণার্থীদের আশ্রয় প্রদানের জন্য বৃটেন বাংলাদেশের প্রতি কৃতজ্ঞতা জ্ঞাপন করে। রোহিঙ্গাদের স্বেচ্ছায়, নিরাপদে, মর্যাদার সঙ্গে প্রত্যাবাসনের লক্ষ্য নিয়ে বৃটেন ও বাংলাদেশ নিজ নিজ প্রতিশ্রুতি পুনর্ব্যক্ত করে। রোহিঙ্গাদের কল্যাণের দিকে মনোনিবেশ করার প্রয়োজনীয়তার ওপর জোর দেয় বৃটেন এবং উল্লেখ করে যে, শিক্ষা ও জীবিকার সুযোগ রোহিঙ্গাদের মিয়ানমারে প্রত্যাবর্তনের জন্য প্রস্তুত করবে ও বাংলাদেশে থাকাকালীন মর্যাদাপূর্ণ জীবনযাপনে সাহায্য করবে। রোহিঙ্গা সংকট সমাধানে উভয় দেশ আসিয়ান ও জাতিসংঘ সহ আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের সঙ্গে কাজ করার অঙ্গীকার ব্যক্ত করে। টেকসই উন্নয়ন অভীষ্ট অর্জনের লক্ষ্যে উভয় দেশ দীর্ঘমেয়াদি প্রতিশ্রুতি পুনর্ব্যক্ত করে এবং ২০৩০ সালের মধ্যে বাংলাদেশ টেকসই উন্নয়ন অভীষ্ট অর্জনের উপায় নিয়ে আলোচনা করে। বৃটেন কারিগরি সহায়তা প্রদান ও প্রোগ্রামের মাধ্যমে কীভাবে বাংলাদেশের অর্থনৈতিক সমৃদ্ধি, প্রাথমিক ও মাধ্যমিক শিক্ষা কার্যক্রমের প্রভাব উন্নত, জনস্বাস্থ্য পরিষেবাগুলোকে আরও মজবুত এবং জলবায়ু পরিবর্তন সংকট মোকাবিলায় সাহায্য করতে পারে তা তুলে ধরে। পরিশেষে, উভয় দেশ এই সংলাপের মাধ্যমে গঠনমূলক আলোচনাকে স্বাগত জানায়। পরবর্তী কৌশলগত সংলাপ (পঞ্চম) ২০২২ সালে ঢাকায় অনুষ্ঠিত হওয়ার আশা ব্যক্ত করার মধ্য দিয়ে চতুর্থ সংলাপ শেষ হয়।
ঢাকার বিজ্ঞপ্তিতে যা বলা হয়েছে-
ওদিকে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়, লন্ডন সংলাপে দক্ষিণ এশিয়ার স্থিতিশীলতায় বাংলাদেশকে গুরুত্বপূর্ণ বলে উল্লেখ করেছে বৃটেন। বিশেষ করে ভারত-প্রশান্ত মহাসাগরকে বিবেচনায় নিয়ে বৃটেনের সমন্বিত পররাষ্ট্র, বাণিজ্য, উন্নয়ন ও নিরাপত্তা নীতিমালা পর্যালোচনার প্রেক্ষাপটে বাংলাদেশের গুরুত্ব অনস্বীকার্য। আফগানিস্তানের চলমান পরিস্থিতি নিয়ে দুই দেশ একে অপরের অবস্থান নিয়ে কথা বলেছে। আলোচনায় বাংলাদেশ প্রতিনিধিদলের নেতা পররাষ্ট্র সচিব মাসুদ বিন মোমেন বলেন, বাংলাদেশের সুবর্ণ জয়ন্তী ও ব্রেক্সিট পরবর্তী পরিস্থিতি আমাদের দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ককে নতুন মাত্রা যোগ করার সুযোগ এনে দিয়েছে। বিশেষ করে গুরুত্বপূর্ণ আন্তর্জাতিক অংশীদারদের সঙ্গে গভীরতর কৌশলগত যুক্ততার লক্ষ্যে পররাষ্ট্র নীতিতে অগ্রাধিকারের প্রেক্ষাপটে বর্তমানে সুযোগ তৈরি হয়েছে। বৃটেনের পার্মানেন্ট আন্ডার সেক্রেটারি ফিলিপ বার্টন ব্যাপকতর দ্বিপক্ষীয়, আঞ্চলিক আন্তর্জাতিক ইস্যুতে গণতান্ত্রিক দুই দেশের এক সঙ্গে কাজ করার বিষয়ে গুরুত্ব আরোপ করেন। বাংলাদেশের করোনা পরিস্থিতির উন্নতির পাশাপাশি গণটিকাদানের সংখ্যা বাড়ার উল্লেখ করে মাসুদ বিন মোমেন অগ্রাধিকার ভিত্তিতে বাংলাদেশের নাগরিকদের যুক্তরাজ্য ভ্রমণের ওপর নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহারের অনুরোধ জানান। দুই দেশ সন্ত্রাসবাদ দমন, মানবাধিকার সুরক্ষা, বেসামরিক বিমান চলাচল এবং সামুদ্রিক ও অন্তর্জাল নিরাপত্তায় সহযোগিতার অঙ্গীকার পুনর্ব্যক্ত করেছে।




আপনার মতামত দিন

এক্সক্লুসিভ অন্যান্য খবর

দুদক কর্মকর্তার অনৈতিক সুবিধা দাবি, ব্যাখ্যা দিতে হাইকোর্টে তলব

২৬ অক্টোবর ২০২১

দুদক তদন্ত কর্মকর্তা তদন্ত করতে গিয়ে অনৈতিক সুবিধা দাবি করার বিষয়ে ব্যাখ্যা দিতে দুদকের তদন্ত ...

ব্যারিস্টার সালামের গ্রামের বাড়িতে নেতাকর্মীদের ঢল

পুলিশের ব্যারিকেড ভেঙে দক্ষিণ সুরমায় ছাত্রদলের সমাবেশ

২২ অক্টোবর ২০২১



এক্সক্লুসিভ সর্বাধিক পঠিত



ব্যারিস্টার সালামের গ্রামের বাড়িতে নেতাকর্মীদের ঢল

পুলিশের ব্যারিকেড ভেঙে দক্ষিণ সুরমায় ছাত্রদলের সমাবেশ

DMCA.com Protection Status