সরকার গঠনে বিলম্ব, তালেবান-পাকিস্তান ঘনিষ্টতা, ভারতের দুশ্চিন্তা

ড. মাহফুজ পারভেজ

মত-মতান্তর ৫ সেপ্টেম্বর ২০২১, রোববার

আফগান পরিস্থিতিতে অচলাবস্থা ও উত্তেজনা বাড়ছে। কয়েক দফা ঘোষণা দিয়েও সরকার গঠন করতে পারছেনা সদ্য ক্ষমতাসীন তালেবান গোষ্ঠী। এদিকে প্রাথমিক পর্যায়ে আন্দোলনের মাঠে দেখা যাচ্ছ আফগান নারীদের। হেরাতের পর কাবুলেও হয়েছে বিক্ষোভ। আহমাদ শাহ মাসুদের নর্দার্ন অ্যালায়েন্স পানশির উপত্যকায় সশস্ত্র প্রতিরোধ গড়ছে, যার পেছনে আছে বিদায়ী আফগান সরকারের ভাইস প্রেসিডেন্ট সালেহ। আর তালেবান-পাকিস্তান ঘনিষ্টতায় দুশ্চিন্তা বাড়ছে ভারতের।

'আমেরিকান সৈন্য পূর্ণ প্রত্যাহার হলেই সরকার গঠন করবে তালেবানরা', এমন ঘোষণার পটভূমিতে ৩০ আগস্ট শেষ মার্কিন সৈন্য আফগান মাটি ছাড়লে শুক্রবার (৩ আগস্ট) জুমার নামাজের পর সরকার গঠনের ঘোষণা দিয়েছিল তালেবানরা। কিন্তু শুক্র এবং পরের দিন শনিবারও (৪ আগস্ট) তালেবানদের সরকার গঠিত হয় নি। বরং পানশিরে যুদ্ধ আর নারীদের আন্দোলনে উতপ্ত হচ্ছে পরিস্থিতি।
তালেবানরা মহিলাদের 'ওয়ার্ক ফ্রম হোম'-এর সুযোগ দিলেও আতঙ্ক কাটেনি। ভয়ে দেশ ছাড়তে চাইছেন আফগানিস্তানের প্রায় ২৫০ মহিলা বিচারক।

দেশের ভেতরের মতো আন্তর্জাতিক ও আঞ্চলিক ক্ষেত্রেও তালেবান নিয়ন্ত্রিত আফগান পরিস্থিতির নানা মাত্রা উন্মোচিত হচ্ছে। আফগানিস্তানে তালেবান গোষ্ঠীর উত্থানে দক্ষিণ এশিয়ার আঞ্চলিক ক্ষমতা বিন্যাসে ভারত যথেষ্ট বেকায়দায় পড়েছে আর পাকিস্তান চলে এসেছে সুবিধাজনক অবস্থানে। তালেবান-পাকিস্তানের মধ্যকার ঘনিষ্টতা ক্রমশ বাড়তে থাকায় ভারতের দুশ্চিন্তা বাড়ছে। কারণ, আগে থেকেই তালেবান-চীন নৈকট্যের বিষয়টি ভারতের চিন্তা বাড়িয়ে রেখেছে।

ক্ষমতাচ্যুত আশরাফ গণির সরকার ছিল অপেক্ষাকৃত ভারত-ঘেঁষা এবং আফগানিস্তানে রয়েছে ভারতে বিশাল বিনিয়োগ এবং অসংখ্য চলমান প্রজেক্ট। ভারত গত দুই দশকে চার শতাধিক সামাজিক-অর্থনৈতিক এবং বড় বড় অবকাঠামো প্রকল্পে ৩০০ কোটি ডলারেও বেশি বিনিয়োগ করেছে। শিক্ষা, স্বাস্থ্য, ক্রীড়া, সাংস্কৃতিক উন্নয়নে ডজন ডজন প্রকল্প ছাড়াও, দিলারাম-জারাঞ্জ মহাসড়ক নামে ২১৮ কিমি দীর্ঘ গুরুত্বপূর্ণ একটি সড়ক তৈরি করে দিয়েছে ভারত। কাবুলে নতুন আফগান পার্লামেন্ট ভবনটিও তৈরি করেছে তারা।

ভারতের এইসব অর্থনৈতিক স্বার্থ ছাড়াও নিরাপত্তা এবং ভূ-রাজনৈতিক স্বার্থের জন্য আফগানিস্তানের গুরুত্ব অপরিসীম। ফলে কাবুলের ক্ষমতায় পালাবদলে ভারত শুধু জটিল সঙ্কটেই নিপতিত হয়নি, আন্তর্জাতিক ও আঞ্চলিক পরিসরে যথেষ্ট কোণঠাসাও হয়ে পড়ছে। ফলে অনেক দেশ আফগানিস্তানের ভবিষ্যৎ নিয়ে উদ্বিগ্ন হলেও অন্য যে কোনও দেশের চেয়ে আফগানিস্তানে সবচেয়ে বেশি স্বার্থ এখন ভারতের। 'তালেবান ক্ষমতায় আসায় ভারতের ক্ষতি হবে সবচেয়ে বেশি', মর্মে বিশেষজ্ঞরাও মত দিয়েছেন।

ভারতের চলমান শত শত প্রকল্প নিয়ে যেমন অনিশ্চয়তা দেখা দিয়েছে, তেমনই এসব বিনিয়োগের উদ্দেশ্য ও ভবিষ্যৎ নিয়েও হতাশা তৈরি হয়েছে। 'এগুলো কি পানিতে যাবে?' ভারতের নীতি-নির্ধারকরা এখন সে চিন্তায় অস্থির।

তবে শুধু ৩০০ কোটি ডলার বিনিয়োগের বিষয়ই নয়, বরং আরও অনেক কারণে ভারতের জন্য আফগানিস্তানের গুরুত্ব রয়েছে। মধ্য এশিয়ার বাজারে ঢোকার জন্য ভারতের জন্য আফগানিস্তান খুবই জরুরি। এর সঙ্গে রয়েছে অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তা বিষয়ক উদ্বেগ। কারণ, কাশ্মীর নিয়ে পাকিস্তানের সঙ্গে এবং লাদাখ নিয়ে চীনের সঙ্গে ভারতের বিপজ্জনক দ্বন্দ্ব রয়েছে। এখন আফগানিস্তান শত্রু রাষ্ট্রে পরিণত হলে এবং চীন ও পাকিস্তান কাবুলে ক্ষমতাসীন তালেবানদের ঘনিষ্টতর হলে ভারতের জন্য দুশ্চিন্তা বাড়াবে।

এজন্য, ভারত বিভিন্ন ফোরামে একাধিক বার 'তালবানের উত্থানে পাকিস্তানের প্রত্যক্ষ মদত রয়েছে' বলে অভিযোগ করেছে। ভারতীয় মিডিয়া, বিশেষজ্ঞ ও গোয়েন্দা সূত্রগুলো তালেবান-পাকিস্তান মৈত্রীর নানা দৃষ্টান্ত সামনে এনেছে। এমনকি, আন্তর্জাতিক ও আঞ্চলিক মিডিয়ায় বিশেষভাবে প্রকাশ না হলেও আফগানিস্তানের রাজধানী কাবুলে পাকিস্তানের গুপ্তচর সংস্থা আইএসআই-এর প্রধান জেনারেল ফায়েজ হামিদদের সফরের বিষয়টি গুরুত্ব দিয়ে প্রচার করছে।

পাকিস্তান বা তালেবান সূত্রে বিস্তারিত জানানো না হলেও দায়িত্বশীল ভারতীয় সূত্রগুলো মিডিয়ার কাছে জানিয়েছে যে, শনিবার (৪ আগস্ট) জেনারল হামিদ কাবুলে পৌঁছন। সেখানে কেন তিনি গিয়েছেন তা খোলসা না করলেও সূত্রের খবর, বরাদররা ক্ষমতায় বসার আগে তালেবানের সঙ্গে জরুরি বৈঠক করতেই কাবুলে গিয়েছেন আইএসআই চিফ।

ভারতের প্রচারণার মুখে পাকিস্তান ধারাবাহিক ভাবে তালেবানকে অস্ত্র ও অর্থ সাহায্যের কথা অস্বীকার করে এসেছে। তবে, ভারতের মতোই ওয়াশিংটনও মাঝেমধ্যেই তালেবানদের প্রতি পাকিস্তানের সরকারের মদতের অভিযোগে সরব হয়। কিন্তু পাকিস্তানের ইমরান খানের প্রশাসন সরাসরি তা অস্বীকার করে।


এসব অভিযোগ ও পাল্টা অভিযোগের পটভূমিতে বলার অপেক্ষা রাখেনা যে, তালেবান নিয়ন্ত্রিত কাবুলের ঘটনাপ্রবাহ আন্তর্জাতিক ও আঞ্চলিক অঙ্গনে যথেষ্ট প্রভাব ফেলছে এবং ক্ষমতার নতুন বিন্যাস তৈরি করছে। যে মেরুকরণে চীন ও পাকিস্তান অপেক্ষাকৃত সুবিধাজনক অবস্থানে থাকলেও চাপ আর দুশ্চিন্তা বাড়ছে ভারতের।

ড. মাহফুজ পারভেজ, প্রফেসর, রাজনীতি বিজ্ঞান, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়।

পাঠকের মতামত

**মন্তব্য সমূহ পাঠকের একান্ত ব্যক্তিগত। এর জন্য সম্পাদক দায়ী নন।

মো: আব্দুল খালেক

২০২১-০৯-০৬ ২০:১০:১২

ভারতকে আফগানিস্তানে প্রবেশ না করতে দেয়াই উত্তম। কারন ভারত মুসলিম বিরোধী দেশ। আফগান সমস্যায় প্রতিবেশী কোন দেশ সুযোগ নিযে প্রবেশ করার করেনি। আর ভারত সুযোগ পাওয়া মাত্রই আমেরিকার সাতে প্রবেশ করেছে (কিন্তু বৈশ্বিক ভাবে পারে না কারন তাদের সে ক্ষমতা নাই, যদি থাকতো তাহলে মুসলিম নিধন আরও হাজার গুন বেড়ে যেত) । কারন তাদের লক্ষ্য উন্নয়ন লোক দেখানো কিন্তু তাদের মূল লক্ষ্য হলো ‍বিপথগামী মুসলমান (মুসলিম হয়ে যে দল মুসলমানদের ক্ষতি করাতে বদ্ধপরিকর, এবং সয়তানি অমুসলিমদের ক্ষমতায়ন করতে চায়, অর্থাৎ ইসলাম কে নিশ্চিহ্ন করা) দলকে শক্তিশালী করা, যাতে করে ইসলাম বা মূল ধারার মুসলমানদেরকে ধ্বংস করা যায়।

জামশেদ পাটোয়ারী

২০২১-০৯-০৬ ১৩:২৬:৪৯

আফগানিস্তানে আমেরিকার মত পরাশক্তির সাথে দীর্ঘমেয়াদী যুদ্ধে যাবার মত তালেবান ছাড়া আর কোন একক শক্তি ছিলনা। আমেরিক আগফগানিস্তানে ২ ট্রিলিয়ন ডলার খরচ করলেও তা কোথায় খরচ করেছে তা বলাই বাহুল্য তারা তালেবানদের উপর যেসব বোমা ফেলেছে তাতেই বেশীরভাগ ডলার খরচ করেছে। আমেরিকার ডলার যে আফগানিস্তানের উন্নয়নে খরচ হয়নি তা আফগানিস্তানের সেনাবাহিনীর দিকে তাকালেই পরিস্কার হয়ে যায়। আমেরিকা বিশ বছরে আফগানিস্তানে সাড়ে তিন লাখ সদস্যের সেনাবাহিনী গঠন করে দিয়েছে যারা তালেবানের সামনে দাড়াতেই পারেনি। ভারত এত বড় বিনিয়োগ করে বোকামী করেছে, তারা বিনিয়োগের আগে আমেরিকা যে আফগানিস্তানে স্থায়ী কোন সমাধান নয় তা বিবেচনায় নেয়নি, আশরাফ ঘানির সরকার যে কতটা নড়বড়ে তা ভারত অনুধাবন করতে পারেনি। ভারতে যেমন তালেবানকে রুখতে গিয়ে আমেরিকার মদদে আশরাফ ঘানির সরকারকে সহযোগীতা করেছে, ঠিক একই ভাবে পাকিস্তান আমেরিকা এবং ভারতকে আফগানিস্তান থেকে বিতারিত করতে তালেবানকে সমর্থন করেছে। তালেবান আমেরিকাসহ দখলদার এবং ভারতের কাছে সন্ত্রাসী হলেও তালেবান নিজেদের দেশকে দখলদা মুক্ত করার লক্ষ্যে যুদ্ধেরত যোদ্ধা। এখানে ভারত হেরে গেছে পাকিস্তান জিতে গেছে। স্বাভাবিকভাবেই যারা হেরে যায় তাদের লোকসান বেশী হয়। আমেরিকা যেখানে ২ ট্রিলিয়ন ডলার লোকসান দিয়েছে সেখানে ভারত মাত্র তিনশত কোটি ডলার লোকসান দিয়েছে।

আপনার মতামত দিন

মত-মতান্তর অন্যান্য খবর

মুরগিকে মনে হয় যেনো গরু

২২ অক্টোবর ২০২১

অশনি সঙ্কেত!

১৮ অক্টোবর ২০২১

থার্ড পয়েন্ট

সাকিবদের ‘টেস্ট’ ব্যাটিংয়ের ব্যাখ্যা কী?

১৮ অক্টোবর ২০২১

শনাক্তের হার ২.৩৪

করোনায় আরও ১৭ জনের মৃত্যু

১৩ অক্টোবর ২০২১



মত-মতান্তর সর্বাধিক পঠিত



দেখা থেকে তাৎক্ষণিক লেখা

কোটিপতিদের শহরে তুমি থাকবা কেন?

কাওরান বাজারের চিঠি

ছবিটির দিকে তাকানো যায় না

DMCA.com Protection Status