বাজবে স্কুলের ঘণ্টা, ওদের ফেরাবে কে?

পিয়াস সরকার

মত-মতান্তর ৪ সেপ্টেম্বর ২০২১, শনিবার | সর্বশেষ আপডেট: ১০:৩৫ পূর্বাহ্ন

উত্তরের জেলা গাইবান্ধার বালাসীঘাট এলাকা বন্যায় যবুথবু। প্রতিবছর বন্যা আসাটা যেন নিয়ম হয়ে দাঁড়িয়েছে। সেবার সংবাদ সংগ্রহ করতে গিয়ে কষ্ট দেখে মনের অজান্তেই চোখে পানি চলে এসেছিল।

চারদিকে পানি। আসাদের বাড়িও বাদ যায়নি। কোমার পানিতে ডুবে যায় সব। অর্ধ বস্তা চাল ছিল। হঠাৎ বাঁধ ভাঙা পানির স্রোতে তলিয়ে নিয়ে গেছে বস্তাটাও। আসাদ ও তার পরিবার স্বল্প কিছু নিয়ে ডাঙায় এসেছিল।
আসাদ হাতে করে নিয়ে এসেছিল ক'টা বই। পেট চালাতে আসাদের নাম লেখাতে হয়ে শ্রমিকের খাতায়। ঘটনাটা ২০২০ সালের। আসাদকে নিয়ে সংবাদ হয়েছিল মানবজমিনে। ছোট্ট আসাদ গেলো বছর ষষ্ঠ শ্রেণির শিক্ষার্থী ছিলো।

অষ্টম শ্রেণির শিক্ষার্থী আদনান আহমেদ। স্কুল বন্ধ থাকায় সবজির দোকান চালায় রংপুরের মিঠাপুকুর উপজেলায় ভে-াবাড়ী বাজারে। করোনায় চাকরি হারানো বাবার আয়ের হাতিয়ার সে। স্কুলে ফিরবে কিনা? এই প্রশ্নের জবার তার বাবা পাশ থেকে বলেছিল, ভাত জোটে না স্কুল।

একই এলাকার মো. জীবন জমা দেয়নি একটা অ্যাসাইনমেন্টও। ভাত জোটাতে ব্যস্ত জীবনের স্কুলের ফেরার তাগাদাটা একদমই নেই।

রংপুরের মিঠাপুকুর উপজেলার শঠিবাড়ীর দশম শ্রেণি পড়ুয়া পারুলের বিয়ে হয়েছে আট মাস হলো। বিয়ে হয়েছে তার বেশ কজন বান্ধুবীরও।

আরও উত্তরের জেলা নীলফামারীর সীমান্তবর্তী ডোমার উপজেলার চিলাহাটির মেয়ে মনি। অভাবকে টেক্কা দিয়ে পাঁচ কিলোমিটার সাইকেল চালিয়ে স্কুলে যেতো সে। বাবা মায়ের সঙ্গে লড়াইটা জয় করে লেখা পড়াটা চালিয়ে গেলেও পারলো না করোনার সঙ্গে। একাদশে পড়ুয়া মনিকেও বসতে হলো বিয়ের পীড়িতে। এবারের ঈদে বিয়ে হয় তার।
তার স্বামী ট্রাক চালক। বিয়েতে স্বাক্ষরটাও করতে পারেননি তিনি। দিয়েছেন আঙ্গুলে ছাপ। বয়সটাও মনির থেকে ঢের বেশি। বিয়েতে হই হুল্লোড় করেছে সবাই। করবেই বা না কেন- মনির স্বামী বিয়েতে খরচের জন্য তার বাবার হাতে দিয়েছে নগদ ৫০ হাজার টাকা। সবাই খুশি। শুধু মনি বিয়েটা করেছে গোমড়া মুখে।

খুলছে স্কুল-কলেজ। কোটি শিক্ষার্থীর মুখে চওড়া হাসি। মুদ্রার উল্টা পিঠে অসংখ্য মনিরা আর ফিরবে না স্কুল-কলেজে। তাদের ফেরার রাস্তাটা কাঁটায় ভরে গেছে। স্কুলের ঘণ্টা বাজবে দূর থেকে হয়ত কানে আসবে শব্দটা। কিন্তু ক্লাসে বসাটা হয়তো হবে না। হবে না সবার সঙ্গে গলা মিলিয়ে ‘আমার সোনার বাংলা, আমি তোমায় ভালোবাসি’ গাওয়া। যত্নে রাখা স্কুলের পোশাকটা শরীরে শোভা ঠিকই পাবে কিন্তু স্কুলে নয়।

মনির বন্ধুটা যখন বই খাতা নিয়ে বসবে, আর প্রস্তুতি নেবে পরীক্ষার। মনি তখন রাতের রান্নার জোগাড় করবে। আদনানের বন্ধুটা যখন স্কুল শেষে ক্রিকেট খেলতে বের হবে, আদনান তখন আলুতে ক'টাকা লাভ হলো তার হিসেব কষবে।

তারা স্কুলে-কলেজে ফিরবে না সহসা। তাদের ফেরাতে হবে। আর তাদের ফেরার উদ্যোগ যদি আমরা না নেই তবে ধসে যাবে একটা অধ্যায়। বঞ্চিত হবে আলো থেকে। তাদের ফেরান, তাদের ফেরাতেই হবে।

রংপুরের পীরগঞ্জ উপজেলার প্রত্যন্ত এলাকার এক শিক্ষক লাজু রহমান বলেন, অ্যাসাইনমেন্ট মিলছে না আনুমানিক ১০ শতাংশ শিক্ষার্থীর কাছ থেকে। যাদের অভিভাবকদের সঙ্গে যোগাযোগ করে লাভ হয়নি। প্রায় সবাই ডুবে আছে আয়মূলক কাজে।
এই এলাকায় ১০ শতাংশ অ্যাসাইনমেন্ট মিলছে না। কিন্তু এর থেকেও ভয়ংকর অবস্থা বিরাজ করছে নদীপাড়ের এলাকায়। প্রাথমিক ও গণশিক্ষা প্রতিমন্ত্রী মো. জাকির হোসেনের এলাকা কুড়িগ্রামের অবস্থা আরও করুন। প্রতিবছর আঘাত হানে সেখানে বন্যা।

প্রতিমন্ত্রীর নির্বাচনী এলাকা রৌমারি উপজেলার এক প্রাইমারি স্কুলের শিক্ষক জানান, তার স্কুল নদীপাড়ের গ্রামে। স্কুলের সঙ্গে সম্পৃক্ততা আছে অধিকাংশ শিক্ষার্থীরই। স্কুলে আসতে হয় না তাই এই সম্পৃক্ততা। দরিদ্র পরিবারের অধিকাংশ শিক্ষার্থী প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে আয়ের সঙ্গে যুক্ত। হাতে কাচা টাকা পাওয়া এসব শিক্ষার্থী আর ফিরবে বলে মনে হয় না। দারিদ্রতায় জর্জরিত অভিভাবকরাও হয়ত চাইবে না।

আপনার মতামত দিন

মত-মতান্তর অন্যান্য খবর

শনাক্তের হার ২.৩৪

করোনায় আরও ১৭ জনের মৃত্যু

১৩ অক্টোবর ২০২১

প্রধান শিক্ষকের দাঁত!

১০ অক্টোবর ২০২১

১৫ মাসে ১৫১ আত্মহত্যা

শিক্ষার্থীদের কেন কুঁরে খাচ্ছে মানসিক যন্ত্রণা!

১০ অক্টোবর ২০২১

'টাইট' দেশ সমাচার!

৮ অক্টোবর ২০২১



মত-মতান্তর সর্বাধিক পঠিত



দেখা থেকে তাৎক্ষণিক লেখা

কোটিপতিদের শহরে তুমি থাকবা কেন?

কাওরান বাজারের চিঠি

ছবিটির দিকে তাকানো যায় না

DMCA.com Protection Status