কাওরান বাজারের চিঠি

ছবিটির দিকে তাকানো যায় না

সাজেদুল হক

মত-মতান্তর ৩১ আগস্ট ২০২১, মঙ্গলবার | সর্বশেষ আপডেট: ১২:০২ পূর্বাহ্ন

আইন সাংবাদিকদের একটি ম্যাসেঞ্জার গ্রুপে প্রথম ছবিটি দেখি। বুকটায় কেমন যেন ব্যথা শুরু হয়। ডেইলি স্টারের এমরান হোসেনের তোলা। ছোট্ট সাফার ছবিটির দিকে তাকানো যায় না। মুহূর্তে মনে পড়ে যায় সাংবাদিকতার ক্লাসে বারবার বলা শিক্ষকদের কথা। একটি ছবি কখনও কখনও হাজার বা লাখো শব্দের চেয়েও শক্তিশালী। আসলেই কি তাই? কোনো শব্দ বা বাক্যের ক্ষমতা আছে এই ছবিটি ব্যাখ্যা করার? কী যন্ত্রণা, কী কষ্ট, কী বেদনা বহন করে এই ছবি! কার সাধ্য আছে সে কথা বলার!
৩০শে আগস্ট। আন্তর্জাতিক গুম প্রতিরোধ দিবস।
গেলো ক’ বছর ধরে দিনটিতে জাতীয় প্রেস ক্লাবে হাজির হন গুম হয়ে যাওয়া ব্যক্তিদের স্বজনরা। বুকে তাদের প্রিয় মানুষের ছবি। কারও বাবার, কারও ভাইয়ের। অনেকের মতো গতকাল প্রেস ক্লাবে এসেছিল ছোট্ট সাফা। বাবা মাহফুজুর রহমান সোহেলকে খুঁজছে সে। সবার কাছে তার আকুতি, আপনারা আমার বাবাকে ফিরিয়ে দেন।
হারিয়ে যাওয়া ছাত্রদল নেতা সাজেদুল ইসলাম সুমনের বোন আফরোজা ইসলাম আঁখির সঙ্গে কথা বলেন আমাদের রিপোর্টার শাহনেওয়াজ বাবলু। অডিও রেকর্ড শুনি। সহ্য করা যায় না। তিনি বলতে থাকেন, আমার ভাইয়ের ছোট মেয়েটা কেমন যেন হয়ে গেছে। অন্য বাচ্চাদের থেকে একদম আলাদা। ভাইকে যখন তুলে নিয়ে যায় তখন ওর বয়স এক বছর। বেড়ে ওঠার সময়টায়ও ঠিক যত্নটা পায়নি। ২০১৩ সালের ৪ঠা ডিসেম্বর বসুন্ধরা আবাসিক এলাকা থেকে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর পরিচয়ে তুলে নেয়া হয় এই ছাত্রদল নেতাকে। এরপর থেকে আজও তার খোঁজ মিলেনি। অপেক্ষায় বৃদ্ধা মা। প্রায়ই জানতে চান ছেলে কবে ফিরবে? অপেক্ষায় পরিবারের অন্য সদস্যরাও। তাদের এই অপেক্ষা কবে শেষ হবে কেউ জানে না।
এমন অপেক্ষায় আরও অনেকে। কেউ ফিরে, কেউ ফিরে না। কেউবা ফিরে লাশ হয়ে। জীবিত যারা ফিরে আসেন তাদের অনেকে চলে যান আড়ালে। গণমাধ্যমের সামনে একেবারেই মুখ খোলেন না। কী যেন ভয় তাড়া করে ফিরে তাদের। হারিয়ে যাওয়া মানুষ যায় কোথায়? সে প্রশ্নের উত্তর আজও অজানা।
গণমাধ্যম থেকে সংগ্রহ করা তথ্যের ভিত্তিতে মানবাধিকার সংগঠন আইন ও সালিশ কেন্দ্র বলছে, ২০০৭ সাল থেকে গত ২৫শে আগস্ট পর্যন্ত দেশে ৬১৪ জনের গুমের শিকার হয়েছেন। তাদের মধ্যে পরবর্তী সময়ে ৭৮ জনের লাশ উদ্ধার করা হয়েছে। গ্রেপ্তার দেখানো হয়েছে ৯৪ জনকে। ফেরত এসেছেন ৫৭ জন। অন্যদের ভাগ্যে কি ঘটেছে তা জানা যায়নি।
এই গুমের মর্মান্তিক পরিণতির কথা ভাবতে ভাবতে মানবাধিকার কর্মী মীনাক্ষী গাঙ্গুলির একটি পুরনো লেখার কথা মনে পড়ে। তিনি লিখেছিলেন, ‘সরকারের অস্বীকার করাই হচ্ছে বলপূর্বক গুমের সবচেয়ে বড় ট্র্যাজেডি। প্রিয়জন হয়তো বহু বছর ধরে এক অনিশ্চয়তা নিয়ে বাঁচে, আশা আর নিরাশার দোলাচলে। মায়েরা চিন্তিত থাকেন, তাদের সন্তান যদি কখনও ফেরেও, তাহলে তাকে চেনা যাবে কিনা। ভারতের জম্মু ও কাশ্মীরে যেসব নারী তাদের হারিয়ে যাওয়া স্বামীর খোঁজে এখনও অপেক্ষায় আছেন তাদের বলা হয় ‘অর্ধ-বিধবা’। গুমের শিকার ব্যক্তিদের পরিবার জানিয়েছে, তারা শোকও প্রকাশ করতে পারেন না ঠিকঠাকভাবে। তারা অস্থির থাকেন এই ভেবে যে, তাদের প্রিয়জন কি এখন নির্যাতন ভোগ করছে, নাকি তাকে মেরে ফেলা হয়েছে, কবরে শায়িত হওয়ার মর্যাদা কি সে পেয়েছে? আজকের বাংলাদেশে, বহু পরিবার এমন প্রশ্ন নিয়ে বেঁচে রয়েছে।’
গতকালই প্রেসক্লাবে এক মা বলেন, আমরা আর গুমের ভার বহন করতে পারি না। কতদিন আর এই কষ্ট সহ্য করবো। আরেক নারী জানান, স্বামী নিখোঁজ থাকায় সন্তানকে স্কুলে ভর্তি করাতে গিয়েও ঝামেলায় পড়েন তিনি। তিনি বলেন, কাউকে বলা যায় না যে আমার সন্তানের বাবা নিখোঁজ হয়ে আছে। স্কুল কর্তৃপক্ষ এবং ওর বন্ধুরা জানে যে, ওর বাবা বিদেশে আছে।
ছোট্ট সাফার কথা বলছিলাম। তার ছবিটি মাথা থেকে নামানোই যাচ্ছে না। কী যন্ত্রণা আর কষ্ট বহন করে চলেছে এই বাচ্চাটি। আমাদের কী করার আছে ভাবতে ভাবতে যন্ত্রণায় নীল হই। প্রার্থনা করি, সাফা যেন ওর বাবাকে ফেরত পায়। সবার যেন একটু করুণা হয়।

পাঠকের মতামত

**মন্তব্য সমূহ পাঠকের একান্ত ব্যক্তিগত। এর জন্য সম্পাদক দায়ী নন।

al-mamun

২০২১-১০-১০ ১৬:৫২:১০

dhikkar janay aey shomaj k

Zakiul Islam

২০২১-০৯-০২ ১৪:৫৭:৪৭

এ দেশ, আমার দেশ নয় । এই দেশ আমি চাইনি ।

জুনাইদ হোছাইন

২০২১-০৯-০১ ১৭:৪৯:২০

কতটুকু অশ্রু গড়ালে হৃদয় জলে সিক্ত, কত প্রদীপ শিখা জ্বালালেই জীবন আলোয় ত্রিপ্ত। কত ব্যথা বুকে চাপালেই তাকে বলি আমি ধৈর্য, নির্মমতা কতদূর হলে জাতি হবে নির্লজ্জ।

Md. Khadem Hossain

২০২১-০৯-০১ ১৫:০১:১৭

নেতা সারাজীবন বাঙালী জাতির মুক্তি, স্বাধীনতা, সমৃদ্ধির জন্য লড়াই করেছেন তাঁকেই জীবন দিতে হয়েছে কতিপয় হিংস্র দানবের হাতে। এই হত্যাকাণ্ডের মধ্য দিয়ে একটি জাতির স্বপ্ন ধূলিসাৎ হয়ে যায়।আল্লাহ সুবহানা তাআলা কোরানে কি বলেছেন শুনুন: যে ব্যক্তি ইচ্ছাকৃতভাবে মুসলিমকে হত্যা করে, তার শাস্তি জাহান্নাম, তাতেই সে চিরকাল থাকবে। আল্লাহ তার প্রতি ক্রদ্ধ হয়েছেন,তাকে অভিসম্পাত করেছেন। (সুরাহ আন-নেসাঃ আয়াত ৯৩) “যে বাক্তি কাউকে অনায়ভাবে হত্যা করলো, সে যেন সকল মানুষকে হত্যা করলো। “ (সুরাহ মাইদাঃ আয়াত ৩২) সুতারাং এই ধরণের মহাপাপ কাজ থেকে বিরত থাকুন।আল্লাহ সকল কে হেফাজত করুক আমিন ।প্রার্থনা করি, সাফা যেন ওর বাবাকে ফেরত পায়। সবার যেন একটু করুণা হয়।ইতিহাস তার নিজস্ব গতিতে চলবে এটাই নিয়ম; কিন্তু অন্ধকারাছন্ন জায়গাগুলো আলোকিত করা আমাদের সকলের দায়িত্ব। অবশ্যই একদিন আলো ঝলমল করবে আগামী প্রজন্মের এই বাংলাদেশে, বঙ্গবন্ধুর সোনার বাংলায়।স্বাধীনতার প্রশ্নে, ভবিষ্যতে এমন ঘটনার পুনরাবৃত্তিরোধ এবং আগামী প্রজন্মের জন্য একটি মসৃণ পথ তৈরির জন্যই

নুরুল ইসলাম

২০২১-০৯-০১ ১০:৩১:১১

মনে হয় আমরা কোন কথা বলা কোন আলোচনা করা ও বড় আপরাধ, এক দাবি রাখা যায় দল মত যে যাই হউক কোন রকম গুম যেন না হয় কেউ যেন বাবা হারা না হয়, কেউ যেন সন্তান না হারায় আমরা সরকারের নিকট জোর দাবি জানাতে পারি, আল্লাহ সকল কে হেফাজত করুক আমিন ।

Amir

২০২১-০৮-৩১ ১৯:০৬:২০

বসুন্ধরা আবাসিক এলাকা থেকে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর পরিচয়ে তুলে নেয়া হয় এই ..নেতাকে।-------এই পর্যন্ত যারা গুম হয়েছে বলে শোনা যায় তাদের ভিতর কেউই বঙ্গবন্ধু, মওলানা ভাসানী, শেখ শহীদ সরোয়ারদি বা ওনাদের পাশাপাসি দাড়াতে পারে এমন কেউ আছেন বলে শুনি নাই যাদের বক্তব্য মানুষের মনে দাগ কেটে যেকোনো একটি রাজনৈতিক পট পরিবর্তনে অবদান রাখতে পারে। অতএব আমজনতার কাতারের এই ধরনের জনগণকে গুম করে গুমকারি কি ফায়দা লুটতে চাইছে? দু'চারটা সরকারবিরধী বা যে গুম করেছে তার বিরধী বক্তব্য গুম হযে যাবার মত পরিস্থিতী তৈরী করে না! আখেরে এই পরিস্থিতির সকল দায় দায়িত্ব সরকারের উপরই বর্তায়, অতএব অতিসত্বর সরকারকে বিষয়টিকে গুরুত্বসহকারে বিবেচনায় নেওয়া দরকার বলে জনগণ মনে করে।

মোঃ আদিল শাহরিয়ার

২০২১-০৮-৩১ ০২:২৮:৩৪

এ-ই ছবিটির জবাব দেয়ার সময় একদিন আসবে!

কামরুল আহ্সান

২০২১-০৮-৩১ ০২:২০:০৬

আমি ছবিটি যখনই দেখেছি আমার চোখে অশ্রুজল চলে আসে ,ইয়া রাব্বুল আলামিন আপনার সাহায্য চাই।

সজল খোরশেদ

২০২১-০৮-৩১ ১৩:৩৩:৫৪

হায় ! স্বাধিনতা, হায় দেশ এই কী আমার বাংলাদেশ...... মামুনি- পুরো জীবনটাই তোমার বাবা আগলে রাখবে যেভাবে আগলে রাখে বায়ুবলয় অবনি কে

MOHD. SADEQUZZAMAN C

২০২১-০৮-৩১ ১৩:২৪:১৩

ছোট্ট সাফা'র ছবিটির দিকে তাকানোটাও বেশ কষ্টদায়ক। মন থেকে দোয়া করি ওর বাবা ফিরে আসুক, সুস্থ্য - স্বাভাবিক ভাবে

Md Moid

২০২১-০৮-৩০ ২৩:৩৩:৫৪

এইসব বুঝার মতো কেউ নাই

ফারুক হোসেন

২০২১-০৮-৩১ ১২:১৫:২৮

কেউ যদি অন্যায় করে তার বিচার হোক। স্বাধীন দেশে আর কোন গুম-খুন চাই না। একটি ছবি হাজার শব্দের চাইতেও শক্তিশালী। আল্লাহ্‌কে ভয় করুন, দিন শেষে তাঁর সামনেই দাঁড়াতে হবে। তখন কি জবাব দেবো?

Moin Rahman

২০২১-০৮-৩০ ২৩:০০:৩৯

The almighty Allah blessed and protect her ! InsahAllah, hope her father will be back. Amen

Muhammad Jalal Hussa

২০২১-০৮-৩১ ১১:৪১:৫৬

অন্যায় ভাবে মানুষ মানুষকে হত্যা করছে। তারা বুঝতে পারে না যে একজন নিরপরাধ পুরুষ বা মহিলাকে হত্যা করা মহান আল্লাহর দৃষ্টিতে একটি গুরুতর অপরাধ। এই মহাপাপ তাকে জাহান্নামের আগুনে ফেলে দেবে এবং সে সেখানে চিরকাল থাকবে। আল্লাহ সুবহানা তাআলা কোরানে কি বলেছেন শুনুন: যে ব্যক্তি ইচ্ছাকৃতভাবে মুসলিমকে হত্যা করে, তার শাস্তি জাহান্নাম, তাতেই সে চিরকাল থাকবে। আল্লাহ তার প্রতি ক্রদ্ধ হয়েছেন,তাকে অভিসম্পাত করেছেন। (সুরাহ আন-নেসাঃ আয়াত ৯৩) “যে বাক্তি কাউকে অনায়ভাবে হত্যা করলো, সে যেন সকল মানুষকে হত্যা করলো। “ (সুরাহ মাইদাঃ আয়াত ৩২) সুতারাং এই ধরণের মহাপাপ কাজ থেকে বিরত থাকুন।

আপনার মতামত দিন

মত-মতান্তর অন্যান্য খবর

মুরগিকে মনে হয় যেনো গরু

২২ অক্টোবর ২০২১

অশনি সঙ্কেত!

১৮ অক্টোবর ২০২১

থার্ড পয়েন্ট

সাকিবদের ‘টেস্ট’ ব্যাটিংয়ের ব্যাখ্যা কী?

১৮ অক্টোবর ২০২১

শনাক্তের হার ২.৩৪

করোনায় আরও ১৭ জনের মৃত্যু

১৩ অক্টোবর ২০২১



মত-মতান্তর সর্বাধিক পঠিত



দেখা থেকে তাৎক্ষণিক লেখা

কোটিপতিদের শহরে তুমি থাকবা কেন?

কাওরান বাজারের চিঠি

ছবিটির দিকে তাকানো যায় না

DMCA.com Protection Status