প্রশান্ত কিশোর: যিনি জিতিয়েছেন মোদিকে, মমতাকেও

মানবজমিন ডেস্ক

বিশ্বজমিন (১ মাস আগে) জুলাই ২৯, ২০২১, বৃহস্পতিবার, ১০:৪১ পূর্বাহ্ন | সর্বশেষ আপডেট: ৬:০৪ অপরাহ্ন

প্রশান্ত কিশোর (৪৪) কোনো সাধারণ রাজনৈতিক পরামর্শক নন। তার বক্তব্য, তিনি পত্রিকা পড়েন না। টিভিও দেখেন খুব কম। লেখেন না ইমেইল, নেন না নোট। গত এক দশকে ব্যবহার করেননি কোনো ল্যাপটপ। একমাত্র যে গ্যাজেট তিনি ব্যবহার করেন, সেটি হচ্ছে তার ফোন। গত তিন বছরে তার টুইটারে পাঁচ লাখ অনুসারী থাকা সত্ত্বেও মাত্র ৮৬টি টুইট করেছেন তিনি।

কিশোর বলেন, আমি কাজ ও জীবনের মধ্যে ভারসাম্য রক্ষায় বিশ্বাসী নই। কাজের বাইরে কোনো কিছুর প্রতি আমার আক্ষরিক অর্থেই কোনো আগ্রহ নেই।
বিবিসি’র সৌতিক বিশ্বাসকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে ভারতের এই আলোচিত নির্বাচনী কৌশলবিদ এসব কথা বলেছেন। সম্প্রতি অনেক পন্ডিতের পূর্বাভাসকে মিথ্যা প্রমাণ করে তার পরামর্শ মেনে পশ্চিমবঙ্গের নির্বাচনে বিজেপিকে হারিয়েছে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের দল তৃণমূল কংগ্রেস। এরপর তাকে নিয়ে আলোচনা বেড়েছে। আবারও তিনি পাদপ্রদীপের আলোচনায় এসেছেন পেগাসাস কেলেঙ্কারিতে। সংবাদ মাধ্যমের তদন্তে দেখা গেছে, সম্প্রতি ইসরাইলি কোম্পানি এনএসও’র স্পাইওয়্যার পেগাসাস ব্যবহার করে ভারতের যেসব ব্যক্তির উপর গোয়েন্দাগিরি চালানোর সম্ভাব্য পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছিল, তাদের তালিকায় প্রশান্ত কিশোরও আছেন।

বিবিসি’র প্রতিবেদনে বলা হয়, কিশোর ভারতের সবচেয়ে পরিচিত রাজনৈতিক পরামর্শক ও কৌশলবিদ। যদিও এই পরিচয় তার পছন্দ নয়। রাজনৈতিকদের উচ্চ-পর্যায়ের ‘হ্যান্ডলার’ (ব্যবস্থাপক) এবং চমৎকার একজন কৌশলবিদ হিসেবে তিনি পরিচিত, যিনি নির্বাচন জেতার ও মানুষকে প্রভাবিত করার কলাকৌশল নিখুঁতভাবে রপ্ত করেছেন।
২০১১ সাল থেকে কিশোর ও তার রাজনৈতিক পরামর্শদাতা সংস্থা বিভিন্ন দলের জন্য মোট নয়টি নির্বাচনে কাজ করে আটটিতেই বাজিমাত করেছে। ডিজনি, নেটফ্লিক্স ও বলিউডের শাহরুখ খানও তার জীবন নিয়ে চলচ্চিত্র তৈরির প্রস্তাব দিয়েছে তাকে। তবে তিনি সবগুলো প্রস্তাবই প্রত্যাখ্যান করেছেন।

কিশোর সফলভাবে সব ঘরানার রাজনৈতিকদেরই পরামর্শ দিয়েছেন। এর মধ্যে ২০১৪ সালে নরেন্দ্র মোদি নেতৃত্বাধীন ভারতীয় জনতা পার্টি (বিজেপি)-এর হয়ে কাজ করেছেন তিনি। ওই নির্বাচনে মোদি প্রথমবারের মতো ভারতের প্রধানমন্ত্রী নির্বাচিত হন। পরবর্তীতে চলতি বছরের মে মাসে পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী ও মোদীর চির-প্রতিদ্বন্দ্বী মমতা ব্যানার্জিকে জয় এনে দেন তিনি। সমর্থকরা কিশোরকে জাদুর স্পর্শওয়ালা মানুষ হিসেবে ডাকে। অন্যদিকে সমালোচকরা বলেন, তিনি খুব সতর্কভাবে তার গ্রাহক বাছাই করেন ও এমন দলগুলোর হয়েই কাজ করেন যেগুলোর জয়ের সম্ভাবনা বেশি থাকে।

গত মে মাসে কিশোর ঘোষণা দেন তিনি রাজনৈতিক পরামর্শকের কাজ ছেড়ে দিচ্ছেন। তিনি বলেন, আমি এই জগত ছেড়ে যাচ্ছি। আমি অন্যকিছু করতে চাই।
কিন্তু সাম্প্রতিক সপ্তাহগুলোয়, আবার পত্র-পত্রিকার শিরোণামে তার নাম উঠে এসেছে। ভারতের প্রধান বিরোধীদল কংগ্রেস পার্টির নেতা রাহুল গান্ধীসহ অন্যান্য বিরোধী নেতাদের সঙ্গে বৈঠক করেছেন তিনি। এসব বৈঠক ঘিরে গুঞ্জন উঠেছে যে, বিচক্ষণ এ পরামর্শক মোদির বিজেপির বিরুদ্ধে বিরোধীদের একটি জোট গঠনে সহায়তার চেষ্টা করছেন তিনি। এমনও গুঞ্জন রয়েছে যে, কংগ্রেসের ভাগ্য বদলে দিতে দলটিতে যোগ দিতে যাচ্ছেন তিনি।
অবশ্য কিশোর বলেন, এগুলো সবই জল্পনা। তার ভাষ্যমতে, ‘আমি নিশ্চিতভাবেই আগে যা করতাম, তা আর করবো না। কী করবো সে বিষয়ে আমার হাতে কিছু অপশন আছে, তবে এখনও আমি কোনো সিদ্ধান্তে পৌঁছাইনি। এমনটা খুবই সম্ভব যে, আমি এমন কিছু করবো যার সঙ্গে রাজনীতির কোনো সম্পর্কই নেই। আমি এ বিষয়ে সিদ্ধান্তে পৌঁছানোর সঙ্গে সঙ্গেই আনুষ্ঠানিকভাবে তা জানিয়ে দেবো।’

ভারতে জাতীয় নির্বাচনের আর তিন বছর বাকি। বিরোধী দলগুলো বর্তমানে মোদির বিরুদ্ধে বড় ধরনের চ্যালেঞ্জ দাড় করাতে হিমশিম খাচ্ছে। কিন্তু কিশোর বিশ্বাস করেন, বিজেপিকে যতটা মহাশক্তিশালী দল মনে করা হয়, দলটি ততটা শক্তিশালী নয়। তার মতে, ‘নতুন বা বিদ্যমান সকল দলেরই একা বা জোট গঠন করে বিজেপির বিরুদ্ধে চ্যালেঞ্জ তৈরি করার সুযোগ আছে।’

আশির দশকের মাঝামাঝি সময় থেকেই ভোট ও আসন সংখ্যা হারিয়ে আসছে কংগ্রেস। ২০১৯ সালের নির্বাচনে মাত্র ২০ শতাংশ ভোট পেয়েছে দলটি। জিতেছে মোটে ৫২টি আসন। ওই নির্বাচনসহ পরপর দুটি নির্বাচন হেরেছে। তা সত্ত্বেও পার্লামেন্টে প্রায় ১০০ সদস্য রয়েছে দলটির। বিভিন্ন রাজ্যজুড়ে আইনপ্রণেতা রয়েছে ৮৮০ জন। বিজেপির বিরুদ্ধে সবচেয়ে বড় বিরোধী দল এটি।

কিশোর বলেন, কংগ্রেসের সমস্যা কী, তা নিয়ে মন্তব্য করার আমি কেউ নই। আমি কেবল এটা বলতে পারি যে, গত এক দশকে তাদের নির্বাচনি পারফরম্যান্সে যতটা উঠে এসেছে, দলটির সমস্যাগুলো আরও অনেক গভীরে। সেগুলো অনেকটাই কাঠামোগত।
তিনি বলেন, নতুন একটি কেন্দ্রীয় দল গঠন করা বেশ কঠিন কাজ। তৃতীয় একটি বিরোধী জোট গঠন করা ‘সম্ভব নয়, এবং তা টেকসই-ও হবে না’। কারণ জোড়াতালি দিয়ে গঠিত জোট সফলতা আনতে পারে না।
এসব সত্ত্বেও, কিশোর বিশ্বাস করেন, বিজেপি অপরাজেয় নয়। তিনি বলেন, এখানে অপশন আছে, পর্যাপ্ত দৃষ্টান্ত আছে যে, সঠিক কৌশল ও চেষ্টার মাধ্যমে তাদের পরাজিত করা সম্ভব।

কিশোর বলেন, ভারতে জয়ী দলগুলো যতই জনপ্রিয় হোক না কেন, তারা মোট ভোটের ৪৫ শতাংশের বেশি জিততে পারে না। ২০১৯ সালে বিজেপি মোট ভোটের ৩৮ শতাংশ ছিনিয়ে এনেছিল। আসন জিতেছিল ৩০০টির বেশি।
তিনি বলেন, বিজেপি ভারতের পূর্ব ও দক্ষিণ অঞ্চল ২০০ প্রতিকূল আসনের এক-পঞ্চমাংশেরও বেশি জিততে পারেনি। কারণ, আঞ্চলিক দলগুলো সফলভাবে তাদের অঞ্চলগুলোয় বিজেপির প্রবেশ ঠেকিয়ে রেখেছে। এদিকে, উত্তর ও পশ্চিম অঞ্চলে বিজেপি প্রভাবশালি হলেও, ওই অঞ্চলগুলোর ৩৪০টি প্রতিকূল আসনের মধ্যে বিজেপির একটি বিরোধী দল ১৫০টি আসন জিতে নিয়েছে।

কিশোরের কাজের ধরণ দেখে আন্দাজ করা যায় যে, ভারতের মতো দেশে রাজনৈতিক পরামর্শ কীভাবে ভূমিকা রাখে। তার সংস্থা ইন্ডিয়ান পলিটিক্যাল অ্যাকশন কমিটি (আইপিএসি) নির্বাচনি মৌসুমে বিভিন্ন প্রচারণায় চার হাজার কর্মী নিয়োগ দিয়ে থাকে। সংস্থাটি নির্বাচনি সময়ে যে দলের হয়ে কাজ করে, তাদের সঙ্গে মিশে যায়।
কিশোর বলেন, আমরা নির্বাচনে গ্রাহক দলের জয় নিশ্চিতে প্রয়োজনীয় কাজগুলো সম্পন্ন করতে তাদের শক্তিবর্ধক হিসেবে ভূমিকা রাখি। আমরা কিছুটা পরিবর্তন আনি, কিন্তু তার পরিমাণ কতটা তা সুনির্দিষ্টভাবে বলা কঠিন।
গত এক দশক ধরে ভারতীয় নির্বাচন বিশ্লেষণ করে, কিশোরের মতামত হচ্ছে, নির্বাচনি প্রচারণার সমাবেশে লোকজনের অধিক সমাগম হলেও, ভোটকেন্দ্রে এর তাৎপর্য খুবই কম। নির্বাচনি প্রচারণা অত্যধিক ব্যয়বহুল হওয়ায় রাজনীতিতে প্রবেশ কঠিন হয়ে দাঁড়িয়েছে দেশটিতে। একইসঙ্গে রাজনীতি ও সমাজে মেরুকরণ দ্রুত বেড়ে চলছে সেখানে।
তাহলে, ৮০ কোটি ভারতীয় ভোটারের পছন্দ সম্পর্কে তথ্য পাওয়া যায় কিভাবে?
কিশোর বলেন, কোনো সরকারের সামাজিক কল্যাণ সুবিধা, পরিচয়, ক্ষমতায়ন, প্রবেশাধিকার ও আরো নানা অস্পৃশ্য উপাদান সরবরাহের ভিত্তিতে। আমি এ বিষয়ে কখনোই অনুমান করার সাহস করতে পারি না।
তিনি বলেন, আমি কখনোই ভোটাররা কী চায় তা নিজ থেকে অনুমান করার চেষ্টা করি না। আমি কেবল কিছু ব্যবস্থা দাঁড় করাই যেগুলোর মাধ্যমে মানুষ কী বলছে তা শোনা যায়। আর তাদের কথা থেকে পাওয়া তথ্যগুলো আমাদের সবসময়ই বিস্মিত ও বিনীত করে তোলে।

২০১৫ সালে কিশোরের টিম প্রচারণার অংশ হিসেবে তার জন্মস্থান বিহারের ৪০ হাজার গ্রাম পরিদর্শন করে। এটি ভারতের দরিদ্রতম রাজ্য। কিশোর ও তার দল গ্রামবাসীদের সমস্যা চিহ্নিত করতে চেষ্টা করে। তিনি বলেন, তাদের প্রথম সমস্যা ছিল নিষ্কাশন ব্যবস্থার অভাব। অনুসন্ধান করে দেখা গেছে যে, গ্রামগুলোর থানায় জমা হওয়া অভিযোগের এক-পঞ্চমাংশই বাজে নিষ্কাশন ব্যবস্থা ঘিরে হওয়া বিবাদ সংশ্লিষ্ট ছিল।

গত বছর পশ্চিমবঙ্গে জনগণের অভিযোগ শোনার জন্য একটি হেল্পলাইন স্থাপনে সহায়তা করেন কিশোর। প্রায় ৭০ লাখ মানুষ ওই হেল্পলাইনে ফোন দেন। তাদের বেশিরভাগই জাত বা স্বীকৃতিবাচক অ্যাকশন সনদ সরবরাহে বিলম্ব বা দুর্নীতি নিয়ে অভিযোগ করেন। এসব অভিযোগের ভিত্তিতে রাজ্য সরকার ছয় সপ্তাহের মধ্যে এমন ২৬ লাখ সনদ প্রদান করে।
রাজনৈতিক অঙ্গনে সফল হওয়া সত্ত্বেও কিশোর মনে করেন রাজনীতি তার জন্য নয়। তিনি বলেন, আমি আসলে এটা ভালো বুঝি না।
তিনি মনে করেন, সাধারণ বোধজ্ঞান ও মনোযোগ সহকারে কথা শুনতে পারার মধ্যেই তার আসল শক্তি নিহিত। এছাড়া, তিনি বলেন, আমি চাপে থেকে কাজ করতে ভালোবাসি।

(বিবিসি’তে সম্প্রতি প্রকাশিত সৌতিক বিশ্বাসের লেখা প্রতিবেদন অবলম্বনে)

আপনার মতামত দিন

বিশ্বজমিন অন্যান্য খবর

কি কথা তার সঙ্গে!

২৪ সেপ্টেম্বর ২০২১

মার্কেলের পর

২৪ সেপ্টেম্বর ২০২১



বিশ্বজমিন সর্বাধিক পঠিত



সরকারি প্রচার মাধ্যমের প্রক্ষেপণ

নির্বাচনে ট্রুডোর দল সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন করেছে

DMCA.com Protection Status