আমরা যারা আইসিইউতে কাজ করছি আমাদের কাছে মৃত্যুহার ৪০-৫৫ পারসেন্ট

ডা. শাহজাদ হোসেন মাসুম

ফেসবুক ডায়েরি ২৫ জুলাই ২০২১, রোববার | সর্বশেষ আপডেট: ৫:৩৮ অপরাহ্ন

শুধু আপনারাই মধ্যবিত্ত নন। আমরা ডাক্তাররাও মূলত মধ্যবিত্ত। খুব অল্প সংখ্যক চিকিৎসকদেরই আপনারা উচ্চবিত্ত হিসেবে দেখে ভুল করে সবাইকে এক কাতারে ফেলে দেন। আমাদের সাথে সবচেয়ে ঘনিষ্ট সামাজিক যোগাযোগ নিম্নবিত্ত মানুষের। তারা কেউ আমাদের আত্মীয়, কেউ ডিপেনডেন্ট। কেউ আমাদের পরিচিত সবজি বিক্রেতা, কেউ মুদি দোকানদার, কেউ সিএনজি ড্রাইভার, কেউ পাড়ার রিকশাওয়ালা। কেউ প্লাম্বার, কেউ ইলেকট্রিশিয়ান, কেউ দারোয়ান, বাজারের নাইট গার্ড, অনেক পেশার স্বল্প আয়ের মানুষ।
আমরা সবই দেখি।
সবার মুখের হাসি মিলিয়ে গেছে। মানুষ টিকে থাকার লড়াই করছে, কেউ হেরে গিয়ে চোখের পানি নিয়ে কোথাও হারিয়ে গেছে, কেউ খাবি খেয়ে খেয়ে টিকে আছে। তাদের সংসার কিভাবে চলছে তারাই জানে। যারা কচুক্ষেতে বাজার করেন তারা জানবেন রজনীগন্ধা মার্কেট আর কচুক্ষেত বাজারের মাঝখানের জায়গাটায় আগে প্রতি সন্ধ্যায় ভ্যানের উপর খাবারের দোকান বসতো, অন্য অনেক দোকানও বসতো। তাদের ক্রেতারাও ছিলেন স্বল্প আয়ের মানুষ। এসব আমার চোখে পড়তো। ওই জায়গাটা আমার পছন্দের জায়গা ছিল। আমি সেখানকার মানুষদের দেখতাম। আজ বহুদিন ওই দোকানগুলো আর বসে না। এই মানুষগুলো আজ কিভাবে সংসার চালায় জানিনা। নানা কারণে আমি বাজার করি খোলা বাজারে। আমি বড় ডিপার্টমেন্ট শপের মাছ খেতে পারিনা। টুকরিতে রাখা সবজি আমার দেখতে ভালো লাগে। এবার ঈদের বাজার করতে যাবো, হাসপাতাল থেকে বের হয়ে দেখি কালো আকাশ, ঝুম বৃষ্টি। আমাকে স্বপ্নতে যেতেই হলো। কিন্তু আমি সবকিছু সেখান থেকে কিনতে পারিনি। সবার চেহারা আমার মনে পড়ছিল। আমি ফিরে আসি কচুক্ষেতে। কিছুটা ভিজেই বাজার শেষ করি।
আমাদের কাছেও সব মানুষের কষ্টই পরিচিত। আমরা এলিয়েন না। এই দেশেরই ভূমিপুত্র আমরা। সবার জন্য আমরাও কষ্ট পাই। কিন্তু প্রশ্নটা সর্দিজ্বরের নয়। জীবন মৃত্যুর। একটা প্যান্ডেমিক যার মৃত্যুহার আপনার কাছে কম, আমাদের কাছে বেশি। আমাদের ওয়ার্ড উপচানো রোগি। আমরা আমাদের সক্ষমতার বাইরে রোগি নিচ্ছি। আমাদের ওয়ার্ডের, ইমারজেন্সির, ট্রায়াজের চিকিৎসকরা ক্লান্ত। তাঁদের কাছে মৃত্যুহার কিন্তু এক বা দুই পারসেন্ট নয়। পাঁচ থেকে সাত পারসেন্ট। তাঁরা আতংকিত। আর আমরা যারা আইসিইউতে কাজ করছি, আমাদের কাছে মৃত্যুহারটি চল্লিশ থেকে পঞ্চান্ন পারসেন্ট। আমরা ক্লান্ত, অবসন্ন, বিষন্ন। আমরা আতংকিতও। আমদের কাছে কোভিডের চেহারা আর আপনাদের কাছে কোভিডের চেহারা এক নয়। ব্রিফিংএর সময় আইসিইউর সামনে দাঁড়িয়ে রোগিদের স্বজনদের মুখগুলো দেখে যেতে পারেন।
কাজেই আমরা যখন বীরপুঙ্গবদের মাস্কহীন চেহারা দেখি বা কেউ ইন্টারনেটপ্রাপ্ত জ্ঞান নিয়ে আমাদের শেখাতে আসেন তখন আমরা কঠিন করে কথা বলি। আপনাদের যদি তা খারাপ লাগে তাহলে গিলে ফেলবেন। এমনিতে না পারলে পানি দিয়ে গিলে ফেলবেন। অনুরোধ জানাই। বিনীত অনুরোধ।
লেখক: সহকারী অধ্যাপক, অ্যানেসথেসিয়া বিভাগ, কুর্মিটোলা জেনারেল হাসপাতাল

(ফেসবুক থেকে নেওয়া)

পাঠকের মতামত

**মন্তব্য সমূহ পাঠকের একান্ত ব্যক্তিগত। এর জন্য সম্পাদক দায়ী নন।

Md Kamrul Hossain

২০২১-০৭-২৬ ১৯:০১:৫৬

Talk show তে সস্তা উপদেশ দিয়ে front liner দের বিরক্ত করবেন না,

Asma Akhter

২০২১-০৭-২৬ ১২:৪৯:৪৩

Apner life style & bishuddho vabnar jonno onek valo laglo, Obossoy apner jonno doa korbo.

AMIR

২০২১-০৭-২৬ ১০:৫৫:১৪

আপনাদের যদি তা খারাপ লাগে তাহলে গিলে ফেলবেন। ----ক্ষেদোক্তি, এই অতিমারীতে জীবন তেতে গেছে!

shiblik

২০২১-০৭-২৫ ১১:৩৬:২১

খুব ভাল কথা... তবে মনে রাখতে হবে বেশীর ভাগ বাংলাদেশী "ডাক্তার, নার্স এবং তাদের সহযোগীরা" দুর্নীতি, দুর্বল শিক্ষা, রাজস্ব ফাঁকি এবং রাজনিতির সাথে কোন না কোন ভাবে জড়িত। এই কারনে বিত্তবানরা বিদেশে যায় সামান্য চেকাপের জন্য। আর যাদের উপায় নাই তবে শিক্ষিত, তার ইন্টারনেট থেকে শিখে সম্ভাব্য "ম্যাল প্রাকটিস" থেকে বাঁচতে চায়। কিছু মানুষ হয়তো অযৌক্তিক ভাবে ডাক্তারি কাজে বাধার সৃষ্টি করে। যাই হোক - ভাল, শিক্ষিত ডাক্তারদের এই গুলো মেনে নিয়ে চাকরী করতে হবে। অন্যথায় ডাক্তারি পেশা ছেড়ে দেওয়াই উত্তম।

hiron

২০২১-০৭-২৪ ২২:২২:৩৬

খুবই বাস্তব চিত্র, তিনি সাবলিলভাবে ফুটিয়ে তুলেছেন।আশা করি পাঠক এর মাধ্যমে অনেক ডাক্তারের মনোভাব উপলব্ধি করতে পারবেন।

আপনার মতামত দিন

ফেসবুক ডায়েরি অন্যান্য খবর

কি মর্মান্তিক!

৯ জুলাই ২০২১



ফেসবুক ডায়েরি সর্বাধিক পঠিত



পিতার জন্মদিনে মেয়ের আবেগঘন স্ট্যাটাস

‘মির্জা আলমগীরের সারাজীবনের রাজনীতি বৃথা যাবে না’

DMCA.com Protection Status