‘বাংলাদেশে বিরোধী দলের অভাব গণতন্ত্রকে প্রভাবিত করতে পারে’

অনলাইন (৪ দিন আগে) জুলাই ২২, ২০২১, বৃহস্পতিবার, ৯:৩২ পূর্বাহ্ন | সর্বশেষ আপডেট: ৫:০৭ অপরাহ্ন

দীর্ঘ মুক্তিযুদ্ধের পর ১৯৭১ সালে বাংলাদেশ যখন স্বাধীনতা অর্জন করেছিল,  তখন হেনরি কিসিঞ্জারের মতো অনেকেই ভেবেছিলেন, তীব্র খাদ্যাভাবের জন্য এতবড় দেশটি হয়তো আর ঘুরে দাঁড়াতে পারবে না। কিন্তু সেই ভবিষৎবানীকে ভুল প্রমাণিত করে স্বাধীনতার ৫০ বছর পর বাংলাদেশ আজ অনেকটাই এগিয়ে গেছে। অর্থনৈতিক ও সামাজিক খাতে  দেশের পরিসংখ্যান সেই সাফল্যের নিদর্শন।  একই সঙ্গে প্রশ্ন উঠছে, দেশের গণতন্ত্র নিয়েও । গত সপ্তাহে, একদল সাংবাদিক বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রীকে 'প্রেস ফ্রিডমের প্রিডেটর' বলে উল্লেখ করেছেন  অর্থাৎ সংবাদমাধ্যমে হস্তক্ষেপের জন্য প্রধানমন্ত্রীকে অভিযুক্ত করেছেন।  যদিও গণতন্ত্রের অবনতি সত্ত্বেও, বাংলাদেশের অর্থনীতি ভাল ফল করেছে  এবং এটি দক্ষিণ এশিয়ার অন্যান্য দেশগুলোর সঙ্গে তুলনায় নিজের একটা জায়গা তৈরী করেছে । ১৯৭১ সালে পাকিস্তান থেকে বিচ্ছিন্ন হবার পর দেশের মাথাপিছু জিডিপি বেড়েছে ২,২২৭ ডলার, সেখানে পাকিস্তানের জিডিপি  মাত্র ১,৫৪৩ ডলার। মাথাপিছু আয়ের হিসেবে যা ছাপিয়ে গেছে ভারতকেও।  ২০২১ সালের মে মাসে যখন শ্রীলঙ্কা বৈদেশিক মুদ্র্রাজনিত সংকটে পড়েছিল , তখন বাংলাদেশ  শ্রীলঙ্কার  অর্থনীতিতে ২০০ মিলিয়ন ডলারের মুদ্রার যোগান দিয়ে সেই সংকট থেকে মুক্ত করেছিল। বাংলাদেশ এতটাই  আত্মবিশ্বাসী যে বিশ্বব্যাংক দুর্নীতির অভিযোগের কারণে ২০১২ সালে পদ্মা সেতুর জন্য এক বিলিয়ন ডলারের  চুক্তি বাতিল করার পরেও , এই দেশ নিজ অর্থবলে  মেগা সেতুটি তৈরি করেছিল।১৯৯০ সাল থেকে বাংলাদেশের গড় জিডিপির বৃদ্ধি  বিশ্বের গড় জিডিপি বৃদ্ধির চেয়ে বেশি এবং এক দশকেরও বেশি সময় ধরে দক্ষিণ এশীয় দেশগুলির মধ্যে বাংলাদেশের গড়  ধারাবাহিকভাবে বেশ ভালো। ভারতে সাম্প্রতিক অর্থনৈতিক মন্দার পরে বাংলাদেশ দক্ষিণ এশিয়ার অর্থনৈতিক বৃদ্ধিতে  উল্লেখযোগ্য ভূমিকা পালন করছে ।পোশাক শিল্পের ব্যপ্তির কারণে বাংলাদেশ ইতিমধ্যে ২০১৫ সালে  নিম্ন-মধ্য আয়ের দেশ হিসেবে গণ্য হয়েছে ।সফটওয়্যার ও আইটি পরিষেবা প্রদানের জন্য  বাংলাদেশ বিশেষ ভূমিকা নিচ্ছে।
জাতিসংঘের সমীক্ষা বলছে , ২০১৮ সালে জনসংখ্যা এবং অর্থনীতির বিচারে বাংলাদেশ  কম উন্নয়নশীল (Least Developed Country) বা এলডিসি তালিকাভুক্ত ছিল । ২০২৪সালে  এই দেশ এলডিসি তালিকার বাইরে চলে যাবে বলে আশা  করা হচ্ছে। 

১৯৭৪ সালে দেশটিতে ব্যাপক অনাহারে আক্রান্ত হওয়ার পূর্বাভাস দেয়া হয়েছিল, এরই মধ্যে এর ১৬৬ মিলিয়ন জনসংখ্যার জন্য খাদ্য উৎপাদনে স্বয়ংসম্পূর্ণতা অর্জন করেছে বাংলাদেশ । পাশাপাশি ২ দশমিক ৫ মিলিয়ন বিদেশী অভিবাসী অর্থ পাঠিয়ে দেশের অর্থনীতিতে সহায়তা করছেন।  শুধু ২০২০ সালেই রেমিট্যান্স থেকে বাংলাদেশ  ১৯ দশমিক ৮ বিলিয়ন ডলার পেয়েছে । বাংলাদেশের  কৃতিত্ব কেবলমাত্র অর্থনীতির মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই , সামাজিক খাতেও দেশটি ভালো কাজ করছে। জনসেবাতে বিনিয়োগ বাড়ানো হয়েছে ।  কমেছে লিঙ্গ বৈষম্য।  ১৯৬০ সালে বাংলাদেশ ও পাকিস্তানে উর্বরতার হার একই ছিল। প্রতি মহিলা পিছু  ৬ দশমিক ৭ এবং ভারতে এটি ছিল ৫ দশমিক ৯। ৬০ বছর পর ২০২০ সালে বাংলাদেশ তার উর্বরতার হার হ্রাস করে ২ শতাংশে ,  ভারতে সেই হার  ২ দশমিক ২ এবং পাকিস্তানে ছিল ৩ দশমিক ৪ শতাংশ । স্বাস্থ্য খাতেও পরিকাঠামোগত উন্নয়ন বাড়ায় বেড়েছে দেশের মানুষের গড় আয়ুও।  ২০১৮ সালে বাংলাদেশিদের  গড় আয়ু ছিল ৭২ দশমিক ৩২ বছর। পাকিস্তানে এটি ছিল ৬৭ দশমিক ১১ বছর এবং ভারতে এটি ছিল ৬৯ দশমিক ৪২ বছর। সাক্ষরতার হারে বাংলাদেশ পাকিস্তানের চেয়ে অনেক এগিয়ে এবং ভারতের আরও নিকটে এসে গেছে। আরও লক্ষণীয়ভাবে ভারতের তুলনায় বাংলাদেশের মেয়েরা ছেলেদের চেয়ে উচ্চতর শিক্ষা অর্জনে এগিয়ে রয়েছে।পুষ্টি থেকে স্যানিটেশন, শিক্ষা থেকে ক্ষমতায়ন, সাম্প্রতিক দশকগুলোতে বাংলাদেশের অগ্রগতি লক্ষণীয়। অর্থনৈতিক ও সামাজিক ক্ষেত্রে বাংলাদেশের সাফল্য লক্ষণীয় হলেও  দেশের গণতান্ত্রিক  কাঠামো অন্য কথা বলছে।  ১৯৭৫, ১৯৮২ এবং ২০০৭- এ তিনটি সামরিক অভ্যুত্থান প্রত্যক্ষ করেছে বাংলাদেশ। সরকারের অধীনে নির্বাচন আয়োজিত হওয়ায় ২০১১ সালে দেশের গণতান্ত্র বড়সড় ধাক্কা খায়। এর ফলে বৃহত্তম বিরোধী দল ২০১৪ সালের সাধারণ নির্বাচন বয়কট করেছিল। তার পর থেকেই বাংলাদেশের বিরোধী দলকে কোনঠাসা  করা হয়েছে। ২০১৮ সালে নির্বাচনে জয়লাভের পর প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা মসনদে তৃতীয়বার আসীন হয়েছেন । এদিকে অনৈতিক অনুদানের অভিযোগে দেশটির প্রধান বিরোধী নেত্রী  ও প্রাক্তন প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়াকে ১৭ বছরের কারাবাসের সাজা দেয়া হয়েছে। বিরোধী দলের  অনুপস্থিতি এবং সংসদীয় তদারকির অভাব দেশের প্রশাসনের মান নিয়ে প্রশ্ন উত্থাপন করেছে।ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনালের তালিকায় অন্যতম দুর্নীতিগ্রস্থ দেশ হিসেবে তালিকাভুক্ত হয়েছে বাংলাদেশ।  সরকারের সাম্প্রতিক পদক্ষেপের কারণে  ধর্মীয় উগ্রবাদী গোষ্ঠীগুলোর হুমকি কিছুটা হ্রাস পেয়েছে। প্রায় এক মিলিয়ন রোহিঙ্গা শরণার্থীকে আশ্রয় দেয়ার ভারও রয়েছে বাংলাদেশের ওপর  মুখোমুখি, এবং শীঘ্রই তাদের প্রত্যাবর্তন খুব আশাব্যঞ্জক হবে বলে মনেও  হচ্ছে না। সব মিলিয়ে বলা যায় , সাম্প্রতিক বছরগুলোতে বাংলাদেশ  অর্থনৈতিক ও সামাজিক বিকাশে সত্যিই প্রশংসনীয় অগ্রগতি করেছে। তবে শক্তিশালী বিরোধী পক্ষের অভাব দেশটির গণতন্ত্রের ওপর আঘাত হানতে  পারে । সেই পরিস্থিতি রোধ করতে বাংলাদেশের রাজনীতিতে গুরুত্ব সহকারে দৃষ্টি দেয়া দরকার।

 

একটি গালফ নিউসের প্রতিবেদন ,

লিখেছেন- অশোক সোয়েন, সুইডেনের ইউপ্পসালা বিশ্ববিদ্যালয়ে  অধ্যাপক

পাঠকের মতামত

**মন্তব্য সমূহ পাঠকের একান্ত ব্যক্তিগত। এর জন্য সম্পাদক দায়ী নন।

তপু

২০২১-০৭-২২ ০১:৫৯:২৫

গণতন্ত্রহীনতার কারণে দেশে জবাবদিহিতা নেই,আইনশৃঙ্খলার অবনতি ঘটেছে,বখাটে এবং কিশোর গ্যাং এর উত্পাত বেড়েছে।

Kazi

২০২১-০৭-২২ ০০:১৯:৫২

১৯৬৯ সালের নির্বাচনের পর বাংলাদেশে কখনো গনতন্র ছিল না । ঐ সময় গণতান্ত্রিক রাজনৈতিক দল ছিল । এখন কোন দল গণতান্ত্রিক উপায়ে গঠিত ও নয় তাই গণতন্ত্র ও নাই ।

Shobuj Chowdhury

২০২১-০৭-২২ ১১:৩৭:৫৫

The trouble is People like Ashok doesn't matter where they work and live, they will find excuses to support dictators as long as they remain Indian puppies.

Md. Harun al-Rashid

২০২১-০৭-২২ ১১:২৫:৫৯

তুলনামূলক বিচারে বাংলাদেশ অনেক এগিয়েছে। তবে দ্বিদলীয় ব্যবস্থায় রাজনীতির যথার্থ চর্চা হয়। হাড্ডা হাড্ডি প্রতিযোগিতা হয়। মত ভিন্নতার প্রবল দাপটে সঠিক সিন্ধান্তে পৌঁছতে পারা যায়। দিন শেষে গনতন্ত্রেরই জয় হয়। এখন এমন অবস্থা হয়েছে যে বহু দলের অস্থিত্ব সর্বস্ব দলাদলিকে দলভারির উপলক্ষ করে বিরোধীরাও নিজেদের যৌক্তিক বিরোধী দলিয় দায়িত্ব জলাঞ্জলি দিয়ে সরকারের অংশ হতে গিয়ে স্ববিরোধী হয়ে পড়েছে। ফলে এরা স্বাধীনভাবে দাড়াবার সক্ষমতা হারিয়ে ফেলেছে। বস্তুুত যাদের বিরোধী দল ভাবা হয় তারা অনেকটা ওহী (!) নির্ভর ও নেতৃত্বশূণ্য আহালে মসনদ অদৃষ্টবাদি দলে পরিনত হয়েছে।

আপনার মতামত দিন

অনলাইন অন্যান্য খবর



অনলাইন সর্বাধিক পঠিত



DMCA.com Protection Status