বিদেশে পড়াশোনা প্রকল্প

বাস্তবায়নে গণ্ডগোল

সিরাজুস সালেকিন

প্রথম পাতা ১৮ জুলাই ২০২১, রোববার | সর্বশেষ আপডেট: ১২:৪৬ অপরাহ্ন

প্রকল্পটির উদ্দেশ্য মহৎ, লক্ষ্যও চমৎকার। কিন্তু বাস্তবায়নের প্রক্রিয়ায় যত সব গণ্ডগোল। প্রশাসনের ইঞ্জিন খ্যাত জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয় গৃহীত কর্মকর্তাদের বিদেশে উচ্চতর পড়াশোনা বিষয়ক প্রকল্প এটি। সব ক্যাডারের জন্য প্রকল্পটি গ্রহণ করা হলেও দৃশ্যত এখানে একটি ক্যাডারের স্বার্থ রক্ষার জন্যই যেন সব আয়োজন! কিন্তু তাতেও এতদিন কেউ আপত্তি করেনি। উদ্বেগের জায়গা হচ্ছে- সাম্প্রতিক সময়ে ওই প্রকল্পে নারী-পুরুষ বিস্তর বৈষম্যের অভিযোগ উঠেছে। প্রশাসন যন্ত্র তো বটেই, সর্বত্র নারী-পুরুষ সমান অধিকার প্রতিষ্ঠায় বাংলাদেশ বহুদূর এগিয়েছে। যা বিশ্ব দরবারে প্রশংসা কুড়াচ্ছে। কিন্তু সরকারের গুরুত্বপূর্ণ অঙ্গ জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ে চলছে উল্টো যাত্রা।
আর এ নিয়ে প্রশ্ন তুলেছে খোদ বিসিএস উইমেন নেটওয়ার্ক। কড়া লকডাউনের মধ্যে তারা এ নিয়ে সোচ্চার। সংগঠনের প্রেসিডেন্ট ড. মোছাম্মৎ নাজমানারা খানুম জানিয়েছেন, বিসিএস ক্যাডার কর্মকর্তাদের সক্ষমতা বৃদ্ধির মাধ্যমে সরকারকে শক্তিশালীকরণ-২য় পর্যায় (১ম সংশোধিত) শীর্ষক প্রকল্পের অধীনে বিদেশে পড়াশোনায় ৮০ শতাংশ পুরুষ কর্মকর্তা পাঠানো হয়। যা নারী কর্মকর্তাদের প্রতি রীতিমতো অন্যায়। নারীদের অগ্রাধিকার বিবেচনায় ন্যূনতম ২০ শতাংশ নারী কোটা রাখার প্রস্তাব করা হয়েছিল জানিয়ে তিনি বলেন, প্রকল্পের আরডিপিপিতে ‘ন্যূনতম’ শব্দটি বাদ দিয়ে ৮০ শতাংশ পুরুষ আর ২০ শতাংশ নারী কোটা করে দেয়া হয়েছে, যা রহস্যজনক। তিনি বলেন, প্রতিযোগিতাটা উন্মুক্ত অর্থাৎ যোগ্যতার বিচারে নারী-পুরুষ নির্বিশেষে যে কেউ আসবে এমনটি হলেও চলতো। নারী কর্মকর্তারা নিজ যোগ্যতার প্রমাণ দিয়ে নির্বাচিত হতেন। কিন্তু তা না করে মোট আসনের ৮০ শতাংশ পুরুষ কর্মকর্তাদের সংরক্ষিত রাখাটা মোটেও সমীচীন হয়নি। তিনি জানান, বিষয়টি নিয়ে সংগঠনের অভ্যন্তরীণ বৈঠকে কথা ওঠার পরপরই সেক্রেটারির নেতৃত্বে একটি প্রতিনিধিদলকে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের সঙ্গে সার্বক্ষণিক যোগাযোগের দায়িত্ব দেয়া হয়েছে।
প্রকল্প কার্যালয় সূত্রে জানা গেছে, ২০১৮-১৯ অর্থবছরে মোট ৪০ জন মাস্টার্স ফেলোশিপের জন্য মনোনীত হয়েছিলেন। এদের মধ্যে প্রশাসন ক্যাডারের ২৩ জন, পুলিশ ক্যাডারের ৬, গণপূর্তের একজন, ট্যাক্স ক্যাডারের একজন, রেলওয়ে ক্যাডারের একজন, খাদ্য ক্যাডারের একজন, শিক্ষা ক্যাডারের ৩জন, মৎস্য ক্যাডারের একজন এবং স্বাস্থ্য ক্যাডারের ২ জন ছিলেন। করোনাকালীন ২০১৯-২০ অর্থবছরে মাস্টার্স পর্যায়ে মোট ৬০ জন ফেলোশিপের জন্য মনোনীত হন। এর মধ্যে প্রশাসন ক্যাডারের ছিলেন ৩৬ জন, পুলিশ ক্যাডারের ৮ জন, স্বাস্থ্য ক্যাডারের একজন, শিক্ষা ক্যাডারের ৭ জন, পরিবার পরিকল্পনা ক্যাডারের একজন, ট্যাক্স ক্যাডারের ২ জন, পোস্টাল ক্যাডারের একজন, সড়ক ও জনপথ ক্যাডারের একজন, তথ্য ক্যাডারের একজন এবং কৃষি ক্যাডারের ২ জন। বর্তমান ২০২০-২১ অর্থবছরে ৭০ জন মাস্টার্স পর্যায়ে ফেলোশিপের জন্য মনোনীত হয়েছে। ক’দিন আগে ওই মনোনয়ন চূড়ান্ত হয়েছে। সেখানে প্রশাসন ক্যাডারের ৪৯ জন, পুলিশ ক্যাডার ৭, কাস্টমস ৩, কৃষি ক্যাডার ২, মৎস্য ক্যাডার একজন, পররাষ্ট্র ক্যাডারের ৪, শিক্ষা ক্যাডারের ২, ট্যাক্স ক্যাডারের একজন এবং রেলওয়ে প্রকৌশল ক্যাডারের একজন মনোনীত হয়েছেন। এ ছাড়া একই অর্থবছরে প্রশাসন ক্যাডারের ৭ কর্মকর্তা পিএইচডি ফেলোশিপের জন্য মনোনয়ন পেয়েছেন। তাদের ৬জন পুরুষ আর একজন মাত্র নারী। পিএইচডি মনোনয়নের ক্ষেত্রে বিদ্যমান বৈষম্যপূর্ণ নীতিমালার শর্ত অর্থাৎ ২০ শতাংশ নারী কোটাও মানা হয়নি। অন্য ক্যাডার তো বাদই।
প্রশাসন ক্যাডারের দখলে ৭০ শতাংশ, ক্ষুব্ধ অন্যরা: একুশ শতকের অত্যাসন্ন চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় সত্যিকার দক্ষ জনবল তৈরির লক্ষ্যে রাষ্ট্রের প্রথম শ্রেণির কর্মকর্তাদের বিদেশে উচ্চতর পড়াশোনায় সরকার গৃহীত প্রকল্পের বেশির ভাগ ফেলোশিপই প্রশাসন ক্যাডারের দখলে! অথচ সরকারি কর্মকমিশন (পিএসসি) এর নিয়োগকৃত ২৭ ক্যাডারের কর্মকর্তাদের জন্য এ সুযোগ অবারিত হওয়ার কথা ছিল। কিন্তু না, তা হয়নি। পরিসংখ্যান বলছে, ৩ বছরে বিসিএস ক্যাডার কর্মকর্তাদের সক্ষমতা বৃদ্ধি সংক্রান্ত প্রকল্পের আওতায় ১৭০ জন বিদেশে মাস্টার্স এবং পিএইচডি কোর্সে মনোনয়ন পেয়েছেন। যার মধ্যে ১০৮ জনই প্রশাসন ক্যাডারের। উদ্বেগের বিষয় হচ্ছে প্রকল্পটির আরডিপিপি’তেই কর্মকর্তা নির্বাচনের ক্ষেত্রে প্রশাসন ক্যাডার ৭০ শতাংশ এবং অন্যান্য ক্যাডারের মধ্যে ৩০ শতাংশ বণ্টনের কথা বলা রয়েছে। নীতিমালার খসড়া প্রণয়নকাল থেকে এ পর্যন্ত দফায় দফায় অন্যান্য ক্যাডারের কর্মকর্তারা এ নিয়ে দেন-দরবার করলেও সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয় তা আমলে নেয়নি। কর্মকর্তা নির্বাচনের ক্ষেত্রে এমন দৃষ্টিভঙ্গিকে বৈষম্যমূলক মনে করছেন প্রশাসন ব্যতীত অন্যান্য ক্যাডারের কর্মকর্তারা। ফলে বিসিএস কর্মকর্তাদের সক্ষমতা বৃদ্ধির যে লক্ষ্য নিয়ে প্রকল্পটি যাত্রা শুরু করেছিল তা ব্যাহত হচ্ছে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। এ বিষয়ে বিসিএস স্বাস্থ্য ক্যাডার এসোসিয়েশনের সভাপতি অধ্যাপক ডা. সেলিম রেজা বলেন, এটা সুস্পষ্টভাবে বৈষম্য। যোগ্যতা থাকার পরেও অন্য সব ক্যাডারকে বঞ্চিত করে একটি বিশেষ ক্যাডারকে প্রাধান্য দেয়া সংবিধানের লঙ্ঘন। বিসিএস সাধারণ শিক্ষক সমিতির সাবেক সভাপতি প্রফেসর আইকে সেলিম উল্লাহ বলেন, এধরনের ফেলোশিপ শিক্ষকদের বেশি প্রয়োজন। কিন্তু সেখানে শিক্ষকদের অংশগ্রহণ সর্বনিম্ন। এখানে শিক্ষকদের সুনির্দিষ্ট কোটা থাকা উচিত। এ নিয়ে শিক্ষা ক্যাডারের কর্মকর্তাদের মধ্যে ক্ষোভও রয়েছে। বিসিএস লাইভস্টক এসোসিয়েশনের সভাপতি কৃষিবিদ ডা. ফজলে রাব্বী মণ্ডল আতা বলেন, জনপ্রশাসন ক্যাডারের এই ফেলোশিপে লাইভস্টক ক্যাডারের সুযোগ কম থাকায় আমরা এখন আর আবেদনই করি না।
প্রকল্পের লক্ষ্য-উদ্দেশ্য বিঘ্নিত হচ্ছে যে কারণে: প্রশাসন ক্যাডার ব্যাতীত অন্যান্য ক্যাডারের কর্মকর্তাদের অভিযোগ, প্রশাসন ক্যাডারের কর্মকর্তারা সাধারণত যে মন্ত্রণালয়ে কর্মরত থাকেন সেই মন্ত্রণালয় সংশ্লিষ্ট বিষয়ে মাস্টার্স কিংবা পিএইচডি ডিগ্রির জন্য আবেদন করেন। তারা যখন বিদেশে পড়াশোনা শেষে ফিরেন, তখন তাদের নতুন মন্ত্রণালয়ে পদায়ন করা হয়। ফলে বিদেশে অর্জিত বিশেষায়িত জ্ঞানের খুব কমই বাস্তবে তারা কাজে লাগাতে পারেন। কিন্তু প্রশাসন ব্যতীত অন্য ক্যাডারের কর্মকর্তাদের চাকরি জীবনের প্রায় পুরোটাই একই বিষয় নিয়ে কাজ করতে হয়। প্রকল্পটির আরডিপিডিতে বলা আছে, এই উদ্দেশ্য ও লক্ষ্যমাত্রা হচ্ছে, দেশে সুশাসন নিশ্চিত করার জন্য জনপ্রশাসনের ভূমিকা অতীব গুরুত্বপূর্ণ। পরিবর্তনশীল বিশ্বের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে বাংলাদেশের জনপ্রশাসনের উন্নয়নের জন্য বিসিএস ক্যাডার কর্মকর্তাদের জ্ঞান, যোগ্যতা ও দক্ষতা বৃদ্ধির কোনো বিকল্প নেই। বিসিএস ক্যাডার কর্মকর্তারা মাঠ পর্যায়ে এবং মন্ত্রণালয় উভয় স্থানেই কর্মরত আছেন। একুশ শতকের চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় রূপকল্প-২০২১ ও ২০৪১ এবং টেকসই উন্নয়নের লক্ষ্য অর্জনের জন্য যোগ্য ও গতিশীল প্রশাসন তৈরির লক্ষ্যে সকল ক্যাডারের উপযুক্ত কর্মকর্তাদের সুশাসন, উন্নয়ন, প্রশাসনিক পরিবেশ ব্যবস্থাপনা, জলবায়ু পরিবর্তন, নবায়নযোগ্য শক্তি, উন্নয়ন অর্থনীতি, উন্নয়ন পরিকল্পনা, প্রকল্প প্রক্রিয়াকরণ ও ব্যবস্থাপনা, প্রকল্প পরিবীক্ষণ ও মূল্যায়ন, অর্থ ব্যবস্থাপনা, সম্পদ ব্যবস্থাপনা, দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা, তথ্য-প্রযুক্তি ও টেকসই উন্নয়ন প্রভৃতি বিষয়ে মাস্টার্স ও পিএইচডি ডিগ্রি এবং স্বল্প মেয়াদি প্রশিক্ষণ প্রদান করাই অন্যতম উদ্দেশ্য। প্রকল্পটির প্রাক্কলিত ব্যয় ধরা হয়েছিল ৩০৯ কোটি ৪ লাখ ২৯ হাজার টাকা।

পাঠকের মতামত

**মন্তব্য সমূহ পাঠকের একান্ত ব্যক্তিগত। এর জন্য সম্পাদক দায়ী নন।

Md. Abul Hashem

২০২১-০৭-১৮ ০৭:৫১:৪০

This type of project is highly needed for University teachers. Unfortunately, University teacher seeks grant/fellowship by himself or herself. Nobody think for their capacity building. Dr. Hashem BAU, Mymensingh

আপনার মতামত দিন

প্রথম পাতা অন্যান্য খবর

শুভ জন্মদিন, প্রধানমন্ত্রী

২৮ সেপ্টেম্বর ২০২১

গত মাসের চেয়ে চলতি মাসে রেমিট্যান্স কমেছে

২৮ সেপ্টেম্বর ২০২১

চলতি বছরের সেপ্টেম্বর মাসের প্রথম ২৩ দিনে দেশে প্রবাসীদের পাঠানো রেমিট্যান্স  এসেছে ১৩৯ কোটি ১৭ ...

এসএসসি ১৪ই নভেম্বর, এইচএসসি ২রা ডিসেম্বর শুরু

২৮ সেপ্টেম্বর ২০২১

চলতি বছরের এসএসসি, এইচএসসি ও সমমান পরীক্ষার সময়সূচি চূড়ান্ত করে অনুমোদন দিয়েছে শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমিক ...

করোনাকালে তথ্য অধিকারের নজিরবিহীন সংকোচন ঘটেছে

২৮ সেপ্টেম্বর ২০২১

বাংলাদেশে কোভিড-১৯ মহামারির গত ১৮ মাসে জনগণের তথ্য অধিকারের ক্রমাগত লঙ্ঘন ও সংকোচনের নজিরবিহীন প্রবণতায় ...

অনুমোদনহীন ক্ষুদ্র ঋণের ব্যবসা বন্ধে হাইকোর্টের নির্দেশ

২৮ সেপ্টেম্বর ২০২১

দেশে যেসব সংগঠন বা প্রতিষ্ঠান অনুমোদন ছাড়াই ক্ষুদ্র ঋণের ব্যাবসা করছে ওইসব প্রতিষ্ঠান বন্ধের পাশাপাশি ...

খবর নেই বাস রুট পুনর্গঠনের

সড়কে বিশৃঙ্খলা

২৭ সেপ্টেম্বর ২০২১

ইভানার মৃত্যু

অবশেষে মামলা, আলামত জব্দের দাবি

২৭ সেপ্টেম্বর ২০২১

পাঠ্যবইয়ে বঙ্গবন্ধুকে নিয়ে ভুল

এনসিটিবি’র চেয়ারম্যানকে তলব

২৭ সেপ্টেম্বর ২০২১

মাধ্যমিক ও উচ্চ মাধ্যমিক পর্যায়ের পাঠ্য বইয়ে থাকা ভুলের ঘটনায় জাতীয় শিক্ষাক্রম ও পাঠ্যপুস্তক বোর্ডের ...

পেশাজীবীদের সঙ্গে বৈঠক করবে বিএনপি

২৭ সেপ্টেম্বর ২০২১

ভবিষ্যৎ করণীয় ঠিক করতে দলের কেন্দ্রীয় ও অঙ্গ সংগঠনের শীর্ষ নেতাদের সঙ্গে দুই দফা সিরিজ ...

সংসদ সচিবালয়ের এ কেমন বার্তা?

২৭ সেপ্টেম্বর ২০২১



প্রথম পাতা সর্বাধিক পঠিত



ভারতে টাকা ফেরত পাচ্ছেন ভুক্তভোগীরা

গ্রাহকের টাকা ফেরানোর উপায় কি?

ডেসটিনি-যুবক থেকে ইভ্যালি

হতাশার যে গল্পের শেষ নেই

খবর নেই বাস রুট পুনর্গঠনের

সড়কে বিশৃঙ্খলা

DMCA.com Protection Status