পোলাও-কোরমা খেয়ে আমরা জামাতে মরার প্রস্তুতি নিচ্ছি

হাসান তারেক চৌধুরী

ফেসবুক ডায়েরি ১৪ জুলাই ২০২১, বুধবার | সর্বশেষ আপডেট: ১০:২৯ পূর্বাহ্ন

“We’ve dressed up in our best and are prepared to go down like gentlemen.” - আমরা যতটা সম্ভব সুন্দরভাবে নিজেদের সাজিয়েছি, এবং একজন ভদ্রলোকের মতো ডুবে যেতে প্রস্তুতি নিয়েছি।“

ডুবে মারা যাওয়ার কিছুক্ষণ আগে কথাটি বলেছিলেন, টাইটানিকের একজন অভিজাত যাত্রী, বেনজামিন গুগেনহেইম। অনেকেই এটিকে আভিজাত্যের অহংকার হিসেবে ধরে নিলেও, বেশিরভাগ মানুষই একে বীরত্বসূচক উক্তি বলেই মনে করেন। সে যাই হোক, এই উক্তিটি আজ আমার মনে হলো এসব কারণে না, অন্য একটা কারণে। কোভিডের সূচনার পর দেশ যখন সংক্রমণ ও মৃত্যুর সবচেয়ে ভয়াবহ অবস্থার মধ্য দিয়ে অতিক্রম করছে, ঠিক তখনই দেখলাম এক সরকারী প্রজ্ঞাপন - কোরবানি ঈদ উপলক্ষ্যে পাবলিক ট্রান্সপোর্ট এবং বিপণী বিতান খোলা রাখার অনুমতি দেয়া হয়েছে। অর্থাৎ, যথাসম্ভব সাজগোজ করে, গরু-ছাগলের মাংস ও পোলাও-কোরমা খেয়ে আমরা জামাতে মরার প্রস্তুতি নিচ্ছি।

অনেকেই হয়তো আমার উপর ভীষণ রেগে যাবেন। বুলি কপচাবেন, গরীবের পেটে খাবার না থাকলে তারা লকডাউন মানবে না। খুব সত্যি কথা, অনেকবার বলা হয়েছে এটা।
কিন্তু এই সত্যি কথার আড়ালেও আরেকটি সত্যিও আছে। যেখানে ১৫ থেকে ২০ দিন কারফিউয়ের আদলে লকডাউন দিলেই এই মহামারী অনেকখানি নিয়ন্ত্রণে আনা সম্ভব, আমরা সেটা না করে কেন বারবার অর্থহীন লকডাউন আরোপ করে যাচ্ছি? দেশের ইতিহাসে সর্বোচ্চ রিজার্ভ এখন আমাদের দেশে, নিজেদের অর্থায়নে আমরা পদ্মা সেতু করছি, বিদেশি সহায়তা সহ মেট্রোরেল, নদীর নিচে টানেল সহ নানাবিধ কর্মকান্ড চালাচ্ছি, তারা কি ১৫-২০ দিন দেশের এই দরিদ্র জনগণের মুখে খাবার তুলে দেয়ার যোগ্যতা রাখিনা? নিশ্চয় আমাদের সেই যোগ্যতা আছে, শুধু পরিকল্পনার অভাব। কেন বলছি একথা? ব্যাখ্যা করছি।

সর্বশেষ তথ্য অনুসারে এদেশের মানুষের শতকরা ২০.৫ দরিদ্র সীমার নিচে এবং শতকরা ৩৭-৪০ ভাগ মানুষ মধ্যবিত্ত আয় সীমায় অন্তর্ভূক্ত । তবে দরিদ্র ও নিম্ন মধ্যবিত্ত মিলে প্রান্তিক সীমার আশেপাশে বা নিচে আছে প্রায় ৪০ শতাংশ মানুষ। অর্থাৎ, ১৫-২০ দিনের কঠোর অবরোধে এই ৪০ শতাংশ অর্থাৎ প্রায় ৬.৫ কোটি মানুষই খাদ্য ও চিকিৎসা সংকটে পড়তে পারে।  
এবার আসা যাক, এই ৬.৫ কোটি মানুষকে ১৫ দিনের খাদ্য সহায়তা দিতে কত টাকা প্রয়োজন পড়বে?

- গড়ে ৪ জন মানুষে একটি পরিবার ধরলে ৬.৫ কোটি মানুষে গড়ে ১.৬৩টি পরিবার হয়। -
- প্রতিটি পরিবারকে (৪ জন হিসেবে) ১৫ দিনের জন্য ৫,০০০ টাকা করে নগদ বা সমমূল্যের খাদ্য সহায়তা দিলে, মোট খরচ ৮,১৫০ কোটি টাকা।
- আমাদের দেশে বিতরণ ব্যয় সামান্য বেশি। তাই, ধরে নিলাম এই ৮,১৫০ কোটি টাকা বিতরণের জন্য আরও ৮,১৫০ কোটি টাকা প্রয়োজন। তাহলে, মোট দরকার হবে ১৬,৩০০ কোটি টাকা।

আপনার মনে হতে পারে, এটা অনেক অনেক টাকা। কিন্তু তাই কি?

যে দেশে স্বল্প পরিচিত একটি মাত্র সাধারণ প্রতিষ্ঠান তিন হাজার কোটি টাকা পাচার করার সংবাদে দায়িত্বশীল কেউ কেউ বলেন এটা তেমন কোনো বড় ব্যাপার না। সেখানে রাষ্ট্রের পক্ষে ১৬,৩০০ কোটি টাকা তো কোনো টাকাই না! এই প্রসঙ্গে আরেকটি কথা মনে করিয়ে দিচ্ছি, কোভিডের প্রথম ওয়েভে দেশের সম্ভাব্য অর্থনৈতিক প্রভাব উত্তরণে সহায়তা দেয়া হয়েছিলো মোট ৭২ হাজার ৭৫০ কোটি টাকা।

এই সহায়তা কাদের দেয়া হয়েছিলো? উত্তর আমরা সবাই জানি - ব্যবসায়ীদের।  

এবার প্রশ্ন করা যেতে পারে, তাহলে শিল্প মালিকদের কী হবে? এর উত্তর হলো, মাত্র ১৫ দিন লকডাউন থাকলে যে মালিকেরা তাদের শ্রমিকদের বেতন দিতে সরকারের কাছে হাত পাতে, তারা নিজেরাও আসলে সম্পূর্ণ দেউলিয়া অবস্থায় আছে। তাই, সরকার যখন এইসব প্রতিষ্ঠানে কর্মরত নিম্ন আয়ের শ্রমিকদের খ্যদ্য সহায়তা পাঠাবে, দেউলিয়া হিসেবে তাদেরকেও সমমূল্যের কয়েক বস্তা ত্রাণ-সামগ্রী পাঠিয়ে দিলেই চলবে।

আসল বিষয় হলো প্রায়োরিটি। প্রথম প্রায়োরিটি মানুষের জীবন, তারপর খাদ্য, তৃতীয় বাসস্থান। তাই প্রথমেই মানুষের জীবনের বাঁচাতে প্রয়োজনীয় যা কিছু করা দরকার, তাই করতে হবে। তারপর বাসস্থানের ব্যবস্থা। অবশ্য এক্ষেত্রে লক্ষ্য রাখতে হবে যেন হস্তান্তরের আগেই উপহারের সেই ঘর ভেঙে না পড়ে, অথবা রাতের আঁধারে জ্বীন এসে গায়েব না করে দেয়। তারপর না-হয় অন্য উন্নয়ন হবে -  আমরা তখন মনের সুখে উড়োজাহাজে বা সাবমেরিনে চড়ে রেশন তুলতে যাবো।

[হাসান তারেক চৌধুরী বিজ্ঞানবিষয়ক লেখক। লেখাটি তার ফেসবুক থেকে নেয়া]

পাঠকের মতামত

**মন্তব্য সমূহ পাঠকের একান্ত ব্যক্তিগত। এর জন্য সম্পাদক দায়ী নন।

shamsuirrahman

২০২১-০৭-১৯ ১০:৫৬:২০

আসল ব্যাপার হচ্ছে কুল রাখি না শ্যাম রাখি।

md.bodrul.alom

২০২১-০৭-১৪ ১৫:৩৮:৩০

লকডাউন যারা চায় তারা সরকারি লোক কারণ তাদের প্রতি মাসের টাকা সরকার থেকে পায় ঘরে বসে।। যারা নিম্ন আয়ের মানুষ দিন আনে দিন খায় তারা কি করবে তাদের কথা বিবেচনা করা উচিৎ। কারণ তারা তো আমাদের মত মানুষ। অনেক মানুষ আছে তারা করুনায় মরবে না মরবে খাবারের অভাবে

Md. Abbas Uddin

২০২১-০৭-১৪ ২১:৩৪:৫৯

অজ্ঞ ও মুর্খ্যরা বলেছিল দেশে করনা নেই, , করনা বড় লোকের রোগ, , করনা শহরের রোগ, , করনা গরীব বা গ্রামের মানুষকে কিছুই করতে পারবে না, , বস্তির মানুষের মধ্যে করনা রোগী পাওয়া যায় নাই,, মসজিদ-মাদ্রাসায় করনা প্রবেশ করতে পারে না, , মুসলিম দেশে করনা কিছুই করতে পারবে না ত্যাদি.......... ইত্যাদি। বাস্তব সত্যটি হল করনায় এখন গ্রামের অনেক গরীব মানুষ মারা যাচ্ছে। করনায়0 মুসলিম মারা যাচ্ছেন। করনায় মসজিদের ইমাম, মুসল্লি মারা যাচ্ছে। করনায় আমার জানামতে আমার বাসার পাশের একটি মসজিদ কমিটির ২ জন সভাপতি মারা গিয়েছেন। বস্তিতে করনা পরীক্ষা করে দেখা গেছে বস্তিতে করনা সনাক্তের হার ৭০%। অর্থাৎ করনা ধনী-গরীব, নামাজি-বেনামাজি কাহাকেও ছাড় দেয় না। আসুন সবাই মিলে মাস্ক পরি লকডাউনকে বিদায় করি। বৈজ্ঞনিকগন গভেষনা করে দেখেছেন মাস্ক পরার (সঠিক নিয়মে) মাধ্যমে ৭০%-৮০% সংক্রমণ কমানো সম্ভব (ইনশাআল্লাহ্‌)।

Md. Abbas Uddin

২০২১-০৭-১৪ ২১:৩৩:১২

করনায় বাংলাদেশের এই বিপদের মুহূর্তে যাহারা মাস্ক পরবেন না তাদেরকে জাতির দুষমন হিসাবে ঘোষণা করা হউক এবং মাস্ক না পরলে তাদের থেকে বড় অংকের জরিমানা আদায় করে গরীবের জন্য ফান্ড তৈরী করতে হবে। বৈজ্ঞনিকগন গভেষনা করে দেখেছেন মাস্ক পরার (সঠিক নিয়মে) মাধ্যমে ৭০%-৮০% সংক্রমণ কমানো সম্ভব। আসুন সবাই মিলে মাস্ক পরি লকডাউনকে বিদায় করি। করনা সংক্রমণ ‘০’ লেভেলে না আসা পর্যন্ত নিয়মিতভাবে সঠিকভাবে মাস্ক না পরলে আমাদেরকে বারে বারেলকডাউনে পড়তে হবে। স্বাস্থ্যবিধি বিশেষ করে জনগণকে মাস্ক পরার ব্যাপারে জনপ্রতিনিধিদের সম্পৃক্ত করে ব্যাপক মাইকিং করা হয় নাই এটা সরকারের চরম ব্যার্থতা।

Mahbub

২০২১-০৭-১৪ ২০:১৮:১৯

প্রতিটি কোরবানীর পশুর মূল্য+হাসিল+কসাই+চামড়া+পরিবহন ও অন্যান্য খরচ গড়ে ৮০ হাজার করে হলে কেবল ১ কোটি ১৯ লাখ কোরবানীর পশুর মূল্যই ৯৫২,০০০,০০০,০০০ টাকা!

Mashrur

২০২১-০৭-১৪ ০৬:৪৩:৪৫

Rightly said and very well said indeed. It all depends on the intentions and priorities.

শহীদ

২০২১-০৭-১৪ ১৮:১৮:৪২

আরেকজনের ফেসবুক স্টাটাস এখানে কেন? যারা লকডাউন চায়/কারফিউ চায় তাদের কিছু দিনের জন্য লকআপে রাখা হোক। ওখানে থাকা, খাওয়া ফ্রি! বিশাল ভুসম্পত্তির মালিক আর খেটে খাওয়া কুড়ে ঘরের মালিকের জীবন যাপন এক নয়। চিন্তাও এক নয়। বাড়িওয়ালা আর ভাটাটিয়ার অবস্থাও এক না। বড় বড় কর্মকর্তারা বিশাল বাংলো নিয়ে বসবাস করতে পারেন। বেলকনিতে বসে দখিনা হাওয়া নানান “বুদ্ধি” আবিষ্কার করতে পারেন। কিন্তু যাদের বেলকনি নাই, আলো-বাতাস ঢুকার মত রুম নেই। প্রায় বিদ্যুৎহীন ঘরে তারা বসবাস করতে পারে না। তাদের নিত্য ছুটা লাগে খাদ্য অন্বেষণে। লকডাউনের পক্ষে ও বিপক্ষে গণভোট হয়ে যায়। সুক্ষকারচুপি, স্থুলকারচুপি, ভোটডাকাতি, নিশিভোট ছাড়া। যারা লকআপে থাকতে চায়; তাদের সেখানে রাখা হোক।

Mohammad Kabir

২০২১-০৭-১৪ ১৭:৫৪:৩৬

100% agree with the write-up. Wording could have been more and more rude. Many countries of Muslims, Christians and other faiths did not prioritize festivals like Eids, Christmas etc. since Covid-19 break out from February 2020 till now at the cost of people's life. Australia, New Zealand and some Muslim countries are examples.

Mahbub

২০২১-০৭-১৪ ০৩:৪৩:০৩

মেধা শূন্য রাজনীতি এবং দূর্নীতি গ্রস্থ আমলাতন্ত্রের কাছে এর চেয়ে ভালো সিদ্ধান্ত কি আশা করা যায়? তাই এহেন সিদ্ধান্তে আশ্চর্য হইনি, লেখকের প্রস্তাবিত পরিকল্পনা ভস্মে ঘী ঢালার নামান্তর। ‌‌

Md. Abbas Uddin

২০২১-০৭-১৪ ১৫:৪৮:০৬

লিখাটি সময়োপযোগী এবং বাস্তব্ধর্মী। উনার শব্দ চয়নে রূঢ় হলেও বাস্তব কথাগুলি বেরিয়ে এসেছে। এনার খেদোক্তি সকল মানুষের উপর নয়। যেসব মানুষ স্বাস্থ্যবিধি না মেনে বিশেষ করে মাস্ক না পরে এদিক-সেদিক ছুটা-ছুটি করছেন, সীমাহীন আবেগতাড়িত হয়ে নিজেকে করনার কাছে সমর্পন করতে দৌড়-ঝাঁপ শুরু করেছেন তাদের উদ্দেশ্যেই হতো উনার লিখা। আমাদের সংশোধনের এখনও সুযোগ আছে।

Shoukat

২০২১-০৭-১৪ ০২:৩৭:৪৬

Kurbani foroz noy middle East r desh gulu puro lockdown whole Eid time amra vinno groher islam arob desh teke amra piyache R dari chul niya barabari kori apnar kota tik

Alim Zaman

২০২১-০৭-১৪ ০২:৩৪:১৯

AC রুমে বসে বসে বড় বড় ফেসবুক স্ট্যটাস প্রসব করা বুদ্ধিজীবিরা আর যা ই করতে পারে না কেনো, সমাজের সাধারন শ্রেনীর মানুষের দুক্ষ তারা কখনোই উপলগ্ধি করতে পারবে না।

মাহবুব সিদ্দিকী

২০২১-০৭-১৪ ০২:৩২:৪৩

একটা “ছোট ব্যাপার” বাদ পড়ে গেল। বিতরন খরচ ছাড়াও চুরি খরচ যোগ হয় নাই ।

Sadek Hossain

২০২১-০৭-১৪ ০২:১৮:০২

Oh

Aftab Chowdhury

২০২১-০৭-১৪ ০২:০৪:৪৮

কৌশলে সে আসলে কুরবানির বিরোধিতা করতেই শীবের গান গাইল ।

নেছার আহমেদ

২০২১-০৭-১৪ ১৪:১৬:৩৭

আপনার লেখার ৯৯% উপাদানের সাথে আমি একমত শুধু শব্দ চয়নের ক্ষেত্রে " যথাসম্ভব সাজগোজ করে, গরু-ছাগলের মাংস ও পোলাও-কোরমা খেয়ে আমরা জামাতে মরার প্রস্তুতি নিচ্ছি" এই অংশটুকু কটুময় মনে হয়েছে । শব্দ চয়নটা অন্যভাবে লিখলে ১০০% সহমত দিতে পারতাম !!

আপনার মতামত দিন

ফেসবুক ডায়েরি অন্যান্য খবর

কি মর্মান্তিক!

৯ জুলাই ২০২১



ফেসবুক ডায়েরি সর্বাধিক পঠিত



পিতার জন্মদিনে মেয়ের আবেগঘন স্ট্যাটাস

‘মির্জা আলমগীরের সারাজীবনের রাজনীতি বৃথা যাবে না’

DMCA.com Protection Status