ভ্যাকসিন উৎপাদন ত্বরান্বিত করা হোক

এ এম এম নাসিরউদ্দিন

মত-মতান্তর ১১ জুলাই ২০২১, রোববার | সর্বশেষ আপডেট: ৩:৫৯ অপরাহ্ন

করোনা আগ্রাসী রূপ নিয়েছে। দেশে করোনায় প্রতিদিন মারা যাচ্ছে দু'শতাধিক মানুষ। হাসপাতালগুলো করোনা রোগীতে ঠাসা। সংক্রমণ (ডেল্টা ভ্যারিয়েন্ট) ব্যাপকভাবে প্রতিদিন বাড়ছে এবং গ্রামাঞ্চলে ছড়িয়ে পড়েছে। শহরে হাসপাতালগুলোতে আইসিইউ বেড খালি নেই। জীবন জীবিকার সমন্বয় করতে গিয়ে লকডাউন ও ফলপ্রসূভাবে কার্যকর করা যাচ্ছে না। লকডাউন কার্যকর করা উন্নত দেশ সহ সব দেশের জন্যই বিরাট চ্যালেঞ্জ। অন্যদিকে, পেরুতে প্রথম শনাক্ত করোনার ‘ল্যাম্বডা ভ্যারিয়েন্ট’ ত্রিশটিরও বেশি দেশে ছড়িয়ে পড়েছে যা চতুর্থ ঢেউ হিসেবে দেখা দিতে পারে।


১। যে সমস্ত দেশ কোভিড-১৯ নিয়ন্ত্রণে সফল হয়েছে, দেখা যাচ্ছে ওই দেশগুলো তাদের ব্যাপক জনগোষ্ঠীকে টিকার আওতায় নিয়ে এসেছে। যথা, এক্ষেত্রে সফল দেশ অস্ট্রেলিয়া, নিউজিল্যান্ড, হংকং, ইসরাইল, আমেরিকা, যুক্তরাজ্য, ইউরোপের বিভিন্ন দেশ ব্যাপকভাবে টিকার প্রয়োগ নিশ্চিত করেছে। ব্যাপক টিকা কার্যক্রম ব্যতিরেকে আমাদের দেশেও করোনা নিয়ন্ত্রণের বিকল্প কোন উপায় দেখি না। বাংলাদেশ প্রয়োজনীয় টিকা সংগ্রহের চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে। কিন্তু প্রয়োজনীয় টিকার সংস্থান করতে না পারায়, টিকা কার্যক্রমে এক ধরনের হযবরল অবস্থার সৃষ্টি হয়েছে। এযাবৎ বিভিন্ন কোম্পানির এক কোটির কিছু বেশি টিকার সংস্থান হয়েছে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, দেশে হার্ড ইমিউনিটির জন্য ১২ থেকে সাড়ে ১২ কোটি লোককে টিকার আওতায় আনতে হবে। এ জন্য প্রায় পঁচিশ কোটি টিকার প্রয়োজন। বিভিন্ন উৎস থেকে ২০-৩০ লাখ করে টিকা এনে যেভাবে আমরা এগোচ্ছি তাতে প্রয়োজনীয় টিকা জোগাড় করতে বহু বছর লেগে যাবে। যারা টিকা ইতোমধ্যে নিয়েছেন তাদের টিকার কার্যকারিতা কতদিন থাকবে তা নিশ্চিত নয়। এক বা দু বছর পর তাদের আবার টিকা দিতে হলে, টিকার চাহিদা আরো বাড়বে।

২। পৃথিবীতে উৎপাদিত মোট করোনা টিকার প্রায় ৮০% ১০-১২টি উন্নত দেশ নিয়ে গেছে। ভারতের সিরাম ইন্সটিটিউট চুক্তি ভঙ্গ করে আমাদেরকে চুক্তিকৃত টিকার অর্ধেকেরও কম টিকা সরবরাহ করেছে। অবশ্য অতীতে চাল এবং পেঁয়াজ নিয়েও এ ধরনের আচরণ আমরা দেখেছি। এ থেকে শিক্ষনীয় হচ্ছে, আমাদের আত্মনির্ভরশীল হতে হবে। করোনার টিকা আমাদেরই উৎপাদন করতে হবে এবং তা অতি দ্রুত। এ ক্ষেত্রে সময় ক্ষেপণের সুযোগ নেই। কিউবা, ইরান, কাজাখস্তান নিজেরা টিকা উৎপাদন করছে।

৩। সরকার টিকা উৎপাদনের উদ্যোগ নিয়েছে বলে স্বাস্থ্যমন্ত্রী জানিয়েছেন। সরকারের সর্বোচ্চ পর্যায়েও এ ব্যাপারে দৃঢ় প্রত্যয় ব্যক্ত করা হয়েছে। গোপালগঞ্জে বিদ্যমান সরকারি ওষুধ কারখানার কাছেই ভ্যাকসিন তৈরির কারখানা হবে বলে স্বাস্থ্যমন্ত্রী জানিয়েছেন। Essential Drugs Company limited (EDCL) সরকারি মালিকানাধীন বৃহৎ ওষুধ উৎপাদনকারী কোম্পানি যা সরকারি হাসপাতালগুলোর ৬০% -৭০% ওষুধ সরবরাহ করে থাকে। অন্যদিকে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের অধীনে রয়েছে Institute of Public Health (IPH)। অনেক গবেষক এখানে কাজ করেন। আইপিএইচ-এ ভ্যাকসিন উৎপাদন ইউনিট রয়েছে এবং অতীতে আইপিএইচ কলেরা, ডিপিটি, পোলিও ভ্যাকসিন উৎপাদনও করেছে। অবশ্য অনিয়ম, অব্যবস্থাপনাও অবহেলায় সংস্থাটি এখন আগের অবস্থানে নেই। তবে কার্যকর উদ্যোগ ও বিনিয়োগের মাধ্যমে এটাকে অতি দ্রুত সচল করে করোনা ভ্যাকসিন উৎপাদন করা সম্ভব। Green Field প্রকল্পে টিকা উৎপাদন শুরু করা সময় সাপেক্ষ। আইপিএইচ-এর অভিজ্ঞতা ও বিদ্যমান সুবিধাদি ব্যবহার করে এবং প্রয়োজনীয় বিনিয়োগের মাধ্যমে অতি দ্রুত ভ্যাকসিন উৎপাদনের ব্যবস্থা নেয়া যেতে পারে।

৪। এমতাবস্থায়-
ক। আইপিএইচ এবং EDCL এর যৌথ উদ্যোগে ভ্যাকসিন উৎপাদনের ব্যবস্থা নেয়া হোক। আইপিএইচ-এর বিদ্যমান সুবিধাদি উন্নত করে প্রাথমিক পর্যায়ে আইপিএইচ-এর ভ্যাকসিন ইউনিটেই উৎপাদন শুরু করা হোক। পরবর্তীতে গোপালগঞ্জে ভ্যাকসিন ইউনিট-২ বাস্তবায়নের ব্যবস্থা করা যেতে পারে। এ দুটো ইউনিট চালু করা গেলে দেশের বর্তমান এবং ভবিষ্যত চাহিদা মিটিয়ে ভ্যাকসিন রপ্তানি করা সম্ভব। সময় এসেছে, ভ্যাকসিন উৎপাদনকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দিয়ে দ্রত উৎপাদন শুরুর ব্যবস্থা নেয়া। অবশ্য, Intellectual property Rights বাধা হতে পারে যা সুরাহা করতে হবে। আমাদের দেশে উদ্ভাবিত টিকা বঙ্গভ্যাক্স ট্রায়ালের অনুমোদন পেয়েছিল যার সর্বশেষ অবস্থা জানা যায়নি। দেশে টিকা উদ্ভাবন করা না গেলে রাশিয়া, চীন বা অন্য কোন দেশের ভ্যাকসিন কোম্পানির সাথে সহযোগিতা চুক্তির মাধ্যমে টিকা উৎপাদনের ব্যবস্থা নেয়া যায়।

খ। এ খাতে গবেষণায় বিপুল বিনিয়োগ প্রয়োজন। আইপিএইচ গবেষণার জন্য উত্তম প্রতিষ্ঠান। এ সুবিধা কাজে লাগানো জরুরি।
ভ্যাকসিন নিয়ে সিদ্ধান্ত নিতে হবে দ্রুত। কাজ করতে হবে War Footing এ।

লেখক: সাবেক সচিব

পাঠকের মতামত

**মন্তব্য সমূহ পাঠকের একান্ত ব্যক্তিগত। এর জন্য সম্পাদক দায়ী নন।

Kazi

২০২১-০৭-১০ ২২:২৩:৫৩

ফাইজার বলছে তৃতীয় ডোজ নিলে ৫ থেকে ১০ গুণ ইমিউনিটি বৃদ্ধি পায় । তাই প্রকৃত কার্যকর প্রতিরোধ ব্যবস্থা গড়ে তুলতে তৃতীয় ডোজ দিতে হবে । সে হিসাবে বাংলাদেশের ১২ কোটি লোকের জন্য ৩৬ কোটি টিকার দরকার। যা টাকা দিয়ে ও কিনা ও সরবরাহ পাওয়ার নিশ্চয়তা নাই । একমাত্র পথ নিজের দেশে উৎপাদন। দ্রুত সে ব্যবস্থা করাই একমাত্র সমাধান।

আপনার মতামত দিন

মত-মতান্তর অন্যান্য খবর

৯/১১-এর ছায়া!

১৩ সেপ্টেম্বর ২০২১

তালেবান ও ভারতের সমীকরণ

১১ সেপ্টেম্বর ২০২১

তালেবানদের কাতার কানেকশন!

৯ সেপ্টেম্বর ২০২১

ফিরে দেখা ৯/১১

৮ সেপ্টেম্বর ২০২১

আবার আফগান দৃশ্যপটে পানশির

৭ সেপ্টেম্বর ২০২১

দিন দিন হাসির খোরাক হচ্ছে পাকিস্তানি কূটনীতি

৬ সেপ্টেম্বর ২০২১

গত জুলাই মাসে ঘটনা। ইসলামাবাদের কূটনীতিক পাড়ায় খুব কাছাকাছি সময়ের দূটো ঘটনা। প্রথম ঘটনায় একজন ...



মত-মতান্তর সর্বাধিক পঠিত



দেখা থেকে তাৎক্ষণিক লেখা

কোটিপতিদের শহরে তুমি থাকবা কেন?

কাওরান বাজারের চিঠি

ছবিটির দিকে তাকানো যায় না

DMCA.com Protection Status