সেরা চিঠি

এই বুঝি মায়ের ফোন এলো!

সাজেদুল হক

২ জুলাই ২০২১, শুক্রবার, ১০:১৭ পূর্বাহ্ন

২রা জুলাই, ২০২০। দিনটা ছিল বৃহস্পতিবার। পশ্চিমের আকাশে লাল আভা। চুরিয়ে যাওয়া আলো। আপনার শরীরটা ভালো ছিল না। তবে কথা বলছিলেন স্পষ্ট।  তারপর এক বছর হয়ে গেল আপনার সঙ্গে আর দেখা নেই। মা, আপনি কেমন আছেন?
সেদিন বিকালে বাড়ি থেকে বের হওয়ার পর আপনি চিৎকার করে কাঁদছিলেন। বলছিলেন, আমাকে ডাকার জন্য। কেউ ডাকেনি। হয়তো লোকবিশ্বাসের কারণে। বাড়ি থেকে বের হওয়ার পর ফেরাতে নেই। পরে শুনে আমার এত কষ্ট হচ্ছিল। মা, মনে আছে ছোট বেলায় কুমিল্লা শহরে যাওয়ার সময় আমি কতো কাঁদতাম। আব্বা আমাকে অনেকটা পথ এগিয়ে দিতেন। কান্না আমার থামতোই না। বা তারও কিছু আগের কথা। প্রাইমারি স্কুলে পড়ি। স্কুলটা একেবারে কাছে নয়। বাড়ি আসতে বিকাল হয়ে যেতো। উঠানে পা দেয়ার আগেই চিৎকার করতাম- মা, ভাত দাও। বেশির ভাগ দিনই খেতাম দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে। মাঝে মাঝে আমার তীব্র জ্বর আসতো। চারদিকে অন্ধকার। যেন অন্য এক জগৎ। কপালে আপনার হাত। কখনো কখনো দেখতাম আপনি কাঁদছেন। অথবা আপনি যখন অসুস্থ হয়ে পড়তেন। আমাদের এত স্বজন। তবুও উদ্বিগ্ন হয়ে যেতেন। আমি কীভাবে বাঁচবো? আব্বা কিংবা কোনো ভাইবোনের হাতে আমাকে তুলে দিতেন।
চাষা পরিবার আমাদের। মধ্যবিত্ত। জমি-জিরাত ছিল। আয়ের একমাত্র উৎস ছিল কৃষি। বুঝতে পারি না এতকিছু কীভাবে সামলাতেন। প্রায় নিরক্ষর এক মা কীভাবে এতগুলো সন্তানকে স্কুলে-কলেজে পাঠালেন? কে আপনাকে বলেছিল- শিক্ষাই একমাত্র সবকিছু বদলাতে পারে। একসময় ভাইবোনেরা ছড়িয়ে পড়লাম নানা শহরে, ভিন দেশে। আমাদের হৃদয়ের টানটাও কি তাই বলে কমে গিয়েছিল? কুমিল্লা থেকে ঢাকা। আমার স্থানান্তর হলো। আমি ছিলাম খানিকটা চাপা স্বভাবের। কিছুটা বোকা। আপনি উদ্বিগ্ন থাকতেন চতুর মানুষদের শহরে কীভাবে টিকবে আপনার ছেলেটি। আপনি সবসময় বুঝার চেষ্টা করতেন আমার কিছু লাগবে কিনা? যা অন্য কাউকে বলছি না। মা মনে আছে, মোবাইল ফোন এসেছে খুব বেশিদিন হয়নি। আমাকে একটি মোবাইল কিনে দিয়েছিলেন। পরে অবশ্য এ মোবাইলই হয়ে পড়লো স্বজনদের সঙ্গে আপনার যোগাযোগের সবচেয়ে বড় মাধ্যম। এক-দুই দিন ফোন না করলেই আপনি উদ্বিগ্ন হয়ে পড়তেন? ঘড়ির কাঁটা যেন উল্টে গিয়েছিল। খানিকটা অভিমানও দেখাতেন। বলতেন, এতদিন হয়ে গেল! কোনো ফোন করিস না।
এইতো ক’দিন আগে বাড়ি গিয়েছিলাম। সায়েদাবাদ থেকে নাথেরপেটুয়া। আগে কতোবার যে ফোন বাজতো। কবে যেন, বাড়ি যাওয়ার সময় বড় ভাই বললেন, এ রোডের বেশির ভাগ এলাকার নামই আমার জানা। একটু পরপর মা ফোন করতেন। জানতে চাইতেন, কই আছিস? বাইরে তাকিয়ে দেখার চেষ্টা করতাম এলাকার নাম। এভাবে সব চেনা হয়ে গেছে। মা, এবার বাড়ি গিয়ে বরল্লা, হাজরামুড়ী ঘুরতে বের হয়েছিলাম। গ্রামের রাস্তায় একা একা হাঁটার সময় মনের মাঝে অনেক প্রশ্ন জাগে। জানতে ইচ্ছা করে, অমুক দূর বা কাছের আত্মীয়টি কেমন আছে। এসব জানার আমার একমাত্র মাধ্যম ছিলেন আপনি। অন্য কাউকে জিজ্ঞেস করতে ইচ্ছা করে না।
মা, আমার মোবাইলে আপনার নাম্বারটি সেভ করা আছে। একবছর হলো। আমার মনে থাকে না। হঠাৎ হঠাৎ ফোন বেজে উঠলে মনে হয়, এই বুঝি আপনি ফোন করেছেন। অথবা মাঝে মাঝে আমার হাতটিই চলে যায় আপনার নাম্বারে। সেন্ড বাটনে চাপ দিয়ে ফেলি। খানিক পরেই মনে হয়, ফোনটি কেউ ধরবেন না!
মা, ইদানীং একটা বিষয় প্রায়ই আমার মনে হয়। গর্ভে আসার পর থেকে সন্তানের জন্য মায়ের চেয়ে আত্মত্যাগ পৃথিবীর আর কেউই করে না। এটা কোনোদিন সম্ভবই হয় না। এতসব যন্ত্রণার মাঝেও একটি বিষয় ভালো লাগে, কখনো আপনার সঙ্গে রাগারাগি করেছি  মনে পড়ে না। পরম করুণাময়, আপনাকে ভালো রাখুক সবসময়- এই প্রার্থনাই করি।
ইতি
আপনার ছোট ছেলে
প্রধান সম্পাদক মতিউর রহমান চৌধুরী
জেনিথ টাওয়ার, ৪০ কাওরান বাজার, ঢাকা-১২১৫ এবং স্কাইব্রীজ প্রিন্টিং এন্ড প্যাকেজিং লিমিটেড, ৭/এ/১ তেজগাঁও শিল্প এলাকা, ঢাকা-১২০৮ থেকে
মাহবুবা চৌধুরী কর্তৃক সম্পাদিত ও প্রকাশিত।
ফোন : ৫৫০-১১৭১০-৩ ফ্যাক্স : ৮১২৮৩১৩, ৫৫০১৩৪০০
ই-মেইল: [email protected]
Copyright © 2022
All rights reserved www.mzamin.com
DMCA.com Protection Status