করোনাকালে অনুসন্ধানী সাংবাদিকতা: প্রেক্ষিত বাংলাদেশ

মাসুম বিল্লাহ

মত-মতান্তর ২২ জুন ২০২১, মঙ্গলবার | সর্বশেষ আপডেট: ৪:৩৬ অপরাহ্ন

ভূমিকা
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (ডব্লিউএইচও) গতবছরের ১১ মার্চ কোভিড-১৯ এর বিস্তারকে ‘অতিমারি’ হিসেবে ঘোষণা দেয়। সংস্থাটির এই ঘোষণার মধ্য দিয়ে বিশ্বব্যবস্থা স্বাভাবিক একটি অবস্থা থেকে ‘নিউ নরমাল’ পরিস্থিতির সম্মুখীন হয় এবং অন্য যে-কোনো কিছুর তুলনায় চিকিৎসা সেবা ও করোনাভাইরাস সংক্রান্ত সঠিক তথ্য, সারা বিশ্বের আপামর জনগণের জন্য জীবন-মরণের প্রশ্ন হিসেবে দাঁড়িয়ে যায়। আর এক্ষেত্রে,উদার গণতান্ত্রিক শাসন ব্যবস্থা থেকে শুরু করে কঠোর নিয়ন্ত্রণবাদী দেশসমূহের কেউ-ই করোনা অতিমারির তথ্য-উপাত্ত প্রদানে সঠিকভাবে দায়িত্ব পালন করতে না পারায় বা ব্যর্থ হওয়ায় মতপ্রকাশ ও গণমাধ্যমের স্বাধীনতা তথা অনুসন্ধানী সাংবাদিকতার গুরুত্ব নতুন মাত্রা পেয়েছেএবং অনুসন্ধানী সাংবাদিকতা একইসাথেবাক্স্বাধীনতা ও জীবন সুরক্ষার অন্যতম রক্ষাকবচ হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।

করোনাকালীন সময়ে একটা বিষয় স্পষ্ট হয়েছে যে, মতপ্রকাশের স্বাধীনতা, তথ্যপ্রকাশকারীর সুরক্ষা এবং সর্বোপরি গণমাধ্যমের স্বাধীনতা যদি বিঘ্নিত হয়, তাহলে তা মানবসভ্যতার সামষ্টিক হুমকির কারণ হয়ে উঠতে পারে।উদাহরণ হিসেবে গণমাধ্যমের ওপর সেন্সরশিপের অনুপস্থিতি ও অবাধ তথ্য প্রবাহের নিশ্চয়তা থাকলে চাইনিজ গণমাধ্যম করোনা অতিমারি সংক্রান্ত সঠিক তথ্য সম্পর্কে সাধারণ মানুষকে অবহিত করার সুযোগ পেত, যা সে দেশের হাজার হাজার মানুষের প্রাণ রক্ষা করার পাশাপাশি করোনার বৈশ্বিক অতিমারি রূপ পরিগ্রহণ ও প্রতিহত করতে সক্ষম হতো বলে ধারণা করা হচ্ছে।

বিশ্বজুড়ে কোভিড-১৯ পরিস্থিতির সুযোগ নিয়ে মিডিয়া নিয়ন্ত্রণের সুযোগ নিয়েছে ক্ষমতার সাথে সংশ্লিষ্টজন। তথ্যপ্রাপ্তির সুযোগ সীমিত করা, সাংবাদিকদের শারিরীক ও মানসিকভাবে নির্যাতন, অনলাইন মিডিয়া বন্ধ করে দেওয়া ও নিত্য-নতুন আইন প্রয়োগের মাধ্যমে গণমাধ্যমের স্বাধীনতা খর্ব করার প্রচেষ্টা অব্যাহত রয়েছে। এর ফলে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ভুয়ো তথ্যের বিস্তার ঘটেছে। অস্বীকার করা যাবে না যে, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম অনেক অজানা বিষয়কে সামনে নিয়ে আসার পাশাপাশি বিভিন্ন ধরনের মত প্রকাশের অন্যতম বাহন। কিন্তু একইসাথে এটা ‘অলটারনেটিভ ফ্যাক্টস’ ও ‘পোস্ট ট্রুথ’- এর কল্পিত জগত সৃষ্টি করছে অর্থাৎ মানুষ আসল ঘটনা বা সত্যের বদলে তাদের আবেগ ও বিশ্বাসের ওপর নির্ভর করে কোনো একটি যুক্তিকে গ্রহণ করে নিচ্ছে বা ছড়িয়ে দিচ্ছে।

করোনাকালে এ প্রবণতা ‘ইনফোডেমিক’ নামে নতুন পারিভাষিক শব্দের সৃষ্টি করেছে।বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা ও যুক্তরাষ্ট্রের সেন্টার ফর ডিজিজ কন্টোল অ্যান্ড প্রিভেনশন এর মতো ১০টি প্রথম সারির ওয়েবসাইটের কন্টেন্ট এর চেয়ে ভুয়ো তথ্য প্রদান করে এমন সব ওয়েবসাইটের ভিজিটের হার ৪ গুণ বেশি। এর মধ্যে মাত্র ১৬ শতাংশ কন্টেন্টে ফেসবুকের পক্ষ থেকে সতর্কতা চিহ্ন দেওয়া হয় এবং ৮৪ শতাংশ কন্টেন্টে কোনো সতর্কতামূলক চিহ্ন ছিলো না।
অথচ করোনাভাইরাস সম্পর্কে সঠিক তথ্যের অভাবে বিশ্বজুড়ে অনেক মানুষের জীবন বিপন্ন হয়েছে। গণমাধ্যমের স্বাধীনতা ও সঠিক তথ্য প্রবাহের নিশ্চয়তা থাকলে চীনে ৮৬ শতাংশ সংক্রামণ কমানো সম্ভব হতো বলে দাবি করা হচ্ছে। অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনাল এর আইন ও পলিসি বিভাগের পরিচালক আশফাক খলফান এর মতে “সাধারণ মানুষ যদি সঠিক তথ্য না পায়, তাহলে করোনাভাইরাস নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব হবে না।”

করোনাকালে অনুসন্ধানী সাংবাদিকতা: বৈশ্বিক প্রেক্ষিত বিংশ শতাব্দীর শুরুর দিকে থিওডর রুজভেল্ট থেকে হালের ডোনাল্ড ট্রাম্পসহ বিশ্বের নানাপ্রান্তে রাজনীতিবিদরা প্রতিনিয়ত অনুসন্ধানী সাংবাদিকদের সম্পর্কে বিরূপ মন্তব্য করেন। যে প্রবণতা করোনা অতিমারীর সময় চরম আকার ধারণ করেছে।আমেরিকায় করোনা সংকট মারাত্মক হওয়ার পেছনে দেশটির সাবেক প্রেসিডেন্টের গণমাধ্যমের প্রতি ‘জন শত্রু’ মানসিকতা দায়ি বলে অভিযোগ রয়েছে। ডোনাল্ড ট্রাম্পের ক্ষমতার শেষ বছরে যুক্তরাষ্ট্র জুড়ে প্রায় ৪ শত সাংবাদিক বিভিন্নভাবে নির্যাতনের শিকার হয় এবং ১ শত ৩০ এর অধিক গ্রেফতারের ঘটনা ঘটে।তবে জোসেফ আর.বাইডেন ক্ষমতা গ্রহণের প্রথম দিন থেকেই নিয়মিত প্রেস ব্রিফিং পুনরায় চালু করেছেন এবং গণমাধ্যমবান্ধব পদেক্ষপ গ্রহণ করারইঙ্গিত দিলেওএই বাইডেন প্রশাসনই জুলিয়ান অ্যাসেঞ্জকে যুক্তরাষ্ট্রে ফিরিয়ে এনে বিচারের মুখোমুখি করতে যুক্তরাজ্যের একটি কোর্টের রায়ের বিপক্ষে আপিল করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে।

জাতীয় নিরাপত্তা আইনের সুযোগ নিয়ে হংকং এর একমাত্র স্বাধীন ও বিশ্বস্ত গণমাধ্যম ‘অ্যাপেল ডেইলি’- এর শীর্ষস্থানীয় পাঁচ ব্যক্তিকে ‘বিদেশী শক্তির সাথে ষড়যন্ত্র’ করার অভিযোগে গ্রেফতার করেছে দেশটির পুলিশ। একবছরেরও কম সময়ের মধ্যে প্রতিষ্ঠানটিতে এ নিয়ে দ্বিতীয় অভিযান। পাকিস্তানে সর্বাধিক প্রচারিত পত্রিকা ‘জাং’ এর সংবাদকর্মী ‘জুবায়ের মুজাহিদ’ দুর্নীতি ও মানবাধিকার লঙ্ঘনের বিষয়ে প্রতিবেদন প্রস্তুত করায় হত্যার শিকার হয়েছেন। হত্যার সাথে জড়িতদের শনাক্ত করার আহ্বান জানানোর ফলে সে দেশের প্রখ্যাত সাংবাদিক হামিদ মীর কে ‘জিও’ টেলিভিশন ‘বাধ্যতামূলক ছুটিতে’ পাঠিয়ে দিয়েছে। ভারতের উত্তর প্রদেশে সংখ্যালঘু নির্যাতনের ভিডিও টুইট করার কারণে তিন সাংবাদিকের বিরুদ্ধে সাম্প্রদায়িক সম্প্রতি বিনষ্টসহ ‘ক্রিমিনাল কন্সপারেসির’ অভিযোগে পুলিশ এফআইআর করেছে। দুর্নীতিবিরোধী প্রতিবেদন তৈরি করায় দেশটির উত্তর প্রদেশে একজন সাংবাদিককে পুড়িয়ে মারার মতো ঘটনা ঘটেছে।

রিপোর্টার্স উইদাউট বর্ডারস এর ‘ভায়েলেশন অব প্রেস ফ্রিডম ব্যারোমিটার-২০২১’ এর তথ্য অনুযায়ী বিশ্বজুড়ে ১২ জন সংবাদকর্মী ও ৪ জন সংবাদসহযোগী পেশাগত দায়িত্বপালনের সময় নিহত হয়েছেন। এছাড়া, ৩ শত ২২ জন মূল ধারার সাংবাদিক, ১ শত ২ জন জনসাংবাদিক ও ১৩ জন গণমাধ্যম সহযোগীর জেলে যাওয়ার ঘটনা ঘটেছে। ইন্টারন্যাশনাল প্রেস ইনস্টিটিউট (আইপিআই) এর ২০২১ সালের সংগৃহীত তথ্য মতে ভারত, বাংলাদেশ, নেপাল ও পাকিস্তানে মুক্ত ও স্বাধীন সাংবাদিকতা চাপের মুখে আছে। এসব দেশে সমালোচনামূলক সংবাদ ও অনুসন্ধানী প্রতিবেদন করার কারণে মিডিয়া হাউজগুলো সরকার ও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের টার্গেটে পরিণত হচ্ছে বলে মন্তব্য করেছে। এমনকি উদার গণতান্ত্রিক যুক্তরাজ্যে কোভিড-১৯ সংকট মোকাবিলায় সরকারের গৃহীত পদক্ষেপ নিয়ে যে সকল গণমাধ্যম সমালোচনা করছে তাদের প্রতি সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের প্রতিহিংসাপরায়ণআচরণ প্রদর্শনকরার অভিযোগ রয়েছে।

করোনাকালে অনুসন্ধানী সাংবাদিকতা ও মতপ্রকাশের স্বাধীনতা: প্রেক্ষিত বাংলাদেশ গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশের সংবিধানের ৩৯ অনুচ্ছেদে বলা হয়েছে- “চিন্তা ও বিবেকের স্বাধীনতার নিশ্চয়তা দান করা হইল”...যুক্তিসঙ্গত বাধানিষেধ সাপেক্ষে- “প্রত্যেক নাগরিকের বাক্স্বাধীনতা ও ভাব প্রকাশের স্বাধীনতা অধিকারের এবং সংবাদপত্রের স্বাধীনতার নিশ্চয়তা দান করা হইল”। অথচ স্বাধীন মতপ্রকাশ, অনুসন্ধানী সাংবাদিকতা ও গবেষণা কার্যক্রমে তথ্যপ্রাপ্তির ক্ষেত্রে অন্যতম প্রতিবন্ধক হিসেবে পরিগণিত বিতর্কিত ‘ডিজিটাল নিরাপত্তা আইন’- এর ব্যাপক ব্যবহার আমরা লক্ষ করছি। কারো কারো মতে আইনটি শুধু মতপ্রকাশের স্বাধীনতাকে বাধাগ্রস্ত করার জন্য নয়, এটা করা হয়েছে লুটপাটের বিরুদ্ধে তথ্য প্রকাশ বন্ধ করতে।

তথ্য অধিকার আইন-২০০৯ পাশ হওয়ার ফলে স্বাধীনভাবে বাক্ ও মতপ্রকাশের যে আশার আলোটুকু আমরা দেখতে শুরু করেছিলাম, অচিরেই ডিজিটাল নিরাপত্তা আইন প্রবর্তনের মধ্য দিয়ে নিবর্তনমূলক ৩২ ধারায় বৃটিশ আমলের ‘অফিসিয়াল সিক্রেটস অ্যাক্ট ১৯২৩’ ফিরিয়ে আনায়, তা হতাশায় রূপ নিয়েছে। অবাক করার বিষয় হলো, স্বাস্থ্য খাতের দুর্নীতি নিয়ে ধারাবাহিকভাবে প্রতিবেদন করা সাংবাদিক রোজিনা ইসলাম স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ে তথ্য সংগ্রহের সময় নির্যাতনের শিকার ও আটক হন, এবং স্বাধীনতার পর তাঁর বিরুদ্ধেই প্রথম আইনটির প্রয়োগ ঘটিয়ে কারাগারে পাঠানোর মতো ঘটনা ঘটেছে।এক্ষেত্রে, “চৌর্যবৃত্তি আর সাংবাদিকতা কি এক” ক্ষমতাসীন দলের সাধারণ সম্পাদক ও সেতুমন্ত্রীর এ মন্তব্য অনুসন্ধানী সাংবাদিকতার প্রতি কর্তৃপক্ষের মনোভাব ফুটে উঠেছে। পাশাপাশি তথ্য মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত সংসদীয় স্থায়ী কমিটির সভাপতির “মামলা মকদ্দমায় সবাই পড়ে না” মন্তব্যে ক্ষমতার অংশীদার রাজনৈতিক নেতৃত্বের দৃষ্টিভঙ্গির বহিঃপ্রকাশ।

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ব্যবহার করে রাষ্ট্রের ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন করা এবং জেনেশুনে অপপ্রচার ও গুজব ছড়ানোর মতো গুরতর অভিযোগে লেখক মুশতাক আহমেদ ও কার্টুনিস্ট কিশোরসহ ১১ জনের বিরুদ্ধে ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনে মামলা করে র‌্যাব। সেই মামলায় দুজন জামিনে মুক্তি পেলেও, মুশতাক ও কিশোরের জামিন আবেদন ছয়বার নাকচ হয়। কিশোর ও মুশতাকের ওপর অমানবিক নির্যাতনের অভিযোগ থাকলেও কিশোরের গায়ে আঘাতের চিহ্ন দেখে না ‘মেডিকেল বোর্ড’। অন্যদিকে ১০ মাস বিনা বিচারে আটক থাকার পর মুশতাক আহমেদের কারাগারে মৃত্যু হলে, কারা কর্তৃপক্ষ স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে যে তদন্ত প্রতিদেন দিয়েছে, সেখানে “তিনি অত্যন্ত ভালো মানুষ ছিলেন” বলে উল্লেখ করা হয়।

নোয়াখালির কোম্পানিগঞ্জে পেশাগত দায়িত্ব পালনের সময় সাংবাদিক বোরহান উদ্দিন মুজাক্কির, ক্ষমতাসীন দলের দুই গ্রুপের সংঘর্ষের সময় গুলিবিদ্ধ হয়ে নিহত হন। মুজাক্কিরসহ গতবছর বাংলাদেশে দুইজন সাংবাদিক ও একজন গণমাধ্যম সহযোগী নিহত হয়েছেন। আর তিনজন সাংবাদিক গুমের শিকার হয়েছেন। আর্টিকেল-১৯ এর প্রতিবেদন অনুযায়ী, ঢাকায় যারা কাজ করছেন (২২ দশমিক ২২ শতাংশ) তাদের তুলনায় মফস্বলে (৭৭ দশমিক ৭৮ শতাংশ) যারা সাংবাদিকতা করছেন তাদের হামলা-মামলার শিকার হওয়ার হার বেশি।

বিশ্ব মুক্ত গণমাধ্যম সূচক-২০২১ অনুযায়ী ১৮০টি দেশের মধ্যে বাংলাদেশের অবস্থান ১৫২তম, গতবছরের তুলনায় একধাপ পিছিয়ে। যুদ্ধবিধ্বস্ত আফগানিস্তান, আধা সামরিক শাসিত রাষ্ট্র পাকিস্তান, সামরিক নিয়ন্ত্রাধীন মিয়ানমারসহ সর্বোপরি দক্ষিণ এশিয়ার সবগুলো দেশের পেছনে বাংলাদেশের অবস্থান। পাশাপাশি সর্বশেষ বিশ্ব মতপ্রকাশ প্রতিবেদনে ১৬১টি দেশের মধ্যে ১৩২তম অবস্থান দেশের গণমাধ্যমের নাজুক পরিস্থিতি-ই প্রমাণ করে।আর্টিকেল-১৯ এর প্রতিবেদনঅনুযায়ী ২০২০ সালে ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনের ১৯৮টি মামলায় ৪৫৭ জনকে বিচারের আওতায় আনা হয়েছে, এর মধ্যে ৭৫ জন সাংবাদিক। এছাড়া, অনলাইনে মতপ্রকাশের কারণে ৪১০টি মামলা দায়েরের ঘটনা ঘটেছে, সেগুলোর মধ্যে ৪টি আদালত অবমানননার মামলা। সম্প্রতি বাংলাদেশে গণমাধ্যমের স্বাধীনতার বিষয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করে জাতিসংঘের মানবাধিকার সংস্থার প্রধানের হস্তক্ষেপ কামনা করেছে আটটি আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থা। বাক্স্বাধীনতা রক্ষায় জাতিসংঘের তরফ থেকে উদ্যোগ নেওয়ার আহ্বান জানিয়েছে সংস্থাগুলো।

বাংলাদেশে সাংবাদিকতার চলমান এ পরিস্থিতির দায়!
বাংলাদেশে চলমান সাংবদিকতায় যে স্থবিরতা বিরাজ করছে এ পরিস্থিতির দায় আমাদের সকলের। সরকার, রাজনৈতিক দলসমূহ, প্রশাসন, গণমাধ্যমের মালিকপক্ষ, কর্মরত সাংবাদিক, সাংবাদিক ইউনিয়ন, সর্বপরি আমাদের সকলের মেনে ও মানিয়ে নেওয়ার মানসিকতা এবং ক্ষেত্রবিশেষে বাধ্য হওয়ার কারণেই এ পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে-

প্রথমত:বিশ্বের সর্বত্রই সরকার ও রাজনৈতিক দলসমূহের সাথে গণমাধ্যমের সম্পর্ক হচ্ছে ক্ষমতায় থাকলে বিপক্ষে আর বিরোধীদলে থাকলে পক্ষের। ২০১৬ সালে ডোনাল্ড ট্রাম্প নির্বাচনের আগ-মুহূর্তে প্রতিপক্ষ হিলারি ক্লিনটন এর হ্যাক করা ইমেইলের বিষয়বস্তু প্রকাশ করায় উইকিলিকস এর প্রশংসা করেন “আই লাভ উইকিলিকস”। কিন্তু ক্ষমতাগ্রহণের মাত্র একমাসের মধ্যে তারই মনোনিত সিআইএ ডিরেক্টর উইকিলিকসকে “এ নন-স্টেট হোস্টাইল ইন্টেলিজেন্স সার্ভিস” বলে অভিহিত করে। আমাদের দেশের অবস্থা;সম্পাদক পরিষদের সভাপতির মতে, “সরকার বলবে যে খুবই সাংবাদিকবান্ধব সরকার, আবার আমরা সাংবাদিকরা বলবো যে আমরা অত্যন্ত চাপের মুখে আছি।” আমাদের দেশে সরকারে যারা আছেন তারা দেশে গণমাধ্যমের সংখ্যাকে স্বাধীনতার সূচক হিসেবে গর্ব করে প্রচার করেন। তবে স্বাধীনতার প্রশ্নে সংখ্যার আধিক্য মত প্রকাশের স্বাধীনতার সূচক নয়, সেটা প্রমাণিত। তাছাড়া, পৃথিবীজুড়ে গণতন্ত্র সংকটাপন্ন। ফ্রিডম হাউজের ২০২১ সালের বার্ষিক প্রতিবেদন বলছে, ১৫ বছর ধরে গণতন্ত্রের পশ্চাৎযাত্রা অব্যাহত আছে এবং এই নেতিবাচক ধারা গত বছর বেশি শক্তিশালী হয়েছে। মজার ব্যাপার হলো অবনতিশীল গণতন্ত্রের দেশগুলোর ক্ষমতাসীনেরা নিজেদের অগণতান্ত্রিক বলে মনেকরেন না, বরং নিজেদেরকে গণতন্ত্রের রক্ষাকারী বলেই দাবি করেন। জবাবদিহিহীন রাজনৈতিক ব্যবস্থায় নাগরিকের মতপ্রকাশের অধিকার যখন সীমিত হয়ে যায়, তখন সংবাদপত্রের স্বাধীনতা আলাদাভাবে টিকে থাকারও কোনো নজির নেই।

দ্বিতীয়ত: বিদ্যমান আইনিকাঠামোতে গণমাধ্যমের জন্য স্বাধীনভাবে কাজ করার সুযোগ খুবই সীমিত। রাষ্ট্রের ভাবমূর্তি যে আইনে সংজ্ঞায়িত নেই, সেই ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনে সরকার ও রাষ্ট্রের ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন করার অভিযোগে অনেকের বিরুদ্ধে মামলা হচ্ছে। এছাড়া, নতুন সংযোজন ‘অফিসিয়াল সিক্রেটস অ্যাক্টে’ মামলা এবং মানহানি মামলা একটা ভয়ের পরিবেশ সৃষ্টি করেছে।

তৃতীয়ত: আমাদের দেশের গণমাধ্যমের মালিকানা। বাংলাদেশে গণমাধ্যম কী গণমানুষের স্বার্থে কাজ করছে? না-কী ব্যবসায়ী-শিল্পপতিদের ব্যবসার ঢাল হিসেবে ব্যবহৃত হচ্ছে? সাম্প্রতিক কিছু ঘটনায় এমন প্রশ্ন বড় হয়ে সামনে এসেছে। আমাদের দেশে মালিকপক্ষের স্বার্থের বাইরে গিয়ে অনেক সাংবাদিকের পক্ষেই স্বাধীনভাবে কাজ করা সম্ভব হয় না। কারণ নিয়োগ বা চাকরিচ্যুত করা হয় মালিকপক্ষের ব্যক্তিগত পছন্দ অপছন্দের ভিত্তিতে। করোনার কারণে মিডিয়া হাউজগুলোর আয় সঙ্কুচিত হওয়ায় ২০২০ সালে ১ হাজার ৬ শত জন সাংবাদিক চাকরি হারিয়েছেন। কথায় আছে ‘ক্ষুধার্ত সাংবাদিক ভয়ানক ব্যক্তি’ করোনার কারণে মিডিয়া হাউজগুলোর ছাটাইয়ের ঘটনা সংবাদকর্মীদের জীবন-জীবিকাকে বিপর্যস্ত করেছে, এর ফলে সংবাদকর্মীদের মধ্যে পেশাদারিত্বের সাথে আপোসসহ ঘটনার গভীরে গিয়ে কর্তৃপক্ষের চক্ষুশূল না হওয়ার প্রবণতা লক্ষণীয়। অপেক্ষাকৃত উদার গণতান্ত্রিক দেশসমূহে ব্যক্তিমালিকানাধীন গণমাধ্যম সম্পাদকীয় সিদ্ধান্ত নিতে এত বেশি স্বায়ত্তশাসন ভোগ করেন যে, অধিকাংশ ক্ষেত্রে এর পেছনে যে মালিক আছেন- সেটা বুঝাও যায় না।

আমাদের দেশে লুম্পেন কোটিপতি শ্রেণির মানুষেরাই গণমাধ্যম খাতে বিনিয়োগ করেছেন। অর্থনীতিবিদ রেহমান সোবহানের ভাষায় “ফ্রম ডিপেনডেন্স অন স্টেট টু স্টেট ক্যাপচার”- তাঁরা এখন রাষ্ট্রীয় নীতিনির্ধারণের জায়গায় পৌঁছেছেন। ফলে বস্তুনিষ্ঠ সাংবাদিকতাকে দখল করছে মালিকের স্বার্থনির্ভর সাংবাদিকতা। মাহুতের নির্দেশ মত যেমন হাতি পরিচালিত হয়, তেমনি মালিকের নির্দেশনানুযায়ী গণমাধ্যম কর্মীরাও বিশেষ পরিস্থিতিতে মালিকের স্বার্থ রক্ষার জন্য ঝাঁপিয়ে পড়ার দৃষ্টান্ত আছে। সিন্ডিকেট সাংবাদিকতা থেকে শুরু করে সেল্ফ সেন্সরশিপ সবই প্রয়োগ করেন বলে অভিযোগ রয়েছে।

চতুর্থত:গণমাধ্যমের সবচেয়ে বড় প্রতিপক্ষ হলো রাজনৈতিক বিবেচনায় অনুমতি বা লাইসেন্সপ্রাপ্তি এবং কর্পোরেট স্বার্থকে প্রাধান্য দিয়ে পরিচালনা নীতি। ক্ষমতাসীন দলের ঘনিষ্ট না হয়ে গণমাধ্যমের, বিশেষ করে ক্রমবর্ধমান টেলিভিশন চ্যানেলের মালিক হওয়ার সম্ভাবনা প্রায় নেই। আবার এখন যারা পত্রিকা বা টিভি চ্যানেলের লাইসেন্স নিচ্ছেন, তারা নিজেদের ব্যবসারস্বার্থে এই মালিকানা নিচ্ছেন। ফলে পেশাদার সাংবাদিকদের অভিযোগ “স্বাধীন সাংবাদিকতা করার পরিবেশ খুবই খুবই সংকীর্ণ।”

পঞ্চমত: সমাজের অন্যান্য প্রতিষ্ঠানের মতো সাংবাদিক ইউনিয়নগুলো দলীয় ভিত্তিতে বিভক্ত। একটি জাতীয় পত্রিকার সম্পাদকের ভাষায়, “সাংবাদিকরা বহুক্ষেত্রে স্বেচ্ছায় কোনো কিছু পাওয়ার আশায় অনুসন্ধানী রিপোর্ট থেকে দূরে থাকছেন। নিজের দলীয় আদর্শের কারণেও বহুক্ষেত্রে তারা এটা করছেন।”

ষষ্ঠত:অনুসন্ধানী খবরের পেছনে মূখ্য ভূমিকা পালন করেন মূলত হুইসেলব্লোয়াররা। অধিকাংশ ক্ষেত্রে সরকারের বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে সৎ ও নির্ভীক কর্মকর্তাগণ সাংবাদিকদের বিভিন্ন সময়ে অনেক অনিয়ম ও দুর্নীতির তথ্য প্রদান করে থাকেন। কিন্তু সম্প্রতি সাংবাদিক রোজিনা ইসলামের ওপর ‘অফিসিয়াল সিক্রেটস অ্যাক্ট ১৯২৩’ এর প্রয়োগ এক্ষেত্রে অশনি সংকেত বলে মনে করছেন অনেকে। এছাড়া, ‘জনস্বার্থ সংশ্লিষ্ট তথ্য প্রকাশ (সুরক্ষা প্রদান) আইন, ২০১১’ এর সুযোগ গ্রহণের উপযুক্ত পরিবেশের অভাবে, প্রশাসনিক কাঠামোতে এখন পর্যন্ত এই আইনটির ব্যবহার কেউ করেছেন বলে শোনা যায়নি। এতে করে অনুসন্ধানী সাংবাদিকতার ক্ষেত্র সঙ্কুচিত হওয়ার পাশাপাশি একশ্রেণির আমলাদের বেপরোয়া আচরণও লক্ষণীয়।

উপসংহার
স্বাধীন সাংবাদিকতা করার ক্ষেত্রে বাংলাদেশের পরিস্থিতি দিন দিন খারাপ হচ্ছে। দেশের অধিকাংশ গণমাধ্যমে দক্ষ সংবাদকর্মী তৈরি হওয়ার পরিবর্তে ‘স্পাইরাল অব সাইলেন্স’ তত্ত্বের স্পাইরাল ইফেক্ট পড়েছে। ফলে গত কয়েক বছরে পেশার প্রতি প্রতিশ্রুতিশীল অনেক গণমাধ্যমকর্মী স্বেচ্ছায় এবং অনেকক্ষেত্রে নানামুখী চাপ ও জীবন-জীবিকার তাগিদে পেশার পরিবর্তন করেছেন। যা দীর্ঘমেয়াদে সাংবাদিকতার ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলবে। করোনার প্রভাবে ধ্বসে পড়া অর্থনীতি ঘুরে দাঁড়াবে, কিন্তু সাংবাদিকতা তথা গণমাধ্যমের ওপর করোনার যে নেতিবাচক প্রভাব পড়েছে সে ক্ষতি কাটিয়ে উঠতে দীর্ঘ সময়ের প্রয়োজন হবে।গত শতকের পঞ্চাশের দশক থেকে সাংবাদিকতা পেশার সাথে যুক্ত একুশে পদকপ্রাপ্ত একজন বরেণ্য সাংবাদিক একটি জাতীয় দৈনিকের জন্মলগ্ন থেকে দায়িত্ব পালন করার পর করোনা-উদ্ভূত আর্থিক সংকটের দোহাই দিয়ে তাঁকে অবসর নিতে বলা হয়েছে। তাঁর এ দৃষ্টান্ত একজন মেধাবী তরুণকে সাংবাদিকতাকে পেশা হিসেবে গ্রহণেঅনুৎসাহিত করলে সে দায়ভার আসলে কার!আর তাই অবিলম্বে-
  • করোনাকালীন সময়ে সঠিক তথ্যের অবাধ প্রবাহ নিশ্চিতে গণমাধ্যমকে সহযোগী হিসেবেবিবেচনা করে নীতি প্রনয়ণ এবং স্বাধীন সাংবাদিকতার সহায়ক পরিবেশ তৈরিতে কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ করতে হবে;
  •  অতিমারি সংক্রান্ত অনিয়ম ও দুর্নীতি নিয়ন্ত্রণে সাংবাদিকদের বিশেষ করে অনুসন্ধানী সাংবাদিকদের তথ্যের অভিগম্যতা সহজ করতে হবে;
  • অনুসন্ধানী সাংবাদিকতার জন্য হুমকি হয়ে ওঠা ‘ডিজিটাল নিরাপত্তা আইন ২০১৮’- এর বিতর্কিত সব ধারা বাতিল এবং ‘অফিসিয়াল সিক্রেটস অ্যাক্ট ১৯২৩’- এর বিলুপ্ত ঘোষণা করতে হবে;
  • যে-কোনো মূল্যে করোনা পরিস্থিতির সুযোগ নিয়ে গণহারে সাংবাদিকদের চাকুরিচ্যুতির বিষয়টি সরকারের নজরদারিতে আনতে হবে এবং এ ব্যাপারে সাংবাদিকদের বিভিন্ন সংগঠনের সম্মিলিত প্রয়াস নিতে হবে;
  •  পেশাদারি মনোভাব নিয়ে সংবাদমাধ্যমের প্রতি আস্থা বাড়াতে গণমাধ্যম মালিকদের সংগঠন- নিউজ পেপার ওনার্স অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ (নোয়াব) ও অ্যাসোসিয়েশন অব টেলিভিশন চ্যানেল ওনার্স (অ্যাটকো), সম্পাদক পরিষদ, এডিটরস গিল্ড এবং সাংবাদিকদের বিভিন্ন সংগঠনের ঐক্যবদ্ধ পদক্ষেপ নিতে হবে
  •  গণমাধ্যমকে জরুরি সেবাখাত হিসেবে স্বীকৃতি দিয়ে সংবাদকর্মীদের নিয়মিত বেতনভাতা ও জীবিকার নিশ্চয়তা বিধানে রপ্তানীমুখী শিল্পের জন্য ঘোষিত ঋণ প্রণোদনা কর্মসূচির মতো তহবিল ঘোষণা করতে হবে;
  •  পেশাগত নিরাপত্তার পাশাপাশি শারীরিক এবং স্বাস্থ্যগত সুরক্ষায় সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে পর্যাপ্ত ব্যবস্থা নিতে হবে;
  • তথ্য মন্ত্রণালয় নয় বরং ‘প্রেস কাউন্সিল’ কে কার্যকর প্রতিষ্ঠানের ভূমিকায় অবতীর্ণ হওয়ার উপযোগী পরিবেশ সৃষ্টিতে সংশ্লিষ্ট সকল পক্ষকে যথাযথ উদ্যোগ নিতে হবে;
  • গণমাধ্যমের পরিচালনা নীতি ও সম্পাদকীয় সিদ্ধান্ত গ্রহণে কর্মরত সংবাদকর্মীগণ যাতে কার্যকর স্বাধীনতা ভোগ করতে পারেন, মালিকপক্ষকে তা নিশ্চিত করতে হবে; এবং
  • প্রশাসনিক কাঠামোতে ‘জনস্বার্থ সংশ্লিষ্ট তথ্য প্রকাশ (সুরক্ষা প্রদান) আইন, ২০১১’ এর সুযোগ গ্রহণের উপযুক্ত পরিবেশ সৃষ্টিতে কার্যকর পদক্ষেপ নিতে হবে।

লেখক: অ্যাসিসটেন্ট কোর্ডিনেটর, আউটরিচ অ্যান্ড কমিউনিকেশন, ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ (টআিইবি)। টিআইবির `কোভিড-১৯ বিষয়ক বিশেষ অনুসন্ধানী সাংবাদিকতা পুরস্কার’ প্রদান অনুষ্ঠানে উপস্থাপিত মূল প্রবন্ধ।

আপনার মতামত দিন

মত-মতান্তর অন্যান্য খবর

পরিস্থিতি হ-য-ব-র-ল

নিম্ন আয়ের মানুষের অপরাধ কি?

৮ জুলাই ২০২১



মত-মতান্তর সর্বাধিক পঠিত



দেখা থেকে তাৎক্ষণিক লেখা

কোটিপতিদের শহরে তুমি থাকবা কেন?

DMCA.com Protection Status