নতুন নেতৃত্বে মধ্যপ্রাচ্যে উগ্রতা বাড়বে?

ড. মাহফুজ পারভেজ

মত-মতান্তর ২১ জুন ২০২১, সোমবার | সর্বশেষ আপডেট: ১১:২৫ পূর্বাহ্ন

স্বল্প দিনের ব্যবধানে মধ্যপ্রাচ্যের দুটি গুরুত্বপূর্ণ ও ক্ষমতাধর দেশে নেতৃত্বের বদল হয়েছে। ক্ষমতায় এসেছেন অপেক্ষাকৃত কট্টরপন্থী দুই নেতা। অতীতের তুলনায় চরম এই নতুন নেতৃত্বের উত্থানের ফলে মধ্যপ্রাচ্যে উত্তেজনা ও উগ্রতা বৃদ্ধির আশঙ্কা করছেন আন্তর্জাতিক রাজনীতির বিশ্লেষকগণ।

কারণ, মধ্যপ্রাচ্যের কর্তৃত্ব দখলে আরব-ইহুদি পুরনো দ্বন্দ্বের স্থান দখল করেছে ইরান ও ইসরায়েলের মধ্যকার স্নায়ুযুদ্ধ। ইসরাইলের বিরুদ্ধে ফিলিস্তিনিদের একমাত্র প্রতিরোধের একক মদদদাতা ইরান। তদুপরি, মার্কিন মধ্যস্থতায় এবং ইরানের সঙ্গে আঞ্চলিক রাজনীতির মেরুকরণে আরব দেশগুলো প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে ইসরাইলের মিত্রে পর্যবসিত হয়েছে। ফলে বৈরীভাবাপন্ন ইরান ও ইসরায়েলে কট্টরপন্থী নেতাদের ক্ষমতা দখলের ফলাফল নিয়ে চিন্তিত পর্যবেক্ষকগণ।

বস্তুত, বৃহত্তর মধ্যপ্রাচ্যে ঐতিহাসিকভাবে মুসলিম মতাবলম্বী চারটি জাতিগোষ্ঠী বিভিন্ন সময়ে কর্তৃত্ব করেছে। আরব, কুর্দি, তুর্কি, ইরানি বা পারসিয়ানরা সময় সময় পুরো মধ্যপ্রাচ্যের, এমনকি মুসলিম বিশ্বেরও নেতৃত্ব দিয়েছে। তাদের মধ্যে 'ক্রুসেড' ছাড়া অন্য সময় ঐক্য হয়েছে কমই।

বর্তমানেও মধ্যপ্রাচ্যের ভূ-রাজনীতি চতুর্ভুজে বিভাজিত।
সালাফি মতাদর্শের অনুসারী আরব দেশগুলো সৌদি আরবের নেতৃত্ব মান্য করে। সুন্নি তুর্কিরা নিজেদের জাতীয় স্বার্থ রক্ষায় তৎপর। নানা দেশে বিভক্ত কুর্দিরা লড়ছে স্বাধীনতা ও আত্মনিয়ন্ত্রণের অধিকারের জন্য। ইরান শিয়া ব্লক গড়ে তুলেছে সিরিয়া, বাহরাইন, লেবাননের হামাসকে নিয়ে।

মধ্যপ্রাচ্যের এইসব পক্ষ ছোট-বড় অনেকগুলো সংঘাতে লিপ্ত। প্রকাশ্য লড়াইয়ের পাশাপাশি চলছে স্নায়ুযুদ্ধ। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র মধ্যপ্রাচ্যে ইরানের প্রভাব বিস্তার ঠেকাতে আরব দেশগুলোকে একত্রিত করছে এবং পেছন থেকে সামরিক ও কূটনৈতিক সাহায্য করছে। মূলত মার্কিন প্রভাবে আরবরা ইরানকে হটাতে ইসরাইলের সঙ্গে প্রাচীন বৈরিতা ত্যাগ করে কাছাকাছি এসেছে।

মধ্যপ্রাচ্য চতুর্মুখী শক্তির বিন্যাসে পঞ্চম শক্তি হিসেবে গণ্য করা যায় ইসরাইলকে। বছরের পর বছর আরব দেশগুলোর প্রতিরোধে কোণঠাসা ইসরায়েল বর্তমানে আরবদের কাছ থেকে মৈত্রী ও বন্ধুত্বের কারণে নিরাপদ। লেবানন থেকে হামাস ও ছোট ছোট কিছু ফিলিস্তিনি মুসলিম গ্রুপই এখন ইসরায়েলের চিন্তার কারণ, যার পৃষ্ঠপোষক ইরান।

ইরানে সদ্যই ক্ষমতায় এসেছেন অতিরক্ষণশীল, কট্টরপন্থী, ধর্মীয় নেতা ইব্রাহিম রাইসি। ইসরাইলেও বেনজামিন নেতানিয়াহুর ১২ বছরের শাসনের অবসান ঘটিয়ে ক্ষমতা পেয়েছেন ইয়ামিনা পার্টির নাফতালি বেনেট, যিনি, আলোচনা ও শান্তি দূরস্থিত, ফিলিস্তিনের অস্তিত্বই স্বীকার করেন না।

ইরানের রাইসির অতীতও কঠিন আর নির্মম সিদ্ধান্তের জন্য আলোচিত-সমালোচিত। ইরানের রাজনৈতিক ও মতাদর্শিত স্বার্থে তিনি বহুবার চরম সিদ্ধান্ত নিয়েছেন। প্রতিপক্ষকে নির্মমভাবে নিমূর্ল করতে যেকোনও কঠোর পদক্ষেপ নিতে পিছপা হয় নি তিনি। তার নির্বাচনে মার্কিন-ইসরায়েল জোট গণতন্ত্রের সঠিক প্রক্রিয়া অনুসরণ না করার অভিযোগ এনেছে। পশ্চিমা মিডিয়াগুলো তার অতীতের দোষ-ত্রুটির ব্যবচ্ছেদে ব্যস্ত। আর ইরান সমর্থিত দেশ ও গোষ্ঠীগুলো তার ক্ষমতাসীন হওয়ায় প্রশংসায় উচ্চসিত।

ইরান ও ইসরাইলের নতুন দুই চরমপন্থী নেতার উত্থানে স্বাভাবিকভাবেই মধ্যপ্রাচ্যে উত্তেজনা বৃদ্ধির আশঙ্কা রয়েছে। বিদ্যমান সংঘাত ও রক্তপাতের আরও বিস্তৃতি ঘটার বিষয়েও অনেকে উদ্বিগ্ন। তবে, কেউ কেউ মনে করেন, দুই চরমপন্থী নেতার কারণে উত্তেজনার সৃষ্টি হলেও মধ্যপ্রাচ্যে শক্তির ভারসাম্য বজায় থাকবে। কারণ, উভয় পক্ষকেই পা ফেলতে হবে সাবধানে, সতর্কতার সঙ্গে, সব দিক বিবেচনা করে।

বৈশ্বিক মহামারি করোনার উদ্ভবকালে ২০২০ সালের প্রথম সপ্তাহে মধ্যপ্রাচ্যে ইরানি সামরিক নেতৃত্বের অন্যতম স্তম্ভ জেনারেল সোলাইমানিকে হত্যার মাধ্যমে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র যে পাল্টাপাল্টি হামলার সূত্রপাত ঘটিয়েছিল, তার প্রতিশোধ গ্রহণের প্রত্যয় ইরান ঘোষণা করেছে। ইরানের নতুন নেতৃত্বে তা হয়ত আরও তীব্র হবে এবং মার্কিন-ইসরায়েল জোটকেও আরও সতর্ক পদক্ষেপ নিতে হবে। মোদ্দা কথায়, সামনের দিনগুলোতে মধ্যপ্রাচ্যের রক্তাক্ত পরিস্থিতি যে আরও জটিল ও উত্তেজক হবে, তা নির্দ্বিধায় বলা চলে।
 

পাঠকের মতামত

**মন্তব্য সমূহ পাঠকের একান্ত ব্যক্তিগত। এর জন্য সম্পাদক দায়ী নন।

শহীদ

২০২১-০৬-২২ ০৮:২৩:৫৮

যখন আমি চুপ থাকি তখন অন্যজন সরব হয়। সুন্নিরা চুপ ও সুন্নি মতাদর্শের শাসকগণ দখলদার, খুনি ইস্রাইলের সাথে সুসম্পর্ক গড়ে ‍তুলছে তখন শিয়া মতাদর্শ খুনিদের চারপাশে নিজস্ব বলয় গড়ে তুলছে। ইরান কট্টরপন্থী নয়। ইরান কারো সম্পদ দখলে রাখেনি। খুন করেনি। গুম করেনি। নির্যাতন, নীপিড়ন চালায়নি। বরং বিশ্বের জন্য ইস্রাইল ও তার মদদ দাতারা হুমকি।

কালাম ফয়েজী

২০২১-০৬-২১ ২২:১৭:৩২

সমস্যাটা ইসরাইলের, ইরানের না। ইসরাইলে কট্টরপন্থী প্রধারমন্ত্রী নির্বাচিত হয়েছে, তারজন্য ইরান ক্ষুব্ধতা প্রকাশ করেনি। কিন্তু ইরানে কট্টরপন্থী প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হয়েছে, সেজন্য ইসরাইল এত ক্ষুব্ধ কেন?

আপনার মতামত দিন

মত-মতান্তর অন্যান্য খবর

পরিস্থিতি হ-য-ব-র-ল

নিম্ন আয়ের মানুষের অপরাধ কি?

৮ জুলাই ২০২১



মত-মতান্তর সর্বাধিক পঠিত



দেখা থেকে তাৎক্ষণিক লেখা

কোটিপতিদের শহরে তুমি থাকবা কেন?

DMCA.com Protection Status