নেতানিয়াহুর অগ্নিপরীক্ষা

মানবজমিন ডেস্ক

বিশ্বজমিন (১ মাস আগে) জুন ১৩, ২০২১, রোববার, ১০:৫৫ পূর্বাহ্ন | সর্বশেষ আপডেট: ৪:৪৩ অপরাহ্ন

ফিলিস্তিনি শিশু, নারী, পুরুষের রক্তে রঞ্জিত ইসরাইলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর হাত। আজ তার সামনে অগ্নিপরীক্ষা। বিরোধী রাজনৈতিক দলগুলোর কাছে ১২ বছরের মসনদ হারাতে পারেন তিনি। এ খবর দিয়েছে অনলাইন বিবিসি। ইয়ামিনা পার্টির প্রধান নাফতালি বেনেট এবং ইয়েশ আতিদ পার্টির নেতা ইয়াইর লাপিড নতুন সরকার গঠনের ঘোষণা দিয়েছেন কয়েকদিন আগেই। ১২০ আসনের পার্লামেন্ট নেসেট-এ এ জন্য তাদেরকে সংখ্যাগরিষ্ঠতা দেখাতে হবে। পার্লামেন্টে আস্থা ভোটে কমপক্ষে ৬১টি ভোট পেতে হবে। এখন পর্যন্ত তারা যাদেরকে নিয়ে জোট গঠনের ঘোষণা দিয়েছেন, সব মিলে মাত্র একটি আসনে সংখ্যাগরিষ্ঠতা আছে তাদের।
যদি জোটে আসার ঘোষণা দেয়া সবাই নতুন বেনেট ও লাপিডের প্রস্তাবিত জোটের প্রতি ভোট দেন তাহলে বিদায় নিতে হবে প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুকে।

এমনটা হলে দেশটিতে কমপক্ষে দুই বছরের রাজনৈতিক অচলাবস্থার অবসান হবে। এই অচলাবস্থা কাটাতে দু’বছরের মধ্যে চারটি জাতীয় নির্বাচন হয়েছে। সর্বশেষ নির্বাচনের পর ক্ষমতা ভাগাভাগির চুক্তির মধ্য দিয়ে অগ্রসর হয়েছেন বেনেট এবং লাপিড। ফলে আজই নাটকের একটি অংশের যবনিকাপাত ঘটতে পারে। অন্যদিকে নতুন একটি অধ্যায়ের পর্দা উন্মোচন হতে পারে। ভোটের আগে এই জোটে থাকা দলগুলোর প্রতি আস্থা প্রকাশ না করতে এমপিদের প্রতি আহ্বান জানিয়েছেন নেতানিয়াহু। কিন্তু তা কতটা কাজে লাগে তা এখন সময় বলে দেবে। পক্ষান্তরে যদি নতুন সরকার ক্ষমতায় আসে তাহলে বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর বিরুদ্ধে চলমান মামলাগুলোর গতি বৃদ্ধি পেতে পারে। ইসরাইলের সাবেক প্রধানমন্ত্রী আইজাক রবিনকে হত্যার সঙ্গে তার জড়িত থাকার অভিযোগ আছে, যদিও এ অভিযোগ নেতানিয়াহু অস্বীকার করেন। তবু রাজনৈতিক প্রতিপক্ষ হিসেবে তাকে ঘায়েল করতে এ অভিযোগ পুনরুজ্জীবিত করতে পারে নতুন সরকার। এসব পরীক্ষায় কতদূর যেতে পারবেন নেতানিয়াহু!

নেতানিয়াহুকে ক্ষমতা থেকে সরাতে বিরল জোট করেছেন নাফতালি বেনেট এবং ইয়াইর লাপিড। তাদের জোটে আছে বাম, ডান, মধ্যপন্থি ও ধর্মীয় দল। এমন ঘটনা ইসরাইলে বিরল। এ জোটকে অনেকেই অপ্রত্যাশিত বলে মন্তব্য করছেন। কিন্তু সে যা-ই হোক, বেনেট এবং লাপিডের মধ্যে যে চুক্তি হয়েছে, তাতে ক্ষমতার প্রথম অর্ধেক প্রধানমন্ত্রী হবেন নাফতালি বেনেট। এই শর্ত অনুযায়ী ২০২৩ সালের সেপ্টেম্বর পর্যন্ত ক্ষমতায় থাকবেন তিনি। বাকি দুই বছর প্রধানমন্ত্রী হবেন ইয়াইর লাপিড।

অন্যদিকে ইসরাইলে সবচেয়ে দীর্ঘ সময় ক্ষমতায় থাকা নেতা নেতানিয়াহু। তিনি বহু বছর ধরে দেশটির রাজনৈতিক অঙ্গনে প্রাধান্য বিস্তার করে আছেন। যদি বেনেট-লাপিডের কাছে তিনি ধরাশায়ী হন তাহলেও তিনি ডানপন্থি লিকুদ পার্টির প্রধান হিসেবেই রয়ে যাবেন। পার্লামেন্টে তাকে দেখা যাবে বিরোধী দলের নেতার আসনে। এরই মধ্যে তিনি নতুন সরকারের বিরুদ্ধে বক্তব্য দেয়া শুরু করেছেন। বলেছেন, তাদের জোট হবে প্রতারণার এবং আত্মসমর্পণকারী। একই সঙ্গে তিনি এই সরকার ক্ষমতায় এলে অল্প সময়ের মধ্যে তাদেরকে উৎখাতের প্রত্যয় ঘোষণা করেছেন। তবে নেতানিয়াহুর বিরুদ্ধে ঘুষ, প্রতারণা ও আস্থাভঙ্গের অভিযোগে বিচার চলমান। তিনি নিজে এসব অভিযোগ প্রত্যাখ্যান করলেও এরই মধ্যে তার বিরুদ্ধে অনেক তথ্যপ্রমাণ হাজির করা হয়েছে।

উল্লেখ্য, ৫ দফা প্রধানমন্ত্রী হিসেবে তিনি ইসরাইলের রেকর্ড ভঙ্গ করেছেন। প্রথমে ১৯৯৬ সাল থেকে ১৯৯৯ সাল পর্যন্ত, তারপর ২০০৯ সাল থেকে ২০২১ সাল পর্যন্ত তিনি প্রধানমন্ত্রী। সর্বশেষ ২০১৯ সালের এপ্রিলে তিনি নির্বাচন দেন। সেই নির্বাচনে নতুন জোট সরকার গঠনের জন্য পর্যাপ্ত সমর্থন পাননি। প্রথম দিকের দুটি নির্বাচন শেষ হয়। তাতে কোনো ফল আসেনি। তৃতীয় নির্বাচনের পর জাতীয় ঐক্যমতের সরকার গঠনের মধ্য দিয়ে শেষ হয়। এই সরকারে ক্ষমতা ভাগাভাগি নিয়ে তখনকার বিরোধী দলীয় নেতা বেনি গানটজের সঙ্গে চুক্তি করেন নেতানিয়াহু। কিন্তু ওই সরকারও ডিসেম্বরে ভেঙে যায়। ফলে চতুর্থ নির্বাচন আসে। এই নির্বাচনে ১২০ আসনের পার্লামেন্টে লিকুদ পার্টি একক সর্ববৃহৎ দল হিসেবে আবির্ভাব ঘটে। কিন্তু আবারও সরকার গঠনের জন্য জোট তৈরিতে ব্যর্থ হন নেতানিয়াহু। ফলে বল চলে যায় লাপিডের হাতে। তার দল নির্বাচনে দ্বিতীয় বৃহৎ দল হিসেবে আবির্ভূত হয়। ফলে সরকার গঠনের জন্য তিনি সুযোগ পান। বিরোধী দলগুলোর মধ্যে নেতানিয়াহু বিরোধী মনোভাব বৃদ্ধি পেতে থাকে। ফলে জোটবদ্ধ হয় তারা।

মাত্র ৭টি আসন নিয়ে নির্বাচনে ইয়ামিনা পার্টি পঞ্চম অবস্থানে থাকলেও জোট সরকার গঠনে তাদের অংশগ্রহণ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে। কয়েক সপ্তাহ ধরে দরকষাকষি চলতে থাকে। ইয়াইর লাপিড ইয়ামিনা পার্টির নেতা নাফতালি বেনেটের পাওয়া ৭টি আসন নিজের ব্যাগে ভরতে সক্ষম হন। নেতানিয়াহুকে ক্ষমতা থেকে বিদায় করতে তিনি আরব দল, ধর্মীয় দলগুলোর সঙ্গে জোট গঠনের ঘোষণা দেন। অবশেষে ২রা জুন সময় শেষ হয়ে যাওয়ার ঠিক আধা ঘন্টা আগে লাপিড সরকার গঠনের ঘোষণা দেন। লাপিডের নেতৃত্বে নতুন সরকারে যদি নাফতালি বেনেট প্রধানমন্ত্রী হন তাহলে তা হবে ইসরাইলের ৭৩ বছরের ইতিহাসে এক বিরল সরকার।

আপনার মতামত দিন

বিশ্বজমিন অন্যান্য খবর



বিশ্বজমিন সর্বাধিক পঠিত



DMCA.com Protection Status