একাধিক ব্রান্ডের ভ্যাকসিনের মিশ্রণ অধিক কার্যকর, এক দেশের উপর নির্ভরশীলতা নয়

ড. জিয়াউদ্দিন হায়দার

শরীর ও মন ২ জুন ২০২১, বুধবার | সর্বশেষ আপডেট: ১০:২৩ পূর্বাহ্ন

সম্প্রতি মে মাসের ১৯ তারিখে প্রকাশিত বিশ্ববিখ্যাত বৈজ্ঞানিক জার্নাল "ন্যাচার" এর তথ্য মতে করোনাভাইরাসের ভ্যাকসিন এর মিশ্রণ, বিশেষ করে অ্যাস্ট্রাজেনেকা ও ফাইজার এর মিশ্রণ SARS-CoV-2 ভাইরাসের বিরুদ্ধে আমাদের শরীরের রোগ-প্রতিরোধ ক্ষমতা কিছুটা হলেও বাড়িয়ে দেয়। এছাড়াও এই মিশ্রণটির কোনো ক্ষতিকর প্রভাব সম্পর্কিত তথ্য এখন পর্যন্ত কোথাও প্রকাশিত অথবা বৈজ্ঞানিকভাবে প্রমাণিত হয়নি। স্পেনের ৬০০ প্রাপ্ত বয়স্ক ব্যক্তির উপর সর্বপ্রথম গবেষণাটি করা হয় এ বছরের মার্চ-এপ্রিল মাসে, এবং বর্তমানে একই গবেষণা করা হচ্ছে বৃটেনেও। যদিও বৃটেনে করা গবেষণার পূর্ণ ফলাফল এখনো প্রকাশিত হয়নি, প্রাথমিকভাবে পাওয়া বৈজ্ঞানিক তথ্যমতে এই গবেষণার ফলাফল স্পেনে সম্পাদিত প্রথম গবেষণার ফলাফলকেই সমর্থন করবে। SARS-CoV-2 এর বিরুদ্ধে রোগ-প্রতিরোধ ক্ষমতাকে দীর্ঘ সময়ের জন্য দ্রুততার সাথে বাড়ানোর জন্য ইতিমধ্যেই ইউরোপের কিছু দেশ, যেমন- জার্মানি, ফ্রান্স, সুইডেন, নরওয়ে, ডেনমার্ক, তাদের জনসংখার একটি অংশকে সুযোগ থাকলে দুটি ভিন্ন ধরনের (মূলত অ্যাস্ট্রাজেনিকা ও ফাইজার) COVID-19 ভ্যাকসিনের মিশ্রণ নিতে উদ্বুদ্ধ করছে। গবেষকরা আশা করছেন এমন মিশ্রণ মানবদেহের রোগ প্রতিরোধ-ক্ষমতাকে যথেষ্ট পরিমাণে বাড়াবে এবং দীর্ঘমেয়াদি করবে, যা করোনার বিরুদ্ধে আমাদের যুদ্ধ জয়ের সম্ভাবনাকে কিছুটা হলেও বাড়িয়ে দেবে।

ভ্যাকসিনের এই মিশ্রিত প্রয়োগটি বাংলাদেশের মতো অনেক দেশের জন্যই একটি বড় ধরনের সুখবর। বিশেষ করে যারা বিশ্ব বাজার থেকে পূর্ব চুক্তি অনুযায়ী সরবরাহ এবং চাহিদার আকাশ কুসুম পার্থক্যের কারণে একই ব্রান্ডের ভ্যাকসিন পেতে সঙ্গতভাবেই হিমশিম খাচ্ছে এবং এই কারণে করোনা ভ্যাকসিনের ব্যাপক জাতীয় কার্যক্রম সঠিকভাবে শুরু হওয়ার পূর্বেই স্থবির হয়ে যাওয়ার আশংকায় ভুগছে।

যুক্তির খাতিরে সরবরাহ এবং চাহিদার প্রসঙ্গটি না হয় বাদ দিলাম। স্পেন এবং বৃটেনের গবেষণার তথ্য মতে যদি একটি নির্দিষ্ট ভ্যাকসিনের প্রথম ডোজ করোনার নতুন কোনো ভ্যারিয়েন্টের বিরুদ্ধে ততোটা কার্যকর নাও হয় তাহলে ভ্যাকসিনের অন্য একটি ব্রান্ডের দ্বিতীয় ডোজ বুস্টার হিসেবে কাজ করবে এবং ভ্যাকসিনের সার্বিক কার্যকারিতা বাড়িয়ে দেবে।
সুতরাং, ব্যাপারটিকে ভিন্ন দৃষ্টি থেকে দেখলে ভ্যাকসিনের মিশ্র ডোজ নেওয়া আমাদের জন্য হয়তো এক ধরনের শাপে বর হওয়ারই মতো।

এবার আসা যাক, শারীরিক নিরাপত্তার প্রসঙ্গে। বিশ্ববিখ্যাত মেডিকেল জার্নাল ল্যান্সেট এ গত মাসে (মে ২০২১) প্রকাশিত তথ্যমতে প্রথম ও দ্বিতীয় ডোজ হিসেবে অ্যাস্ট্রাজেনেকা এবং ফাইজার এর মিশ্রণ আমাদের শরীরের জন্য একেবারেই নিরাপদ৷ বৃটেনে ৫০ বছরের বেশি বয়সী এমন ৮৩০ জন পুরুষ এবং নারীকে প্রথম ডোজ হিসেবে অ্যাস্ট্রাজেনেকা এবং দ্বিতীয় ডোজ হিসেবে ফাইজার ভ্যাকসিন প্রয়োগ করা হয়েছিল। দ্বিতীয় ডোজ নেওয়ার পর অনেকেই কিছু পার্শ্ব প্রতিক্রিয়া, যেমন ভ্যাকসিন প্রয়োগের জায়গায় ব্যথা, দুর্বলতা, মাথা ধরা, জ্বরজ্বর ভাব, ইত্যাদিতে ভুগছিলেন। এই ধরনের পার্শ্ব প্রতিক্রিয়ার মাত্রা যারা দুটি ডোজেই একই ব্রান্ডের ভ্যাকসিন নিয়েছিলেন তাদের তুলনায় কিছুটা বেশি ছিল। তবে ওই পার্শ্ব প্রতিক্রিয়াগুলো কারো ক্ষেত্রেই তিন দিনের বেশি স্থায়ী ছিল না এবং ব্যথানাশক যেমন প্যারাসিটামল ট্যাবলেট ওই ধরনের পার্শ্ব প্রতিক্রিয়াগুলোকে অনেকাংশেই কমাতে পেরেছিল। স্পেনে করা একই ধরনের আরেকটি গবেষণার ফলাফল বৃটেনে করা এই গবেষণার অনুরূপ ছিল। ওই গবেষণায়ও প্রথম ও দ্বিতীয় ডোজে দুটি ভিন্ন ব্রান্ডের ভ্যাকসিন গ্রহীতাদের মধ্যে কিছুটা বেশি পার্শ্ব প্রতিক্রিয়া দেখা গেলেও তার মাত্রা ছিল সহনীয় এবং স্বল্পমেয়াদি।

এখন পর্যন্ত পাওয়া তথ্যমতে কয়েকটি বিষয়ে উপসংহারে পৌঁছা মোটেই দুরূহ নয়। যারা প্রথম ডোজে অ্যাস্ট্রাজেনেকা ভ্যাকসিন নিয়েছেন তারা কোনো ধরনের দ্বিধাদ্বন্দ্ব ছাড়াই দ্বিতীয় ডোজের ক্ষেত্রে ফাইজার এর ভ্যাকসিন নিতে পারেন। পার্শ্ব প্রতিক্রিয়া কিছুটা বেশি হলেও সেটা সহনীয়, তিন দিনের বেশি সময় স্থায়ী হয় না এবং প্রয়োজনে প্যারাসিটামল জাতীয় ঔষধের ব্যবহারও করা যাবে। তাছাড়া যেহেতু বাংলাদেশেও করোনাভাইরাসের ভিন্ন ভিন্ন ভ্যারিয়েন্ট পাওয়া যাচ্ছে, সেহেতু প্রথম ডোজে অ্যাস্ট্রাজেনেকা নেওয়ার পর দ্বিতীয় ডোজে বুস্টার হিসেবে  ফাইজার এর ভ্যাকসিন নিলে হয়তো করোনার বিরুদ্ধে নিজেকে অধিক মাত্রায় নিরাপদ করা যাবে। এর মাধ্যমে খুব শীঘ্রই নিজেদের অধিক হারে করোনার বিরুদ্ধে সুরক্ষিত করা যাবে।

বর্তমানে বাংলাদেশে অ্যাস্ট্রাজেনেকা ভ্যাকসিনের মজুদ নেই  সঙ্গত কারণেই অতি দ্রুত ভারত থেকে এই ভ্যাকসিনটির কোনো চালান আসবে কিনা তা কেউই স্পষ্ট করে বলতে পারবে না। কিন্তু, 'কোভ্যাক্স' এর সাথে চুক্তির আওতায় বাংলাদেশ ইতিমধ্যেই ফাইজার এর ভ্যাকসিন পেয়েছে। শুনা যাচ্ছে যুক্তরাষ্ট্রের সাথে দ্বিপক্ষীয় চুক্তির আওতায় এই উন্নতমানের ভ্যাকসিনটির অধিক চালান দেশটি খুব শীঘ্রই পেতে যাচ্ছে।

সব মিলিয়ে বলা যায়- একটি দেশের উপর নির্ভরশীলতা নয়, একাধিক ব্রান্ডের ভ্যাকসিনের মিশ্রণ এবং বহুমাত্রিক ভ্যাকসিন ডিপ্লোমেসির মধ্যেই লুকায়িত আছে আমাদের মতো জনবহুল এবং অপেক্ষাকৃত দরিদ্র দেশের জনস্বাস্থ্য উন্নয়নের সাফল্য।

[লেখকঃ স্বাস্থ্য ব্যবস্থা উন্নয়ন ফোরামের প্রতিষ্ঠাতা। লেখাটি ফেসবুক থেকে নেয়া]

আপনার মতামত দিন

শরীর ও মন অন্যান্য খবর



শরীর ও মন সর্বাধিক পঠিত



DMCA.com Protection Status