সোর্স মুছা কোথায়?

জালাল রুমি, চট্টগ্রাম থেকে

শেষের পাতা ১৭ মে ২০২১, সোমবার | সর্বশেষ আপডেট: ২:৩৬ অপরাহ্ন

চট্টগ্রামের চাঞ্চল্যকর মাহমুদা খানম মিতু হত্যাকাণ্ডে তদন্তের গতি পাল্টানো চরিত্র কামরুল ইসলাম মুছা। তবে মিতুর স্বামী তৎকালীন পুলিশ কর্মকর্তা বাবুল    
আক্তারের এক সময়ের কাছের এই সোর্স ঘটনার পর থেকে রহস্যজনক ভাবে নিখোঁজ আছেন। এই বিষয়ে স্ত্রী পান্না আক্তারের দাবি, ঘটনার ১৭ দিন পর পুলিশ এসে তার স্বামীকে বাসা থেকে নিয়ে যায়। এরপর থেকে তার আর খোঁজ পাচ্ছেন না পরিবার। তবে পুলিশ বলছে, আসামি মুছা ঘটনার পর থেকে
 পলাতক আছেন। তাকে ধরার চেষ্টা চলছে।  জানা যায়, মুছা মূলত উত্তর চট্টগ্রামের রাঙ্গুনিয়ার বাসিন্দা। এক সময় তিনি সৌদি আরব  থাকতেন। ২০০৩ সালে তিনি দেশে চলে আসেন।
এরপর ২০০৮ সাল থেকে নগরীর কালা মিয়া বাজার এলাকায় সপরিবারে বসবাস করতে শুরু করেন। সেখানে তার বালুর ব্যবসা ছিল। পাশাপাশি রাঙ্গুনিয়ায় সালাহউদ্দিন কাদের চৌধুরীর হয়ে বিএনপি’র রাজনীতি করতেন। একপর্যায়ে পুলিশ কর্মকর্তা বাবুল আক্তারের সঙ্গে তার পরিচয় হয়। এরপর ২০১৩ সাল থেকে তিনি বাবুল আক্তারের সোর্স হিসেবে কাজ করতে থাকেন।
খোঁজ নিয়ে জানা যায়, বাবুল আক্তারের পরিবারের নানা বিষয়ও জানতেন মুছা। তাকে দিয়ে বাবুল আক্তার অনেক কাজ করাতেন। সর্বশেষ মিতুকে হত্যা করতে তাকে দিয়ে খুনিদের সঙ্গে তিন লাখ টাকায় চুক্তি করেন বাবুল আক্তার। হত্যাকাণ্ডের পরের দিন চুক্তির এই টাকা বাবুলের নিকটাত্মীয় সাইফুলের মাধ্যমে মুছার এক আত্মীয়ের কাছে পৌঁছে দেন বাবুল।
জানা যায়, মিতু হত্যাকাণ্ডের ১৭ দিন পর ২২শে জুন মুছাকে বন্দর থানা এলাকায় এক আত্মীয়ের বাসা থেকে পুলিশ পরিচয়ে উঠিয়ে নেয়া হয়। এরপর থেকে তার আর কোনো সন্ধান পাচ্ছেন না পরিবার। এটি নিয়ে বিভিন্ন জনের কাছে ধরনা দিয়েও স্বামীর সন্ধান পাননি স্ত্রী পান্না। সে সময় স্বামীর সন্ধান চেয়ে চট্টগ্রাম প্রেস ক্লাবে একটি সংবাদ সম্মেলনও করেছিলেন তিনি। একপর্যায়ে ওই বছরের ৬ই অক্টোবর সিএমপির তৎকালীন কমিশনার ইকবাল বাহার মুছার সন্ধান দিতে পারলে পাঁচ লাখ টাকা পুরস্কার ঘোষণা দেন। যদিও এটা ছাড়া পুলিশের তেমন কোনো তৎপরতা লক্ষ্য করা যায়নি। তবে পিবিআইয়ের তদন্তে প্রতিবেদন জমা দেয়া ও বাবুল আক্তারকে আসামি করে শ্বশুর মোশাররফ হোসেনের মামলা করার পর থেকে মুছার বিষয়টি আবার উঠে আসে। সবার এখন প্রশ্ন, বাবুল আক্তারের সেই সোর্স মুছা এখন কোথায় আছেন।
এ বিষয়ে মুছার স্ত্রী পান্না আক্তার মানবজমিনকে বলেন, মিতু হত্যাকাণ্ডের পর পুলিশ অভিযান শুরু করলে মুসা কয়েকদিন আত্মগোপনে চলে যায়। পরে তিনি আত্মসমর্পণের সিদ্ধান্ত নেন। একপর্যায়ে ২২শে জুন একটি টিএন্ডটি নাম্বার থেকে বাবুল আক্তার তাকে ফোন দিয়ে সাবধানে থাকতে বলেন। সেদিন রাতেই পুলিশ এসে তার সামনে হাতকড়া পরিয়ে মুছাকে নিয়ে যায়। এরপর থেকে তার আর কোনো খবর নেই।
তিনি বলেন, ‘মুছাকে উঠিয়ে নিয়ে যাওয়ার পর আমি রাঙ্গুনিয়া থানায় জিডি করতে যাই। কিন্তু সে সময় আমার জিডি নেয়া হয়নি। বলা হয়েছিল, যেখান থেকে নিয়ে যাওয়া হয়েছে সেখানে যান। এ ছাড়া বিভিন্ন নাম্বার থেকে ফোন দিয়ে এই বিষয়ে কোনো কথা না বলতে আমাকে হুমকি দেয়া হচ্ছিল। পরে আমার দুই শিশু সন্তানের জীবনের কথা চিন্তা করে আমি এই বিষয়টি সে সময় কাউকে জানাইনি।’
মুছার স্ত্রী পান্না বলেন, আমার স্বামী যদি সত্যিকারে অপরাধ করে থাকেন, তাহলে তার জন্য তো আইন-আদালত আছে। তারা বিচার করবেন। কিন্তু একটি জলজ্যান্ত মানুষকে এ ভাবে গুম করে ফেলা হলো। এখন সন্তানদের নিয়ে আমরা কার কাছে যাবো। কার কাছে বিচার চাইবো।’
তিনি বলেন, ‘আমার স্বামীর পাসপোর্ট ছিল। সে যদি সত্যিই পালিয়ে যেতেন তবে বাসা থেকে পাসপোর্ট নিয়ে যেতেন। কিন্তু সেটি এখনো তাদের বাসায়। সন্তানদের খোঁজ নিতেন, কিন্তু তার কিছু হচ্ছে না। এর মানে হচ্ছে আমার স্বামী পুলিশের কাছেই আছেন। আমি আমার স্বামীর সন্ধান চাই।’
পান্না বলেন, ‘গত বছরের নভেম্বর মাসে মুছার ব্যাপারে জানতে তদন্ত কর্মকর্তারা আমার বাড়িতে এসেছিলেন। সে সময় আমি যা যা জানি সব বলেছিলাম। এখন বাবুল আক্তারকে আটক করা হয়েছে। তাই আমি সাহস করে প্রকাশ্যে সব বলছি। আমি আশা করছি, এখন আমার স্বামীকে উদ্ধার করা হবে।
তবে মুছাকে পুলিশ আটক করে নিয়ে গেছে বলে স্ত্রী পান্নার দাবি নিয়ে জানতে এই মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তা পিবিআইয়ের ইন্সপেক্টর সন্তোষ কুমার মানবজমিনকে বলেন, মুছার স্ত্রীর এই কথা সত্য নয়। তিনি এতদিন পর এসে এই কথা কেন বলছেন সেটি কোনোভাবেই বোধগম্য হচ্ছে না। তবে মুছাকে আটকের চেষ্টা চলছে।’
এদিকে গত ১৩ই মে মুছার বড় ভাই সাইদুল ইসলাম সিকদার শাকু (৪৫)কে রাঙ্গুনিয়া থেকে আটক করে র‌্যাব-৭। এর একদিন আগে বাবুল আক্তারের শ্বশুরের দায়ের করা মামলায় তিনি সাত নম্বর আসামি ছিলেন। তার বিরুদ্ধে মিতুকে হত্যার সময় ব্যবহৃত মোটরসাইকেলটি সরবরাহের অভিযোগ রয়েছে।
উল্লেখ্য, ২০১৬ সালের ৫ই জুন সকালে চট্টগ্রাম নগরীর জিইসি মোড়ে ছেলেকে স্কুল বাসে তুলে দিতে যাওয়ার সময় খুন হন পুলিশ কর্মকর্তা বাবুল আক্তারের স্ত্রী মাহমুদা খানম মিতু। জঙ্গিরাই এই হত্যাকাণ্ড ঘটিয়েছে বলে শুরুতে এই পুলিশ কর্মকর্তা সবার কাছে উপস্থাপন করেন। এ নিয়ে সে সময় সাধারণ মানুষেরও বেশ সহানুভূতিও আদায় করেন তিনি। তবে ঘটনাস্থলের প্রাপ্ত সিসিটিভি ফুটেজে তার সোর্স মুছার উপস্থিতি ও একটি ফোনালাপে হঠাৎ পাল্টে যায় দৃশ্যপট। স্বয়ং বাবুল আক্তারই যে হত্যাকাণ্ডের মূল কারিগর সেটি প্রকাশ্যে চলে আসে তদন্তকারী সংস্থার কাছে।

পাঠকের মতামত

**মন্তব্য সমূহ পাঠকের একান্ত ব্যক্তিগত। এর জন্য সম্পাদক দায়ী নন।

Md. Fazlul hoque

২০২১-০৫-১৬ ২১:১৬:২২

বিসিএস ক্যাডারের একজন চৌকশ পুলিশ কর্মকর্তার স্ত্রী খুন হওয়ার পরপরই উনি কেন চাকুরি থেকে অব্যাহতি নিয়েছেন ? এ প্রশ্নটির উত্তর খুঁজতে গেলেই মিতু খুনের সব গোপন রহস্য পরিষ্কার হয়ে যাবে। বর্তমানে পিবিআই যে গুলো বলছে এইসব আলামত বিগত চার পাঁচ বছর যাবত ATN News সহ অনেক মিডিয়া তে প্রচার করা হয়েছে কিন্তু কোনো এক রহস্যজনক কারণে বাবুল আক্তারের ব্যাপারে পুলিশ প্রশাসন নীরব ছিলেন। বাবুল আক্তারের নিজ থেকে পদত্যাগ অথবা পদত্যাগে বাধ্য করে ও যেমন মিতু খুনের দায় থেকে বাবুল আক্তার নিস্তার পাননি তেমনি মিতু খুনের নতুন করে মামলা হওয়া ও বাবুল কে রিমান্ডে নেওয়ার মধ্যে ও হয়তো আরো জটিল সমীকরণ জড়িত আছে ।

উদ্দুস উদ্দিন

২০২১-০৫-১৬ ১৩:০৩:০৮

যারা মুছাকে উঠিয়ে নিয়ে গেছিলো তারাই উপরের নির্দেশে এই মুসাক ৬ রাউন্ড গুলি করে। পরে পাথরের বস্তায় বেঁধে তার লাশকে কর্ণফুলীর গভীরে ডুবায়ে দেওয়া হয়। মিডিয়াগুলোকে বলছি অযথা মুসার পিছনে না ছুটে, বরং উপরের ওই নির্দেশদাতা কে ছিল সেটা বের করুন।

আপনার মতামত দিন

শেষের পাতা অন্যান্য খবর

সুইস ব্যাংকে বাংলাদেশিদের ৫২৯১ কোটি টাকা

১৯ জুন ২০২১

নাম-পরিচয় গোপন রেখে অর্থ জমা রাখার জন্য ধনীদের আকর্ষণীয় গন্তব্য হলো সুইজারল্যান্ড। সুইস ব্যাংকে থাকা ...

আরও ৫৪ জনের মৃত্যু

শনাক্তের হার বাড়ছে

১৯ জুন ২০২১

দেশে একদিনে করোনার শনাক্তের হার ফের প্রায় ১৯ শতাংশে পৌঁছেছে। গত ২৪ ঘণ্টায় করোনায় আক্রান্ত ...

প্রার্থীরা মুখোমুখি

সিলেটে ভোটের আগেই উত্তাপ

১৮ জুন ২০২১

বৈশ্বিক শান্তি সূচকে সাত ধাপ এগিয়ে ৯১তম বাংলাদেশ

১৮ জুন ২০২১

বৈশ্বিক শান্তি সূচকে বড় অগ্রগতি হয়েছে বাংলাদেশের। গত বছরের তুলনায় এক লাফে ৭ ধাপ এগিয়ে ...

আরও ৫৩ হাজার গৃহহীন পরিবার পাচ্ছে নতুন ঠিকানা

১৮ জুন ২০২১

প্রধানমন্ত্রীর আশ্রয়ণ প্রকল্পের আওতায় দ্বিতীয় পর্যায়ে আরও ৫৩ হাজার ৩৪০টি গৃহহীন পরিবারকে ঘর দিচ্ছে সরকার। ...



শেষের পাতা সর্বাধিক পঠিত



কেন্দ্রীয় ছাত্রলীগের সাবেক সাধারণ সম্পাদকের গাড়িতে হামলা

জুড়ীতে আওয়ামী লীগের দ্বন্দ্ব চরমে

প্রার্থীরা মুখোমুখি

সিলেটে ভোটের আগেই উত্তাপ

DMCA.com Protection Status