করোনার থাবায় বিবর্ণ ঈদ

ড. মুহম্মদ দিদারে আলম মুহসিন

মত-মতান্তর ১৩ মে ২০২১, বৃহস্পতিবার

দেশে আরো একবার সর্বস্তরের মানুষের মধ্যে পরিবার-পরিজন সমভিব্যহারে একত্রে ঈদ করোনার প্রকোপের মধ্যে রমজানের ঈদের আগমন। একদিকে মালসব্যাপী সিয়াম সাধনার পরকরার আবেগময় প্রতীক্ষা, অন্যদিকে সবেমাত্র থিতিয়ে পড়তে শুরু করা করোনা সংক্রমণ ফের তুঙ্গে উঠার শংকা। পাশের দেশে তান্ডব চালানো করোনাভাইরাসের নতুন রূপের এখানেও ছড়িয়ে পড়ার চোখ রাঙানি। এই ভ্যারিয়েন্ট এরই মধ্যে দেশে ঢুকে পড়েছে বলে প্রমাণ মিলেছে। বলা মুশকিল, দেশের কোথায় কি পরিমাণে এর বিস্তার ঘটেছে ইতোমধ্যে। ঈদযাত্রায় ঘরমুখো মানুষের গমনাগমনে এই ভ্যারিয়েন্ট যদি ছড়িয়ে পড়ে দেশময়, কি ভয়ংকর পরিস্থিতির উদ্ভব হতে পারে ভাবতেই গা শিউরে উঠে। কাজেই, লকডাউন দিয়ে লোকজনকে নিজ নিজ কর্মস্থলে আটকে রাখার কিইবা বিকল্প আছে? আর লকডাউনের মধ্যে ঈদ! কি করুণ দশা! বারে বারে এটাও দেখার বাকি ছিল বৈকি!

এদেশের ধর্মপ্রাণ মুসলমানদের মাঝে রমজানের রোজা ও তৎ-পরবর্তী ঈদ দুই-ই বিশেষ আবেগ-উচ্ছাসের জন্ম দেয়। মাহে রমজানকে সবাই বিপুল উদ্দীপনায় স্বাগত জানায়।
সমাজের সর্বত্র এক স্বর্গীয় আবহের সৃষ্টি হয়। রোজা, ইফতার, তারাবীহ ও সেহেরি প্রতিটি পর্বই যেন এক একটি ব্যতিক্রমী ব্যঞ্জনা নিয়ে উপস্থিত হয়। বিশেষ করে, ইফতারের মুহুর্তে সবাই যখন ইফতার সামগ্রী সামনে নিয়ে মুয়াজ্জিনের আযানের অপেক্ষায় অধীর আগ্রহে প্রতীক্ষমান থাকে, আর আযান শুনে সারাদেশের সকল মানুষ একই সাথে তাদের রোজার ইতি টানে, তখন এক অভিনব ভাবগম্ভীর পরিবেশের সৃষ্টি হয়। অনেকেই বাড়ি-বাড়ি, পাড়া-মহল্লা, ক্লাব-রেস্টুরেন্টে আনুষ্ঠানিক/ অনানুষ্ঠানিকভাবে একত্রে ইফতারের আয়োজন করে। তারাবীহ, জুমাতুল বিদা ও লাইলাতুল কদরে মসজিদসমূহে যে বিপুল সমাগম ঘটে, তা সত্যিই অপূর্ব।

মানুষ এক একটি রোজা রাখে, আল্লাহ পাকের ইবাদত-বন্দেগী করে আর উন্মুখ হয়ে অপেক্ষা করে রাব্বুল আলামীনের দেয়া উপহার সেই বিশেষ দিনটির জন্য ঈদের দিন, আনন্দের দিন, উৎসবের দিন। দিনটি নিজের মতো করে উদযাপনের জন্য সবাই যার যার মতো পরিকল্পনার ছক আঁকতে থাকে। মাঝ রমজান থেকেই নতুন জামা কাপড়, জুতো-স্যান্ডেল কেনার ধূম লেগে যায়। সবাই নিজেকে বিশেষ দিনটিতে অনন্য সাজে সাজাতে চায়। অবশেষে পুরো এক মাসের কঠোর সিয়াম সাধনার পর যখন  বহুল প্রতীক্ষিত দিনটি আসে, চাঁদ দেখা, ঈদ জামাতে শরীক হওয়া আর জামাত শেষে কোলাকুলি আর 'ঈদ মোবারক' সম্ভাষণে চারিদিক মুখরিত করে তোলার যে প্রতিযোগিতা লেগে যায়, তা'ই বলে দেয়, আজ সত্যিই খুশির দিন।

এই অপূর্ব সুযোগ কেই বা মিস করতে চায়? উৎসবপ্রিয় বাঙ্গালী তো নয়ই। তাই, ঈদের ছুটিতে বাস, ট্রেন কিংবা লঞ্চে, যে যেভাবে পারে, ছুটে চলে নাড়ির টানে নিজ নিজ ঠিকানায়। উদ্দেশ্য, আত্মীয়-পরিজন, পাড়া-পড়শির সাথে ঈদের আনন্দ ভাগাভাগি করা। ঘরমুখো মানুষের এই স্রোত ঠেকায় কে? চলমান করোনা পরিস্থিতি মোকাবেলায় সরকার এই স্রোত নিয়ন্ত্রণে দূরপাল্লার গণপরিবহন বন্ধ রেখেছে। তাতে কি তেমন কোন লাভ হয়েছে? ফেরিঘাটসমূহে উপচেপড়া ভীড় অন্তত তেমনটি নির্দেশ করে না। গাদাগাদি করে লোকজন যাচ্ছে ব্যক্তিগত পরিবহণে কিংবা একের পর এক স্বল্প-পাল্লার গণপরিবহন পাল্টে। এতে কি আরও একবার প্রমাণ হল: এধরণের 'সীমিত লকডাউন' আসলে তেমন কাজে আসে না? আসল কথা হল, আমরা জনগণকে উজ্জীবিত করতে পারিনি। বিশেষজ্ঞ মহল থেকে এজন্য বার বার জনপ্রতিনিধি এবং রাজনৈতিক ও সমাজকর্মীদের সম্পৃক্ত করতে পরামর্শ দেয়া হয়েছে। কেবল আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীকে ব্যবহার করে এধরণের কর্ম-পরিকল্পনা বাস্তবায়ন সম্ভব নয়। আরও একটি বিষয় বিশেষভাবে বিবেচ্য। এধরণের বিষয়ে জনগণকে উজ্জীবিত করতে ধর্মীয় নেতাগণ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারেন। ইসলাম তো এই শিক্ষাই দেয় যে, মহামারীর সময় যে যেখানে আছেন, সেখানেই থাকুন।

করোনা মহামারি আর 'লকডাউনে' অনেক লোক জীবিকা হারিয়েছে। নিম্ন আয়ের খেটে খাওয়া মানুষের অবস্থা আরও প্রান্তিক পর্যায়ে গিয়ে ঠেকেছে। যেসব গণপরিবহণ বন্ধ রয়েছে, ওসবের সাথে সংশ্লিষ্ট মালিক-শ্রমিকদের মাথায় যেন বাজ পড়েছে। সারা বছরে ঈদ মৌসুমটা তাদের আয়-রোজগারের একটি বিশেষ সুযোগ। একই কথা যে সব ব্যবসায়ী ঈদ-সামগ্রী, যথা জামা-কাপড়, জুতো-স্যান্ডেল, প্রস্তুত ও বিপণনে নিয়োজিত তাদের বেলায়ও প্রযোজ্য। সরকার শপিং মলসমূহের কার্যক্রমের উপর আরোপিত নিষেধাজ্ঞা শিথিল করলেও এরা এ মৌসুমে কতটা ব্যবসা করতে পারবে সে প্রশ্ন থেকেই যায়। প্রশ্ন হচ্ছে, জীবিকা হারানো কিংবা প্রান্তিকে গিয়ে ঠেকা বিপন্ন, শ্রমজীবী মানুষের জন্য এই ঈদ কি বার্তা নিয়ে আসছে? তাদেরও ত পরিবার-পরিজন আছে, সাধ-আহ্লাদ আছে। এই সমাজ এদের জন্যে কি করতে পারে বা পেরেছে? এদের চাহিদা খুবই সামান্য। এদের কোনভাবে চালিয়ে নিতে প্রণোদনা দেয়ার মতো অর্থ কি রাষ্ট্র বা সমাজের হাতে আছে? এদেশের বিপুল সংখ্যক ধর্মপ্রাণ মানুষ এই রমজান মাসে গরিবের হক বিবেচনায় তাদের সঞ্চয় থেকে যাকাৎ আদায় করে থাকে। হিসেবে করলে দেখা যাবে, এ অর্থ বিপুল। রাষ্ট্র/সরকার কি রাষ্ট্রীয়ভাবে এ অর্থ সংগ্রহ ও বিতরণের জন্য একটি কার্যকর ও সমন্বিত ব্যবস্থা গড়ে তুলতে পারে? নিদেনপক্ষে, স্থানীয় পর্যায়ে প্রতিনিধিস্থানীয় ব্যক্তিবর্গ ও আলেম-উলামাদের সমন্বয়ে কমিটি গঠনের উদ্যোগ নিতে পারে?
সবাই ভাল থাকুন।

লেখক: অধ্যাপক, ফার্মেসি বিভাগ, জাবি।

আপনার মতামত দিন



মত-মতান্তর সর্বাধিক পঠিত



DMCA.com Protection Status