জৈন্তাপুরে শেকলে বেঁধে গৃহবধূ নির্যাতন, তোলপাড়

ওয়েছ খছরু, সিলেট থেকে

প্রথম পাতা ৯ মে ২০২১, রোববার | সর্বশেষ আপডেট: ২:৪৪ অপরাহ্ন

গ্রেপ্তারকৃত জমসেদ আলী
চৌকাঠের সঙ্গে লোহার শেকল দিয়ে বেঁধে রাখা হয় গৃহবধূ কলসুমাকে। এরপর তার ওপর চলে নির্যাতন। মারধর করে পরনের কাপড় পর্যন্ত ছিঁড়ে ফেলা হয়। নির্যাতনকালে ‘বাঁচাও-বাঁচাও’ বলে চিৎকার করলেও কেউ তার ডাকে সাড়া দেয়নি। বরং দূরে দাঁড়িয়ে শত শত মানুষ প্রত্যক্ষ করেছে ঘটনাটি। লোমহর্ষক এমন ঘটনা ঘটেছে সিলেটের জৈন্তাপুরের শিকারখাঁ গ্রামে। তবে- নির্যাতনের খবর পেয়ে জৈন্তাপুর থানা পুলিশ সঙ্গে সঙ্গে গিয়ে কলসুমাকে উদ্ধার করে হাসপাতালে ভর্তি করে। প্রধান আসামি জমসেদ আলীকে গ্রেপ্তার করে কারাগারে পাঠিয়েছে।
তবে- কলসুমাকে বেঁধে মারধর করার ঘটনায় এলাকায় তোলপাড় চলছে। যারাই এমন ঘটনা শুনছেন তারা ধিক্কার জানাচ্ছেন। পবিত্র রমজানে এমন ঘটনা মেনে নিতে পারছেন না কেউ। শিকার খাঁ গ্রামের মশাহিদ আলীর সঙ্গে একই এলাকার দলইপাড়া উপর শ্যামপাড়া গ্রামের কলসুমা বেগমের বিয়ে হয় প্রায় ১৫ বছর আগে। কলসুমার পরিবারের লোকজন জানান, বিয়ের সময় তারা জানতেন না মশাহিদ মিয়া মানসিক রোগে ভুগছেন। বিয়ের পর তাদের কাছে মশাহিদ মিয়ার ত্রুটি ধরা পড়লেও তারা কখনোই মশাহিদের উপর ক্ষুব্ধ হননি। বরং সবকিছু মেনে নিয়ে তারা মশাহিদ ও কলসুমাকে সবধরনের সহযোগিতা করে আসছেন। বর্তমানে মশাহিদ ও কলসুমা চার ছেলে মেয়ের জনক-জননী। বছরের কিছু সময় মশাহিদ মিয়া অসুস্থ থাকেন। মানসিকভাবে বিপর্যস্ত হলে তাকে চিকিৎসকের পরামর্শে থাকতে হয়। মশাহিদ মিয়া পেশায় ড্রাইভার, সিএনজি অটোরিকশা চালান তিনি। সুস্থ থাকা অবস্থায় তিনি গাড়ি চালিয়ে টাকা উপার্জন করেন। আর সেই টাকা স্ত্রী কলসুমার কাছে জমা রাখেন। মশাহিদ মিয়া অসুস্থ হলে তখন সংসার চালানো ও চিকিৎসার ব্যয়ভার বহন করা হয়। কলসুমার ভাই ইসা মিয়া মানবজমিনকে জানিয়েছেন, গত বৃহস্পতিবার বিকালে তিনি খবর পান তার বোন কলসুমাকে ঘরের চৌকাঠের সঙ্গে বেঁধে রাখা হয়েছে। এবং নির্যাতন করা হচ্ছে। খবর পেয়ে তিনি স্থানীয় চারজন গণ্যমান্য লোক নিয়ে ছুটে যান কলসুমার স্বামীর বাড়িতে। গিয়ে তারা ঘটনাটি প্রত্যক্ষ করেন। এবং দেখেন যে কলসুমা বাধা অবস্থায়ই চিৎকার করছেন। কিন্তু কেউ তার সাহায্যে এগিয়ে যাচ্ছে না। এ সময় কলসুমার ভাসুর জমসেদসহ তাদের পরিবারের অনেকেই তাকে নির্যাতন করছিল। এমন দৃশ্য দেখে তিনি প্রতিবাদ করলে তাকেও হুমকি দেয়া হয়। পরে তিনি ঘটনাটি স্থানীয় জৈন্তাপুর থানা পুলিশকে অবগত করেন। পুলিশ গিয়ে চৌকাঠে বাধা অবস্থায় গুরুতর আহত কলসুমাকে উদ্ধার করে জৈন্তাপুর স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে ভর্তি করেন। নির্যাতনের শিকার কলসুমা হাসপাতালে থাকা অবস্থায় জানিয়েছেন, তার ভাসুর ও শ্বশুরের পরিবারের লোকজন প্রায় সময় টাকার জন্য মারধর করে। বৃহস্পতিবার তার ভাসুরসহ পরিবারের লোকজন তার কাছে ৩০ হাজার টাকা চায়। কথা মতো তিনি টাকা না দেয়ায় ভাসুর, বড় দুই ননদসহ পরিবারের লোকজন তাকে মারধর করে। তাদের অকথ্য নির্যাতনে তিনি গুরুতর আহত হন। পরে ঘটনার দিন দুপুরের দিকে তাকে লোহার শেকল দিয়ে চৌকাঠের সঙ্গে বেঁধে রাখা হয়। কলসুমা জানান, এ সময় তিনি সহযোগিতা চাইলে নির্যাতনকারীদের ভয়ে কেউ এগিয়ে আসেনি। এলাকার মানুষ ঘটনাটি প্রত্যক্ষ করলেও কেউ প্রতিবাদ করেননি। তার উপর অমানুষিক নির্যাতন চালানো হয়েছে দাবি করেন কলসুমা বেগম। নির্যাতনে তার পরনে থাকা ‘মেস্কি’ ছিড়ে ফেলা হয়। শরীরের বিভিন্ন স্থানে লাঠি দিয়ে আঘাত করা হয়।’ এদিকে- গুরুতর আহত অবস্থায় জৈন্তাপুর উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে কলসুমাকে ভর্তি করার দুইদিন গতকাল কিছুটা সুস্থ হলে তাকে বাড়ি পাঠিয়ে দেয়া হয়। এর আগে কলসুমা বাদী হয়ে সিলেটের জৈন্তাপুর থানায় নির্যাতনকারীদের আসামি করে মামলা দায়ের করেন। মামলা দায়েরের পর পুলিশ অভিযান চালিয়ে কলসুমার ভাসুর জমসেদ মিয়াকে গ্রেপ্তার করে কারাগারে পাঠিয়েছে। এ ব্যাপারে জৈন্তাপুর মডেল থানার ওসি গোলাম দস্তগীর আহমদ জানিয়েছেন, ‘খবর পাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে পুলিশ গিয়ে লোহার শেকলে বাঁধা অবস্থায় ওই মহিলাকে উদ্ধার করে। এ সময় সে অসুস্থ থাকায় তাকে জৈন্তাপুর স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে ভর্তি করা হয়। পরে কলসুমার জবানবন্দি রেকর্ড করে মামলা গ্রহণের পর প্রধান আসামি জমসেদকে গ্রেপ্তার করে কারাগারে প্রেরণ করা হয়েছে। অন্য আসামিদের গ্রেপ্তারে পুলিশ অভিযান অব্যাহত রেখেছে। তিনি বলেন, দুইদিন চিকিৎসা গ্রহণের পর গতকাল কলসুমা বাড়ি গেছেন। এ সময় পুলিশও তার সঙ্গে যায়। কলসুমা যাতে নিরাপত্তাহীনতায় না থাকে সে বিষয়টি নিশ্চিত করা হয়েছে। কলসুমা ও তার পরিবারের লোকজন জানান, প্রতি ৩-৪ মাস পরপর কলসুমার শ্বশুর ও ভাসুরসহ পরিবারের লোকজন তাকে মারধর করে। প্রায় ৪ মাস আগে নির্যাতন চালিয়ে তার কাছ থেকে ৫০ হাজার টাকা নেয়া হয়েছে। এ নিয়ে পারিবারিক দ্বন্দ্ব দেখা দিলে কলসুমা সন্তানদের নিয়ে পিতার বাড়ি চলে আসেন। গত রমজান মাসের ৩-৪ দিন আগে স্থানীয় ফতেহপুর ইউনিয়নের চেয়ারম্যান আব্দুর রশীদের মধ্যস্থতায় কলসুমা স্বামীর বাড়ি আসেন। এরপর থেকে শান্তিপূর্ণই চলছিল তাদের সংসার। কিন্তু কথামতো ৩০ হাজার টাকা না পেয়ে এবার মধ্যযুগীয় কায়দায় তার উপর চালানো হলো নির্মম নির্যাতন।

পাঠকের মতামত

**মন্তব্য সমূহ পাঠকের একান্ত ব্যক্তিগত। এর জন্য সম্পাদক দায়ী নন।

AL-MAMUN DEWAN

২০২১-০৫-০৮ ১৭:০৯:২৭

এমন লোভী পরিবারের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি খুবই প্রয়োজন,,,, পবিত্র রমজান মাসেও যারা টাকা অর্থ সম্পদের জন্য অমানুষিক নির্যাতন করে তাদের প্রকাশ্যে শাস্তি হোক,,,সবাইকে বিচারের আওতায় আনা হোক,,,

আপনার মতামত দিন

প্রথম পাতা অন্যান্য খবর

স্ত্রী ও দুই সন্তান হত্যা

সিলেটে পুলিশের কব্জায় হিফজুর

২০ জুন ২০২১

ইরানের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে রাইসির ভূমিধস জয়

২০ জুন ২০২১

ইরানের ১৩তম প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে ভূমিধস জয় পেয়েছেন কট্টর রক্ষণশীল প্রার্থী ইব্রাহিম রাইসি। প্রাথমিক ফলাফলের ভিত্তিতে ...

করোনাকালেও রিজার্ভে নয়া রেকর্ড

২০ জুন ২০২১

করোনাভাইরাস মহামারিকালেও বাংলাদেশ ব্যাংকের বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ বেড়েই চলেছে। হচ্ছে একের পর এক রেকর্ড। বর্তমানে ...

স্বাস্থ্যবিধি মানাবে কে?

ভারতীয় ভ্যারিয়েন্ট ছড়িয়ে পড়ায় উদ্বেগ-উৎকণ্ঠা

১৯ জুন ২০২১



প্রথম পাতা সর্বাধিক পঠিত



নাসির অল কমিউনিটি ক্লাবেরও সদস্য

সুনির্দিষ্ট অভিযোগ পেলে ব্যবস্থা

স্ত্রী ও দুই সন্তান হত্যা

সিলেটে পুলিশের কব্জায় হিফজুর

বাসযোগ্য শহরের তালিকা

ঢাকা কেন তলানিতে?

পুলিশ বলছে, আত্মগোপনে ছিলেন

৮ দিন পর খোঁজ মিললো আবু ত্ব-হার

DMCA.com Protection Status