হতাশায় লাখো চাকরি প্রত্যাশী

আলতাফ হোসাইন

প্রথম পাতা ৬ মে ২০২১, বৃহস্পতিবার | সর্বশেষ আপডেট: ১:৪৪ অপরাহ্ন

ফাইল ছবি
গত বছর ঢাকা কলেজ থেকে ইংরেজিতে অনার্স সম্পন্ন করেন নাটোরের রাকিব হাসান। নিম্ন মধ্যবিত্ত পরিবারের সন্তান রাকিবের স্বপ্ন ছিল পড়ালেখা শেষ করে একটি ভালো চাকরির ব্যবস্থা করে পরিবারের হাল ধরা। সন্তানকে নিয়ে একই স্বপ্ন বুনেছিলেন মা-বাবাও। কিন্তু করোনা মহামারি সব স্বপ্ন যেন ভেঙে চুরমার করে দিয়েছে। যে সময় রাকিবের চাকরির প্রস্তুতি নেয়ার কথা, তখন সংকটে পড়ে বাধ্য হয়ে তাকে ঢাকা ছেড়ে গ্রামে চলে যেতে হয়েছে। টিউশনি করে পড়ালেখার খরচ চালাতেন রাকিব। করোনার প্রকোপ শুরু হলে টিউশনি বন্ধ হয়ে যাওয়ায় শহরে টিকতে না পেরে গ্রামে গিয়ে এখন কৃষিকাজ করছেন। রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্যামিস্ট্রির ছাত্র হাসিদুল ইসলাম।
৩য় বর্ষে ওঠার পর বিশ্ববিদ্যালয় বন্ধ হয়ে যায়। এক বছর পেরিয়ে গেলেও এখনো তিনি ৩য় বর্ষের ছাত্র। অথচ বাবা মায়ের স্বপ্ন ছিল অল্পদিনের মধ্যেই সন্তান পড়ালেখা শেষ করে ভালো চাকরি করে পরিবারের দুঃখ-দুর্দশা দূর করবে। কিন্তু করোনায় সবকিছু থমকে আছে। কবে শিক্ষা প্রতিষ্ঠান খুলবে? কবে একটি চাকরির ব্যবস্থা হবে? সেই চিন্তায় ঘুম আসে না তাদের। শুধু রাকিব কিংবা হাসিদুল নন, করোনাকালে শিক্ষা কার্যক্রম স্থবির হয়ে পড়ায় এমন লাখ লাখ শিক্ষার্থীর ভবিষ্যৎ অনিশ্চয়তার মধ্যে পড়েছে।

রাজশাহীতে হাসিদুল টিউশনি করে পড়ালেখার খরচ জোগাতেন। কিন্তু করোনার কারণে টিউশনিও বন্ধ। এ অবস্থায় আর্থিক সংকটে পড়েন তিনি। পরে রাকিবের মতো হাসিদুলও গ্রামে এসে কৃষিকাজ শুরু করেন। অন্যদিকে তাকে নিয়ে যে স্বপ্ন দেখেছিলেন সেটিও অনিশ্চিত ধরে নিয়েছেন তার বাবা মা। হাসিদুল বলেন, মা-বাবা ভাবেন যে, সব মনে হয় শেষই হয়ে গেল। আমাদের পড়ালেখা শেখাতে তাদের কষ্ট ও শ্রম সবই বোধ হয় বৃথা। মনে হয় আমাদের নিয়ে তারা আশা ছেড়েই দিয়েছেন। এ অবস্থায় আমরাও হতাশার মধ্যে আছি। কবে নাগাদ বিশ্ববিদ্যালয় খুলবে কবে চাকরি-বাকরি করবো, পরিবারের স্বপ্ন পূরণ করবো? সেই চিন্তায় আমাদের চোখে ঘুম নেই।
 
রাকিব হাসান বলেন, যখন অনার্স শেষ হলো এর কিছুদিন পরেই করোনার প্রকোপ শুরু হয়। সবকিছু বন্ধ হয়ে যায়। টিউশনি করাতাম সেটাও বন্ধ। এ অবস্থায় বাড়িতে চলে আসি। বাড়িতে বাবার কাজে সহযোগিতা করি। পড়ালেখাও করি কিন্তু মনে হয় যেন পড়ালেখা করে আর কি করবো। চাকরির পরীক্ষা তো হচ্ছে না, প্রস্তুতি নিয়ে কী হবে। তবুও বাড়ির কাজের পাশাপাশি কিছুটা চাকরির প্রস্তুতি নেয়ার চেষ্টা করছি। কবে পরিস্থিতি ভালো হবে, কবে চাকরির পরীক্ষা হবে তার তো কোনো ঠিক নেই। মা বাবাও স্বপ্ন দেখেন যে ছেলে একটা ভালো চাকরি করবে। কিন্তু তারাও এখন দুশ্চিন্তায় থাকেন।

জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন বিভাগের ৪৬ ব্যাচের ৩য় বর্ষের শিক্ষার্থী ইউসুফ আলী বলেন, করোনার প্রকোপ শুরুর পর থেকে শিক্ষা কার্যক্রম বন্ধ। কবে বিশ্ববিদ্যালয় খুলবে তার কোনো তথ্য আমরা জানি না। ঢাকায় টিউশনি করে পড়ালেখার খরচ চালাতাম। সবকিছু বন্ধ হয়ে যাওয়ায় বাড়িতে এসে দিনমজুরের কাজ করেছি। আমাদের এলাকায় সারা বছরই বিভিন্ন কৃষিকাজ চলে। তাই আর্থিক টানাপড়নের মধ্যে শিক্ষিত হয়েও কৃষিকাজ করতে বাধ্য হচ্ছি। তিনি বলেন, পরিবার থেকে তো অনেক নিয়েছি। এখন তাদেরকে আমার কিছু দেয়ার কথা ছিল। এ বছর আমার অনার্স শেষ হওয়ার কথা ছিল। অথচ এখনো ৩য় বর্ষেই পড়ে আছি। আমার মতো এমন হাজার হাজার শিক্ষার্থীর একই সমস্যা। অনলাইনে ক্লাস চলে কিন্তু কোনো পরীক্ষা তো হয় না। তাহলে এই ক্লাস দিয়ে কি হবে? দেশে লকডাউনের মধ্যেও সবকিছু চলছে। শুধু শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বন্ধ। এতে দিন দিন আমাদের ভবিষ্যৎ নষ্ট হচ্ছে। এমনিতেই অভাবের সংসারে আমাদের বিভিন্ন সমস্যা। এভাবে পড়ালেখা বন্ধ থাকলে আমাদের ভবিষ্যৎ অনিশ্চয়তার মধ্যে পড়বে।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ভূগোল ও পরিবেশ বিজ্ঞান বিভাগের শিক্ষার্থী বেলাল হোসেন বলেন, এক বছর হলো ৩য় বর্ষেই পড়ে আছি। অনলাইনে ক্লাস হয়। বিশ্ববিদ্যালয় খুললে পরীক্ষা নেয়ার কথা। কিন্তু কবে বিশ্ববিদ্যালয় খুলবে আর কবে পরীক্ষা হবে তাতো বলা যাচ্ছে না। এ নিয়ে আমরা অনিশ্চয়তার মধ্যে আছি। আমাদের অভিভাবকরাও হতাশায় ভুগছেন। কারণ ঢাকায় থাকতে টিউশনি করে খরচ চালাতাম। কিন্তু এখন বাসায় বসে বসে খেতে হচ্ছে। কোনো কাজ নেই। আগে এলাকায় টিউশনি ছিল। এখন আমার মতো প্রচুর ছাত্র এলাকায় রয়েছে। এতো টিউশনি তো গ্রামে নেই। তাই কেউ কেউ বাধ্য হয়ে কৃষিকাজও করছেন। বেলাল আরো বলেন, এভাবে এক দুই বছর যদি বসে থাকতে হয় তাহলে আমাদের জন্য এটা বড় লস। কারণ চাকরির বয়স যা নির্ধারিত, তাইতো থাকবে। কবে শেষ করবো কবে চাকরির প্রস্তুতি নেবো তা নিয়ে আমাদের মধ্যে হতাশা কাজ করে।

চাকরিপ্রার্থীদের বয়সে ছাড় দিতে যাচ্ছে সরকার: ওদিকে লকডাউনে চাকরির পরীক্ষা নিতে না পারায় গত বছরের মতো এ বছরও চাকরিপ্রার্থীদের বয়সে ছাড় দিতে যাচ্ছে সরকার। জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয় শিগগিরই বিভিন্ন মন্ত্রণালয় ও বিভাগগুলোকে বয়সে ছাড় দিয়ে বিজ্ঞপ্তি দিতে নির্দেশনা দেবে বলে জানিয়েছেন জনপ্রশাসন প্রতিমন্ত্রী ফরহাদ হোসেন। জনপ্রশাসন প্রতিমন্ত্রী ফরহাদ হোসেন গণমাধ্যমকে বলেন, করোনায় বিধিনিষেধের কারণে চাকরিপ্রার্থীরা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন। তাদের ক্ষতি পুষিয়ে দিতে চেষ্টা করবো। বয়সটা যাতে ছাড় দেয়া হয় সেই পদক্ষেপ আমরা নেবো। তিনি বলেন, যে সময়টা তাদের লস হয়েছে, যখন যে সময় বিজ্ঞপ্তি হওয়ার কথা ছিল, আগের সময় ধরেই পরবর্তীকালে বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ করা হবে। গত বছর করোনা মহামারিতে সাধারণ ছুটির কারণে ক্ষতিগ্রস্ত চাকরি প্রার্থীদের বয়সের ক্ষেত্রে ছাড় দেয় সরকার। ওই বছর ২৫শে মার্চ যাদের বয়স ৩০ বছর পূর্ণ হয়েছিল তাদের পরবর্তী ৫ মাস পর্যন্ত সরকারি চাকরিতে আবেদনের সুযোগ দেয়া হয়। কিন্তু এ বছর কতদিন ছাড় দেয়া হবে তা নির্দিষ্ট করেননি জনপ্রশাসন প্রতিমন্ত্রী।

পাঠকের মতামত

**মন্তব্য সমূহ পাঠকের একান্ত ব্যক্তিগত। এর জন্য সম্পাদক দায়ী নন।

Moin Uddin

২০২১-০৫-০৭ ০৫:০৪:২৮

আমাদের চিন্তা ভাবনার কারনেই আমাদের এই অবস্থা। আমরাতো বসে ছিলাম ৩ মাসে করোনা চলে যাবে। ২-৩ বছরের আগে করোনা যাবে না এই কথা কেউ বললে তারে মানুষ রীতিমত গালি দিসে। যাদের দূরদৃষ্টি এতই ছোট তাদের এই অবস্থা হওয়াই স্বাভাবিক। আমরা লেখা পড়া করি দূরদৃষ্টি বাড়ানোর জন্য। কিন্তু আমাদের কমে। আফসোস

আবুল কাসেম

২০২১-০৫-০৫ ২২:১৬:৪২

সত্যি কথা বলতে কি, সরকার করোনা তাণ্ডবের শুরুতে যেমন কি করা দরকার বুঝতে পারেনি বা বুঝতে দেরি করে ফেলেছে ঠিক সেভাবেই দেশের কোটি কোটি শিক্ষার্থীদের জন্য কি করা দরকার তাও সময় মতো বুঝতে উঠতে পারেনি। যার ফলে ২০২০ সালের এইচএসসি পরীক্ষা নেবে নেবে বলে শেষ পর্যন্ত সবাইকে সান্ত্বনার অটো পাশে দিতে হয়েছে। অথচ বরাদ্দ বাড়িয়ে হল সংখ্যা ও জনবল বৃদ্ধি করে পরীক্ষা নেয়া যে একেবারে অসম্ভব ছিলো তা কিন্তু নয়। অন্যান্য শ্রেণির অনলাইনে পাঠদান শতভাগ নিশ্চিত করাও সম্ভব হয়নি। ফলে শিক্ষার্থীদের জীবন থেকে হারিয়ে গেছে যে মূল্যবান সময় তাদের ফিরিয়ে দেয়া অসম্ভব। হতাশা ও নৈরাশ্য কবলিত হয়ে হাজার হাজার কিশোর শিক্ষার্থী অপরাধী গ্যাং-এর সঙ্গে জড়িয়ে পড়েছে। আমাদের জীবনের অন্যান্য সবকিছু মোটামুটি সীমিত আকারে হলেও চলমান রয়েছে। শুধু স্থবির হয়ে পড়েছে ক্লাস পরীক্ষা সহ পুরো শিক্ষা ব্যবস্থা। এইচএসসির অটোপাশ দেয়ার পর বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি পরীক্ষা নিয়েও দোলাচাল চলতে চলতে করোনার দ্বিতীয় ঢেউ আছড়ে পড়েছে। মহামারির মধ্যেও সাহস করে মেডিকেল ভর্তি পরীক্ষা নেয়া হয়েছে। অন্যর এখনো সিদ্ধান্তহীনতায়। গত মার্চ মাসের ৫ তারিখে MIST ও ১৯ তারিখে IUT'র ভর্তি পরীক্ষা সাবলীলভাবে নেয়া সম্ভব হয়েছে। ওই সময় মহামারি মোটামুটি নিয়ন্ত্রণে ছিলো। তাই মনে করা যায়, ফেব্রুয়ারী মার্চের ভেতর পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়গুলো ভর্তি পরীক্ষা সম্পন্ন করতে পারতো। অনার্স ফাইনাল ইয়ারের শিক্ষার্থীরা দাবি করেও পরীক্ষা দিতে পারেনি। প্রথম থেকে চতুর্থ বর্ষের শিক্ষার্থীদের ভাগে ভাগে বর্ষশেষ পরীক্ষা নিয়ে নিলে সেশনজট নিরোধ করা সম্ভব হতো। সিদ্ধান্ত ও সমন্বয়হীনতার দরুন শিক্ষার্থীদের জীবন ধ্বংসের মুখোমুখি। একটা জাতির শিক্ষা ধ্বংস হয়ে গেলে আর কি থাকে। অভিভাবকদের কপালে ভাঁজ পড়েছে। পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রত্যন্ত এলাকার মধ্যবিত্ত ও নিম্নমধ্যবিত্ত পরিবারের ছেলে মেয়েরাই বেশি। করোনার দুর্যোগে এরাই বেশি ক্ষতিগ্রস্ত। বর্তমানের শিক্ষা কার্যক্রম স্থবির অবস্থা স্থায়ী রূপ নিলে এদের অবস্থা কোন পর্যায়ে গিয়ে ঠেকবে বলা মুশকিল। মার্চ এপ্রিল থেকে পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়গুলো ভর্তি পরীক্ষার বিজ্ঞাপন প্রকাশ করে এখন দ্বিধা দ্বন্দ্বে পড়েছে। ইতোমধ্যে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ ভর্তি পরীক্ষার তারিখ পিছিয়ে দিয়েছে। ভর্তিচ্ছু শিক্ষার্থীর অনিশ্চয়তার মধ্যে দিনাতিপাত করছে। বাস্তবতা হচ্ছে করোনা সাধারণ সর্দি কাশির মতো হলো আর সারলো এমন প্রকৃতির রোগ নয়। এটা কবে নাগাদ বিদায় নেবে আবার যেতে যেতে পুনরায় কয়বার ফিরে আসবে তাও সঠিকভাবে কেউ জানে না। সুতরাং করোনা মহামারির মধ্যে কিভাবে সংক্রমণ ঠেকিয়ে চলাচল করা যায় তা ভাবত হবে। বিশ্ববিদ্যালয়ের ভর্তি পরীক্ষা কিভাবে নেয়া যায় এবং কিভাবে অনার্স কোর্স সমূহের ফাইনাল পরীক্ষা নেয়া যেতে পারে তার একটা রাস্তা বের করা জরুরি।

আপনার মতামত দিন

প্রথম পাতা অন্যান্য খবর

স্বাস্থ্যবিধি মানাবে কে?

ভারতীয় ভ্যারিয়েন্ট ছড়িয়ে পড়ায় উদ্বেগ-উৎকণ্ঠা

১৯ জুন ২০২১

বাসযোগ্য শহরের তালিকা

ঢাকা কেন তলানিতে?

১৯ জুন ২০২১

পুলিশ বলছে, আত্মগোপনে ছিলেন

৮ দিন পর খোঁজ মিললো আবু ত্ব-হার

১৯ জুন ২০২১

‘ঢাকায় শনাক্তের ৬৮ ভাগই ভারতীয় ধরন’

১৮ জুন ২০২১

রাজধানীতে শনাক্ত হওয়া করোনা রোগীদের ৬৮ শতাংশই ভারতীয় ধরনে আক্রান্ত হচ্ছেন বলে এক গবেষণায় উঠে ...

নাসির অল কমিউনিটি ক্লাবেরও সদস্য

সুনির্দিষ্ট অভিযোগ পেলে ব্যবস্থা

১৮ জুন ২০২১



প্রথম পাতা সর্বাধিক পঠিত



রহস্যঘেরা অমির কর্মকাণ্ড

নাসিরকে নিয়ে বিব্রত স্বজনরা

পরীমনির মামলায় নাসিরসহ গ্রেপ্তার ৫, বিচার দাবি সংসদে

কী ঘটেছিল বোট ক্লাবে

নাসির অল কমিউনিটি ক্লাবেরও সদস্য

সুনির্দিষ্ট অভিযোগ পেলে ব্যবস্থা

দুই শিশু ও মায়ের লাশ উদ্ধার

গোয়াইনঘাটে নৃশংসতা নেপথ্যে কী

DMCA.com Protection Status