সন্তান যেন বিপথে না যায়, সেজন্য বাবা-মাকেও প্রযুক্তির ব্যবহার জানতে হবে

অনলাইন ডেস্ক

অনলাইন (১ সপ্তাহ আগে) মে ২, ২০২১, রোববার, ৪:৪৭ অপরাহ্ন | সর্বশেষ আপডেট: ১০:০৫ পূর্বাহ্ন

শিশুর ব্যক্তিত্বের বিকাশে প্যারেন্টিং-এর ভূমিকা খুব গুরুত্বপূর্ণ। করোনাকালে বাচ্চারা স্কুলে যাচ্ছে না। তাই তাদের ঘরে পর্যবেক্ষণ করতে হবে,  অনুসরণ করতে হবে, তারা যেনো অনলাইনে ক্লাস করতে গিয়ে প্রযুক্তিতে আসক্ত না হয়ে পড়ে। বাচ্চাদের গুণগত সময় দিতে হবে। দেশে বাল্যবিবাহ বেড়েছে, স্কুল খুললে দেখা যাবে অনেক মেয়েশিশুই আর স্কুলে আসছে না। করোনাকালে বাচ্চারা গৃহ নির্যাতনের শিকার হচ্ছে। গতানুগতিক শিক্ষা বাদ দিয়ে প্রয়োজনে এই করোনাকালীন সময়ে বাচ্চাদের শুধু মূল্যবোধের শিক্ষা দেয়া যেতে পারে। প্রযুক্তির ব্যবহারের উপর নিয়ন্ত্রণ আনতে হবে, সন্তানরা যেনো বিপথে না যেতে পারে সেজন্য বাবা-মাকেও প্রযুক্তির ব্যবহার জানতে হবে।

বাবা-মার নিজেদের মধ্যে নৈতিকতা চর্চা করতে হবে যেনো বাচ্চারা তাদের রোল মডেল হিসেবে নিতে পারে।

 

রাতে (০২ মে) স্বাস্থ্য ব্যবস্থা উন্নয়ন ফোরাম আয়োজিত 'সন্তানের মানসিক বিকাশে বর্তমানের প্যারেন্টিং প্র্যাকটিস কতটা সহায়ক' শীর্ষক এক ওয়েবিনারে আলোচকরা এসব মতামত ব্যক্ত করেন। স্বাস্থ্য ব্যবস্থা উন্নয়ন ফোরামের প্রতিষ্ঠাতা ড. জিয়াউদ্দিন হায়দারের সঞ্চালনায় এতে আলোচনায় অংশ নেন বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ডা. ঝুনু শামসুন নাহার, ব্র্যাকের প্রাক্তন পরিচালক শিপা হাফিজা এবং শিশু এডোলেসেন্ট এন্ড ফ্যামিলি সাইক্রিয়াট্রিস্ট ডা. হেলাল উদ্দিন আহমেদ।

 

আলোচনার শুরুতে ডা. শামসুন নাহার বলেন, বর্তমানে পরিবারগুলো দম্পতি কেন্দ্রিক বা নিউক্লিয়ার পরিবার। আগে যৌথ পরিবারগুলোতে বাবা-মা ছাড়াও অন্য আত্মীয়রা শিশুদের দেখতেন। এখন বাবা-মার জন্য চ্যালেঞ্জ চলে এসেছে। এছাড়া বাবা-মা দুজই কর্মজীবী হলে বাচ্চাকে কোথায় রেখে যাবেন সে প্রশ্নও চলে আসে। কারণ আমাদের বাচ্চাদের দেখভাল করার মতো সেরকম কোন কেন্দ্রও নেই। এটা একটা বড় সমস্যা। বেশিরভাগ ক্ষেত্রে দেখা যায় বাবা-মা বাচ্চাদের গৃহকর্মীদের কাছে রেখে যান, সেক্ষেত্রে অনেক সময় অনেক সমস্যা হয়ে যায়। এছাড়া রয়েছে বাচ্চাদের উপর অতিরিক্ত পড়াশোনার চাপ। এই যে প্রতিযোগিতা তা কিন্তু বাবা-মা বাচ্চাদের উপর চাপিয়ে দেন। তারা তাদের বলেন ডাক্তার হও, ইঞ্জিনিয়ার হও, গ্রেড ভালো করো। বলেন না যে, তুমি একটা ভালো মানুষ হও। এই মানসিকতা আমাদের দেশে দেখা গেলেও বিদেশে কিন্তু এমনটা দেখা যায় না। তাছাড়া সিংগেল প্যারেন্টিং এর চ্যালেঞ্জতো রয়েছেই।

 

তিনি বলেন, করোনাকালে বাবা-মা দুজনও যদি বাসায় থেকে অনলাইনে অফিস করেন তাও তারা বাচ্চাদের সময় দিতে পারেন না। বাচ্চারা হয়তো অনলাইনে ক্লাস করতে গিয়ে ইউটিউব, ফেসবুকে ব্রাউজিং করছে, প্রযুক্তিতে আসক্ত হয়ে পড়ছে। এটাও একটা নতুন চ্যালেঞ্জ। বাচ্চারা স্কুলে না গিয়ে বাসায় থেকে থেকে বিরক্ত হয়ে উঠছে, তাদের মেজাজ খিটখিটে হয়ে যাচ্ছে। বাবা-মাও খিটখিটে হচ্ছেন, পারিবারিক সহিংসতা বেড়ে যাচ্ছে। বাচ্চাদের উপর তারা হয়তো অনেক সময় না বুঝেই নির্যাতন করে বসছেন।

 

শিশুর ব্যক্তিত্বের বিকাশে তার প্যারেন্টিং এর ভূমিকা খুব গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করেন ডা. হেলাল উদ্দিন। তিনি বলেন, শৈশবে কোন কারণে যদি শিশুর প্যারেন্টিং বিঘ্নিত হয় তাহলে প্রাপ্তবয়স্ক হয়ে সে নিজেও গুড প্যারেন্টিং করতে পারবে না। বাবা-মা তার সন্তানের ইমোশনের সাথে রেসপন্স করবেন, তার ফিজিক্যাল কিউ এর সাথে রেসপন্স করবেন, তার না বলা কথাগুলো যেনো আগে থেকে বুঝতে পারেন এমন রেস্পন্সিভ প্যারেন্টিং করতে হবে। করোনার কারণে আগামীর নিওনরমাল লাইফে বয়স্করা সেভাবে নিজেদের অভিযোজিত করতে পারবেন না, আজকের শিশুরা তাই অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ, তারাই হবে আগামীদিনের কান্ডারী। তাই এই করোনাকালেও বাচ্চাদের ঘরে পর্যবেক্ষণ করতে হবে, অনুসরণ করতে হবে। বাবা-মার কারণে বাচ্চারা নিজেদের পরিবর্তন করবে না, বাচ্চাদের মতো করে প্যারেন্টিং এর ধরন পরিবর্তন করতে হবে।

 

অন্যদিকে শিপা হাফিজা মনে করেন বাবা-মা একা কখনো বাচ্চাকে প্যারেন্টিং দিতে পারেন না। বাচ্চারা ঘরে একটা কথা শুনে, স্কুলে গিয়ে শুনে আরেকটা। শিক্ষকদের কথা বাচ্চারা অসম্ভব মান্য করে। তাছাড়া বন্ধুবান্ধব, সমাজ তো আছেই। প্রযুক্তিও রয়েছে। সুতরাং বাবা-মা যা বলবেন বাচ্চারা তাই শিখবেন এমনটি নয়।

 

সম্প্রতি বাংলাদেশে ইউনিসেফ এর একটি গবেষণা নিয়ে তিনি বলেন, সেখানে বাচ্চারা বলছে- প্রযুক্তি শিখতে গিয়ে আমরা সোশ্যাল স্কিলগুলো হারিয়ে ফেলছি, স্নেহ-ভালোবাসা, কথা বলা, বাবা-মাকে সময় দেয়া ইত্যাদি। অনলাইনে ক্লাস করার মধ্য দিয়ে বাচ্চারা এবং বাবা-মা দুপক্ষই চাপে থাকে। আর অনলাইনে ক্লাসও করছে নামমাত্র কিছু বাচ্চা, অধিকাংশরাই স্কুলে যাওয়া থেকে বঞ্চিত হচ্ছে, কোন রকম শিক্ষার সাথে সম্পৃক্ত হওয়া থেকে বিরত অনেকেই।

 

দেশে বাল্যবিবাহের হার অনেক বেড়েছে উল্লখ করে তিনি বলেন, আমাদের অভিবাসীরা অধিক হারে বিদেশ থেকে আসছেন, মেয়েদের বিয়ে দিয়ে দিলে খরচপাতি লাগবে না এরকম একটা ভাবনা কাজ করছে বাবা-মার মধ্যে। সুতরাং স্কুল খুললে দেখা যাবে অনেক মেয়েশিশুই আর স্কুলে আসছে না।

 

করোনাকালে বাচ্চারা গৃহ নির্যাতনের শিকার হলেও বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই সেগুলো উপেক্ষিত হচ্ছে, কেননা আইন শৃংখলা রক্ষাকারী বাহিনী, সাংবাদিক, এনজিওকর্মী সবাই এখন করোনা নিয়ন্ত্রণে ব্যস্ত। গতানুগতিক শিক্ষা বাদ দিয়ে প্রয়োজনে এই করোনাকালীন সময়ে বাচ্চাদের শুধু মূল্যবোধের শিক্ষা দেয়া যেতে পারে যাতে তারা শিখতে পারে কিভাবে বাবা-মা এবং অন্যদের সাথে সম্পর্ক বৃদ্ধি বা উন্নততর করতে হয়। প্রয়োজনে নতুন কারিকুলাম তৈরি করতে হবে। এসবই সম্ভব যদি রাজনৈতিক স্বদিচ্ছা থাকে।

 

শিপা হাফিজার সাথে একাত্মতা পোষণ করে ডা. শামসুন নাহার বলেন, আমাদের বাচ্চাদের মূল্যবোধের শিক্ষায় গুরুত্ব দিতে হবে। পাশাপাশি বাচ্চাদের ইমোশনকেও আমলে নিতে হবে। অফিস থেকে ঘরে ফিরে তাদের 'কোয়ালিটি টাইম' দিতে হবে। অতীতে আমরা অনেক প্রযুক্তির সাথে পরিচিত ছিলাম না, তাই বলে তারাও তেমন থাকবে তা ভাবা যাবে না। পাশাপাশি আমাদের কিছু জিনিসও যেন বাচ্চারা মেনে নেয় তা নিশ্চিত করতে হবে৷ এছাড়া তাদের কোন চাহিদা পূরণেরও একটা সীমারেখা বেঁধে দেয়া উচিত।

 

অনেকে বাবা-মা বলেন তাদের সন্তানরা ইন্টারনেট বা প্রযুক্তিতে আসক্ত। এ নিয়ে ডা. হেলাল উদ্দিন  বলেন, প্রযুক্তিকে দূরে ঠেলে দিলে নিজেকেই পিছিয়ে পড়তে হবে। তিনি বাচ্চাদের জন্য সবচেয়ে উন্নত প্রযুক্তি নিশ্চিত করার উপর জোর দিয়ে বলেন, প্রযুক্তির ব্যবহারের উপর একটা নিয়ন্ত্রণ আনতে হবে। তাছাড়া সন্তানরা যেনো বিপথে না যেতে পারে সেজন্য বাবা-মাকেও প্রযুক্তির ব্যবহার জানতে হবে। পরিবার, শিক্ষক, সমাজ তথা রাষ্ট্রকেও শিশুদের বুঝতে হবে। রাষ্ট্র শিশুবান্ধব না হলে গুড প্যারেন্টিং করেও কোন লাভ হবে না।

 

বাচ্চা ইন্টারনেটের ব্যবহার শেখার আগেই বাবা-মাকে নিরাপদ ইন্টারনেট ব্যবহার শেখাতে হবে বলে মনে করেন শিপা হাফিজা। তিনি বলেন, এগুলো রাষ্ট্রকেই নিশ্চিত করতে হবে। অনেক বাবা-মা বাচ্চাদের ঠান্ডা করতে বা খাওয়াতে গিয়ে তাদের হাতে ভিডিও গেম বা ইন্টারনেট তুলে দেন, যেটা ঠিক নয়। বাচ্চার বাবা-মাকে এসব শেখাতে, বুঝাতে রাষ্ট্রকেই দায়িত্ব নিতে হবে, কেননা এটা একটা নতুন জগত। ডিজিটাল যুগে বাজেটের কতো অংশ এ খাতে ব্যয় করা হচ্ছে এ প্রশ্ন করে তিনি বলেন, সব টিভি চ্যানেল এবং ইন্টারনেট মাধ্যমকে সরকারিভাবে বাধ্য করতে হবে দিনের একটা নির্দিষ্ট সময় এই খাতে ব্যয় করতে।

 

দেশে ডিভোর্সের হার অনেক বেড়েছে উল্লেখ করে  ডা. শামসুন নাহার বলেন, ডিভোর্স স্বামীর সাথে স্ত্রীর হয়, সন্তানের সাথে বাবা-মার হয়না। সুতরাং ডিভোর্স এর পর সন্তানের দায়িত্ব নেয়া বাবা বা মা যেনো তার প্যারেন্টিং ঠিকমতো হয় সেদিকে নজর দেন। অনেক গবেষণায় দেখা গেছে, বাচ্চারা পর্নোগ্রাফিতে আসক্ত হয়ে পড়ছে। সেক্ষেত্রে বাচ্চাদের সময় দিতে হবে, তারা মোবাইল বা কম্পিউটার ব্যবহার করার সময় আশেপাশে থাকার চেষ্টা করতে হবে। এছাড়া পর্নো সাইট ব্লক করে রাখার অনেক সফটওয়্যার আছে, সেগুলোর আশ্রয় নেয়া যেতে পারে। সবমিলিয়ে বাচ্চাদের দেখভাল করতে বাবামাকেও প্রযুক্তিগত দিক থেকে শিক্ষিত হতে হবে। বাচ্চাদের খেলাধুলা সুযোগ করে দিতে হবে। সম্ভব হলে বাইরে মাঠে খেলতে বা ঘুরাতে নিয়ে যেতে হবে।

 

এসব থেকে উত্তরণের উপায় নিয়ে আলোচনা করতে গিয়ে শিপা হাফিজা বলেন, ইন্টারনেট নিরাপত্তার ব্যবস্থা নিতে আর এক মুহূর্তও দেরি করা যাবে না। ইন্টারনেটের অসুস্থ ব্যবহার থেকে বিরত রাখতে বিবেককে জাগ্রত করার শিক্ষা দিতে হবে। ডা. শামসুন নাহার বলেন, বাচ্চাদের যতটুকু সময়ই দেয়া হবে তা যেনো গুণগত হয় তা নিশ্চিত করতে হবে। পুরো পরিবার দিনের একটি নির্দিষ্ট পরিমাণ সময় একসাথে বসে খোলামেলা আলোচনা করা উচিত। সেখানে বাচ্চারা তাদের কোন দুঃখ বা ক্ষোভ প্রকাশ করলে তা  মনোযোগ দিয়ে শুনতে হবে। তাদের ইমোশন এর রেস্পন্স করতে হবে। আজকাল অভিভাবকদের দেখে বাচ্চারা নৈতিকতা বিবর্জিত কাজ করছে, তাই বাবা-মার নিজেদের নৈতিকতা চর্চার উপর গুরুত্বারোপ করতে হবে মন্তব্য করে ডা. হেলাল উদ্দিন বলেন, যেনো বাচ্চারা বাবা-মাকে রোল মডেল হিসেবে নিতে পারে।

 

অনুষ্ঠানের শেষে আলোচকরা এমন একটি জনগুরুত্বপূর্ণ ওয়েবিনার নিয়মিতভাবে আয়োজনের জন্য স্বাস্থ্য ব্যবস্থা উন্নয়ন ফোরামকে আন্তরিক ধন্যবাদ জানান।

আপনার মতামত দিন

অনলাইন অন্যান্য খবর



অনলাইন সর্বাধিক পঠিত



DMCA.com Protection Status