আদালতে বাড্ডার মনজিল হত্যার লোমহর্ষক বর্ণনা

রুদ্র মিজান

অনলাইন (১ সপ্তাহ আগে) মে ১, ২০২১, শনিবার, ৩:০১ অপরাহ্ন | সর্বশেষ আপডেট: ১২:১১ অপরাহ্ন

মনজিল দাঁড়িয়ে ইয়াসিনের সঙ্গে কথা বলছিলেন। কথা বলার মধ্যেই পেছন থেকে এ কেএম মনজিল হককে জাপটে ধরে ইয়াসিন। সঙ্গী কিলাররা ছুরি নিয়ে প্রস্তুত। মনজিল বলেন, ‘আমাকে ছেড়ে দে, কত টাকা লাগবে বল, আমি দিচ্ছি। ভাই, তুই আমাকে মারিস না।’ তারপর আর কথা বলতে দেয়া হয়নি মনজিলকে। মুখ বেঁধে ছুরি দিয়ে তার পেটে আঘাত করা হয়। রক্তে ভেসে যায় ঘরের মেজে। ২০১৭ সালের ১১ই ডিসেম্বর সকালে এভাবেই নিজ বাসায় হত্যা করা হয় মনজিলকে।
দীর্ঘদিন পর কিলারদের গ্রেপ্তার করে সিআইডি। গ্রেপ্তারের পর একে একে আদালতে ১৬৪ ধারায় স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দেয় মনজিলের সৎভাই ইয়াসনি হক, ভাড়াটে কিলার রবিউল ইসলাম সিয়াম ও মাহফুজুল ইসলাম রাকিব।
গত ৮ই এপ্রিল মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট শাহীনুর রহমানের আদালতে ১৬৪ ধারায় হত্যাকাণ্ডের লোমহর্ষক স্বীকারোক্তি দেয় ফেনীর দাগনভূঁইয়ার পূর্ব চণ্ডিপুরের বাসিন্দা মাহফুজুল ইসলাম রাকিব। সে ঢাকায় যাত্রাবাড়ী এলাকায় বসবাস করতো। যাত্রাবাড়ী ভাঙ্গা প্রেস কার্টন কারখানায় কাজ করতো রাকিব। পাশে লেদের কাজ করতো সীমান্ত হোসেন তাকবীর। কিলার সিয়ামের মাধ্যমেই তাদের পরিচয় ঘটে মনজিলের সৎভাই ইয়াসিনের সঙ্গে। সিয়ামের সঙ্গে হত্যাকাণ্ডের চুক্তি হয় ইয়াসিনের। চুক্তি অনুসারেই ঘটনার আগের দিন বনশ্রী এলাকায় ইয়াসিনের বাসায় রাত্রি যাপন করে কিলিং মিশনে অংশগ্রহণকারী ভাড়াটে তিনজন। স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দিতে রাকিব জানিয়েছে, ওই রাতেই পরিকল্পনা হয় কীভাবে হত্যা করা হবে মনজিলকে। পরদিন সকালে চারজন ছুটে যায় মনজিলের বাসায়। সঙ্গে কালো ব্যাগে করে নেয় ধারালো ছুরি। চারজন ওই বাড়ির গেটে গেলেও দারোয়ান ভেতরে যেতে দেয় না। তারপর ইয়াসিন দারোয়ানকে ডেকে নিয়ে কথা বলে। পরে দারোয়ান ভেতরে যেতে দেয়। তারপর সবাই মিলে মনজিলের বাসার ষষ্ঠ তলায় যায়। প্রথমে ইয়াসিন দরজায় নক করলে মনজিল জানতে চান, ‘কে?’ তখন ইয়াসিন বলে, ‘ভাই আমি, আমি ইয়াসিন। কিছু কথা বলবো।’
তারপরই গেট খুলে দেন মনজিল। ভাড়াটে কিলারদের দেখে তিনি জানতে চান, এরা কারা? ইয়াসিন বলে, এরা আমার সঙ্গে আসছে। কিলাররা তখন ভেতরে গিয়ে দাঁড়িয়ে ছিল।  মনজিল তার রুমে যায়, সঙ্গে ইয়াসিনও যায়। তারপর মনজিল ও ইয়াসিন ড্রয়িরুমে আসে।  
মনজিল দাঁড়িয়ে ইয়াসিনের সঙ্গে কথা বলে। কথা বলার মধ্যেই ইয়াসিন ভিকটিমের পেছনে চলে যায়। তাৎক্ষণিকভাবে পেছন থেকে মনজিলকে ঝাপটে ধরে। ইয়াসিন তখন সিয়ামকে বলে মনজিলের মুখ বাঁধতে। ওই সময়ে মনজিল বলেন, আমাকে ছেড়ে দে, কত টাকা লাগবে বল, আমি দিচ্ছি। আমাকে ছেড়ে দে ভাই।
এ সময় মাপলার দিয়েই মনজিলের মুখ বাঁধে। পেছন থেকে মাপলার ধরে রাখে রাকিব। ওই সময়ে সিয়াম ব্যাগ থেকে ছুরি বের করে মনজিলের পেটে আঘাত করলে ভুঁড়ি প্রায় বের হয়ে যায়। পরে সবাই মিলে বিছানার উপর চিৎকরে রাখে মনজিলকে। রাকিব মনজিলের হাত ও মুখ চেপে ধরে রাখে। তাকবীর পা ধরে রাখে। রশি দিয়ে মনজিলের পা বাঁধে সিয়াম ও তাকবীর। তখন সিয়াম ব্যাগ থেকে আরো একটি ছুরি বের করে ইয়াসিনের হাতে দেয়। ইয়াসিন ওই ছুরি দিয়ে তার সৎভাই মনজিলের গলায় পোঁচ দিয়ে গলা কেটে দেয়। তারপর দুই হাতের রগ কেটে দেয়। থুঁতনিতেও পোঁচ দেয় ইয়াসিন। তাকবীর ছুরি দিয়ে মনজিলের পায়ের রগ কাটে। মনজিল তখন ছটফট করছিল। রক্ত তখন চারপাশে ছড়িয়ে পড়ছিল। মনজিলের রক্ত তখন কিলারদের শরীরে লেগেছিল। রগ কেটে মনজিলের মৃত্যু নিশ্চিত করে তারা। ইয়াসিন ছুরি দিয়ে মনজিলের বুকে আবার আঘাত করে।
তারপর রক্ত পরিষ্কার করে বাথরুমে গিয়ে মনজিলের পোশাক পরে কিলাররা। ওই সময় হঠাৎ দরজায় নক। একজন নারীর কণ্ঠ। সিয়াম তার সঙ্গে কথা বলে। ওই নারীকে জানায়, মনজিলের শরীর ভালো না। পরে আসেন। কিছুক্ষণ পর ওই নারী মনজিলের ফোনে কল দেয়। তখন ইয়াসিন ফোন রিসিভ করে একই কথা বলে। তারপর বাসা থেকে বের হওয়ার সময় তৃতীয় তলার সিঁড়িতে ওই নারীর সঙ্গে দেখা হয়। সে কিছু বুঝে ওঠার আগেই কিলাররা বাসার বাইরে চলে যায়। ইয়াসিন ও সিয়াম মোটরসাইকেলে চলে যায় এবং  রাকিব ও তাকবীর রিকশায় চলে যায়।
এভাবেই জবানবন্দি দেয় রাকিব। সিআইডি সূত্রে জানা গেছে, ওই নারী শারমিন আক্তার। নিহত মনজিলের বান্ধবী। পরবর্তী সময় তিনি ও দারোয়ান সাক্ষী দেন। তাদের সাক্ষ্য-প্রমাণ ও তথ্য-প্রযুক্তির ভিত্তিতেই দীর্ঘদিন ছদ্মনামে দেশের বিভিন্ন প্রান্তে পালিয়ে থাকা ইয়াসিন হকসহ অন্যদের গ্রেপ্তার করে সিআইডি।
এ বিষয়ে অতিরিক্ত বিশেষ পুলিশ সুপার জাকির হোসেন বলেন, আফতাবনগরের বি-ব্লকের তিন নম্বর রোডের পাঁচ নম্বর ভবনের ষষ্ঠতলার ফ্ল্যাটে একাই থাকতেন মনজিল। সম্পত্তি নিয়ে বিরোধ ছিল সৎভাইয়ের সঙ্গে। ইতিমধ্যে হত্যাকাণ্ডে জড়িতদের গ্রেপ্তার করা হয়েছে। তাদের অনেকে আদালতে ১৬৪ ধারায় জবানবন্দি দিয়ে জড়িত থাকার কথা স্বীকারও করেছে।

পাঠকের মতামত

**মন্তব্য সমূহ পাঠকের একান্ত ব্যক্তিগত। এর জন্য সম্পাদক দায়ী নন।

salman

২০২১-০৫-০৩ ০৫:৪৩:৪৮

3 khuni k o ak ak kore ai Vabe HOTTA kora hok.

জামশেদ পাটোয়ারী

২০২১-০৫-০২ ১০:২৪:৫৪

এর চেয়েও বড় বড় খুনি এদেশে ক্ষমা পেয়ে গেছে। রাষ্ট্রপতির ক্ষমা করে দেয়ার বিধানটি বাদ দেয়া দরকার। একমাত্র ক্ষতিগ্রস্তরাই (মা-বাবা, স্বামী-স্ত্রী-পূত্র-কণ্যা) ক্ষমা করার অধিকার রাখে। যাকে হত্যা করা হয় সে তো চিরদিনের জন্য চলে যায়, কিন্তু নিকট আত্বীয়রা সুষ্টু বিচারের জন্য এই কোর্ট সেই কোর্ট চলাকালীণ বুক বেঁধে অপেক্ষা করতে থাকে। আদালত মৃত্যুদন্ড দেয়ার পর যদি তাকে ক্ষমা করে দেয়া হয় তাহলে সারা জীবন তারা দীর্ঘ শ্বাস ফেলতে থাকে যে তারা বিচার পায়নি। অনেক ক্ষেত্রে দেখা যায় সংসারের একমাত্র উপার্জনক্ষম ব্যক্তিটিই ক্ষুনের স্বীকার হয়ে পরিবারটি রাস্তায় বসে।

salman

২০২১-০৫-০২ ০৩:২৩:৪১

Druto bechar er Maddhom a ai Kukhato KHUNI der FASHI na hoi CROSS FIRE a dewaa hok.

আনিস উল হক

২০২১-০৫-০১ ০৩:০৫:১৮

এই ধরনের নৃশংস খুনের বিচার মূল আদালতে ৬ মাসের মধ্যেই নিস্পত্তি করে পরবর্তী ৬ মাসের হাইকোর্ট বিভাগে ও এরপর যদি দণ্ডিত আসামী সুপ্রিম কোর্টে যায় তবে তাও পরবর্তী ৩ মাসের মধ্যে নিস্পত্তি করা জন্য আইন করে দেয়া উচিৎ;এর পর রাষ্ট্রপতি বরাবর ক্ষমা ভিক্ষার প্রার্থনা ৭ দিনের মধ্যেই নিস্পত্তি করে দ্রুত দণ্ড কার্যকর করতে হবে এবং তা কার্যকর করার আগে দণ্ডিতের এলাকায় জনসমক্ষে তার ব্যাপকভাবে প্রচার চালাতে হবে তাহলে এ ধরনের সম্ভাব্য আসামীরা অন্ততপক্ষে কিছুটা হয়ত ভাববে !

শহীদ

২০২১-০৫-০১ ১৫:৪২:১১

আশা করি বিচারক এ রায়ের সমাপ্তি আনতে যথেষ্ট সময় নিবেন না।

আপনার মতামত দিন

অনলাইন অন্যান্য খবর



অনলাইন সর্বাধিক পঠিত



DMCA.com Protection Status