মুনিয়াদের সরকারি সম্পত্তি হয়ে যাওয়া!

যুক্তরাজ্য থেকে ডা: আলি জাহান

মত-মতান্তর ২৯ এপ্রিল ২০২১, বৃহস্পতিবার | সর্বশেষ আপডেট: ১১:৪৭ পূর্বাহ্ন

১. আপাতদৃষ্টিতে আত্মহত্যা করে মুনিয়া এখন সরকারি সম্পত্তি। ভাবছেন আপনি কখনো সরকারি সম্পত্তি হবেন না? আপনার ধারণা ভুল হতে পারে। আপনি যদি বাংলাদেশে বাস করেন তাহলে দুর্ঘটনা, হত্যা বা আত্মহত্যার মাধ্যমে আপনি যেকোনো সময় পাবলিক এসেট বা সরকারি সম্পত্তি হয়ে যেতে পারেন। সরকারি সম্পত্তি হয়ে গেলে আপনাকে নিয়ে সরকারের কিছু দায়-দায়িত্ব আছে। আপনাকে বা আপনার পরিবারকে তা মানতেই হবে।আপনার করার কিছু থাকবেনা কারণ তখন আপনি থাকবেন মৃত। পরিস্থিতির কারণে আপনার মৃত শরীর নিয়ে সরকারের অনেক কিছু করার আছে। আইন সরকারকে সেই ক্ষমতা দিয়েছে।

২. আপনার মৃত শরীরে নাড়াচড়া হবে মূলত দুই জায়গায়। প্রথমটি হচ্ছে, আপনি যেখানে মারা গেছেন সেখানে।
দ্বিতীয় রিপোর্ট তৈরি হবে হাসপাতালের মর্গে। প্রথমটিতে আপনার শরীরের সামান্য কিছু নাড়াচাড়া হবে। দ্বিতীয়টিতে নাড়াচাড়া ছাড়াও আপনার শরীরের ব্যবচ্ছেদ হবে। যাকে বলা হয় পোস্টমর্টেম। তখন আপনি মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের লাশ ঘরে পড়ে থাকবেন।

৩. উন্নত বিশ্বের সবখানে এই দুই রিপোর্ট খুবই গোপন এবং সংবেদনশীল। সাধারণ জনগণের এখানে কোন প্রবেশাধিকার নেই। শুধুমাত্র পুলিশের সংশ্লিষ্ট লোকজন, আইনজীবী, বিচারক এবং আইনের সাথে সংশ্লিষ্ট লোকজন তা দেখতে পাবে। শুনানির পর যখন রায় ঘোষিত হবে, তখন কিছু প্রয়োজনীয় তথ্য সাধারণের জন্য উন্মুক্ত করে দেয়া হয়। তথ্যগুলো মিডিয়ার হাতে আসে। মিডিয়া তখন তা প্রকাশ করে।

৪. এর আগে ধর্ষণের বা ফ্যান্টাসির শিকার আনুশকার মৃত্যু বা হত্যাকাণ্ডের সময় পুলিশ এবং ফরেনসিক ডাক্তাররা পত্রিকা থেকে শুরু করে ইলেকট্রনিক মিডিয়ায় এসে তার শরীরের গোপন অংশ সম্পর্কে আলোচনা করেছেন। তাদের সেই বর্ণনা শুনে আমি স্তম্ভিত হয়েছি। উনাদেরকে কেউ থামাতে আসেনি। উনাদেরকে কেউ বলতে আসেনি যে, যে মেয়েটি মারা গেছে তার শরীরের গোপন অংশ নিয়ে আপনি প্রকাশ্য কথা বলতে পারেন না। আপনি আপনার রিপোর্ট তৈরি করবেন। সে রিপোর্ট গোপন থাকবে। গোপন রিপোর্ট আদালতের কাছে যাবে।আদালতে যখন শুনানি হবে তখন প্রয়োজনে আপনি সেখান থেকে প্রয়োজনীয় অংশ পড়ে শোনাবেন। তার আগে প্রকাশ্যে এসে আপনি সেন্সিটিভ ইনফর্মেশন মিডিয়ায় প্রকাশ করতে পারেন না। করা উচিত নয়।

৫. ২৭ এপ্রিল গুলশানের ফ্ল্যাট থেকে কলেজ ছাত্রী মোসারাত জাহান মুনিয়ার লাশ উদ্ধার করার পর তা নিয়ে সারাদেশে তুমুল আলোচনা চলছে। তার এই আত্মহত্যা বা হত্যাকাণ্ডের পেছনে কে দায়ী তা নিয়ে আমি আলোচনা করছি না। আমার আলোচনা হচ্ছে, মারা যাবার সাথে সাথে এই মেয়েটি কীভাবে সরকারি সম্পত্তি হয়ে গেল এবং সরকারের সংশ্লিষ্ট বিভাগ মৃত মুনিয়াকে নিয়ে কী করছে।

৬. গুলশান থানার তদন্তকারী পুলিশ কর্মকর্তা মুনিয়ার যে সুরতহাল রিপোর্ট তৈরি করেছেন তা কিছু পত্রিকা প্রকাশ করেছে। অথবা তিনি পত্রিকার মাধ্যমে তা প্রকাশ করেছেন। আমি সেই রিপোর্ট পড়ছিলাম এবং ভাবছিলাম আমরা কোথায় গেলাম। রিপোর্টের কিছু অংশে খুবই সংবেদনশীল বর্ণনা রয়েছে যা আমি এখানে পুরোপুরি উল্লেখ করতে পারবো না। শরীরের গোপন অঙ্গের বর্ণনা রয়েছে। সেখান থেকে কোনো তরল পদার্থ বের হচ্ছে কিনা তাও বলা হয়েছে। মৃত শরীরের বুক, পেট এবং পিঠের বর্ণনা দেয়া হয়েছে। এছাড়াও অনেক বর্ণনা রয়েছে যা এখানে আমি হয়তো লিখতে পারবো না।

৭. যিনি এই বর্ণনা লিখেছেন তা সঠিক আছে। এটি তাঁর দায়িত্ব।সুরতহাল রিপোর্ট এভাবেই তৈরি করতে হয়। কিন্তু প্রশ্ন হচ্ছে সেই সুরতহাল রিপোর্টতো একটি অতি গোপনীয় ব্যাপার। এই অতি গোপনীয় ব্যাপার মিডিয়ার কাছে কীভাবে প্রকাশ করা হয়? বাংলাদেশের প্রচলিত আইন কি তা সমর্থন করে? যদি সমর্থন করে থাকে তাহলে সে আইন নিয়ে ভাবার সময় এসেছে। যদি সমর্থন না করে থাকে তাহলে তা বন্ধ হওয়া উচিত। এক্ষুণি।

৮. মেয়েটি হত্যার শিকার হয়েছে না আত্মহত্যা করেছে তা এখন আদালতের ব্যাপার।মেয়েটির শরীরের বর্ণনা মিডিয়াতে কেন দেয়া হচ্ছে? সুরতহাল রিপোর্ট পত্রিকার কাছে কীভাবে আসলো? আমার এখন ভয় হচ্ছে না জানি কখন ফরেনসিক ডাক্তার তার রিপোর্ট নিয়ে মিডিয়ার সামনে হাজির হন!

৯. প্রতিটি মৃত্যু কষ্টের। মুনিয়ার মৃত্যুর জন্য আমরা শিল্পপতিকে দায়ী করতে পারি। মুনিয়া এবং তার পরিবারকেও দায়ী করতে পারি। চূড়ান্ত বিচারে কে দোষী অথবা নির্দোষ তা আদালত নির্ধারণ করবে। আদালতকে সাহায্য করার জন্য তথ্য সংগ্রহ করা পুলিশের দায়িত্ব। কিন্তু সেই তথ্য সাধারণ মানুষের কাছে উন্মুক্ত করে দেয়া কি দায়িত্বের মধ্যে পড়ে? তাহলেতো কোর্টের আর বিচার করার প্রয়োজন পড়ে না।আমরা আমজনতাই বিচারকার্য সম্পন্ন করে ফেলতে পারি!

১০. যুক্তরাজ্যের পুলিশ সার্জন (Forensic Medical Officer) হিসেবে ৫ বছর কাজ করেছি। অসংখ্য রিপোর্ট তৈরি করতে হয়েছে। কোর্টের আদেশ পেয়ে অসংখ্যবার রিপোর্ট তৈরি করেছি। মাঝেমধ্যে আদালতে যাবার ডাক পড়েছে। আমি কখনো কল্পনায়ও চিন্তা করতে পারিনা আমার রিপোর্টের কোন অংশ আদালত এবং উকিল ছাড়া অন্য কেউ দেখবে। এসব তথ্য হচ্ছে চরম গোপনীয় তথ্য। এ গোপনীয়তা ভাঙ্গার কোন সুযোগ নেই। গোপনীয়তা ভঙ্গ হলে আমাকেই আসামির কাঠগড়ায় দাঁড়াতে হবে।

১১. বাংলাদেশে এই গোপনীয়তা কেন রক্ষা করা যাচ্ছে না তা নিয়ে ভাবছি। কিন্তু কোনো কূলকিনারা করতে পারছি না। তাহলে কি আমাদের সাধারণ বিচারবুদ্ধি এবং বিবেকের মৃত্যু হয়েছে! হয়তোবা। সে কারণেই মুনিয়া বা আনুশকার শরীরের সংবেদনশীল অংশের বর্ণনা গোপন না থেকে সবার হাতে চলে যাচ্ছে।

ডা: আলী জাহান
প্রাক্তন পুলিশ সার্জন (Forensic Medical Officer)
যুক্তরাজ্য পুলিশ
[email protected]

পাঠকের মতামত

**মন্তব্য সমূহ পাঠকের একান্ত ব্যক্তিগত। এর জন্য সম্পাদক দায়ী নন।

Mohd. Nazrul Islam

২০২১-০৫-০১ ১৯:৩৪:২২

Really a touching observation if we are human.

nasir uddin

২০২১-০৪-৩০ ১৭:৪৪:২১

It surprises me why the said accused's family has been allowed to leave the country. They were vital to information. Their money is so powerful!

মোঃ শরীফুজ্জামান

২০২১-০৪-২৯ ০৯:৫৮:০৩

সমস্যা হচ্ছে আমরাতো সভ্য জাতি না। সভ্য হলে ব্যক্তিগত ফোনালাপ, প্রেসক্রিপশন..... এ রকম বহুকিছু পাবলিকলী ফাঁস হয়। পরিবেশ নিজের অনুকুলে থাকলে সত্য মিথ্যা যা কিছু যেভাবে ইচ্ছা বলা যায়। কোনটা বলা যায় কোনটা বলা যায় না সে এটিকেট এখনও আমরা অর্জন করতে পারিনি।

খোকন

২০২১-০৪-২৯ ০৯:৪৭:৫১

Dr. Ali jahan আপনি ইংল্যান্ডে কাজ করেছেন এবং বাস করছেন এবং সেখানের নিয়ম কানুন বর্ণনা করেছেন। কিন্তু এটা তো বাংলাদেশ ? এখানে সবই ভেজাল এবং এর জন্যই তাই নাম হয়েছে তৃতীয় বিশ্ব, সেটা আপনি উপলদ্ধি না করলেও আপনার পূর্ব পুরুষরা ভালো জানেন !! ভেজাল মালের বর্ণনা ঠিকঠাকমতো বর্ণনা না করলে, কেউ বিশ্বাস করে না। পুলিশ, ডাক্তরবাবুরা ভালো ভাবে বিশ্লেষণ না করলে সব কিছু গায়েব হবার পরিক্রম থাকে এবং জনগণও বিশ্বাস করেন না। জনগন এটায় শান্তি পায় এবং একটা দলিল হিসাবে মনে করে ওই কথা গুলির উপর ভিত্তি করে বিচারের আশায় বাকি দিন গুলি অপেক্ষায় থাকে। সে বিচার পাক বা না পাক ? এদেশের পুলিশরা নিজেরা বিচার করে, বিচারপতির জন্য অপেক্ষা করে না , তা তারা পরিস্কার বলে যে, বিচার কার্যের জন্য তারা কাজ করেন। কিন্তু তারা এটা বলেন না যে, তারা সঠিক ভাবে তাদের কর্তব্য পালন করবেন ? জনগন ও বুজে কোনো একটা দুর্ঘটনা হলেই পুলিশের আয়ের পথ বেড়ে যায়, সেটা সততার সাথে পালন করলেও জনগন মনে করে something বোধহয় wrong ? এর পর কত জ্বালা, আছে এমপি, মন্ত্রী, লিডার, উপলিডার, ছোট লিডার, পাঁচড়া লিডার ইত্যাদি ইত্যাদি এবং ইদানিং যোগ হচ্ছে মুক্তি যোদ্ধা এর পর আসছে ক্যাপিটালিস্ট ? তাই কেউর কিছুই করার থাকেনা। এখানে শুধু যোগ-ই হচ্ছে যতসব......!! আর এসব কেরামতির কারণে দেশের জনগন ওই সব নিয়েই ব্যাস্ত থাকেন। এই সুযোগে কিন্তু সরকারও দেশের জন্য দেশের মানুষের জন্য কি করবেন সেদিকে খেয়াল করেন না ? এটাই সরকারের প্লাস পয়েন্ট ?? শুধু আপনি বা আপনারা কিছু লিখে সময় নষ্ট না করাই ভালো। মুনিয়া আসবে মুনিয়া চলে যাবে, এটাই বিধির বিধান।

Mahbub

২০২১-০৪-২৯ ০৪:৪৩:৫৩

আপনি বাংলাদেশে বসবাসের উপযুক্ত নন, সম্ভবত বিদেশে থাকেন তাই আলোচিত বক্তব্য উপস্থাপন করতে পেরেছেন। পশ্চিমা বিশ্বে যা সম্ভব আমাদের দেশে তা সম্ভব নয়। আপনার বক্তব্য প্রকারন্তরে আসামি পক্ষে যয়। চলুন সবাই মিলে সম্মিলিত কন্ঠে আওয়াজ তুলি বসুন্ধরা গ্রুপের সকল পন্য বর্জন করার আর এভাবেই এদের শাস্তি নিশ্চিত করতে হবে।

No name

২০২১-০৪-২৯ ০৪:০৬:৪৯

Excellent evaluation/writing. Thank you ⚘

Arafath Suzon Ahmed

২০২১-০৪-২৯ ০২:৪৬:৩৮

The honourable court can make a ruling regarding the privacy of this matter. Now a days in our country people’s makes false case , false court whiteness statements, along with any private medical treatment information also not secured. That’s why so many crimes are happening day by day. It only can be stopped when any innocent lawfully effected persons can take a legal action against this types of crime done by fraudulent people. When fraudulent people done such a things like that , they knows for sure do not have answer to anyone or any country enforcement.

Citizen

২০২১-০৪-২৯ ১৪:৩১:০০

Maybe, a reason for these explanation/description of a deceased's private body-parts is to get complacency that BD media enjoys absolute freedom and thus to let people know that Bangladesh is truly a democratic country. But contrarily, none can utter a word of criticism of any performance of the government, specially the PM, who grossly lacks public mandate.

akther

২০২১-০৪-২৯ ১৪:১১:২৬

সার এটা বাংলাদেশ, রিপোর্ট প্রকাশ না হলে আসামী খালাস পাবে কিভাবে?

zahedul anwer

২০২১-০৪-২৯ ১৪:০৬:৫৫

This is Bangladesh. Here everything is possible. PM to bottom no one maintains  public privacy. National assembly to street. 

ওমর ফারুক

২০২১-০৪-২৯ ০০:৫৪:১৭

যৌক্তিক বর্ননা।

Md. Shamsul Hoque

২০২১-০৪-২৮ ২৩:৩১:৪৯

Thanks Dr. Ali Jahan for your valuable writings. We hope the concern people will rightly do their job.

ATA BANGLADESH SOB K

২০২১-০৪-২৯ ১১:৩৪:৪১

ATA BANGLADESH SOB KISO HOY

আপনার মতামত দিন

মত-মতান্তর অন্যান্য খবর



মত-মতান্তর সর্বাধিক পঠিত



দেখা থেকে তাৎক্ষণিক লেখা

কোটিপতিদের শহরে তুমি থাকবা কেন?

DMCA.com Protection Status