বড় যদি হতে চাও ছোট হও তবে

ইংল্যান্ড থেকে ডাঃ আলী জাহান

মত-মতান্তর ১৯ এপ্রিল ২০২১, সোমবার | সর্বশেষ আপডেট: ১১:০৯ পূর্বাহ্ন

১. ইংল্যান্ডে আমার ডাক্তারি ট্রেনিং পোস্টের প্রথমদিকের ঘটনা। Dr. David Summerfield তখন আমাদের ট্রাস্টের ডিরেক্টর। ইংল্যান্ডে একটি NHS (সরকারি স্বাস্থ্য ব্যবস্থা) Trust'র অধীনে সাধারণত কয়েকটি হাসপাতাল থাকে। Dr. Summerfield ছিলেন সে ধরনের একটি ট্রাস্টের ডিরেক্টর। আমি সেই ট্রাস্টের একটি হাসপাতালে একজন জুনিয়র ডাক্তার মাত্র। সবেমাত্র ইংল্যান্ডে ডাক্তারি শুরু করেছি।


২. ডাক্তারদের সাপ্তাহিক Case Presentation মিটিং হচ্ছে। একেক দিন একেক ইউনিটের দায়িত্ব। কনসালটেন্ট (হাসপাতালে অধ্যাপক পদ বলতে কিছু নেই) , রেজিস্ট্রার, জুনিয়র ডাক্তার ছাড়াও সাপ্তাহিক ওই মিটিংয়ের দিন ওয়ার্ডের নার্স, সহকারি নার্স, অকুপেশনাল থেরাপিস্ট এবং সাইকোলজিস্টরা থাকেন।


৩. সব মিলিয়ে মাঝেমধ্যে ৪০-৫০ জন উপস্থিত থাকেন।
গড় উপস্থিতি ৩০-৪০ জনের মতো। চেয়ারও আছে ৩০-৪০ জন বসার মতো। দেরিতে আসলে কাউকে কাউকে দাঁড়িয়ে থাকতে হয়। অবস্থা খারাপ হলে মেঝেতে বসতে হয়।


৪. নির্ধারিত দিনের মিটিংয়ে Dr. Summerfield ( Trust Director) একটু দেরিতে আসলেন। ততক্ষণে সবাই আসন নিয়েছে। বসার মতো কোন খালি চেয়ার নেই। প্রেজেন্টেশন তখন চলছে। উনি ডানে-বামে একটু তাকালেন। কোনো সিট খালি নেই। আমি ছিলাম একটু পেছনে। অবাক বিস্ময়ে দেখলাম জুনিয়র ডাক্তার, সিনিয়র ডাক্তার, নার্স কেউই তাঁর জন্য চেয়ার ছেড়ে দিলো না। Dr. Summerfield ফ্লোরে বসে পড়লেন। সেই ফ্লোরে বসে থেকেই তিনি case presentation শুনলেন এবং আলোচনায় অংশ নিলেন। কেউ তাকে চেয়ার ছেড়ে না দেয়ার কারণে অমি একটু ধাক্কা খেলাম। আমার ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের দিনগুলোর কথা স্মরণ করলাম।


৫. নির্ধারিত লাঞ্চ ব্রেকের সময় Dr. Summerfield জুনিয়র ডাক্তারদের সাথে কথা বলছেন। কথা বলার এক পর্যায়ে আমার কাছে আসেন। জিজ্ঞেস করলেন, কেমন যাচ্ছে আমার দিনগুলো। নতুন পোস্টিং নিয়ে কোনো সমস্যা হচ্ছে কিনা। হালকা লাঞ্চ খাবার ফাঁকে তাকে ভেন্ডিং মেশিন থেকে চা বানাতে দেখলাম। মেশিনের পাশে ওয়ার্ডের নার্স দাঁড়িয়ে আছে। তিনি নার্সকে জিজ্ঞেস করলেন যে, তার জন্য কি চা বানাবেন? আমি আবার ধাক্কা খেলাম। হাসপাতালের ডিরেক্টর নার্সকে চা বানিয়ে দিচ্ছেন? ততক্ষণে আমার স্যান্ডউইচ খাওয়া শেষ। Dr. David Summerfield আমাকে জিজ্ঞেস করলেন 'তোমার জন্য চা বানাবো?' আমি বিনয়ের সাথে বললাম 'না'। বাংলাদেশের প্রেক্ষিতে গড়ে ওঠা আমার মস্তিষ্ক তখন ঘুরপাক খাচ্ছে। কী দেখলাম?হাসপাতালে ডিরেক্টর জুনিয়র ডাক্তারকে চা বানিয়ে দেবে? নার্সকে চা বানিয়ে দিচ্ছে?


৬. এখন আমি অভ্যস্ত হয়ে গিয়েছি। যখন চা বা কফি বানাতে যাই, তখন আশেপাশে থাকা নার্স, সহকারি নার্সদের(ওয়ার্ড বয়/ আয়া/ক্লিনার) জিজ্ঞেস করি ওদের জন্য চা বানাবো কিনা। মাঝেমধ্যে তাদের জন্য আমাকে চা বানাতে হয়। চা বানানোর সময় আমার এখন আর মনে থাকে না যে আমি হাসপাতালের কনসালট্যান্ট। কোন মিটিংয়ে আসন খালি না পেলে আমাকে দাঁড়াতেই হয় অথবা মেঝেতে হাঁটু গেড়ে বসতে হয়।আমার জন্য নার্স, জুনিয়র ডাক্তার বা সহকারি নার্স কেউ আসন ছেড়ে দেয় না। হাসপাতালের ডিরেক্টর বা অন্য কোনো সিনিয়র ডাক্তারকে দেখলে আমিও আমার আসন এখন আর ছাড়িনা। ছাড়লেও উনারা সেই আসন গ্রহণ করেন না। আমরা এসব অভ্যস্ত হয়ে পড়েছি। আসন না পেলে আমরা মেঝেতে বসে পড়ি অথবা দাঁড়িয়ে থাকি।


৭. ঢাকা মেডিকেল কলেজে প্রথম বর্ষের ক্লাসের কথা মনে পড়ছে। এ্যানাটমি প্র্যাকটিক্যাল (dissection) ক্লাস শুরু হবে। স্যার এখনো আসেনি। ডাক্তার মাহবুব মোর্শেদ স্যার ওই ক্লাসের শিক্ষক। ছোট গ্রুপের সামনে একটি মৃতদেহ। Chest ডিসেকশন করতে হবে। মৃতদেহটিকে উন্মুক্ত করা হলো। জীবনের প্রথম মৃত মানুষের শরীর কাটতে যাচ্ছি। কেউ কেউ একটু হাসাহাসি করছে। আমি আর আমার ঘনিষ্ঠ বন্ধু ডাক্তার খাইরুল বাশার (এখন সহকারী অধ্যাপক, সাইকিয়াট্রি) একটু ভয় পেয়ে গেলাম। আমরা একটু পেছনের সারিতে দাঁড়িয়ে আছি। ডাঃ আল আমিন সালেক ( এখন প্রখ্যাত ভাস্কুলার সার্জন) ছুরি হাতে নিয়ে প্রস্তুত |সামনের সারির কেউ কেউ শব্দ করে হাসাহাসি করছে। ঠিক সেই সময় ডাক্তার মাহবুব মোর্শেদ স্যার ক্লাসে ঢুকলেন। আমরা সঙ্গে সঙ্গে শান্ত হয়ে গেলাম। কিন্তু মৃতদেহ নিয়ে হাসাহাসি করার দৃশ্য স্যারের চোখে পড়েছিল। আমরা একটু ভয় এবং আতঙ্ক নিয়ে শান্ত হয়ে বসে থাকলাম।


৬. মাহবুব মোরশেদ স্যার নিরবতা ভেঙ্গে কথা বললেন। 'তোমাদেরকে আজ একটি কথা বলবো। কথাটি ভালোভাবে বোঝার চেষ্টা করবে। জীবনে অনেক উপকারে আসবে'। স্যার কথা বলতে লাগলেন। পিনপতন নিরবতার ভেতরে আমরা তার কথা শুনতে থাকলাম।


৭. স্যার একটি উদাহরণ দিলেন। তোমরা কি ফলন্ত গাছ দেখেছো? লিচু গাছ, আম গাছ, ডালিম গাছ, আপেলের গাছ, আঙ্গুর ফলের গাছ, পেয়ারার গাছ, ধান গাছ? এই গাছগুলোতে যখন ফল/শস্য আসে তখন তারা মাটির দিকে ঝুঁকে পড়ে। ফল আসার আগে দেখবে তারা ঊর্ধ্বমুখী হয়ে আছে। কিন্তু যখন ফল আসে তখন ফলের ভারের কারণে নিম্নমুখী হয়ে যায়, গাছের কান্ডগুলো মাটির দিকে ঝুঁকে পড়ে। মানুষের কথাবার্তা এবং ব্যবহারের মধ্যে এর হুবহু প্রতিফলন আছে। মানুষ যখন জ্ঞানের আলোয় আলোকিত হয়, প্রজ্ঞাবান হয়, মানবিক হয় তখন তাদের ব্যবহার ফলন্ত গাছের মতো মাটির দিকে, নিচের দিকে ঝুঁকে থাকে। তাদের ভেতর আত্মম্ভরিতা থাকেনা, উগ্রতা থাকেনা, অন্য মানুষকে হেয় প্রতিপন্ন করার অভ্যাস থাকে না। তোমরা ঢাকা মেডিকেল কলেজে পড়াশোনা করার সুযোগ পেয়েছো। আমরা তোমাদের ভেতর প্রজ্ঞা এবং বিবেকের ফলগুলোকে পূর্ণতা দিয়ে তোমাদেরকে মাথা নুইয়ে ফলন্ত গাছের মত বেঁচে থাকার উপাদান দেবো। যখন এই ফল পূর্ণতা পাবে তখন দেখবে আর কখনো মৃত বা জীবিত মানুষকে নিয়ে হাসাহাসি করবে না। মানুষকে অসম্মান করে কথা বলবে না। অহংকার প্রকাশ করবে না। মনে করবে, তুমিও তাদের মতই একজন মানুষ। আলাদা কোনো প্রাণী নও|


৮. এ্যানাটমি ক্লাসের দুই বছরে আর কখনো কাউকে মৃতদেহের সামনে হাসাহাসি করতে দেখিনি। হতে পারে আমাদের কেউ কেউ ডাক্তার মাহবুব মোর্শেদ স্যারের সে উদাহরণ মনে রেখেছিল। আমি মনে রাখার চেষ্টা করি। সন্তানদের, ছাত্র-ছাত্রীদের এই উদাহরণ দিই।


৯. সমস্যা হচ্ছে যে, সবখানে তো আর ডাক্তার মাহবুব মোর্শেদকে পাওয়া যাবে না। সেরকম উপদেশ দেবার লোকজনও পাওয়া যাবে না। তাই ডাক্তার হলেও আমাদের সকলের ভেতরে মানবিকতার চর্চা থাকবে এমনটা ভাবা ভুল। মানুষকে মানুষ হিসেবে দেখার সহজ অংকে বাংলাদেশ অনেক পিছিয়ে আছে। মানুষকে শ্রেণীভেদে সম্মান/ অসম্মান করার চর্চায় বাংলাদেশ অনেক এগিয়ে আছে। ওখানে Dr. David Summerfield দের জন্ম হওয়া খুবই প্রয়োজন। তা না হলে আমাদের আচার-আচরণের কোন পরিবর্তন হবে না। আমরা মানুষকে তুই-তুকারি করবো। নিজের ক্ষমতার দেমাগ দেখাবো। নিজের ক্ষমতা যথেষ্ট নাহলে পূর্বপুরুষকে নিয়ে আসবো। ক্ষমতা আমাকে দেখাতেই হবে। হয় নিজের ক্ষমতা নাহলে পৈত্রিক সূত্রে প্রাপ্ত ক্ষমতা!


১০. ডাক্তার মাহবুব মোর্শেদ স্যারদের প্রয়োজন।Dr. David Summerfield দের খুব প্রয়োজন। না হলে আমাদের বেঁচে থাকার একমাত্র অবলম্বন হয়ে দাঁড়াবে ক্ষমতার কাছাকাছি থেকে অহংকারী হয়ে যাওয়া। জ্ঞান আর প্রজ্ঞা আমাদের অহংকারী বানিয়ে দিচ্ছে, আমরা মানুষকে মানুষ মনে করছিনা| মাহবুব মোর্শেদ স্যারের কাজ কেউ করতে পারছেনা বা করতে দেয়া হচ্ছেনা|


১১. ক্ষমতার ব্যবহার আর অহংকার প্রকাশ করা থেকে দূরে থাকুন। দিনশেষে আপনি-আমি শুধুমাত্র একজন মানুষ। প্রতিরাতে আপনি যখন ঘুমাতে যান তখন আপনার কি নিশ্চয়তা আছে পরের দিন আপনি জেগে উঠবেন? তাহলে কেন এই অহংকার এবং ক্ষমতার বহিঃপ্রকাশ?


ডা: আলী জাহান
ইংল্যান্ডে কর্মরত বাংলাদেশি চিকিৎসক
[email protected]

পাঠকের মতামত

**মন্তব্য সমূহ পাঠকের একান্ত ব্যক্তিগত। এর জন্য সম্পাদক দায়ী নন।

Mohd. Nazrul Islam

২০২১-০৪-৩০ ১০:৩৯:৫৫

The example would be a milestone in my life. That is real humanity.

AMIR

২০২১-০৪-২০ ১০:৪৫:৪৯

৯. আমরা মানুষকে তুই-তুকারি করবো। নিজের ক্ষমতার দেমাগ দেখাবো। নিজের ক্ষমতা যথেষ্ট নাহলে পূর্বপুরুষকে নিয়ে আসবো। ক্ষমতা আমাকে দেখাতেই হবে। হয় নিজের ক্ষমতা নাহলে পৈত্রিক সূত্রে প্রাপ্ত ক্ষমতা! -----------সাম্প্রতিক সময়ে বাংলাদেশের রাস্তায় ডাঃ, পুলিশ বচসার আলোকে লেখাটি সময়োপযোগি!

এ কে এম মহীউদ্দীন

২০২১-০৪-২০ ০৯:১৭:৪৩

একদম মনের কথা। আমাদের রসুলুল্লাহও (সঃ) কাউকে উঠিয়ে তার জায়গায় বসতেন না। আমরা হয়ে গেছি তাঁর পোড়া কপালী উম্মত।

Anam

২০২১-০৪-২০ ০৮:০০:২৬

Salam and thank you for the wonderful post.

Mohammed

২০২১-০৪-১৯ ১১:২২:২৫

Dr Ali Jahan, you are absolutely right. Bangladesh and England day/night difference. In Bangladesh everybody want to show the power. That’s awful.

মাসুদুল হক

২০২১-০৪-১৯ ০৯:৩৮:৪০

অসাধারন লেখাটির জন্য ধন্যবাদ। এজন্য ই ইসলাম ধর্মে বলা হয়েছে যে,যার মধ্যে সরিষার দানা পরিমাণ অহঙ্কার থাকবে সে যত ভালো কাজ ই করুকনা কেন সে জান্নাতে যেতে পারবে না।

Rasu

২০২১-০৪-১৯ ২১:৩৯:৫৬

লেখকের কথার সাথে কিছুটা একমত হলেও; লেখার শেষে দেখলাম তিনিও "ইংল্যান্ডে কর্মরত বাংলাদেশি চিকিৎসক" নামে নিজেকে পরিচয় করিয়েছেন!!!

Joytirmoy Chowdhury

২০২১-০৪-১৯ ২১:১৩:০৮

Thanks for this article

ড.মোঃ মোফাজ্জল হায়দা

২০২১-০৪-১৯ ০৭:৪৩:৪০

বর্নিত লেখক কে অবশ্যই ধন্যবাদ দিতে হবে এতো সুন্দর ভাবে সময়পোযোগী লেখাটির জন্য...আর একটা জিনিস হচ্ছে.. আমরা যারা চাকুরী করি তারা সবাই জনসাধারণের সেবক/চাকর এটা মনে রেখে আমাদের মালিককে (জন সাধারণকে) সেবা দিলে অহংকার কিছুটা কমতে পারে..

Mahmud

২০২১-০৪-১৯ ০৭:৩৬:৩২

ডঃ আলী জাহান সাহেবকে ধন্যবাদ তার চমৎকার লেখার জন্য । যাদের উদ্দেশ্যে এ লেখা তারা এটা পড়বে কিনা জানি না , কিন্তু এ লেখায় সবার জন্য শিক্ষনীয় কিছু আছে । উনার কাছ থেকে জানতে ইচ্ছে করে , উনি যখন বাসা থেকে হাসপাতালে যান , তখন রাস্তায় সাদা মেডিকেল গাউন পড়ে থাকেন কি না । একজন পুলিশ অফিসার বা ম্যাজিষ্ট্রেট হয়তো ভুল করে থাকতে পারেন । কিন্তু তাদেরকে তুই তুকারি বা হারামজাদা বলে গালি দেওয়া , এটা কোন ধরনের শিক্ষা ? একজন বীর বিক্রম কি তার মেয়েকে এই শিক্ষাই দিয়েছেন ? ক্ষমতার দম্ভ যে মানুষকে অমানুষ করে দেয় , আমরা গতকালকে তা দেখলাম ।

আপনার মতামত দিন



মত-মতান্তর সর্বাধিক পঠিত



DMCA.com Protection Status