আশুগঞ্জ গণহত্যা দিবস

অধ্যক্ষ মোঃ শাহজাহান আলম সাজু

মত-মতান্তর ১৩ এপ্রিল ২০২১, মঙ্গলবার | সর্বশেষ আপডেট: ৬:৪২ অপরাহ্ন

১৪ এপ্রিল আশুগঞ্জ গণহত্যা দিবস। একাত্তরের মহান মুক্তিযুদ্ধের সূচনালগ্নে ১৪ এপ্রিল আশুগঞ্জে পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীর আকস্মিক হামলায় বিপুল সংখ্যক নিরপরাধ মানুষ গণহত্যার শিকার হয়েছিল। অন্যদিকে এইদিন আশুগঞ্জের মাটিতেই ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্ট ও বীর মুক্তিযোদ্ধাদের মধ্যে ভয়াবহ সমুহ যুদ্ধে পাকিস্তানি হানাদারদের কয়েকজন কমান্ডো ও অফিসার সহ বেশ কিছু সৈন্য নিহত হয়েছিল। সেদিন বাংলা মায়ের দামাল সন্তান ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্টের সদস্য ও স্হানীয় মুক্তিযোদ্ধারা বীরত্বের সাথে লড়াই করে পাকিস্তানি হানাদারদের উপযুক্ত জবাব দিয়েছিল। মুক্তিযুদ্ধের সূচনালগ্নে বীর বাঙালিদের এই প্রতিরোধ যুদ্ধের খবর মুক্তিযোদ্ধাের উজ্জীবিত করার পাশাপাশি পাকহানাদার বাহিনীকে চরম আতংকিত করে তুলেছিল। ১৪ এপ্রিলের আশুগঞ্জ রেলস্টেশন এলাকায় সংঘটিত এই ভয়াবহ যুদ্ধ মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসে চিরস্মরণীয় হয়ে আছে।

উল্লেখ্য একাত্তরের ৭ মার্চের সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের ঐতিহাসিক ভাষণের পর পরই আশুগঞ্জের বিভিন্ন গ্রামে স্হানীয় ছাত্র যুবকরা মুক্তিযুদ্ধের ট্রেনিং শুরু করে। আশুগঞ্জ বন্দরে হাজী আব্দুল জলিল উচ্চ বিদ্যালয়ের মাঠ ও বিভিন্ন গ্রামে আওয়ামী লীগের নেতাদের উদ্যোগে ট্রেনিং শুরু হয়।
আমাদের গ্রাম বড়তল্লা ঈদগাহ মাঠে ছাত্র ও যুবকদের ট্রেনিং দিতেন অবসরপ্রাপ্ত হাবিলদার জনাব খুরশেদ আলম, সাবেক সেনা সদস্য আবুল কাছেম আলী,আনসার কমান্ডার আব্দুল মালেক মেম্বার (এরা তিনজনই সম্পর্কে আমার দাদা) এবং যুবকদের সংগঠিত করতেন আমার বাবা মরহুম সামসুল হক।

১৪ এপ্রিল সকালে আশুগঞ্জ বাজারের নিকটবর্তী সোহাগপুর গ্রামের আওয়ামী লীগ নেতা সাফিউদ্দিন চেয়ারম্যানের বাড়ির কাছে ফসলের মাঠে পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীর বেশ কয়েকটি হেলিকপ্টার যোগে বিপুল সংখ্যক সেনা অবতরণ করে। সোহাগপুর গ্রামের সহজ সরল আম্বর আলী পাকিস্তানী সেনাদের প্রতিরোধ করার জন্য বল্লম হাতে (দেশীয় অস্ত্র) হেলিকপ্টারে আঘাত করতে এগিয়ে গেলে পাকিস্তানি হানাদারদের ব্রাশ ফায়ারে ঘটনাস্থলেই তিনি নিহত হন। মুক্তিযুদ্ধে আশুগঞ্জ এলাকায় তিনিই প্রথম শহীদ।

সোহাগপুর গ্রামে হেলিকপ্টার থেকে অবতরণকারী পাকিস্তানি কমান্ডোরা সোহাগপুর গ্রামে বাড়িঘরে আগুন দিতে দিতে আশুগঞ্জ বাজারের দিকে এগুতে থাকে। আশুগঞ্জ বাজারের বিওসি ঘাট এলাকায় মেঘনা নদীর তীরে ধানের গাল্লায় পাকিস্তানি হানাদার বাহিনী নিরীহ ৪০ জন সাধারণ মানুষকে নদীর তীরে লাইন ধরে দাড় করিয়ে একসাথে গুলি করে হত্যা করে। সোনারামপুর গ্রামের রতন সিকদার (খুরশিদ সিকদারের ভাতিজা) ছাড়া নিহতদের অধিকাংশই ছিল আশুগঞ্জের বাইরের বিভিন্ন অঞ্চলের লোক । তারা ধানের গাল্লায় কাজ করতেন। তাদের অনেকের মৃত দেহ পাকিস্তানিরা মেঘনা নদীতে ভাসিয়ে দিয়েছিল। পাকিস্তানি হানাদার বাহিনী আশুগঞ্জ বাজারে ঢুকে নির্বিচারে গুলি করে যাকে যেখানে পেয়েছে তাকে সেখানেই হত্যা করেছে৷ আশুগঞ্জ বড় মসজিদের ঘাটলায় গুলি করে হত্যা করা হয় সোহাগপুর গ্রামের বল্টু মিয়া,মৈশার গ্রামের আওয়ামী লীগ নেতা সিরাজুল ইসলামসহ বেশ কয়েকজনকে। আশুগঞ্জ বিদ্যুৎ উৎপাদন কেন্দ্রের দক্ষিণ পাশে সোনারামপুরে মুক্তিযোদ্ধা শের আলী মিয়ার বাড়ির পাশে লাইন ধরে দাড় করিয়ে ব্রাশ ফায়ার করে এই গ্রামের মালু মিয়ার দুই ছেলে হোসেন আলী,মুসলিম মিয়া,মোতালেব মিয়ার ছেলে আবুল কাসেম ও আড়াইসিধা গ্রামের সোনা মিয়া মুন্সির ছেলে বাচ্চু মিয়াকে গুলি করে হত্যা করা হয়।

আশুগঞ্জ বাজার নিয়ন্ত্রণে নেওয়ার পর পাক বাহিনী তাদের পুর্ব পরিকল্পনা অনুযায়ী আশুগঞ্জ রেলস্টেশন এলাকায় পুর্বথেকেই অবস্থান নেয়া ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্টের ক্যাম্পের দিকে এগিয়ে গেলে তারা প্রবল প্রতিরোধের সম্মুখীন হয়। পাকিস্তানিদের টার্গেট ছিল তাদের উপর হামলা করে যে কোনা মুল্যে আশুগঞ্জ তাদের দখলে নেয়া। কারণ পাকিস্তানি হানাদার বাহিনী ঢাকা থেকে ভৈরব পর্যন্ত নিয়ন্ত্রণ নিলেও আশুগঞ্জ ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্টের দখলে থাকায় তারা সামনে এগোতে পারছিল না। ভৌগোলিক কারণে আশুগঞ্জ ছিল অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। বিশেষ করে পুরো সিলেট বিভাগ এবং চট্টগ্রাম বিভাগের ভারতের সীমান্তবর্তী ব্রাহ্মণবাড়িয়া ও কুমিল্লা জেলার প্রবেশধার হলো আশুগঞ্জ। আশুগঞ্জ দখলে নিতে না পারায় পাকিস্তানি হানাদাররা হবিগঞ্জ,মৌলভীবাজার, সিলেট, সুনামগঞ্জ এবং ব্রাহ্মণবাড়িয়া ও কুমিল্লা অঞ্চলে ঢুকতে পারছিল না। পাকিস্তানী হাজার হাজার সৈন্য আশুগঞ্জের নিকটবর্তী মেঘনা নদীর পশ্চিম তীর ভৈরব বাজারে এসে অবস্থান নেয়। আশুগঞ্জ মুক্তিযোদ্ধাদের দখলে থাকায় তারা নদী পার হয়ে আশুগঞ্জে আসতে পারছিল না। পাকিস্তানি হানাদার বাহিনী তাদের সর্বশক্তি দিয়ে ১৪ এপ্রিল আশুগঞ্জ দখলের জন্য মরিয়া হয়ে যুদ্ধে লিপ্ত হয়। তাদের সৈন্য সংখ্যার তুলনায় মুক্তিযোদ্ধা ও ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্টের সৈন্য সংখ্যা ছিল খুবই নগন্য।

আধুনিক অস্ত্রশস্ত্রে সজ্জিত পাকিস্তানি হানাদার বাহিনী আশুগঞ্জ রেলস্টেশন এলাকায় আক্রমণ চালাতে এলে ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্টের দামাল ছেলেদের চরম প্রতিরোধের সম্মুখীন হয়। আশুগঞ্জে অবস্থানরত মেজর নাসিম (পরবর্তী সময়ে সেনা প্রধান) ও ক্যাপ্টেন হেলাল মুর্শেদ খানের নেতৃত্বে ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্টের প্রতিরোধ যোদ্ধারা সেই দিন বীরত্বের সাথে পাকিস্তানি সৈন্যদের মোকাবেলা করে। আশুগঞ্জ রেলস্টেশন যেহেতু ভূমি থেকে অনেক উচুতে সেহেতু পাকিস্তানি সেনারা চরম প্রতিরোধের সমুখীন হয়। এদিকে ভৈরব থেকে বিপুল সংখ্যক পাকিস্তানি সেনা রেল ব্রীজের উপর দিয়ে আশুগঞ্জে রেলস্টেশন অবস্থানরত ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্ট এবং স্হানীয় মুক্তিযোদ্ধাদের হামালা করতে এগিয়ে গেলে মুক্তিযোদ্ধাদের পাল্টা আক্রমণে বিপুল সংখ্যক পাকিস্তানি সৈন্য নিহত হয়। নিহত অধিকাংশের মৃতদেহ মেঘনা নদীর অতলে হারিয়ে যায়। অপরদিকে আশুগঞ্জ বাজার হাটি ও পুরনো থানা এলাকায় ১০/১৫ কমান্ডো সহ বেশ কয়েকজন পাকিস্তানি সৈন্য নিহত হয়। অপরদিকে এই যুদ্ধে আশুগঞ্জের সোনারামপুর গ্রামের হোসেন মিয়া,ল্যান্স নায়েক আঃ হাই, সুবেদার সিরাজুল ইসলাম, সিপাহি সফিক উদ্দিন, সিপাহি আঃ রহমান নিহত হন। আশুগঞ্জ যুদ্ধে পাকিস্তানিরা যুদ্ধ বিমান ব্যবহার করেছিল। এই যুদ্ধে পাকিস্তানি গোলার আঘাতে মেজর নাসিম ও ক্যাপ্টেন হেলাল মুর্শেদ খান গুরুতর আহত হন। এক পর্যায়ে ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্ট ও মুক্তিযোদ্ধারা আশুগঞ্জ রেলস্টেশন এলাকা ছেড়ে ব্রাহ্মণবাড়িয়ার দিকে পশ্চাদাপসরণ করে প্রথমে তালশহর ও পরে ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় অবস্থান নেয়।

আশুগঞ্জ বাজার পুরোপুরি পাকিস্তানি হানাদারদের নিয়ন্ত্রণ নেওয়ার পর আশুগঞ্জ রেলস্টেশন থেকে পাকিস্তানি হানাদার বাহিনী রেললাইন দিয়ে পুর্বদিকে তালশহরের দিকে এগোতে থাকে। যাবার সময় তারা রেললাইনের দুইপাশে গানপাউডার দিয়ে বাড়িঘরে আগুন দিতে থাকে। আমাদের বাড়িও সেদিন আগুন পুড়িয়ে মাটির সাথে মিশিয়ে দেওয়া হয়েছিল । আমাদের বাড়ির পুর্বপাশে উকিল্লা পাড়ায় হাসান আলীর ছেলে মঞ্জুর আলী ও জোরালিকে গুলি করে হত্যা করে।

১৪ এপ্রিল সকালে লালপুরে পাকিস্তানি হানাদার বাহিনী মেঘনা নদী দিয়ে গানবোট নিয়ে হামলা চালায়। এ সময় লালপুরে অবস্থানরত ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্ট ও স্হানীয় মুক্তিযোদ্ধারা প্রতিরোধের চেষ্টা চালায়। কিন্তু বিপুল সংখ্যক পাকিস্তানি সৈনদের সাথে বেশিক্ষণ টিকে থাকতে পারেনি মুক্তিযোদ্ধারা। এখানে শহীদ হন আশুগঞ্জের চরচারতলা গ্রামের ১৯ বছরের তরুণ মুক্তিযোদ্ধা মোঃ শাহজাহান। পাকিস্তানি হানাদাররা হিন্দু অধ্যুষিত লালপুর দখলে নেওয়ার পর সেখানে নির্বিচারে গুলি করে হাজী মহরম আলী ও তার ছেলে মোঃ শহীদুল্লাহ (এমএসসি),যোগেশ চন্দ্র,পন্ডব শর্মা, লক্ষিনধর,মন্তাজ মিয়া, ইদ্রিস মিয়া,ব্রজেন নাথ,সুরুজ মিয়া,আবুল মিয়া,মুক্তার নেছা, ঈশ্বর চন্দ্র,মিনতি রানী দাস, হরচরণ দাস,কুদ্দুস মিয়ার মা, জীবন চন্দ্র,অশ্বনী দেবনাথ,জয়নাল আবেদিন,বাধ্যরানী দাস,নিরাণ চন্দ্র দাস, কুদ্দুস মিয়া,রাশমনি দাস,কালা চন্দ্র দাস,পুরণ মোহন দাস,রায় মোহন দাস,জুম্মত আলী,আব্দুস সালাম মাস্টারের মা সহ ৫৭ জন নিরপরাধ মানুষকে হত্যা করে। একইদিনে পাকিস্তানি হানাদাররা খোলাপাড়া গ্রামের জনু ফকির,চামু মিয়া,আবুল মিয়া ও মাহমুদ হোসেনের ভাইকে নির্বিচারে গুলি করে হত্যা করে।

১৪ এপ্রিল আশুগঞ্জে সংগঠিত গণহত্যা এবং মুক্তি যোদ্ধাদের পাল্টা হামলায় বিপুল সংখ্যক পাকিস্তানি সৈন্য নিহত হওয়ার ঘটনা মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসে চিরস্মরণীয় হয়ে আছে। একাত্তরে আজকের এই দিনে আশুগঞ্জে শাহাদাতবরণকারি সকল শহীদের প্রতি গভীর শ্রদ্ধা।

এখানে উল্লেখ একাত্তরে বিজয়ের শেষ প্রান্তে ৯ ডিসেম্বর আশুগঞ্জের সোহাগপুর যুদ্ধটিও মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসে চিরভাস্কর হয়ে আছে। এই যুদ্ধে ভারতীয় মিত্র বাহিনী ও পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীর কয়েকশ সৈন্য নিহত হয়েছিল।

লেখক: মুক্তিযুদ্ধ গবেষক, সাধারণ সম্পাদক-স্বাধীনতা শিক্ষক পরিষদ। ইমেইল:[email protected]

আপনার মতামত দিন

মত-মতান্তর অন্যান্য খবর

এ দায় কার?

১৩ মে ২০২১



মত-মতান্তর সর্বাধিক পঠিত



DMCA.com Protection Status