খরচ দিতে না পারায় আইসিইউ’র রোগী সাধারণ বেডে

পিয়াস সরকার

প্রথম পাতা ১১ এপ্রিল ২০২১, রোববার | সর্বশেষ আপডেট: ৩:২২ অপরাহ্ন

করোনা আক্রান্ত সংকটাপন্ন রোগীদের জন্য আইসিইউ’র হাহাকার গোটা রাজধানীজুড়ে। সরকারি হাসপাতালে খালি নেই আইসিইউ শয্যা। বেসরকারি হাসপাতালে  কোনোভাবে একটি শয্যা মিললেও খরচের কারণে অনেকে সেই সেবা নিতে পারছেন না। কারণ আইসিইউতে নেয়া রোগীদের সেখানে দিনের পর দিন রাখতে হচ্ছে।

৪২ বছর বয়সী ছেলে ইমরান হোসেনকে নিয়ে রাজধানীর শহীদ সোহ্‌রাওয়ার্দী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে এসেছেন তার মা। হাসপাতালের বাইরে অপেক্ষা করছেন একটা সিটের জন্য। ইমরান হোসেনের মা রাহেলা বেগম বলেন, ছেলেটার অবস্থা খারাপ। ১১দিন ধরে করোনা আক্রান্ত।
পজিটিভ রিপোর্ট পাওয়ার দিন রাতেই শ্বাসকষ্ট শুরু হয়। মানিকগঞ্জের সিংগাইর থেকে ঢাকায় নিয়ে আসি। এই মেডিকেলেই (সোহ্‌রাওয়ার্দী মেডিকেল) ভর্তি ছিল প্রথমে সাতদিন। ডাক্তাররা বলে, আইসিইউ না পেলে রোগীকে বাঁচানো যাবে না। হাসপাতালে আইসিইউ’র সিট না পেয়ে বাধ্য হয়ে কলেজ গেটের একটি  বেসরকারি হাসপাতালে নিয়ে যাই। এরপর সেখানে চারদিন আইসিইউ’তে ছিল। ওর বাবা নাই। আমি প্রাইমারি স্কুলের শিক্ষক ছিলাম। যা আয় ছিল সব চলে গেছে। এই চারদিনে প্রতিদিন ৪০ থেকে ৫০ হাজার টাকা খরচ হয়েছে। আর খরচ দিতে পারছি না। এখন আবার এখানে নিয়ে এসেছি। সাধারণ বেডে রাখবো। আল্লাহ্‌ হায়াত দিলে বাঁচবে। রাহেলা জানান, তার ছেলে ইমরানের অষ্টম ও পঞ্চম শ্রেণি পড়ুয়া দু’টি সন্তান রয়েছে।
রাহেলা মানবজমিনকে এই কথাগুলো বলছিলেন এম্বুলেন্সের সামনের সিটে বসে। পিছনে ছেলে শোয়া। পাশে নিষ্পলক তাকিয়ে ছিলেন তার স্ত্রী। প্রায় আধাঘণ্টা অপেক্ষার পর তার মামা এসে জানালেন সিট খালি নাই। এম্বুলেন্সে বসলেন মামা। সাইরেন বাজিয়ে বেরিয়ে গেল। গন্তব্য ঢাকা মেডিকেল।

সোহ্‌রাওয়ার্দী হাসপাতালে সরজমিন গিয়ে দেখা যায়, প্রায় ফাঁকা পড়ে আছে হাসপাতালটির অন্যান্য ওয়ার্ড। দ্বিতীয় তলায় করোনা ইউনিট। সেখানে বসার স্থানে বসে আছেন স্বজনরা। আর সেইসঙ্গে রোগীর স্বজনরা পায়চারি করছেন একটা সিটের জন্য। সুফিয়া খাতুন সাভারের হেমায়েতপুর থেকে এসেছেন স্বামী ও স্বামীর বোনের সঙ্গে। দু’দিন ধরে শ্বাসকষ্টে ভুগছেন তিনি। মেলেনি অক্সিজেন। তার স্বামীর বোন বলেন, আমরা গরিব মানুষ বাবা। একটু আগে কইলো সিট ফাঁকা আছে এখন বলে নাই। এখন এই রোগীরে লইয়া কই যামু?

সিট আছে এমনটা জানানোর পরেও কেন ভর্তি হতে পারলেন না? এই প্রশ্নের উত্তরে দায়িত্বরত নার্স আসমা খাতুন জুঁই বলেন, একটা সিট ফাঁকা ছিল। তাদের ফর্ম পূরণ করতে বলি। কিন্তু এই সময়ে আরেকজন রোগী আগেই চলে আসে। এখন আমাদের যিনি আগে আসবেন তাকেইতো ভর্তি করতে হবে।

এই ওয়ার্ডেই বসার স্থানে মোবাইলে আইসিইউ’র জন্য আবদার করতে শোনা যায় আশিকুর রহমানকে। তার শাশুড়ির জন্য জরুরি ভিত্তিতে আইসিইউ’র ব্যবস্থা করতে বলেছেন চিকিৎসক। কথাশুনে বোঝা যায়, অপরপ্রান্তের ব্যক্তি না করবার পরেও বারংবার অনুরোধ করছেন তিনি।

আশিকুর রহমান বলেন, আমার মায়ের (শাশুড়ি) ৬১ বছর বয়স। এবার দ্বিতীয়বার আক্রান্ত হয়েছেন। টিকা নেয়ার পরেও দ্বিতীয়বার আক্রান্ত হলেন। প্রথমবার ১৪দিন আক্রান্ত ছিলেন। বেশ ভেঙে পড়েছেন এখন বাঁচাতে আইসিইউ চাই। কোথায় পাবো আল্লাহ্‌ জানেন?

হাসপাতালের ভিতরে তিনতলায় আইসিইউ ইউনিট। সিঁড়ি বেয়ে সেখানে যেতেই চোখে পড়ে মিরপুর থেকে আসা রুহুল আমিন খান বোনের ঘাড়ে মাথা রেখে কাঁদছেন। তাদের মা তহুরা বেগম ১০দিন ধরে হাসপাতালে ভর্তি, চারদিন ধরে আইসিইউ’তে। তার অক্সিজেন লেবেল নেমে এসেছে ৫৪’তে। বড় বোনের কাঁধে মাথা রেখে তিনি বলতে থাকেন, আল্লাহ্‌ আমাকেও করোনা দাও। আল্লাহ্‌ আমাকেও করোনা দাও!

কিছু সময় পর স্থির হলে জানতে চাইলে রুহুল আমিন খান বলেন, আম্মার অবস্থা খুব খারাপ। মাঝে-মধ্যে সেবার জন্য হাসপাতালের ভিতরে যেতে দেয় তারা। কিন্তু আম্মা কাছে আসতে দেয় না। যাতে আমার করোনা না হয়। এখন আমার করোনা হোক- এটাই চাই। যাতে আম্মার কাছে যেতে দেয়। একটু সেবা করতে পারি।
আইসিইউ ইউনিট ছেড়ে নিচে এসে দেখা মেলে বেশ কয়েকজন এম্বুলেন্সচালক চা পান করছিলেন। এম্বুলেন্সচালক মো. মাসুদ ক্ষোভ নিয়ে বলেন, আমরাতো মানুষ না, আমরা ড্রাইভার। সেদিন এক রোগীরে গাজীপুর থেকে নিয়া আসছি। সঙ্গে বাপ আর ভাই। দুইজন মিলে মেয়েটারে ওঠাতে পারছিল না। আমিসহ কোনোরকম উঠাই। পাঁচ হাসাপাতাল ঘুরে শেষে পিজিতে ভর্তি করায়। তাদের অবস্থা দেখে আমার কান্না আসছিল। যদিও এমন রোগী আগেও পাইছি কিন্তু এই রোগী শ্বাস নিতে না পেরে এমনভাবে চিৎকার দিয়ে উঠছিল, বলার মতো না। কতোই আর বয়স হবে ১৮/২০।

তিনি আক্ষেপ নিয়ে বলেন, আমার এম্বুলেন্সে রোগী মারাও গেছে কিছু মনে হয় নাই। কিন্তু সেদিন মেয়েটার কষ্ট দেখে খুব খারাপ লাগছে। আরেক এম্বুলেন্সচালক বিনয় দাস বলেন, আমাদের ওপর ভগবানের কৃপা আছে। সারাদিন আমরা করোনা রোগীদের সঙ্গে থাকি। আমাগো মাস্ক ছাড়া আর কিছুই নাই। আমাগো করোনা ধরে তাও যাত্রী লই। আমি একা থাকি ঢাকায়। কিন্তু যারা পরিবারের সঙ্গে থাকে তাদের ভয় আছে। কিন্তু রোগী না লইলে ভাত জুটবো না ভাই।

পাঠকের মতামত

**মন্তব্য সমূহ পাঠকের একান্ত ব্যক্তিগত। এর জন্য সম্পাদক দায়ী নন।

সায়র আলমগীর

২০২১-০৪-১১ ১০:০০:২৮

আহা! আল্লাহ তুমি আমাদের রহমত করোা। আর মানুষকে বিবেকবোধ দাও যেন এতটু সচেতন হয়।

আপনার মতামত দিন

প্রথম পাতা অন্যান্য খবর

ফিলিস্তিনে রক্তপাত বন্ধে যুক্তরাষ্ট্রের সক্রিয় ভূমিকা চায় ঢাকা

১৮ মে ২০২১

ফিলিস্তিন ও ইসরাইলের মধ্যকার দ্বন্দ্ব নিরসন ও চলমান রক্তাক্ত সহিংসতা বন্ধে যুক্তরাষ্ট্রকে সক্রিয় ভূমিকা পালনের ...

ভারতীয়সহ চার ভ্যারিয়েন্ট শনাক্ত

১৮ মে ২০২১

সমপ্রতি আইইডিসিআর, আইসিডিডিআর,বি’ ও আইদেশি’র সঙ্গে যৌথভাবে প্রায় ২০০ কোভিড-১৯ নমুনার জিনোম সিকোয়েন্সিং করে দেশে ...

জামিন পেলেন তৃণমূল কংগ্রেসের ৩ নেতা ও প্রাক্তন মেয়র শোভন চট্টোপাধ্যায়

দিনভর নাটকীয়তা

১৮ মে ২০২১

তৃণমূল কংগ্রেসের দুই মন্ত্রী সুব্রত মুখোপাধ্যায়, ফিরহাদ হাকিম, কলকাতার প্রাক্তন মেয়র শোভন চট্টোপাধ্যায় ও বিধায়ক ...

মাথাপিছু আয় বেড়ে ২২২৭ ডলার

১৮ মে ২০২১

চলতি অর্থবছরের (২০২০-২১) হিসাব অনুযায়ী মাথাপিছু আয় গত অর্থবছরের চেয়ে ১৬৩ ডলার বেড়েছে। এ বছর ...

মৃতপুরী গাজা

১৭ মে ২০২১

বিশেষ সম্পাদকীয়

আল জাজিরা ও এপি’র পাশে মানবজমিন

১৭ মে ২০২১

হাস্যকর

১৭ মে ২০২১



প্রথম পাতা সর্বাধিক পঠিত



ভারতীয় ভ্যারিয়েন্ট

কঠিন বিপদ দেখছেন বিশেষজ্ঞরা

আগাম প্রস্তুতির পরামর্শ বিশেষজ্ঞদের

করোনার ভারতীয় ভ্যারিয়েন্ট বাংলাদেশে

খালেদা জিয়ার বিদেশ যাওয়া

সরকারি সিদ্ধান্ত জানা যাবে আজ

DMCA.com Protection Status