সরজমিন

একের পর এক আসছে এম্বুলেন্স

স্টাফ রিপোর্টার

এক্সক্লুসিভ ৩ এপ্রিল ২০২১, শনিবার | সর্বশেষ আপডেট: ২:১০ অপরাহ্ন

৫৫ বছর বয়সী ফজলুুল হক। বাড়ি নোয়াখালীর মাইজদীতে। বেশ কিছুদিন ধরে পেটের সমস্যায় ভুগছেন। নোয়াখালীর চিকিৎসকরা জানিয়েছেন পেটে সমস্যা। ঢাকায় নিয়ে চিকিৎসা করাতে হবে। এরইমধ্যে এই রোগীর শ্বাসকষ্টজনিত সমস্যা শুরু হয়। তাই স্বজনরা তড়িঘড়ি করে তাকে বৃহস্পতিবার নিয়ে আসেন ঢাকার শ্যামলীর শহীদ সোহরাওয়ার্দী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে। একদিকে শ্বাসকষ্টের সমস্যা অন্যদিকে করোনা পরীক্ষা করানো হয়নি।
তাই বৃহস্পতিবার দিনরাত ওই হাসপাতালে ঘুরে তাকে ভর্তি করানো সম্ভব হয়নি। রাতভর কয়েকটি বেসরকারি হাসপাতালে ভর্তি করাতে ব্যর্থ হয়েছেন। হাসপাতালের বারান্দায় আর সড়কে সড়কে ঘুরে সকালে আসেন ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের নতুন ভবনের নিচতলায়। সকাল থেকে দুপুর আড়াইটা পর্যন্ত সেখানে শত চেষ্টা করেও ভর্তি করানো যায়নি ফজলুল হককে। পরে বিকাল ৩টার দিকে স্বজনরা তাকে নিয়ে মিটফোর্ড হাসপাতালের উদ্দেশ্যে রওয়ানা হন।

ফজলুল হকের স্ত্রী আমেনা বেগম মানবজমিনকে বলেন, বৃহস্পতিবার রাত থেকেই আমার স্বামীর শ্বাসকষ্ট ও পেটের ব্যথা বেড়ে গেছে। সোহরাওয়ার্দী হাসপাতাল ও কয়েকটি বেসরকারি হাসপাতালে অনেক চেষ্টা করেও ভর্তি করাতে পারিনি। সোহরাওয়ার্দী থেকে ব্যথার ইঞ্জেকশন দিয়ে ছেড়ে দেয়া হয়। সকালে এই হাসপাতালে এসে বসে আছি। কারো সঙ্গে ঠিকমতো কথা বলতে পারিনি। দুপুরের দিকে জানতে পারি এখানে সিট নেই তাই ভর্তি নেবে না। আমার স্বামীর অবস্থা এতটাই খারাপ তাকে অন্য হাসপাতালে  নিয়ে যাবার সুযোগ নাই। চোখের সামনে তাকে নিস্তেজ হতে দেখে নিজেকে ঠিক রাখতে পারছি না। এখানকার অনেকের কাছে অনুরোধ করে কোনো লাভ হয়নি। কাঁদতে কাঁদতে হাসপাতালের ফ্লোর ভিজিয়েছি। কিন্তু কারো মন গলাতে পারিনি। সবাই বলে সিট নাই, সিট নাই।

শুধু ফজলুল হক নন। করোনার উচ্চ সংক্রমণ পরিস্থিতিতে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের নিয়মিত চিত্র এটি। গতকাল সকাল থেকে দুপুর পর্যন্ত মোট ৪ ঘণ্টা এই হাসপাতালটিতে অবস্থান করে দেখা গেছে রোগীদের সিট পাবার লড়াই। হাসপাতালের নতুন ভবনের জরুরি বিভাগে প্রতি ১০-১৫ মিনিট পর পর এসে একটি এম্বুলেন্স থামছে। ঢাকা ও দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে আসা এসব এম্বুলেন্সে লম্বা সারির সৃষ্টি হয়েছে। ৪ ঘণ্টায় প্রায় শতাধিক রোগী দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে বিভিন্ন হাসপাতালের সুপারিশ নিয়ে ভর্তি হতে এসেছেন। কিন্তু এদের কাউকেই সিট দিতে পারেননি হাসপাতাল সংশ্লিষ্টরা। একের পর এক হাসপাতাল ঘুরে রোগীদের সর্বশেষ ভরসা ছিল এই হাসপাতাল।

কিন্তু সিট না পেয়ে এসব রোগীরা ফিরে গেছেন। ভর্তি হতে আসা বিভিন্ন রোগীদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, ৮০ শতাংশ রোগীর শ্বাসকষ্ট রয়েছে। স্বাভাবিক মাত্রার চেয়ে অক্সিজেনের মাত্রা অনেক নিচে নেমে গেছে। লাঞ্চে ৩০ থেকে ৬০ বা তার চেয়ে বেশি সংক্রমণ নিয়ে অনেকে এসেছেন। এধরনের রোগীদের দ্রুত চিকিৎসা ও অক্সিজেন সাপোর্ট না দিলে বাঁচানো কঠিন। কিন্তু অনেক রোগী এম্বুলেন্সে এম্বুলেন্সে দিন পার করে দিচ্ছেন। হাসপাতালে এসেও এম্বুলেন্স থেকে নামার সুযোগ পাচ্ছেন না। কারণ স্বজনরা করোনা জরুরি বিভাগে যাওয়ার পরপরই জানিয়ে দেয়া হচ্ছে সিট খালি নাই। ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের জরুরি বিভাগের টিকিট কাউন্টার সূত্র জানিয়েছে, সকাল ৮টা থেকে দুপুর ২টা পর্যন্ত ১৪ জন রোগী ভর্তি হয়েছেন। এরমধ্যে করোনা পজেটিভ ১ জন ও আর ননকরোনা ১৩ জন রোগী ভর্তি হয়েছেন। হাসপাতাল সংশ্লিষ্টরা বলেছেন, রাতের চিত্র আরো বেশি করুণ। করোনার জটিল রোগীরা রাতের বেলাতেই আসছেন। রাত হলেই শুধু এম্বুলেন্সের সাইরন শোনা যায়। লাইন ধরে দাঁড়িয়ে থাকে এম্বুলেন্স।
মিটফোর্ড হাসপাতালের সুপারিশ নিয়ে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে এসেছেন সত্তর বছর বয়সী জয়নাল আবেদিন। ৪-৫ দিন ধরে তার জ্বর, কাশি ও শ্বাসকষ্ট হচ্ছে। করোনা পরীক্ষায় তার পজেটিভ রেজাল্ট এসেছে। তার জামাতা আল আমিন বলেন, ভোর বেলা নারায়ণগঞ্জ থেকে রওয়ানা দিয়ে স্যার সলিমুল্লাহ মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল (মিটফোর্ড)-এ গিয়েছিলাম। সেখানে আমার শ্বশুরকে এম্বুলেন্সে রেখেই কর্তব্যরত চিকিৎসকদের সঙ্গে কথা বলেছি। তারা রোগীর সমস্যার কথা শুনে ঢাকা মেডিকেলের পরামর্শ দেন। এখানে এসে শুনতেছি কোনো সিট খালি নাই। একজন এসে অক্সিজেন মেপে বলেছে মাত্রা অনেক কম। জরুরি ভিত্তিতে অক্সিজেন সাপোর্ট ও চিকিৎসা শুরু করতে হবে। এখন এই হাসপাতালে ভর্তি করা সম্ভব হচ্ছে না। কোথায় যাবো সেটিও ভেবে পাচ্ছি না। শুনেছি এই হাসপাতালেই সবচেয়ে বেশি সিট আছে। কিন্তু এখানে যদি না পারি তবে আর কোথায় পারবো? তিনি বলেন, ভোর ৫টা থেকে ৩টা পর্যন্ত মোট ১০-১১ ঘণ্টা ধরে আমার শ্বশুরকে এম্বুলেন্সেই শুইয়ে রেখেছি। কখন, কোথায় তার চিকিৎসা শুরু হবে জানিনা। আর চিকিৎসা করাতে পারবো কিনা সেটিও জানিনা।

মুন্সীগঞ্জের ব্যবসায়ী ফারুক খান। কয়েকদিন ধরে জ্বর ও শ্বাসকষ্টে ভুগছেন। স্বজনরা তাকে মুন্সীগঞ্জ সদর হাসপাতালে ভর্তি করিয়েছেন। অক্সিজেন মাত্রা কমে যাওয়াতে সেখান থেকে তাকে ছাড়পত্র দিয়ে ঢাকায় পাঠানো হয়। ঢাকার কয়েক হাসপাতাল ঘুরে করোনা পজেটিভ সার্টিফিকেট না থাকায় স্বজনরা তাকে কোথাও ভর্তি করাতে পারেননি। অবশেষে গতকাল বেলা ১২টার দিকে তাকে আনা হয় ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে। সিট খালি না থাকায় তাকে ঢামেকে ভর্তি করানো যায়নি। ফারুক খানের স্ত্রী আফরোজা বেগম মানবজমিনকে বলেন, মুন্সীগঞ্জ হাসপাতালে অক্সিজেন লেভেল কমে যাওয়াতে ঢাকায় নিয়ে এসেছি। কোথাও ভর্তি করাতে পারছি না। শেষ ভরসা ছিল ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল। এখানে ভর্তি করাতে পারছিনা। কি করবো, কোথায় নিয়ে যাবো জানিনা। দ্রুতই তার অবস্থা খারাপ হচ্ছে। ২-১টি হাসপাতালে করোনা টেস্টের জন্য গিয়েছিলাম। সবাই বলে আগামীকাল ছাড়া রেজাল্ট জানা সম্ভব না। এদিকে, এম্বুলেন্সের অক্সিজেন সাপোর্ট দিয়েই তাকে রাখা হয়েছে। কিছুক্ষণের ভেতরে সেটিও শেষ হয়ে যাবে। এরপরে কি করবো?

গোপালগঞ্জের বাসিন্দা রাজু খান। কয়েকদিন ধরে তার খাবারে অরুচি ও পেট ব্যথা। গতকাল বাথরুম থেকে বের হওয়ার সময় ঢলে পড়েন মাটিতে। পরিবারের সদস্যরা তাকে প্রথমে নিয়ে যান গোপালগঞ্জের স্থানীয় চিকিৎসকের কাছে। অবস্থার অবনতি হওয়াতে ওই চিকিৎসক ঢাকায় আনার পরামর্শ দেন। বৃহস্পতিবার রাতে ঢাকার ইউনি হেলথ হাসপাতালে থেকে এক রাতে ৪০ হাজার টাকা বিল দিয়েও অবস্থার পরিবর্তন হয়নি রাজুর। পরে সেখান থেকে আনা হয় ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে। এখানকার চিকিৎসকরা অক্সিজেন লেভেল মেপে দেখেন দ্রুতই সেটি কমতেছে। কিন্তু চিকিৎসকরা সিট না থাকায় ভর্তি নিতে অপারগতা দেখান। পরে স্বজনরা রাজু খানকে অন্য হাসপাতালে নিয়ে যান। ধানমণ্ডি থেকে আসা রফিকুল গাউসেরও একই অবস্থা। করোনা পজেটিভ হয়ে একটি সিট পাবার জন্য হাসপাতাল থেকে হাসপাতালে ঘুরছেন তিনি। ভাড়া অক্সিজেন সিলিন্ডার দিয়েই তিনি শ্বাস প্রশ্বাস নিচ্ছিলেন। ঢামেকে একটি সিটের জন্য তার স্বজনরা কয়েক ঘণ্টা অপেক্ষা করেছেন কিন্তু লাভ হয়নি। উপায়ন্তর না পেয়ে স্বজনরা তাকে একটি বেসরকারি মেডিকেলে নিয়ে ভর্তি করেন।

দুই ঘণ্টা ধরে করোনা উপসর্গের রোগী হামেদুল ইসলামকে নিয়ে এম্বুলেন্সে বসে অপেক্ষা করছিলেন তার স্ত্রী ও দুই বোন। হামেদুলের বড় বোন বুলু বেগম বলেন, ভালোই ছিল আমার ভাইটা। দু’দিন ধরে শ্বাসকষ্ট হচ্ছিল। মানিকগঞ্জ থেকে এই হাসপাতালে নিয়ে এসেছি। করোনা পরীক্ষা করাইনি তাই কয়েকটি হাসপাতালে ভর্তি নেয়নি। শুনেছি এই হাসপাতালে পরীক্ষা না করালেও ভর্তি নেয়। এখানে এসে দুই ঘণ্টা ধরে একটি সিটের জন্য যুদ্ধ করতে করতে বিরক্ত হয়ে যাচ্ছি। চোখের সামনে আমার ভাইটা কষ্ট পাচ্ছে অথচ তাকে কোনো সেবাই দিতেই পারছিনা।

ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল প্রশাসন সূত্র জানিয়েছে, ঢাকার করোনা ডেডিকটেড ও অন্যান্য বেসরকারি হাসপাতাল থেকে এখানে রোগী পাঠানো হয়। দেশের বিভিন্ন জেলা থেকেও রোগীরা আসছে। ফেব্রুয়ারি মাসে শত শত সিট খালি ছিল। কিন্তু মার্চ মাসের মাঝামাঝি সময় থেকেই রোগী ভর্তি বাড়তে শুরু করে। এখন হাসপাতালের সাধারণ শয্যা, আইসিইউ, এইচডিইউ, কেবিন কোথাও সিট খালি নাই। সুস্থ হয়ে যেসব রোগী ছাড়পত্র নিয়ে যাচ্ছেন তাদের সিটে নতুন রোগী ভর্তি নেয়া হচ্ছে। এছাড়া করোনা ওয়ার্ডের অনেক খালি স্থানে সিট বসিয়েও রোগী রাখা হচ্ছে।

পাঠকের মতামত

**মন্তব্য সমূহ পাঠকের একান্ত ব্যক্তিগত। এর জন্য সম্পাদক দায়ী নন।

Md. Harun al-Rashid

২০২১-০৪-০৩ ১৩:৪৮:১৯

এই সব উন্নয়নের খিস্তি খেউড় আজ আমাদের বিড়ম্বিত অস্হিত্বকে আরো বিড়ম্বিত করে তুলছে। কোথায় গেল ধনকুবের মহোদয়গনের প্রতিশ্রুত আপদকালীন হাসপাতাল? প্রথম ঢেউ এর সময় যে গন আবেগ ও উচ্ছাস ছিল সে উচ্ছাস ও আবেগে সহযোগিতার হাত বাড়াই।

আপনার মতামত দিন

এক্সক্লুসিভ অন্যান্য খবর

পুলিশ ও বিজিবি’র টহলে হামলার পরিকল্পনা ছিল জঙ্গিদের

১০ মে ২০২১

পুলিশ ও বিজিবি’র টহলে হামলা করে দেশ ছাড়ার পরিকল্পনা করেছিল নিষিদ্ধ ঘোষিত জঙ্গি সংগঠন আনসার ...

ঈদে ৩ দিন সংবাদপত্র প্রকাশিত হবে না

১০ মে ২০২১

পবিত্র ঈদুল ফিতর উপলক্ষে সংবাদপত্র অফিস ৩ দিন বন্ধ থাকবে। নিউজ পেপার ওনার্স এসোসিয়েশন (নোয়াব)-এর ...

নির্যাতনের ভিডিও পাঠিয়ে টাকা দাবি

লিবিয়ায় বন্দি মাদারীপুরের ২৪ যুবক

৯ মে ২০২১



এক্সক্লুসিভ সর্বাধিক পঠিত



নির্যাতনের ভিডিও পাঠিয়ে টাকা দাবি

লিবিয়ায় বন্দি মাদারীপুরের ২৪ যুবক

DMCA.com Protection Status