নিজের ছায়া দেখে ভয় পেলে কি চলবে?

আরাফাতুল ইসলাম

অনলাইন (৬ দিন আগে) ফেব্রুয়ারি ২৩, ২০২১, মঙ্গলবার, ১১:১০ পূর্বাহ্ন | সর্বশেষ আপডেট: ৪:২০ অপরাহ্ন

বাংলাদেশে গণমাধ্যমের স্বাধীনতা নিয়ে মাঝেমাঝেই আলোচনা শোনা যায়৷ নানা সময় নানা শাসক গণমাধ্যমের কণ্ঠরোধ করতে চেয়েছেন৷ সেই চেষ্টায় এক অপেক্ষাকৃত নতুন সংযোজন ডিজিটাল নিরাপত্তা আইন৷এই আইনের ভয়ে ভীত গণমাধ্যম৷ প্রশ্ন হচ্ছে, ভয়কে জয় করা কি সম্ভব নয়?

ডয়চে ভেলের সাক্ষাৎকারভিত্তিক অনুষ্ঠান ‘কনফ্লিক্ট জোন'-এর উপস্থাপক বিশ্বখ্যাত সাংবাদিক টিম সেবাস্টিয়ান৷ কয়েক সপ্তাহ আগে বাংলাদেশের গণমাধ্যমের স্বাধীনতা এবং অন্যান্য প্রসঙ্গ নিয়ে প্রধানমন্ত্রীর আন্তর্জাতিক উপদেষ্টা গওহর রিজভীর সাক্ষাৎকার নিয়েছিলেন তিনি৷ সেখানে এক পর্যায়ে গওহর রিজভীকে সেবাস্টিয়ান  বলেন, ‘‘আপনি চাপ প্রয়োগ করে গণমাধ্যমকে নতিস্বীকার করতে এবং চুপ থাকতে বাধ্য করেছেন, ফলে এটি এখন নিজের ছায়া দেখেই ভয় পাচ্ছে৷''গণমাধ্যমের নিজের ছায়া দেখে নিজেই ভয় পাওয়ার এই বিষয়টি আমাকে বিস্তর ভাবিয়েছে৷ এমন নয় যে এখনই বাংলাদেশের গণমাধ্যমকে চাপের মধ্যে কাজ করতে হচ্ছে৷ বরং বাংলাদেশের স্বাধীনতার পর থেকে নানা সময়ে নানা শাসক গণমাধ্যমের কণ্ঠরোধ করার চেষ্টা করেছে৷ কখনো কখনো তাতে সাময়িক সাফল্য এসেছে, কখনো কখনো শাসকগোষ্ঠীর এই চাপ গণমাধ্যমকে খুব একটা দমাতে পারেনি৷ অর্থাৎ চাপটা কম বা বেশি সবসময়ই ছিল, গণমাধ্যম পুরোপুরি স্বাধীন ছিল এমন সময় আমার জানামতে স্বাধীন বাংলাদেশে এখনো আসেনি৷

তাহলে বর্তমানে গণমাধ্যমকে দৃশ্যত এতটা ভীতসন্ত্রস্ত মনে হচ্ছে কেন? এক্ষেত্রে আমার নিজের ভাবনার জায়গা থেকে বলতে পারি, ডিজিটাল নিরাপত্তা আইন এক বড় কারণ৷ এই আইন ব্যবহার করে সাংবাদিকদের হয়রানি করার সুযোগ যথেষ্টই রয়েছে৷ খোদ গওহর রিজভীও স্বীকার করেছেন আইনটিতে কিছু ‘শব্দচয়ন দুর্বল এবং অস্পষ্ট' যার অপব্যবহারের সুযোগ রয়েছে৷

আমি মনে করি, ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনের এই দুর্বলতা সম্পর্কে সরকার অবগত এবং এটা ইচ্ছাকৃতভাবেই এভাবে রাখা হয়েছে৷ অন্যথায় বর্তমান সরকারের পক্ষে আইনটি সংশোধন করে সেটির দুর্বলতা দূর করা মোটেই কঠিন কিছু নয়৷ এটা করতে গেলে সরকারের কোনো বাধার মুখে পড়ার কথা নয়৷

আর সেটা না করায় এই আইনের অপব্যবহারের নানা উদাহরণ আমরা মাঝেমাঝেই পাই৷ বাকস্বাধীনতা বিষয়ক সংগঠন আর্টিকেল ১৯-এর এক সাম্প্রতিক প্রতিবেদন জানাচ্ছে, ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনে গত বছর ৪৫৭ জনের বিরুদ্ধে মামলা করা হয়েছে, যার মধ্যে ৭৫ জনই সাংবাদিক৷ খোঁজ নিলে দেখা যাবে এই সাংবাদিকদের অধিকাংশই আইনের গ্যাঁড়াকলে পড়েছেন তথাকথিত ‘সরকারবিরোধী' লেখালেখি করে কিংবা কার্টুন এঁকে বা ফেসবুকে কিছু পোস্ট করে৷ এখন, ‘সরকারবিরোধী' বিষয়টি যে কী সেটা নিয়েও বিস্তর আলোচনা করা যায়৷ আপাতদৃষ্টিতে যা কিছু সরকারের বিপক্ষে যায় তার সবকিছুকেই আপনি সরকারিবরোধী তকমা দিতে পারেন৷ সেটা হতে পারে কোনো দুর্নীতি নিয়ে কথা বলা কিংবা নেহাত সরকারের কোনো একটি বিষয় যা আপনার হয়ত ভালো লাগেনি বলে কড়া ভাষায় কিছু লিখেছেন, সেটাও৷

কথা হচ্ছে, সরকারের বিরোধিতা কেন করা যাবে না? একজন ব্যক্তির যদি সরকারের কিছু ভালো না লাগে, সেটা তিনি কেন বলতে পারবেন না? একজন প্রধানমন্ত্রী যদি সমালোচিত হওয়ার মতো কিছু করেন, সেটার সমালোচনা করতে বাধা থাকবে কেন? এমন সমালোচনার জন্য একটি শিশুকে জেলে যেতে হবে কেন? কেন একজন আলোকচিত্রী বা কার্টুনিস্টকে মাসের পর মাস কারাভোগ করতে হবে?এরকম প্রশ্ন অজস্ত্র করা যায়৷ সহজ করে বললে, এগুলো করা হয় ভয় সৃষ্টির জন্য, যে ভয়ে ভীত হয়ে সাংবাদিক, সাধারণ মানুষ সবাই নিজেকে গুটিয়ে নেবে৷ আর যত মানুষ নিজেকে গুটিয়ে নেবে শাসকগোষ্ঠীর পক্ষে ততই নিজেকে জবাবদিহিতা থেকে দূরে রাখা সহজ হবে৷ মোটা দাগে বাংলাদেশের বাকস্বাধীনতা পরিস্থিতিকে এভাবে মূল্যায়নের সুযোগ রয়েছে৷

তবে আমি মনে করি, এই ভয়কে জয় করার কথাও ভাবতে হবে গণমাধ্যমকে৷ আর এজন্য নানা পন্থা নিজেদেরই খুঁজে বের করতে হবে৷ নিজের ছায়া দেখে যে নিজেই ভীত নয় তা গণমাধ্যমকে জানান দিতে হবে৷ সেটা না করে নিজেদের গুটিয়ে নিলে সাধারণ জনগণই বঞ্চিত হবে৷ আর গণমাধ্যমের গুরুত্ব ক্রমশ কমতে থাকবে৷ সেটা গণমাধ্যমের জন্য যেমন ক্ষতিকর, ক্ষতিকর গণতান্ত্রিক সরকারব্যবস্থার জন্যও৷

সূত্রঃ ডয়চে ভেলে

পাঠকের মতামত

**মন্তব্য সমূহ পাঠকের একান্ত ব্যক্তিগত। এর জন্য সম্পাদক দায়ী নন।

ezana huda

২০২১-০২-২৩ ২৩:৫১:১৬

The Yellow journalists are also responsible for this situation, because they are the beneficiary of this black law.

N Islam

২০২১-০২-২৩ ০৯:৪৫:০৫

সংবাদ সংগ্রহ ও প্রচারে যারা নিয়োজিত তাদের একটা বড় অংশ যখন অর্থ ও প্রতিপত্তির কাছে বিক্রি হয়ে যায়, তখন বাঁকিদের ভয়কে জয় করার সুযোগ প্রায় শেষ হয়ে যায় । বাংলাদেশে বড় বড় কয়েকটি শিল্প/ব্যবসায়ী গ্রুপ, যাদের বিরুদ্ধে জোর-জবরদস্তি, এমন কি খুন-খারাবির বিস্তর অভিযোগ আছে, তাদের পত্রিকা ও টিভি চ্যানেলগুলোতে দেশের প্রথিতযশা সাংবাদিকরা অনেক অনিয়মের সংবাদ প্রচার করেন, শুধু সংশ্লিষ্ট পত্রিকা/টিভি চ্যানেলের মালিক পক্ষের শিল্পগ্রুপ ধোয়া তুলসী পাতা । সরকারদলীয়দের অন্যায়কে বৈধতা দেয়া অধিকাংশ সংবাদ মাধ্যমের প্রধান কাজ । এই অবস্থায় ভয়কে জয় করার কথা না বলাই ভাল ।

আপনার মতামত দিন

অনলাইন অন্যান্য খবর

চলন্ত প্রাইভেটকারটিকে হঠাৎ আগুন ধরে যায়

২ মার্চ ২০২১

ঢাকার সাভারে একটি চলন্ত প্রাইভেটকারে হঠাৎ আগুন ধরে পুড়ে ছাই হয়ে গেছে। সোমবার রাত পৌনে ...

স্বামীর মৃত্যুর খবরে কাঁদলেন ডা. অন্তরা

২ মার্চ ২০২১

 স্বামীর মৃত্যুর খবর শুনে কাঁদলেন ডা. অন্তরা। গতকাল দুপুরের দিকে তাকে মৃত্যুর খবর জানানো হয়। ...

বরগুনায় প্রতারণার মামলায় ইউপি সদস্য কারাগারে

১ মার্চ ২০২১

বরগুনার বেতাগী উপজেলায় প্রতারণা ও জালিয়াতি মামলায় এক ইউপি সদস্য ও প্যানেল চেয়ারম্যান মো. হুমায়ুন ...



অনলাইন সর্বাধিক পঠিত



বিদায় সংবর্ধনায় বিচারপতি মির্জা হোসেইন হায়দার-

বাস্তবে বিচার বিভাগ কতটুকু স্বাধীন, তা আমরা সকলেই জানি

তিন বছর পর রহস্য উদঘাটন

এক প্রেমিকের প্রতারণার বলি দুই বোন

DMCA.com Protection Status