একজন ‘উটুবার’ চা বিক্রেতার দুর্ভাবনা ও হায়দারের গান

কাজল ঘোষ

মত-মতান্তর ৫ ফেব্রুয়ারি ২০২১, শুক্রবার | সর্বশেষ আপডেট: ২:৩০ অপরাহ্ন

কি দেখার কথা কি দেখছি, কি শোনার কথা কি শুনছি, কি ভাবার কথা কি ভাবছি, কি বলার কথা কি বলছি। একজন চা বিক্রেতা রাজধানীর জনাকীর্ণ এক রাস্তার মোড়ে টি স্টলে বসে এই লাইনগুলো আওড়াচ্ছেন। সাতসকালে হঠাৎ এই গান কেন? এমন প্রশ্নে হোঁচট খায় চা বিক্রেতা। কেন? আফনে বুঝি দ্যাহেন নো। ইডা কি বলে তার মুঠোফোন এগিয়ে দেয়। আফনে উটুব দ্যাহেন। জাজিরা কি কইছে? বিষম খেলাম। জাজিরা মানে আল জাজিরা এই চা ওয়ালা চেনে নাকি? বুঝতে বাকি রইল না এটি সাম্প্রতিক প্রচারিত একটি প্রতিবেদন নিয়ে বলা।


৩৬০ ডিগ্রি অ্যাঙ্গেল থেকে যখন ক্যামেরা প্যান করি তখন চারপাশের অন্যান্য দৃশ্যও ভেসে ওঠে। স্থানটি রাজধানীর ফার্মগেট এলাকা। দৃশ্যমাণ হচ্ছে মেট্টোরেলের পিলার। শোনা যাচ্ছে আগামী জুলাইতে এর এক অংশ চালু হবে। অল্পকদিন আগেই পদ্মাসেতুর সব শেষ স্প্যানটিও বসেছে। নিঃসন্দেহে দেশ এগিয়ে যাচ্ছে। কিন্তু পাশাপাশি আল জাজিরার এমন প্রতিবেদনগুলোও মানুষের মধ্যে নানান মিশ্র আলোচনার খোরাক যোগাচ্ছে। ঘুরেফিরে আলোচনায় থাকা জনশ্রুতিগুলোকে হালে পানি ঢেলে দিচ্ছে। এটা আপনি, আমি এবং আমরা স্বীকার করি বা না করি।

জনপ্রিয় সঙ্গীত শিল্পী হায়দারের এই গানটি একসময় মুখে মুখে ছিল। অসাধারণ সুর আর ছন্দে গাওয়া গানটি আমজনতা নানান ভাবে গেয়ে থাকে। গানের এই কথাগুলোর অভিব্যক্তিতো বাস্তবতায় মূর্ত। গীতি কবির এই কাব্যময়তা কখনও কখনও হয়ে ওঠে অনেক বেশি বাস্তব। প্রসঙ্গের অবতারণা সঙ্গত কারণেই। গেল সপ্তাহের ঘটনা প্রবাহে একটি প্রতিবেদন নিয়ে দেশের আনাচে কানাচে সবখানেই আলোচনা। উত্তাপহীন রাজনীতির মঞ্চেও চলছে এ নিয়ে নানা তীর্যক বিতর্ক, মন্তব্য। আর এই আলোচনা বা বিতর্ক মূলত আল জাজিরার একটি প্রতিবেদন ঘিরে। আপনি শরীয়তপুরের জাজিরা বলুন আর কোথাকার আল বা কোথাকার জাজিরা যাই বলুন, প্রতিবেদনটির নির্মাণ ব্যয় নিয়ে যত প্রশ্নই করুন একটি মাধ্যম বেশকিছু বিষয় নিয়ে অনুসন্ধান করেছে, টিভি পর্দায় তুলে ধরেছে এটা দৃশ্যমাণ।

এই প্রতিবেদন ঘিরে যে উত্তাপ তার রেশ দেখা গেছে সংবাদপত্রের পাতায় এবং বেশকিছু টেলিভিশন টকশোতেও। চলছে পাল্টা বিতর্ক। আল জাজিরার এই প্রতিবেদন প্রকাশের পর সরকারের পররাষ্ট্র দপ্তর একটি প্রতিবাদ আর অন্যদিকে সেনা সদর থেকেও পৃথক আরেকটি প্রতিবাদপত্র পাঠানো হয়েছে। যা প্রকাশিত হয়েছে সর্বত্র।

প্রতিবেদনটি প্রকাশের পর প্রাথমিক আলোচনায় ছিল, হয়তো প্রতিবেদনটি যে চ্যানেলে প্রচারিত হয়েছে তা বন্ধ করে দেয়া হতে পারে। কিন্তু এক্ষেত্রে তা হয়নি। সরকার এখানে গণমাধ্যমের অবাধ প্রবাহের ধারাকেই লালন করেছে যা মহল বিশেষে সবখানেই প্রশংসনীয় হয়েছে। এটি এখনও দেশের প্রচলিত অন্তর্জালে দেখা যাচ্ছে। বরং এই প্রতিবেদন প্রকাশের পর এর যা শিরোনাম ছিল ‘প্রাইম মিনিস্টারস ম্যান’ তার বিপরীতে সামাজিক মাধ্যম ছেয়ে গেছে, ‘উই আর হাসিনাস ম্যান’ শিরোনামের হ্যাশট্যাগে। এতেও একটি গণতান্ত্রিক রীতির প্রকাশ লক্ষ্য করা গেছে। সব ছাপিয়ে একটি আলোচনা আছে, খবর নেতিবাচক হোক আর ইতিবাচক হোক এ ধরণের প্রতিবেদন বিদেশি মিডিয়া করছে অথচ নিজ দেশে কোন বিষয়েই কোন অনুসন্ধান নেই কেন? আমজনতা এ প্রতিবেদনের সরকারি ভাষ্য নিয়ে আরও স্পষ্ট হতে চায়। যখন দেশে শক্তিশালী বিরোধীদল থাকে না, গণতন্ত্র স্বল্পমাত্রায় বিরাজিত, গণমাধ্যম অনেক ক্ষেত্রেই নরমসুরে কথা বলছে তখন বিদেশি মিডিয়ায় প্রকাশিত প্রতিবেদন কি চলমান দুর্নীতির আগুনে ঘি ঢেলে দিল এ প্রশ্নও অনেকের?  

পত্র পত্রিকার সম্পাদকীয়তে বেশকিছু বিষয় ওঠে এসেছে। ডেইলি স্টার লিখেছে, যদি দ্রুত তদন্তের মাধ্যমে এর সত্যতা পাওয়া যায়, তাহলে ব্যবস্থা নেয়া জরুরি। নিয়মবহির্ভূত কর্মকান্ডের সঙ্গে সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিয়ে শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনা সরকারের দায়িত্ব। কেবলমাত্র আল জাজিরার প্রতিবেদনকে উদ্দেশ্য প্রণোদিত বলা যথেষ্ট নয়। একেবারে শেষদিকে আরও লিখেছে, বাংলাদেশে আল জাজিরার প্রতিবেদনটি দেখতে কোনো প্রকার বাধা সৃষ্টি না করায় সরকারের প্রশংসা অবশ্যই করতে হবে। প্রযুক্তির এই যুগে এ জাতীয় ব্যবস্থাগুলো আর কোনো কাজে আসে না। সরকার সব   দেখেছে এবং সব শুনেছে। তারা কি আদৌ কিছু করবে? এটাই এখন সবচেয়ে বড় প্রশ্ন।

প্রথম আলো লিখেছে, আল জাজিরার প্রতিবেদন এড়িয়ে গেলে জনগণ ভুল বার্তা পাবে। এর কারণ বিশ্লেষণে তারা সম্পাদকীয়তে বলছে, দুটি প্রতিবাদ ও প্রতিক্রিয়ায় প্রতিবেদনটি প্রত্যাখ্যান করা হলেও সেখানে যেসব বিষয় ওঠেছে সে প্রসঙ্গে সরাসরি কোন বক্তব্য পাওয়া যায়নি।

দেশজুড়ে এই প্রতিবেদনটি ব্যাপক আলোচনার জন্ম দিয়েছে এটি বলার অপেক্ষা রাখেনা। তা মোড়ে মোড়ে চায়ের স্টলে দাঁড়ালেই টের পাওয়া যাবে। এর জন্য খুব বেশি আড়ি পাতার দরকার নেই। আম জনতা এই প্রতিবেদনে বিশ্বাস করুক আর নাই বা করুক সেটি ভিন্ন তর্ক তবে এসবের বিষয়ে স্পষ্ট বক্তব্য না পেলে এক ধরণের ভুল বোঝার অবকাশ থেকেই যাবে।

পাঠকের মতামত

**মন্তব্য সমূহ পাঠকের একান্ত ব্যক্তিগত। এর জন্য সম্পাদক দায়ী নন।

আবুল কাসেম

২০২১-০২-০৫ ১০:৪১:১৮

বাংলাদেশের সরকারের বিপক্ষে বহুলালোচিত প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে আল- জাজিরা। বিষ্ময়কর ব্যপার হচ্ছে, সরকারের তরফে চ্যানেলটির সম্প্রচার এখনো বন্ধ করা হয়নি। এটা সরকারের গণতান্ত্রিক মূল্যবোধের বহিঃপ্রকাশ। সরকার গণমাধ্যমের অবাধ তথ্যপ্রবাহে বিশ্বাসী, এটা তারই প্রমাণ বহন করে। এটা নিসন্দেহে সরকারের প্রশংসনীয় কাজ। আল-জাজিরার রিপোর্টটিকে সরকার বলেছে উদ্দেশ্য প্রনোদিত। ষড়যন্ত্রের অংশ। কিন্তু, অফিস থেকে শুরু করে চা দোকানী পর্যন্ত, খামারি থেকে শুরু করে গৃহিণী পর্যন্ত এবং ছাত্র-শিক্ষক থেকে শুরু করে চাষাভুষা পর্যন্ত যাদের মন মগজে রিপোর্টটি আলোড়ন তুলেছে তাদের মগজের স্নায়ুকোষের ভেতর থেকে রিপোর্টটি বেরিয়ে পড়বে কিভাবে? তা-কি অতোই সহজ! মানুষের মগজে একবার যদি কোনো কিছুর ছাপ বসে যায়, শত ঘষামাজার পরও সেই ছাপ মুছে ফেলা যায়না। সরকারের এবং দেশের মান-মর্যাদা ও ভাবমূর্তি রক্ষা করতে হলে সরকারকে যথাযথ উদ্যোগ নিতে হবে। প্রতিটি অভিযোগের যুক্তি ও প্রমাণ ভিত্তিক প্রত্যুত্তর দেওয়া আবশ্যক। আমার ধারণা ছিলো ঘটনাটি রাজনৈতিক ও বুদ্ধিজীবী মহলেই আলোচনা পর্যালোচনা পর্যন্ত সীমাবদ্ধ থাকবে। কিন্তু, চক্ষু চড়কগাছে ওঠে পড়েছে এই রিপোর্টটি পড়ার পর যে, একজন চা দোকানী পর্যন্ত আল-জাজিরার খবর রাখেন এবং তাদের রিপোর্ট নিয়ে চিন্তা ভাবনা করেন। সরকারের এই রিপোর্ট এড়িয়ে যাওয়ার বা কোনো রকমে ধামাচাপা দেয়ার চেষ্টা করা হলে চা দোকানী সহ সকল মানুষের ভূল বা সন্দেহ আরো ঘনীভূত হবে। উন্নয়নের আকাশস্পর্শী সরকারের মর্যাদার সাথে রিপোর্টটি এড়িয়ে যাওয়া খাপ খায়না। সুতরাং, বুদ্ধি দিয়ে বুদ্ধির, জ্ঞান দিয়ে জ্ঞানের, কৌশল দিয়ে কৌশলের, তত্ব দিয়ে তত্ত্বের এবং তথ্য দিয়ে তথ্যের মোকাবিলা করা অপরিহার্য। যাতে মানুষ ভূল বুঝার সুযোগ না পায়।

আপনার মতামত দিন

মত-মতান্তর অন্যান্য খবর

করোনা আক্রান্ত হালখাতা

বিদায় নিয়েছে পান্তা ইলিশ, পুরনো ছবিতেই বৈশাখ

১৫ এপ্রিল ২০২১

আশুগঞ্জ গণহত্যা দিবস

১৩ এপ্রিল ২০২১

যাত্রীরা যাবে কোথায়?

১ এপ্রিল ২০২১



মত-মতান্তর সর্বাধিক পঠিত



হাজী সেলিমপুত্র ইরফানকাণ্ড

আল্লাহর মাইর, দুনিয়ার বাইর

আইন পেশায় বিরল এক মানুষ ব্যারিস্টার রফিক-উল-হক

অ্যাটর্নি জেনারেল পদে বেতন নেননি, লড়েছেন দু'নেত্রীর মামলা নিয়ে

ড্রাইভার মালেকের বালাখানা

দরজা আছে, দরজা নেই

DMCA.com Protection Status