আনুশকা, দু'টি ভিডিও ক্লিপ এবং জ্ঞানীদের মানসিক বৈকল্য

ডা. আলী জাহান, যুক্তরাজ্য থেকে

মত-মতান্তর ২৫ জানুয়ারি ২০২১, সোমবার | সর্বশেষ আপডেট: ৬:২০ অপরাহ্ন

১. দুটি ভিডিও ক্লিপ। প্রথম ক্লিপটি বাংলাদেশের একটি জনপ্রিয় টিভি চ্যানেলের কয়েক মিনিটের ভিডিও। পুরো টকশোর একটি অংশ। আর দ্বিতীয় ক্লিপটি হচ্ছে (প্রায় ঘণ্টা খানেকের) বাংলাদেশ থেকে প্রচারিত একটি ফেসবুক অনলাইন চ্যানেলের ভিডিও। দু’টি ভিডিওতেই সাম্প্রতিক একটি বিষয় নিয়ে আলোচনা/পর্যালোচনা হচ্ছে। আলোচনা করতে এসেছেন বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষক, মেডিকেল কলেজের অধ্যাপক, খ্যাতনামা আইনজীবী ও মানবাধিকার নেত্রী এবং সাথে আরও দু’জন জ্ঞানী মানুষ, যাদের পরিচয়টি সময় স্বল্পতার কারণে টিভি চ্যানেলের ছোট ভিডিও ক্লিপে পরিষ্কার হয়নি। সময়ের স্বল্পতার কারণে আমিও আর বের করতে পারিনি।

২. বহুল আলোচিত আনুশকা হত্যাকাণ্ড নিয়ে প্রকাশ্যে টিভি চ্যানেলে আলোচনা হচ্ছে। শুধু আলোচনা হলে আমি হয়তো কিছু বলতাম না।
আদালতে বিচারাধীন বিষয় নিয়ে প্রকাশ্যে আলোচনা করা বাংলাদেশে অনেকটা ডাল-ভাতের মতো হয়ে যাচ্ছে। অনেকের হয়তো মনে আছে যে, বাংলাদেশের সর্বোচ্চ আদালত (সুপ্রিম কোর্টের) থেকে কয়েক বছর আগে অবসরে যাওয়া এক বিচারপতি (তখন তিনি দায়িত্বে ছিলেন) লন্ডনে এক টিভি চ্যানেলে লাইভ শোতে এসে কথা বলেছিলেন। বিচারাধীন মামলা নিয়ে প্রকাশ্যে sitting বিচারপতি হওয়া সত্ত্বেও উনি উনার বক্তব্য পেশ করেছিলেন। দর্শকদের প্রশ্নের উত্তর দিয়েছিলেন। উনাকে সেজন্য কোন জবাবদিহিতা করতে হয়নি। সে কারণে বিচারাধীন বিষয় নিয়ে অন্য কেউ কথা বলতেই পারেন। তাকে থামানো কঠিন।

৩. প্রথমে আসি টিভি চ্যানেলের কয়েক মিনিটের ভিডিও ক্লিপে। ফরেনসিক মেডিসিনের অধ্যাপক, যিনি আনুশকার ডেড বডির পোস্টমর্টেম করে রিপোর্ট দিয়েছেন, অবলীলায় টেলিভিশনের পর্দায় বলে যাচ্ছেন তিনি পোস্টমর্টেমে কী দেখেছেন (ক্ষতবিক্ষত গোপনাঙ্গ) এবং তা কীভাবে সংঘটিত হয়েছে সে বিষয়ে তার মতামত।। মৃত মেয়েটির গোপনাঙ্গ কীভাবে ক্ষতবিক্ষত হয়েছে, ব্যাপারটা কি স্বাভাবিক না বিকৃত যৌনাচার, শারীরিক সম্পর্কের সময় কোন টয় (sex toy) ব্যবহার করা হয়েছে কিনা তা নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা করেছেন। সেই গুরুত্বপূর্ণ আলোচনায় বিশিষ্ট এক আইনজীবীর অংশগ্রহণের দৃশ্য আছে। শারীরিক সম্পর্কের সময় সেক্স টয় ব্যবহার করলেও তা ধর্ষণের সংজ্ঞার ভেতরে পড়ে কিনা- এ নিয়ে আইনি ব্যাখ্যায় সেই আইনজীবী প্রজ্ঞা দেখিয়েছেন। আমার কাছে মনে হয়েছে, একটি (গোপন) আদালতে যেসব শব্দ বা বাক্যের ব্যবহার সতর্কতার সাথে করার অনুমতি থাকে, তা প্রকাশ্যে একটি টিভি চ্যানেলে দু’জন জ্ঞানী ব্যক্তি অবলীলায় করে গেছেন। উপস্থাপিকাও তার ক্ষুরধার প্রশ্ন নিয়ে তাদের ‘কথা বলা’কে উৎসাহিত করেছেন! এ নিয়ে কারও কোনো প্রতিক্রিয়া দেখিনি। তারা যখন কথা বলছিলেন, তখন তাদের কথার মধ্যে কোন জড়তা বা অস্বস্তিও আমি খেয়াল করিনি। এ ধরনের একটি সিরিয়াস বিষয় নিয়ে কথা বলার সময় কেন তারা অস্বস্তি বোধ করেননি তা আমার এই ছোট মাথায় আসছে না। কেউ মারা গেলে কি তা সরকারি সম্পত্তি হয়ে যায়? সেই মৃতদেহ নিয়ে যার যা ইচ্ছে বলবেন, যা ইচ্ছে বলাবেন? মামলার বাদী বিবাদীর কি কোন গোপনীয়তা নেই? একটি মৃত মেয়ের শরীরের বর্ণনা দিতে আপনাদের একটুও বুক কাঁপলোনা? আপনাদের কি খেয়াল ছিলনা যে আপনাদের এ অনুষ্ঠান অনেক অপ্রাপ্তবয়স্ক ছেলেমেয়েরাও দেখছে? সবচেয়ে বড় কথা হচ্ছে সেই মৃত মেয়েটি যদি আপনার মেয়ে হতো তখন?

৪. এবার বলি অনলাইন চ্যানেলের লাইভ টক শো নিয়ে। ফেসবুকের একটি পরিচিত গ্রুপ। তারা মূলত মানসিক সমস্যা নিয়ে আলোচনার আয়োজন করে থাকেন। দর্শকরা লাইভ অনুষ্ঠানে সরাসরি যোগদান করতে পারেন। ওইদিনের লাইভ টকশোতে দু’জন অতিথি ছিলেন। দু’জনই বাংলাদেশের দুই স্বনামধন্য শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের শিক্ষক। অনুষ্ঠানে প্রশ্ন ওঠেছে কেন এতো ধর্ষণ এবং বিকৃত যৌনাচারের ঘটনা ঘটছে। একপর্যায়ে আমি একটু বিস্মিত হয়ে দেখলাম এক শিক্ষক বেশ কিছু কারণ উল্লেখ করেছেন, যার ভেতর একটি হচ্ছে- ছোট পরিবার, ছোট ছেলে মেয়েদের অন্যরুমে রাখার ব্যবস্থা না থাকা, স্বামী-স্ত্রীর মধ্যে দিনের বেলা ঝগড়াঝাঁটি কিন্তু রাতের বেলা অন্তরঙ্গ সময় ইত্যাদি ইত্যাদি। এ অতিথির বক্তব্য হচ্ছে যে, এসব দেখে শিশুরা অনেক সময় বিভ্রান্ত হচ্ছে। দিনের বেলা তারা দেখতে পাচ্ছে মা-বাবা ঝগড়াঝাঁটি করেন কিন্তু রাতের বেলা তারা শারীরিক সম্পর্কে লিপ্ত হচ্ছেন। এসব দৃশ্য শিশুরা দেখছে। তারা কনফিউজড হচ্ছে। তারা তাদের সেই কনফিউশন থেকে বিকৃত যৌনাচারে লিপ্ত হচ্ছে! আমি বিস্ময়ে বিমূঢ় হয়ে গেলাম। এ কোন ধরনের যুক্তি? হতে পারে তিনি কোন গবেষণাপত্রে তা পেয়েছেন। কিন্তু এধরনের একটি বিষয় এবং এ ধরনের একটি বর্ণনা প্রকাশ্যে ফেসবুক লাইভে দেয়া কতটুকু মানানসই হলো?

৫. মিডিয়াতে কোন কোন বিষয়ে কতটুকু কথা বলা যাবে তা মনিটর করার জন্য বাংলাদেশে নিশ্চয়ই একটি রেগুলাটরি বডি আছে। উনারা কি এসব ব্যাপার মনিটর করেন? নাকি উনাদের কাজ হচ্ছে শুধুমাত্র সরকারবিরোধী কোনো বক্তব্য আসলো কিনা তা মনিটর করা?

৬. বাংলাদেশের সমাজ ও সংস্কৃতি কি এমন পর্যায়ে চলে গেছে বাছ-বিচার ছাড়াই যেকোনো বিষয়ে যে কেউ টিভিতে বা অনলাইন মিডিয়ায় কথা বলতে পারেন? আমি নিশ্চিত বাংলাদেশ এমন পর্যায়ে উন্নীত হয়নি।

৭. আদালতে বিচারাধীন বিষয় নিয়ে প্রকাশ্যে মিডিয়ায় আলোচনা এবং মতামত দেয়ার ব্যাপারে আদালতের একটি স্পষ্ট নির্দেশনা দরকার। Adult conversation and content প্রকাশ্য মিডিয়ায় আলোচনায় আসতে পারে কিনা সে ব্যাপারেও একটি নির্দেশনা খুবই প্রয়োজন। রক্ষণশীল একটি সমাজে প্রাপ্তবয়স্কদের বিষয় নিয়ে এভাবে আলোচনা পর্যালোচনা ইলেকট্রনিক মিডিয়ায় করা সম্ভব বা উচিত?

৮. যুক্তরাজ্যে মিডিয়ার জন্য একটি আইন আছে। এখানে মিডিয়াকে নিয়ন্ত্রণ করার জন্য নিরপেক্ষ শক্তিশালী যে body আছে তার নাম ofcom.
যারা মিডিয়ার সাথে জড়িত তারা যমের মতো ofcomকে ভয় পান। শিশু এবং অপ্রাপ্ত বয়স্কদের রক্ষা করার জন্য ofcom এর একটি স্পষ্ট নির্দেশনা আছে। যাকে আমরা বলি watershed. সকাল সাড়ে ৫টা থেকে রাত ৯টা পর্যন্ত রেডিও বা টিভি চ্যানেলের কোথাও এমন কোন আলোচনা/ নাটক/সিনেমা (গালাগালি, মারামারি, সেক্স কনটেন্ট) দেখানো যাবেনা যা শিশু এবং অপ্রাপ্তবয়স্কদের ওপর ক্ষতিকর প্রভাব ফেলে। আইন ভঙ্গ করলে শাস্তি অবধারিত এবং মারাত্মক। আদালতে বিচারাধীন বিষয় নিয়ে কথা বলা তো কল্পনারও অতীত।

৯. বাংলাদেশে watershed এর মতো একটি গাইডলাইন খুবই প্রয়োজন। বিচারাধীন বিষয়ে মিডিয়ায় প্রকাশ্যে (বিচারক, আইনজীবী ও ডাক্তারদের) আলোচনার বিষয়ে স্পষ্ট নির্দেশনা আসা খুবই দরকার। প্রাপ্তবয়স্কদের বিষয় নিয়ে অবলীলায় টকশো করা এবং অদ্ভুত সব যুক্তি দেয়ার মাধ্যমে শিশু এবং অপ্রাপ্ত বয়স্কদের আমরা কী মেসেজ দিচ্ছি তা নিয়ে আবার একটু চিন্তা করুন।

১০. অনলাইন গ্রুপের লাইভ টকশোর শেষের দিকে ছোট্ট একটি বক্তব্য আছে। বক্তব্যটি আমার চিন্তাজগতে প্রভাব ফেলেছে। সিলেট ওসমানী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের সাইকিয়াট্রি বিভাগের সহকারী অধ্যাপক ডাক্তার সাঈদ এনাম ওয়ালিদ একটি সুন্দর কথা বলেছেন। তিনি বলেছেন যে, তার কাছে মনে হচ্ছে মিডিয়াতে এসে বাংলাদেশে রেপ ভিক্টিমের শারীরিক বর্ণনা যারা দিচ্ছেন এবং যারা এ বিষয়ে শুনতে/জানতে গভীর আগ্রহী তারা মানসিকভাবে সুস্থ আছেন কিনা তা নিয়ে চিন্তার অবকাশ আছে। তাদের মধ্যে অনেকেই হয়তো মানসিকভাবে অসুস্থ।

১১. চিন্তার বৈকল্য আমাদের ধ্বংস করছে। নিজেদের অজান্তেই আমরা এমন একটি সমাজ গড়ছি যা আমাদের জন্য কাল হয়ে দাঁড়াচ্ছে।


লেখক: কনসালটেন্ট সাইকিয়াট্রিস্ট এবং
প্রাক্তন Forensic Medical Examiner,
যুক্তরাজ্য।
ইমেইল- [email protected]

পাঠকের মতামত

**মন্তব্য সমূহ পাঠকের একান্ত ব্যক্তিগত। এর জন্য সম্পাদক দায়ী নন।

Iqbal chowdhury

২০২১-০১-২৬ ০৪:২১:৪৫

An excellent article. Thanks Dr. Jahan.

Sayeem

২০২১-০১-২৪ ২২:২০:০৩

I think it has root problem. We are now in transition point. So some will be filtered very soon and then it's become good health society.

gts

২০২১-০১-২৪ ২২:০২:৩২

Now this time we are living in "Herok Ranir Desh". So, take it easy.. .

আপনার মতামত দিন

মত-মতান্তর অন্যান্য খবর

মত মতান্তর

কাশিমপুর থেকে আজিমপুর

২৮ ফেব্রুয়ারি ২০২১

পর্যালোচনা

'বীরত্বসূচক পদক' বাতিল করা যায় না

১২ ফেব্রুয়ারি ২০২১

পরামর্শক সেবা বা কনসালটেন্সি

১০ ফেব্রুয়ারি ২০২১



মত-মতান্তর সর্বাধিক পঠিত



হাজী সেলিমপুত্র ইরফানকাণ্ড

আল্লাহর মাইর, দুনিয়ার বাইর

ড্রাইভার মালেকের বালাখানা

দরজা আছে, দরজা নেই

আইন পেশায় বিরল এক মানুষ ব্যারিস্টার রফিক-উল-হক

অ্যাটর্নি জেনারেল পদে বেতন নেননি, লড়েছেন দু'নেত্রীর মামলা নিয়ে

DMCA.com Protection Status