৯৩ বছরের পুরনো আইনে চলছে বনবিভাগ

রাশিম মোল্লা

এক্সক্লুসিভ ১৪ জানুয়ারি ২০২১, বৃহস্পতিবার | সর্বশেষ আপডেট: ১১:৩৬ পূর্বাহ্ন

বন আইন ১৯২৭। ৯৩ বছরের পুরনো আইন। এ আইনে নেই বনের সংজ্ঞা, বনের ধরন, বন সংরক্ষণ প্রক্রিয়া ও উন্নয়ন কাজে বনের জমি ব্যবহার ও বরাদ্দ প্রদান বিষয়ে উল্লেখ। এ সংক্রান্ত নেই কোনো বিধিমালা। সরকারি গেজেট প্রজ্ঞাপন দ্বারা সংরক্ষিত বনের মর্যাদা রহিতকরণের সুযোগ ধারা ২৭ রাখা হলেও এক্ষেত্রে বন অধিদপ্তরের পূর্বানুমতি গ্রহণ ও কী প্রক্রিয়ায় রহিত করা হবে তা আইনে বলা নেই। ফলে ঢালাওভাবে ব্যবহৃত হচ্ছে বনভূমি। বন্যপ্রাণী (সংরক্ষণ ও নিরাপত্তা) আইন-২০১২তেও সংকটাপন্ন ও বিপন্ন বন্যপ্রাণীর পরিবেশ স্বাভাবিক অবস্থায় ফিরিয়ে আনতে ও তা সুরক্ষায় কী করা হবে তার উল্লেখ নেই। এ সংক্রান্ত সুনির্দিষ্ট কর্ম পরিকল্পনা প্রণয়ন করার কোনো বিধানও রাখা হয়নি।
করাত কল (লাইসেন্স) বিধিমালা-২০১২ এর বিধি ৭ (ক) এ পৌর এলাকায় করাত কল স্থাপন ও পরিচালনার সুযোগ থাকায় সংরক্ষিত বনের পাশে বা মধ্যে অবস্থিত পৌর এলাকায় করাত কল স্থাপন করে সংরক্ষিত ও রক্ষিত বনের গাছ চুরির ঝুঁকি বাড়িয়ে দিয়েছে। এ ছাড়া, বন সংরক্ষণ ও ব্যবস্থাপনা কার্যক্রমে আধুনিক প্রযুক্তির সমপ্রসারিত না হওয়া এবং এসব ব্যাপারে সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয় ও অধিদপ্তরের কার্যকর উদ্যোগের ঘাটতি বিদ্যমান। টিআইবি’র নির্বাহী পরিচালক ড. ইফতেখারুজ্জামান বলেন, বন আইনের বিধিমালার অনুপস্থিতি খুবই অবাক করার মতো বিষয় এবং ৯৩ বছরের পুরনো আইন বিদ্যমান থাকায় সংস্থাটির সদিচ্ছার সম্পূর্ণ ঘাটতি হিসেবেই বিবেচনা করছি, যা অত্যন্ত হতাশাব্যঞ্জক। আইনটির খসড়া হয়েছে বলে আমরা জানি কিন্তু বিশেষ কোনো অগ্রগতি হয়নি। সার্বিক পরিস্থিতি বিবেচনায় নিয়ে বন অধিদপ্তরকে ঢেলে সাজাতে হবে। নতুন আইন প্রণয়নসহ আমূল পরিবর্তন করতে হবে।
এ ছাড়া, বন অধিদপ্তর কর্তৃক বৈষম্যমূলকভাবে ক্ষমতার অপব্যবহার এবং বনকেন্দ্রিক যে দুর্নীতি তার ঘটনায় অধিদপ্তরের একশ্রেণির কর্মকর্তাদের যোগসাজশ ও অদক্ষতা টেকসই বন উন্নয়নের অন্যতম প্রতিবন্ধক হিসেবে দাঁড়িয়েছে বলে মনে করেন ড. জামান। তিনি বলেন, রিমোট সেন্সিং ও আধুনিক প্রযুক্তির সহায়তায় সর্বোচ্চ ও কার্যকরভাবে বন ব্যবস্থাপনার উন্নতি বাধাগ্রস্ত হচ্ছে অধিদপ্তরের একশ্রেণির অসাধু কর্মকর্তার কারণে। যার কারণে বন ও বনজ সম্পদের সুরক্ষা নিশ্চিতের ক্ষেত্রে বন অধিদপ্তরের কার্যক্রম বিশেষভাবে প্রশ্নবিদ্ধ হয়ে পড়েছে। বন সুরক্ষায় সরকারের উদাসীনতাও লক্ষণীয়। কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎ প্রকল্পসহ শিল্পকারখানাসমূহ অবারিতভাবে বনাঞ্চলে গড়ে উঠতে দেয়া হয়েছে এবং সেক্ষেত্রে বন অধিদপ্তর কখনোই তার ভূমিকাটি জোরালোভাবে পালন করতে পারেনি।
বন অধিদপ্তরের সকল স্তরের কার্যালয়ের কর্মকাণ্ডে কার্যকর তদারকি, পরিবীক্ষণ, জবাবদিহিতা ও ‘ফরেস্ট্রি পারফরমেন্স অডিট’-এর অনুপস্থিতিতে বন অধিদপ্তরকেন্দ্রিক দুর্নীতির প্রাতিষ্ঠানিকীকরণ হয়েছে বলে মন্তব্য করেছে ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ (টিআইবি)। এ ছাড়া, ৯৩ বছরের পুরনো বন আইন (১৯২৭)-এর কার্যকর প্রয়োগে প্রয়োজনীয় বিধিমালা ও কর্মপরিকল্পনা প্রণয়ন ও আমূল সংস্কারের জন্য কার্যকর উদ্যোগের ঘাটতি রয়েছে। অধিদপ্তরের কর্মকাণ্ড বননির্ভর আদিবাসীদের প্রথাগত ভূমি অধিকার সুরক্ষাবান্ধব ও অন্তর্ভুক্তিমূলক নয়। বননির্ভর জনগোষ্ঠীর প্রথাগত ভূমি অধিকার হরণ, বন আইন লঙ্ঘন ও একতরফাভাবে সংরক্ষিত বন, বন্যপ্রাণীর অভয়ারণ্য, জাতীয় উদ্যান ঘোষণাসহ জবরদখল উচ্ছেদের নামে অধিদপ্তরের বৈষম্যমূলকভাবে ক্ষমতা চর্চার সামপ্রতিক উদাহরণ রয়েছে। সম্প্রতি ‘বন অধিদপ্তর: সুশাসনের চ্যালেঞ্জ ও উত্তরণের উপায়’ শীর্ষক গবেষণা প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে টিআইবি। ওই প্রতিবেদনে বলা হয়, বন অধিদপ্তরের কার্যক্রম বাস্তবায়নে অগ্রাধিকারমূলক বরাদ্দ, অবকাঠামো ও লজিস্টিকস-এর ঘাটতি এবং এ ব্যাপারে যথোপযুক্ত ও কার্যকর উদ্যোগের অভাব লক্ষ্য করা যায়। অধিদপ্তরের কর্মকাণ্ডসহ রাজস্ব সংগ্রহের লক্ষ্যমাত্রা অর্জন, বন সংরক্ষণ ও বনায়নকে কেন্দ্র করে দুর্নীতির বিস্তার এবং তা প্রতিরোধে কার্যকর পদক্ষেপের ঘাটতি আছে বলে মনে করে টিআইবি।
প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়, বন মামলার কার্যক্রম পরিচালনার জন্য নেই পৃথক বাজেট। নামে মাত্র রিটেইনার ফি রয়েছে। বন অধিদপ্তরের মাঠ পর্যায়ের কার্যালয়গুলোতে অত্যাবশ্যক অবকাঠামো ও আসবাবপত্রের সংকটে ক্ষেত্রবিশেষে প্রায় পরিত্যক্ত ভবন বা ঘরে বনকর্মীরা দাপ্তরিক কাজ সম্পাদন করেন। বন মামলার আলামত সংরক্ষণের জন্য নিজস্ব সংরক্ষণাগার নেই। ফলে জব্দ ও উদ্ধারকৃত গাছ ও কাঠ উন্মুক্ত স্থানে ফেলে রাখায় তা নষ্ট হয়ে যায়। বনায়ন, বনভূমি সংরক্ষণ ও ব্যবস্থাপনা কার্যক্রম বিজ্ঞানসম্মত উপায়ে পরিচালনার লক্ষ্যে আধুনিক প্রযুক্তির (যেমন, জিআইএস ও রিমোট সেন্সিং) ব্যবহার সমপ্রসারণ করা হয়নি। বনভূমির জমির দলিল, রেকর্ডপত্র ও মানচিত্র, মামলার আলামত, ইত্যাদি এখনো সনাতন পদ্ধতিতে সংরক্ষণ করায় তা বিনষ্ট, চুরি ও হারিয়ে যাওয়ায় বনভূমি জবরদখলের সুযোগ তৈরি হয়েছে।
প্রাপ্ত তথ্যে দেখা যায়, এ পর্যন্ত বনভূমির প্রায় এক লাখ ৬০ হাজার ২৪০ একর জমি বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান বরাদ্দ করে নিয়ে গেছে। ২০১৯ সালের ডিসেম্বর অবধি মোট ২ লাখ ৮৭ হাজার ৪৫৩ একর বনভূমি জবরদখল করা হলেও অধিদপ্তর কর্তৃক সর্বশেষ পাঁচ বছরে মাত্র ৮ হাজার ৭৯২ একর (৩%) জবরদখলকৃত বনভূমি উদ্ধার করা সম্ভব হয়েছে। জবরদখলকৃত বনভূমি উদ্ধারের পরিমাণ কম হওয়ার পেছনে বন অধিদপ্তরের অভ্যন্তরীণ ও বাহ্যিক কারণ রয়েছে। এক্ষেত্রে বনভূমির জমির দলিল ও নথিপত্র অধিদপ্তরের কাছে চূড়ান্ত অবস্থায় না থাকা ও যথোপযুক্ত উদ্যোগের অভাব রয়েছে।

আপনার মতামত দিন

এক্সক্লুসিভ অন্যান্য খবর

পর্ব-৫৩

আমি জানি কোনো কিছুই নিশ্চিত নয়

২৬ জানুয়ারি ২০২১

পর্ব-৫১

তারা এক নিষ্ঠুর গোলক ধাঁধায় আটকে থাকলো

২৪ জানুয়ারি ২০২১

ইসমোনাকের অভিনব উদ্ভাবন

‘ক’ বর্ণের শব্দের খোঁজে ২০ বছর

২৩ জানুয়ারি ২০২১



এক্সক্লুসিভ সর্বাধিক পঠিত

DMCA.com Protection Status